সববাংলায়

সাগরদ্বীপ ভ্রমণ | গঙ্গাসাগর ভ্রমণ

বিভাগঃ ,

“সব তীর্থ বার বার, গঙ্গাসাগর এক বার” – এই কথাটা নিশ্চয়ই শুনে থাকবেন। বাংলার প্রাচীনতম ও বৃহত্তম মহাতীর্থ গঙ্গাসাগর। হিন্দুদের বিশ্বাস অনুযায়ী সমস্ত তীর্থে ভ্রমণ করলে যে পুণ্য মেলে, একবার গঙ্গাসাগর ভ্রমণেই সেই পুণ্য মেলে। গঙ্গাসাগর বলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে কাদা-জলের সমুদ্রে অসংখ্য মানুষের স্নানের ছবি বা ছাই-ভস্ম মাখা সাধু-সন্ন্যাসীর ভিড়। তীব্র ঠান্ডা বা ভিড় উপেক্ষা করেও মকর সংক্রান্তির পুণ্যলগ্নে একটি বারের জন্য সমুদ্রের জল মাথায় ছোঁয়ানোর তীব্র বাসনা। তবে পুণ্য অর্জনের জন্য না হলেও শুধু সৌন্দর্যের টানেই দুই দিন গঙ্গাসাগর ভ্রমণের অভিজ্ঞতা পেতে একবার এখানে ঘুরে আসুন। বঙ্গোপসাগরের কোলে অবস্থিত পশ্চিমবঙ্গের এই দ্বীপটি এক প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জায়গা।

সাগরদ্বীপ কোথায়

পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলায় গঙ্গা ও বঙ্গোপসাগরের মিলনস্থলে অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপ হল সাগরদ্বীপ। এটি গঙ্গাসাগর নামেও পরিচিত। কলকাতা শহর থেকে প্রায় ১১০ কিলোমিটার দূরে, বর্ধমান শহর থেকে প্রায় ২১০ কিলোমিটার দূরে এবং শিলিগুড়ি থেকে ৬৭০ কিলোমিটার দূরে দ্বীপটি অবস্থিত। বকখালি বা ফ্রেজারগঞ্জ সৈকত থেকে এর দূরত্ব ৭০ কিলোমিটারের কাছাকাছি।

সাগরদ্বীপের ইতিহাস

গঙ্গাসাগরের উল্লেখ ভারতীয় মহাকাব্য রামায়ণ ও মহাভারতে পাওয়া যায়। জনশ্রুতি অনুসারে, গঙ্গাসাগরে কপিল মুনির মন্দির প্রথম প্রতিষ্ঠা করেন রানী সত্যভামা। ১৪৩৭ সালে স্বামী রামানন্দ মন্দিরের বর্তমান মূর্তিটি প্রতিষ্ঠা করেন । ব্রিটিশ আমলেও এই দ্বীপ বেশ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। উপনিবেশিক শাসকরা দ্বীপটির ব্যবহার করত সামুদ্রিক পরিবহণ এবং সামরিক কর্মকাণ্ডের জন্য। স্বাধীনতার পর সাগরদ্বীপ ধীরে ধীরে একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন এবং তীর্থস্থানে পরিণত হয়।

কিংবদন্তি অনুসারে, এখানে কপিল মুনির আশ্রম ছিল। জনশ্রুতি অনুসারে কর্দম মুনি বিষ্ণুর সাথে চুক্তি করেন যে তিনি এই শর্তেই বিয়ে করবেন যদি বিষ্ণু তাঁর পুত্ররূপে জন্ম নেন। সেই শর্ত অনুযায়ী বিষ্ণু, কপিল মুনির রূপে জন্ম নেন। তাই কপিল মুনিকে বিষ্ণুর অবতার মনে করা হয়। বলা হয় কপিল মুনির আশ্রম এই দ্বীপেই অবস্থিত ছিল। একদিন রাজা সাগরের অশ্বমেধ যজ্ঞের ঘোড়াটি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। তখন রাজা তাঁর ৬০,০০০ পুত্রকে ঘোড়াটি খুঁজে বের করার জন্য পাঠান। খুঁজতে খুঁজতে তাঁরা কপিল মুনির আশ্রমের পাশে ঘোড়াটিকে খুঁজে পান। তাঁরা কপিল মুনিকে চোর বললে রেগে গিয়ে কপিল মুনি তাঁদের পুড়িয়ে ছাই করে দেন এবং তাঁদের আত্মাকে নরকে পাঠিয়ে দেন।

আসলে সাগর রাজা অশ্বমেধ যজ্ঞের আয়োজন করছেন দেখে ইন্দ্র ভয় পেয়ে গেছিলেন এবং ঘোড়াটি চুরি করে কপিল মুনির আশ্রমের পাশে রেখে এসেছিলেন। পরে সাগর রাজার বংশধর ভাগীরথের প্রার্থনায় কপিল মুনি রাজা সাগরের পুত্রদের উদ্ধারে রাজি হন। তিনি জানান দেবী গঙ্গা পৃথিবীতে এলে সেই জলে স্নান করেই রাজার পুত্রেরা মোক্ষলাভ করতে পারবেন। তখন রাজা ভাগীরথ ভগবান শিবকে অনুরোধ করেন যাতে ভগবান শিব গঙ্গাকে স্বর্গ থেকে পৃথিবীতে আসার নির্দেশ দেন। সেইমত গঙ্গা পৃথিবীতে এসে রাজা সাগরের ৬০,০০০ পুত্রকে মোক্ষদান করেন। তাঁরা গঙ্গাস্নান করে স্বর্গে চলে যান, কিন্তু গঙ্গা পৃথিবীতেই থেকে যান। বলা হয় মকর সংক্রান্তির দিনেই গঙ্গা পৃথিবীতে এসেছিলেন।

সাগরদ্বীপ কীভাবে যাবেন

ট্রেনে, বাসে বা গাড়ি তিনভাবেই এই দ্বীপে যাওয়া যায়। ট্রেনে বা বাসে করে কাকদ্বীপ পর্যন্ত যাওয়া যায়। কাকদ্বীপ থেকে গঙ্গার ঘাট অবধি পৌঁছে, লঞ্চে করে সাগরদ্বীপ যেতে হবে। সেখান থেকে অটো বা প্রাইভেট গাড়ি করে হোটেল, সমুদ্রসৈকত বা কপিল মুনির আশ্রম যাওয়া যায়। দ্বীপে যাওয়ার পথে লঞ্চে ভ্রমণ বেশ রোমাঞ্চকর। গঙ্গা এবং বঙ্গোপসাগরের মিলনস্থল দিয়ে যাওয়ার সময় পর্যটকরা প্রকৃতির এক অপূর্ব সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন। নিজের গাড়িতে করে গেলেও কাকদ্বীপ অবধিই যেতে পারবেন, তার পরের পথ একই।

তবে অটো বা প্রাইভেট গাড়ি করে যাবার সময় সাবধান। যেহেতু কাকদ্বীপ বা গঙ্গার ঘাট অবধিই নিজেদের আয়োজনে যাওয়া যায় এবং গঙ্গার ঘাট পেরোনোর পর অটো বা প্রাইভেট গাড়িই ভরসা, তাই অনেকক্ষেত্রেই ওরা অনেক বেশি দাম চায়। তাই সঠিকভাবে কথা বলে না উঠলে পরে সমস্যা হতে পারে। দ্বীপে পৌঁছে ওদের সাথে ভাল করে টাকাপয়সার কথা বলে নিন। তারপরেই গাড়িতে উঠুন।

সাগরদ্বীপে কোথায় থাকবেন

সাগরদ্বীপে থাকার জন্য রয়েছে বিভিন্ন ধরনের হোটেল, গেস্টহাউস এবং রিসোর্ট। গঙ্গাসাগর মেলার সময় অস্থায়ী তাঁবু এবং কটেজের ব্যবস্থাও করা হয়। হোটেলগুলির মধ্যে কিছু হোটেল রয়েছে সমুদ্রের কাছাকাছি, যা থেকে সমুদ্রের ঢেউয়ের শব্দ শুনতে পাওয়া যায়। আবার বহু হোটেলে রুম বা বাথরুম ভালো নয় । তাই অবশ্যই বুক করার সময় ভালো করে হোটেলের ব্যাপারে খোঁজ খবর করে নেবেন, নাহলে পৌঁছে সমস্যায় পড়তে পারেন। গঙ্গাসাগর মেলার সময় বিশেষ করে অনেক আগে থেকে বুক না করে গেলে রুম নিয়ে সমস্যা হয়।

সাগরদ্বীপে কী দেখবেন

ভৌগোলিক অবস্থানের জন্য ধর্মীয় ক্ষেত্রের পাশাপাশি পর্যটনের ক্ষেত্রেও জায়গাটি এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করেছে। এখানকার পরিবেশ এবং জীববৈচিত্র্যও অত্যন্ত সমৃদ্ধ। এই দ্বীপের প্রধান আকর্ষণ এখানের পরিবেশ। শহরের কোলাহল থেকে দূরে এসে প্রকৃতির মাঝে কয়েকটি দিন কাটানোর জন্য এটি আদর্শ স্থান। তবে গঙ্গাসাগর মেলার সময় লক্ষাধিক লোকের ভিড়ে পরিবেশ অন্যরকম থাকে। তাই শান্তিতে এখানের পরিবেশ অনুভব করতে চাইলে অবশ্যই মকর সংক্রান্তির সময় গঙ্গাসাগরের মেলা এড়িয়ে চলুন। গঙ্গাসাগর ভ্রমণের অভিজ্ঞতা পেতে আপনাকে যে যে জায়গা ঘুরে দেখতে হবে তা নিচে আলোচনা করলাম।

