উত্তরপ্রদেশের প্রয়াগরাজে ১৪৪ বছর পর ২০২৫ সালে মহাকুম্ভমেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বিশ্বজুড়ে লক্ষ লক্ষ ভক্ত এই পবিত্র উৎসবে অংশগ্রহণ করতে এসেছেন। ভক্তদের বিশ্বাস যে প্রয়াগরাজে অনুষ্ঠিত মহাকুম্ভের ত্রিবেণী সঙ্গমে স্নান করলে তাঁদের পাপ ধুয়ে যায় এবং মোক্ষলাভ হয়।
মহাকুম্ভ কোথায়
মূলত চারটি তীর্থস্থানে নদীতীরবর্তী মেলাগুলিকে কুম্ভমেলা বলা হয়। এগুলো হল যথাক্রমে – প্রয়াগরাজ (গঙ্গা-যমুনা-সরস্বতী নদীর সঙ্গম), হরিদ্বার (গঙ্গার তীরে), নাসিক-ত্র্যম্বক (গোদাবরীর তীরে), এবং উজ্জয়িনী (শিপ্রা নদীর তীরে)। তবে এদের মধ্যে প্রয়াগরাজের গঙ্গা, যমুনা এবং সরস্বতী নদীর মিলনস্থল বা ত্রিবেণী সঙ্গম হল মহাকুম্ভ স্নানের কেন্দ্রবিন্দু। সরস্বতী নদীর কথা বলা হলেও তার উল্লেখ পুরাণেই রয়েছে। বাস্তবে এখানে শুধুই গঙ্গা এবং যমুনার মিলন হয়েছে।
আরও পড়ুন: গঙ্গাসাগর ভ্রমণ
মহাকুম্ভের ইতিহাস
পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে সমুদ্র মন্থনের সময় অমৃতের অধিকার নিয়ে দেবতা ও অসুরদের মধ্যে প্রচণ্ড যুদ্ধ বাধে। তখন ভগবান বিষ্ণু, দেবী মোহিনীর রূপ ধারণ করে মধ্যস্থতা করেন এবং অমৃতের কলসী নিয়ে উঠে আসেন। এই সময়ে তাড়াহুড়োতে কয়েক ফোঁটা অমৃত চারটি জায়গায় পড়ে। এই চারটি জায়গা হল – প্রয়াগরাজ, উজ্জয়িনী, হরিদ্বার ও নাসিক। সেই থেকে এই চার জায়গায় কুম্ভমেলা আয়োজিত হয়।তবে গঙ্গা, যমুনা ও সরস্বতী নদীর সঙ্গমস্থল হওয়ায় প্রয়াগরাজের গুরুত্ব এই চার জায়গার মধ্যে সবচেয়ে বেশি। ভক্তদের বিশ্বাস অনুযায়ী শাহী স্নানের মুহূর্তে যাঁরা এই তিন নদীর সঙ্গমস্থলে স্নান করেন, তাঁদের মুক্তিলাভ হয়।
মহাকুম্ভে স্নানের উৎসব ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম বৃহত্তম ধর্মীয় মিলন হিসেবে গণ্য করা হয়। অনেকের মতে এটি বিশ্বের বৃহত্তম ধর্মীয় মিলন উৎসব। কবে থেকে ঠিক এর শুরু হয়েছে, এ নিয়ে তর্ক রয়েছে। সম্রাট হর্ষবর্ধনের আমলে যে কুম্ভমেলার আয়োজন হত, তার নথি পেয়েছেন বলে ইতিহাসবিদদের একাংশের দাবি। এই প্রয়াগরাজেই প্রতি পাঁচ বছর অন্তর কুম্ভমেলার আয়োজন করতেন তিনি। সেখানে তিনি সবকিছু দান করে যেতেন, এমনকি দান করতে করতে নিজের পরনের বস্ত্রটুকুও নাকি দান করে দিতেন।
তবে, অনেক ঐতিহাসিকদের মতে উনিশ শতকের আগে “কুম্ভ মেলা” নামের কোন মেলার ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায় না। তবে মাঘ মেলার কথা বহু প্রাচীন। মাঘ মাসে এই মেলা বিভিন্ন স্থানে হত – যেখানে ছয় বা বারো বছর পর পর প্রচুর মানুষের সমাবেশ হত। কালক্রমে সেই মেলাই কুম্ভমেলার রূপ নিয়েছে কিনা তা তর্কের বিষয়।
মহাকুম্ভ কীভাবে যাবেন
দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে প্রয়াগরাজের জন্য তেরো হাজারেরও বেশি ট্রেন চালানো হচ্ছে। এই তেরো হাজার ট্রেনের মধ্যে দশহাজার নিয়মিত এবং তিনহাজার স্পেশাল ট্রেন রয়েছে। মহাকুম্ভের সময় এই ট্রেনগুলি চালু থাকবে যাতে এখানে ভক্তদের কোনও সমস্যা না হয়। এই সময়ে প্রয়াগরাজের নয়টি স্টেশন থেকে ট্রেন চলবে। যেগুলো হল প্রয়াগরাজ জংশন, প্রয়াগরাজ সঙ্গম, রামবাগ সিটি স্টেশন, প্রয়াগ স্টেশন, সুবেদারগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশন, চিউনকি জংশন, ঝুনসি স্টেশন, ফাফামাউ স্টেশন এবং নৈনি রেলওয়ে স্টেশন। প্রয়াগরাজ জংশন জেলার প্রধান রেলস্টেশন এবং প্রয়াগরাজ সঙ্গম স্টেশন মেলাপ্রাঙ্গণের নিকটবর্তী। তবে ভিড় এবং যানজট এড়াতে শাহী স্নানের দু’দিন আগে বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে প্রয়াগরাজ সঙ্গম স্টেশন।
উত্তরপ্রদেশ রাজ্য সড়ক পরিবহন কর্পোরেশন রাজ্যের সমস্ত জেলা থেকে সাত হাজারের বেশি বাস পরিষেবা চালু করেছে। উত্তরপ্রদেশে থাকলে এই বাস পরিষেবা নিতে পারেন। তবে বাস বা ট্রেন যেভাবেই আসুন না কেন, মেলাপ্রাঙ্গণ এবং আশেপাশের এলাকাতেও অটো, টোটো, অনলাইন ক্যাব বা অন্য প্রাইভেট গাড়ি পাওয়ার অনেক কম। কিছু ক্ষেত্রে গাড়ি পেলেও মাঝপথে কোন চেকপয়েন্টে নেমে যেতে হতে পারে। মনে রাখবেন স্নানের জন্য এখানে প্রায় ৫ কিলোমিটার থেকে ১০ কিলোমিটার অবধি হাঁটতে হতে পারে। সেই অনুযায়ী সমস্ত পরিকল্পনা করুন।
এছাড়া বারাণসী বা দিল্লী হয়েও প্রয়াগরাজ যেতে পারেন। বারাণসী থেকে গাড়িতে করে দুই ঘণ্টার মধ্যে প্রয়াগরাজ পৌঁছানো যায়। সেক্ষেত্রে বারাণসী এবং কুম্ভমেলা একসাথে ঘুরে দেখার পরিকল্পনা করতে পারেন। আর দিল্লী হয়ে গেলেও একই যাত্রায় দিল্লিতেও ঘুরে নিতে পারবেন।
মহাকুম্ভে কোথায় থাকবেন
বর্তমানে প্রচুর আশ্রম এবং অস্থায়ী শিবিরের আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়াও বিভিন্ন হোটেল, গেস্ট হাউস রয়েছে। বাজেট হোটেল থেকে শুরু করে বিলাসবহুল হোটেল পর্যন্ত সমস্ত ব্যবস্থাই রয়েছে। তবে মেলায় যাওয়ার আগে থাকার ব্যবস্থা আগেভাগেই বুক করে রাখুন। অন্যথায় লাখ লাখ মানুষের ভিড়ে সেখানে পৌঁছে অনেক অসুবিধায় পড়বেন। এখানে থাকার জায়গা মেলা প্রাঙ্গণ থেকে অনেকটা দূরে, তাই আপনাকে অনেকটা হাঁটতে হবে। সেকারণে আরামদায়ক জুতো এবং পোশাক পরুন। ব্যাগে যথাসম্ভব কম জিনিসপত্র নেবেন। নিজে যতটুকু ভার বইতে পারবেন, ততটাই জিনিস ব্যাগে রাখুন। এছাড়াও অনেকেই শুধু স্নানের জন্যই যাচ্ছেন, তাঁদের জন্য সঙ্গমক্ষেত্রের কাছাকাছি পরিচ্ছন্ন ৫০টি শৌচালয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বোঝার সুবিধার জন্য মহিলাদের শৌচালয়ের রং গোলাপি এবং পুরুষদের শৌচালয়ের রং নীল রাখা হয়েছে।
আরও পড়ুন: কচুয়া ধাম ভ্রমণ
মহাকুম্ভে কী দেখবেন
১৪৪ বছর পর প্রয়াগরাজে মহাকুম্ভ মেলার আয়োজন হয়েছে। এই মেলা একাধারে পূর্ণ কুম্ভমেলা যা প্রতি ১২ বছর অন্তর প্রয়াগরাজে হয়। সেই সঙ্গে সঙ্গে জুড়েছে একটি বিশেষ যোগ। সেই যোগই পূ্র্ণ কুম্ভমেলা টিকে মহাকুম্ভ বানিয়েছে। সাধারণত যে চার প্রকারের কুম্ভমেলা হয়ে থাকে, তার বিবরণ নিচে দেওয়া হল।
- কুম্ভমেলা – ৪ বছরে একবার হয়।
- অর্ধকুম্ভমেলা – ৬ বছরে একবার হয়।
- পূর্ণ কুম্ভমেলা – ১২ বছরে একবার হয়।
- মহাকুম্ভমেলা – ১৪৪ বছরে একবার হয়।
এখানে দর্শনীয় এবং করণীয় বিষয়গুলো তুলে দেওয়া হল।
শাহী স্নান
কুম্ভমেলার প্রধান আকর্ষণ হল শাহী স্নান। লক্ষ লক্ষ তীর্থযাত্রী গঙ্গা, যমুনার সঙ্গমের পবিত্র জলে স্নান করেন। তাঁরা বিশ্বাস করেন যে এই শুভ সময়ে স্নান করলে তাঁদের আত্মা পবিত্র হয় এবং পাপ ধুয়ে যায়। শাহী স্নানের তিথি আগামী অংশে উল্লিখিত রয়েছে। তবে ‘স্নানের ক্ষেত্র’ বলে চিহ্নিত জায়গাতেই স্নান করুন, অন্য জায়গায় স্নান করবেন না।
সাধুদের আখড়া
কুম্ভমেলায় বিভিন্ন আখড়া বসে। প্রতিটা আখড়া আসলে বিভিন্ন সন্ন্যাসীদের দল। এই সন্ন্যাসীরা ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসেন। তাঁদের নিজস্ব সংস্কৃতি নিয়ে আসেন। তাঁরা প্রায়শই ছাই এবং গেরুয়া পোশাক পরে আসেন। তাছাড়াও রয়েছে নাগা সাধু। এরা এদের কঠোর জীবনযাত্রা এবং ন্যূনতম পোশাকের জন্য পরিচিত। কুম্ভমেলার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ তাঁরা। ভক্তেরা তাঁদের কাছে আশীর্বাদ নিতে আসেন। অনেকেই আশীর্বাদের সাথে প্রসাদ দিয়ে থাকেন। তবে খেয়াল রাখবেন রাস্তাঘাটে যার তার কাছ থেকে প্রসাদ খাবেন না।
সাংস্কৃতিক এবং অন্যান্য অনুষ্ঠান
কুম্ভমেলা জুড়ে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়, যার মধ্যে রয়েছে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের কনসার্ট, লোকনৃত্য ইত্যাদি। ভারতের বিভিন্ন জায়গা থেকে আগত শিল্পীরা এই অনুষ্ঠানগুলির আয়োজন করেন। তাঁরা তাঁদের অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ওসেই অঞ্চলের ভারতের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে তুলে ধরেন।
তাছাড়াও এখানে অসংখ্য যোগাসন এবং ধ্যান শিবিরের আয়োজন করা হয়। বিখ্যাত গুরু এবং আধ্যাত্মিক নেতারা এই শিবিরগুলো পরিচালনা করেন।
মহাকুম্ভে কখন যাবেন
১৩ জানুয়ারি থেকে ২৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মহাকুম্ভ মেলা চলবে। এর মাঝে যে কোন সময় যাওয়া যায়। তবে যারা শাহী স্নানের জন্য মহাকুম্ভে যাচ্ছেন তাঁদের জন্য তারিখ গুলো দেখা হল –
- প্রথম শাহী স্নান: ১৩ জানুয়ারি
- দ্বিতীয় শাহী স্নান: মকর সংক্রান্তির দিন ১৪ জানুয়ারি।
- তৃতীয় শাহী স্নান: মৌনী অমাবস্যার দিনে ২৯ জানুয়ারি। এটা প্রধান শাহী স্নান। বলা হয় মৌনী অমাবস্যার দিনে প্রয়াগরাজ ও অন্যান্য তীর্থস্থানে স্নান করলে মোক্ষ লাভ হয়।
- চতুর্থ শাহী স্নান: বসন্ত পঞ্চমী বা সরস্বতী পূজার দিন ৩ ফেব্রুয়ারি।
- পঞ্চম শাহী স্নান: মাঘী পূর্ণিমার দিন ১২ ফেব্রুয়ারি।
- ষষ্ঠ এবং শেষ শাহী স্নান: মহাশিবরাত্রির দিন ২৬ ফেব্রুয়ারি।
সতর্কতা ও পরামর্শ
- ‘স্নানের ক্ষেত্র’ বলে চিহ্নিত জায়গাতেই স্নান করুন, অন্য জায়গায় স্নান করবেন না।
- রাস্তাঘাটে যার তার কাছ থেকে প্রসাদ খাবেন না।
- মেলাপ্রাঙ্গণ তো বটেই, তার আশেপাশের এলাকাতেও অটো, টোটো, অনলাইন ক্যাব বা অন্য প্রাইভেট গাড়ি পাওয়ার অনেক কম। কিছু ক্ষেত্রে গাড়ি পেলেও মাঝপথে কোন চেকপয়েন্টে নেমে যেতে হতে পারে।
- মনে রাখবেন স্নানের জন্য এখানে প্রায় ৫ কিলোমিটার থেকে ১০ কিলোমিটার অবধি হাঁটতে হতে পারে। সেই অনুযায়ী সমস্ত পরিকল্পনা করুন।
- যেহেতু অনেক হাঁটতে হবে, তাই আরামদায়ক জুতো এবং পোশাক পরুন।
- যথাসম্ভব ব্যাগে কম জিনিসপত্র নেবেন। নিজে যতটুকু ভার বইতে পারবেন, ততটাই জিনিস ব্যাগে রাখুন।
- সাধারণত ভিড় এবং যানজট এড়াতে শাহী স্নানের দু’দিন আগে বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে প্রয়াগরাজ সঙ্গম স্টেশন। তাই যেসময় যাচ্ছেন এটা মাথায় রাখবেন।
- সঙ্গমক্ষেত্রের কাছাকাছি পরিচ্ছন্ন ৫০টি শৌচালয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বোঝার সুবিধার জন্য মহিলাদের শৌচালয়ের রং গোলাপি এবং পুরুষদের শৌচালয়ের রং নীল রাখা হয়েছে।
- মোবাইলের চার্জ ফুরিয়ে গেলে মাঝপথে রিচার্জ করতে পাওয়ার ব্যাঙ্ক রাখুন, নাহলে অসুবিধায় পড়বেন।
সর্বশেষ সম্পাদনার সময়কাল – ২০২৫
আরও পড়ুন: পুরী ভ্রমণ
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান