ইতিহাস

তুলসী চক্রবর্তী

তুলসী চক্রবর্তী

তুলসী চক্রবর্তী (Tulsi Chakraborty) একজন বিখ্যাত বাঙালি চলচ্চিত্র অভিনেতা যিনি মূলত তাঁর কৌতুক অভিনেতার চরিত্রে অনবদ্য অভিনয়ের কারণে বিখ্যাত। ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ এবং ‘পরশপাথর’ তাঁর অভিনীত জনপ্রিয় দুটি চলচ্চিত্র।

কৃষ্ণনগরের গোয়ারী গ্রামে ১৮৯৯ সালে ৩ মার্চ জন্ম হয় তুলসী চক্রবর্তীর। তাঁর বাবা আশুতোষ চক্রবর্তী ছিলেন অবিভক্ত বাংলার রেলের কর্মী। বাবার বদলির চাকরিতে প্রায় অনেক জায়গায় ঘুরতে হত তাঁদের। তবে ছোটবেলাতেই পিতৃহারা হয়ে মা নিস্তারিণী দেবীকে নিয়ে জ্যাঠামশাই প্রসাদ চক্রবর্তীর জোড়াসাঁকোর বাড়িতে এসে ওঠেন তুলসী চক্রবর্তী ।

চরম অর্থকষ্ট থেকে বাঁচার জন্য কিশোর বয়সেই কলকাতা শহরে কাজ খোঁজা শুরু করেন তুলসী চক্রবর্তী। তাই পুঁথিগত শিক্ষালাভ তাঁর খুব বেশী হয়নি। তাঁর জ্যাঠা প্রসাদ চক্রবর্তী কাজ করতেন স্টার থিয়েটারে। তাঁর ছিল নিজের অর্কেস্ট্রা। সেই দলে শ্যামাসংগীত, কীর্তন গাইতেন তুলসী। কলকাতার রাস্তায় কাজের সন্ধানে ঘুরতে ঘুরতে মদের হোটেলে বেয়ারার চাকরি পেয়ে সেখানেই যোগ দেন। জ্যাঠামশাইয়ের আপত্তিতে এই কাজ তাঁকে শেষ পর্যন্ত ছাড়তে হয়। এরপরে তিনি যোগ দেন ঘড়ি সারাইয়ের দোকানে। সেখানেও মন না টিকলে তিনি পালিয়ে যান বর্মা। যে জাহাজে পালিয়েছিলেন, সেখানে ছিল এক সার্কাসের দল। সেখানেই কাজ নিলেন তিনি। মাঝে মাঝে জোকার সেজে খেলাও দেখাতেন। বলা হয় তাঁর হাস্যকৌতুকের প্রতি আকর্ষনের সূত্রপাত এখান থেকেই। জাহাজে থাকাকালীন তিনি শিখলেন হিন্দী এবং উর্দু ভাষা। ছ মাস পর তিনি দেশে ফিরে আসেন।

কলকাতায় ফিরে এসে জ্যাঠামশাইয়ের সুপারিশে তুলসী চক্রবর্তী কাজ শুরু করেন একটি ছাপাখানায়। কম্পোজিটারের কাজ করতে গিয়ে থিয়েটারের হ্যান্ডবিল আর পোস্টার দেখে তাঁর অভিনয় করার বাসনা জাগ্রত হয়। আবারো জ্যাঠামশাইকে অনুরোধ করে স্টার থিয়েটারে একটি কাজ জুটিয়ে নেন। থিয়েটার করার উদগ্র বাসনায় ৩২ টাকা মাইনের চাকরি ছেড়ে ৮ টাকা মাস মাইনেতে কাজ শুরু করেন স্টার থিয়েটারে এবং শীঘ্রই স্টার থিয়েটারের মালিক অপরেশ মুখোপাধ্যায়ের নজরে পড়েন তিনি। তাঁরই  তত্ত্বাবধানে তুলসী চক্রবর্তী টপ্পা, হারমোনিয়াম, তবলা, পাখোয়াজের তালিম নিতে শুরু করেন।

১৯২০ সালে দুর্গেশনন্দিনী নাটকে প্রথম মঞ্চে অভিনয়ের সুযোগ পান তিনি। এরপর দীর্ঘ সাত বছর তিনি স্টার থিয়েটারে যুক্ত থাকেন। ১৯২৭ সালে যোগ দেন মনমোহন থিয়েটারে। এরপর ১৯৩২ সালে নিউ থিয়েটারের ‘পুনর্জন্ম’ ছবিতে চলচ্চিত্র অভিনেতা হিসেবে অভিষেক হয় তাঁর। ছবিটি পরিচালনা করেছিলেন সাহিত্যিক প্রেমাঙ্কুর আতর্থী।  তবে তুলসী চক্রবর্তী অভিনেতা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন ‘শচীদুলাল’ ছবিটির মাধ্যমে। এই ছবিতে তিনি নিমাই গৌরাঙ্গের গুরু অদ্বৈতাচার্য এর ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন।সারা জীবনে প্রায় তিনশতাধিক বাংলা এবং তেইশটি হিন্দী ছবি করেছেন। করেছেন অসংখ্য নাটক। বাঙালীর কাছে তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন পরশপাথর এবং সাড়ে চুয়াত্তর ছবিদুটির জন্য।

তুলসী চক্রবর্তীর সহজাত অভিনয় ক্ষমতার সম্পর্কে বিভিন্ন গল্প শোনা যায়। একবার এক শুটিং ফ্লোরে অযাচিত ভাবে ঢুকে পড়ে বৈষ্ণব সাজার সুযোগ পেয়ে তুলসী চক্রবর্তী বৈষ্ণব রূপে শ্রীখোল হাতে পরিচালকের সামনে যেতেই তিনি তাঁকে একেবারে প্রথম সারিতে দাঁড় করিয়ে দেন এবং সেই দৃশ্যে শ্রীখোল বাজিয়ে হরিনামরত তুলসী চক্রবর্তীর দুচোখ ভরা জলে বুক ভিজে যাওয়া দেখে পরিচালক এমনই মুগ্ধ হন যে দেড় মিনিটের দ্রিশ্যকে চার মিনিট ধরে শ্যুট করেন এবং সিনেমাতেও সম্পূর্ণ অংশটি শেষ পর্যন্ত রাখেন। থিয়েটার করার সময়ে তুলসী চক্রবর্তী নাচেরও তালিম নেন। তাছাড়াও তিনি মুখে মুখে গান বাঁধার অবিশ্বাস্য ক্ষমতা ছিল তাঁর। এর সাথে ছিল টপ্পা-ঠুংরি গাওয়া রেওয়াজি কন্ঠস্বর। তাঁর এইসমস্ত গুণাবলী প্রত্যক্ষ করা যায় ‘কবি’ ছায়াছবিতে যেখানে কবিয়ালদের গানের লড়াই তিনি অত্যন্ত সুচারুভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন পর্দায়। একথাও শোনা যায়, রাজলক্ষী শ্রীকান্ত নাটকের শোয়ে একবার তবলচি অসুস্থ হয়ে পড়ায় জহর গাঙ্গুলীর অনুরোধে তুলসী চক্রবর্তী তবলা বাজিয়ে দিয়েছিলেন সমান দক্ষতায়।

পথের পাঁচালীর পন্ডিতমশাইয়ের ছোট্ট একটি চরিত্রে অভিনয় করেই সত্যজিৎ রায়ের নজরে আসেন তিনি। কালজয়ী বাংলা ছবি ‘পরশপাথর’- এর পরেশ কেরানীর চরিত্রে তুলসী চক্রবর্তী অভিনয় আজও বাঙালী মননে চির স্মরণীয় হয়ে আছে। ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ ছবিতে এক শহরের মেসমালিকের চরিত্রে তুলসী এবং তাঁর গ্রাম্য স্ত্রীর চরিত্রে মলিনা দেবীর খুনসুটি আজও দর্শকের মনে গেঁথে রয়েছে। এই ছবিতেই আত্মপ্রকাশ করে বাংলা ছায়াছবির নতুন জুটি উত্তমসুচিত্রা। শুধুমাত্র কমিক চরিত্র নয়, অভিনয় জীবনের শুরুর দিকে বহু রাশভারী চরিত্রেও অভিনয় করেছেন তিনি। ‘মেজদিদি’, ‘পন্ডিতমশাই’, ‘দর্পচূর্ণ’, ‘কবি’, ‘বামুনের মেয়ে’ প্রভৃতি ছবিগুলিতে তাঁর দাপুটে অভিনয় প্রত্যক্ষ করা যায়। 

তুলসী চক্রবর্তীর ব্যক্তি জীবন ছিল আর পাঁচটা সাধারণ মানুষের মতোই। সারাজীবনই তিনি অর্থকষ্টে ভুগেছেন। অথচ কখনো মুখ ফুটে নিজের ন্যায্য পাওনাটুকু দাবী করতে পারেননি। শোনা যায়, ‘পরশ পাথর’-এ অভিনয়ের প্রস্তাব নিয়ে সত্যজিৎ রায় স্বয়ং তুলসী চক্রবর্তী বাড়িতে হাজির হয়েছিলেন। এতবড় পরিচালক নিজে থেকে তাঁর দরজায় এসেছেন, আনন্দে কেঁদে ফেলেছিলেন তিনি। এই ছবির জন্য মাত্র ১৫০০ টাকা পারিশ্রমিক নিয়েছিলেন। সত্যজিৎ রায়ের অনেক অনুরোধের পরেও বেশী টাকা নিতে রাজি হননি তুলসী। বলেছিলেন, বেশী টাকা নিলে সবাই ভাববে তুলসী রেট বাড়িয়ে নিয়েছে। এরপর আর কেউ আমার কাছে কাজ নিয়ে আসবে না। এরপরই সত্যজিৎ রায় প্রোডাকশন কন্ট্রোলের লোকদের সাথে কথা বলেন তুলসী চক্রবর্তীর রেট বাড়ানোর জন্য। পরশপাথরের শুটিংয়ের সময় তাঁর হাওড়া থেকে টালিগঞ্জ যাতায়াতের জন্য গাড়ির ব্যবস্থা করা হলেও তিনি তা নিতে অস্বীকার করেছিলেন। তুলসী চক্রবর্তীর চলচ্চিত্রপঞ্জীতে পরশপাথর হল একমাত্র ছবি, যাতে তিনি নায়কের ভূমিকায় অভিনয় করেন। তাঁর অভিনয় দক্ষতা দেখে সত্যজিৎ রায় তুলসী চক্রবর্তীকে ভারতের মরিস শিভ্যালিয়র আখ্যা দিয়েছিলেন। উত্তম কুমার তুলসী চক্রবর্তী সম্পর্কে বলেছিলেন, “তুলসীদা যে ভাবে অভিনয় করেন, আমি তো কোনও দিনই পারব না। ওঁর মতো ‘জীবন্ত’ হয়ে ওঠা আমার দ্বারা হবে না।” সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বলেছিলেন, “কেউ যদি দেখাতে পারেন অমুক ছবিতে তুলসী চক্রবর্তী খারাপ অভিনয় করেছেন, তা হলে আমি লক্ষ টাকার বাজি হেরে যাব।”

অসামান্য প্রতিভাধর এই মানুষটির কদর অবশ্য টলিউড কোনদিনই সেভাবে করেনি। চিরকাল তিনি লঘু হাস্যরসাত্মক চরিত্র করার জন্যই ডাক পেতেন। পরশপাথরের সফলতার পরেও তুলসী চক্রবর্তী নিজের পারিশ্রমিক বাড়াননি। কাজ কমে যাওয়া এবং অর্থকষ্টের ভয়ে তিনি কোন রোলই বাদ দিতেন না। ফলত সারাজীবন ছোটখাটো পার্শ্বচরিত্রেই তিনি সীমাবদ্ধ থেকে গেলেন। তুলসী চক্রবর্তী এবং তাঁর স্ত্রী উষারানী নিঃসন্তান ছিলেন। সারাজীবন তাঁরা অর্থের জন্য সংগ্রাম করে অবশেষে হাওড়ার শিবপুরে একটি দোতলা বাড়ি কেনেন। কখনো অর্থাভাবে পৌরহিত্য করে দিন কাটিয়েছেন তিনি।

শেষ বয়সে তুলসী চক্রবর্তী প্রচন্ড অসুস্থ হয়ে পড়েন। চিকিৎসা করানোর মতো অর্থ সামর্থ্য তাঁর ছিলনা। ১৯৬১ সালের ১১ ডিসেম্বর তুলসী চক্রবর্তীর মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী চরম অর্থকষ্টে পড়েন। অবশেষে তুলসী চক্রবর্তীর পাওয়া মেডেলগুলি  বিক্রি করে তাঁকে অন্নসংস্থান করতে হয়।


এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com


 

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

সববাংলায় তথ্যভিত্তিক ইউটিউব চ্যানেল - যা জানব সব বাংলায়