গঙ্গাসাগর সৈকত – এখানে সুন্দর শান্ত সৈকত বিরাজমান। বাঙালিদের কাছে অধিক পরিচিত দীঘা, মন্দারমনি, বকখালির পাশাপাশি সাগরদ্বীপ সৈকতও এখন এক পরিচিত নাম হয়ে উঠছে। পূর্বে এখানে যাতায়াতের অসুবিধা ছিল। বর্তমানে মেঠো রাস্তায় পিচের প্রলেপ পড়েছে, যাতায়াতও তুলনামূলক ভাবে সহজ হয়েছে। তাই এখন ভক্তগণ ছাড়াও শুধুই সমুদ্র বা সৈকতের আনন্দ নিতেও লোকে এই দ্বীপে ঘুরতে যাচ্ছে। এখানের সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্তের দৃশ্য অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর।

কপিল মুনির আশ্রম – গঙ্গাসাগর বলতেই যে দর্শনীয় স্থানটির কথা প্রথম মনে আসে তা হল কপিল মুনির আশ্রম বা মন্দির। এই মন্দির হিন্দুদের কাছে একটি পবিত্র স্থান। ছোট তিন চূড়া বিশিষ্ট মন্দিরের ভিতরে রয়েছে কপিল মুনি, সাগর রাজা এবং গঙ্গাদেবীর মূর্তি। এখানে পূজা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। এখানে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ তীর্থযাত্রী আসেন। মকর সংক্রান্তির দিনে জায়গাটি কানায় কানায় ভরে ওঠে।

কপিল মুনির মন্দিরের পাশেই মা গঙ্গা পার্ক। সন্ধ্যায় আলো দিয়ে সাজানো হয় পার্কটি। বেশ মনোরম এই পার্কে বসে সময় কাটাতে পারেন। তাছাড়াও টোটো বা গাড়ি করে কাছাকাছির মধ্যে লাইট হাউস, মনসা মন্দির, রামকৃষ্ণ মিশন এইসব জায়গা ঘুরে দেখতে পারেন। তবে গাড়িতে ওঠবার আগে ভাড়া এবং কতটা সময় ঘোরাবে সেই কথা অবশ্যই বলে নেবেন।

সাগরদ্বীপে কখন যাবেন

বছরের যেকোনো সময়ই যাওয়া যায়, তবে অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে এখানকার আবহাওয়া আরামদায়ক এবং পরিবেশ মনোরম থাকে। ঘুরতে গেলে এই সময়ের মধ্যে যাবেন তবে মকর সংক্রান্তির সময় এড়িয়ে চলুন। মকর সংক্রান্তির সময় গঙ্গাসাগর মেলা অনুষ্ঠিত হয়, যা অন্যতম বৃহৎ এক মেলা এবং এক বড় আকর্ষণ। এই সময়ে লক্ষ লক্ষ তীর্থযাত্রী এখানে এসে পুণ্যস্নান করেন এবং কপিল মুনির মন্দিরে পূজা দেন। মেলার সময় সাগরদ্বীপ একটি উৎসবের মেজাজে থাকে। আবার উদ্দেশ্য যদি পূজা দেওয়া হয়, তাহলে আগে থেকে পরিকল্পনা করে এই সময়ে ঘুরতে যেতে পারেন।

সাগরদ্বীপে কী খাবেন

সাগরদ্বীপে গেলে স্থানীয় মাছ এবং সামুদ্রিক খাবার উপভোগ করতে পারেন। গঙ্গাসাগর মেলার সময় ঘুরতে গেলে স্থানীয়দেড় তৈরি পাটিসাপটা, নলেন গুড়ের সন্দেশ এবং আরও অনেক কিছু খাবার পাবেন। গঙ্গাসাগর মেলার সময় স্থানীয় খাবারের স্টলগুলি পর্যটকদের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয়।

সাগরদ্বীপে কী কিনবেন

সাগরদ্বীপে বিভিন্ন ধরনের স্থানীয় হস্তশিল্প পাওয়া যায়। বিশেষ করে গঙ্গাসাগর মেলার সময় স্থানীয় বাজার থেকে বিভিন্ন সামগ্রী কিনতে পারেন যেগুলি শুধুমাত্র স্মৃতিচিহ্নই নয়, বরং সাগরদ্বীপের সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যের একটি অংশ হয়ে থাকবে।

সতর্কতা ও পরামর্শ

  • সমুদ্রতট একদম নোংরা করবেন না।
  • মকর সংক্রান্তিতে প্রচণ্ড ভিড় হয়, তাই সাবধানে থাকবেন। মকর সংক্রান্তিতে যাবার পরিকল্পনা থাকলে আগে থেকে হোটেল বুক করে যাবেন।
  • স্থানীয় যানবাহনে চড়বার আগে ওদের সাথে ভালভাবে কথা বলে নেবেন।

সর্বশেষ সম্পাদনার সময়কাল – ২০২


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading