ইতিহাস

সুধা ভট্টাচার্য

মানবদেহে আমাশয় (Amoebiasis) রোগ সৃষ্টিকারী প্রোটোজোয়া এন্টামিবা হিস্টোলাইটিকার উপর বিস্তারিত গবেষণার জন্য বিখ্যাত হয়েছেন মহিলা বিজ্ঞানী এবং লেখিকা সুধা ভট্টাচার্য (Sudha Bhattacharya)। পরজীবীটি নিয়ে গবেষণাকালে তিনি প্রথম পরজীবীটির দেহকোষে সার্কুলার ডিএনএ-র উপর রাইবোজোমাল আরএনএ-র উপস্থিতি আবিষ্কার করেন। প্রধানত আণবিক পরজীবীবিদ্যা (Molecular Parasitology) ও জিন নিয়ন্ত্রণের (Gene Regulation) উপর তিনি গবেষণা করেছিলেন। আশির দশকে ভারতবর্ষে যখন আণবিক জীববিদ্যা নিয়ে গবেষণার কোনো পরিকাঠামোই ছিল না সেই সময় এন্টামিবার উপর জিনস্তরের গবেষণা করে সারা পৃথিবীতে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন সুধা ভট্টাচার্য।

১৯৫২ সালের ৭ মার্চ সুধা ভট্টাচার্যের জন্ম হয়। ছোটোবেলা থেকেই তিনি অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। ১৯৭১ সালে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উদ্ভিদবিদ্যায় অনার্স নিয়ে স্নাতক উত্তীর্ণ হন সুধা ভট্টাচার্য। এরপর নতুন দিল্লিতে অবস্থিত ‘ইণ্ডিয়ান এগ্রিকালচারাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট’-এ স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের জন্য ভর্তি হন তিনি। ১৯৭৩ সালে জৈব রসায়ন ও আণবিক জীববিদ্যায় স্নাতকোত্তর উত্তীর্ণ হয়ে দীর্ঘ চার বছর ধরে একনিষ্ঠভাবে ‘এসচেরিচিয়া কোলাই’ নামের অণুজীবটি নিয়ে গবেষণা করেন সুধা ভট্টাচার্য। এসচেরিচিয়া কোলাই (Escherichia coli, E.coli)-এর দেহে কিভাবে আরএনএ (RNA) সংশ্লেষ নিয়ন্ত্রিত হয় তা আবিষ্কার করে ১৯৭৭ সালে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। কিন্তু এখানেই থেমে থাকেননি সুধা। পোস্ট-ডক্টরাল গবেষণার উদ্দেশ্যে তিনি বিদেশ যাত্রা করেন। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৭৭ সাল থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত সুধা ভট্টাচার্য ব্যাক্টেরিওফাজের উপর গবেষণা করেন এবং ১৯৭৯ সাল থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত তিনি বোস্টন বায়োমেডিকেল ইনস্টিটিউটে ব্যাক্টেরিয়ার দেহে ডিএনএ (DNA) অণুর দ্বিত্বকরণ বিষয়টির ওপর কাজ করেন। ‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ হেলথ’-এ ১৯৮৫ ও ১৯৮৬ এই দুই বছর ‘এক্সেনিক কাল্টিভেশন’ (Axenic Cultivation) নিয়ে পড়াশুনা করেন।

১৯৮১ সালে অল ইণ্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ মেডিকেল সায়েন্স-এ রিসার্চ অফিসার হিসেবে সুধা ভট্টাচার্যের কর্মজীবন শুরু হয়। ছিলেন। মাত্র এক বছর তিনি এই সংস্থায় কাজ করেন। ১৯৮২ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত টানা তিন বছর ‘টাটা রিসার্চ ডেভেলপমেন্ট অ্যাণ্ড ডিজাইন’ সংস্থায় বিজ্ঞানী হিসাবে তিনি নিযুক্ত হন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল মানবদেহের সাধারণ রোগগুলি ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে নির্ধারণ করা। এরপর সহকারী অধ্যাপক হিসেবে সুধা ভট্টাচার্য ১৯৮৬ সালে জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। এন্টামিবা হিস্‌টোলাইটিকা নিয়ে গবেষণা করার জন্য তিনি একটি গবেষণাগার স্থাপন করেন। জেএনইউ (JNU) পরিচালিত বিভিন্ন অ্যাকাডেমিক কমিটির প্রধান হিসাবে দায়িত্বভার সামলেছেন তিনি। শুধুমাত্র গবেষণাই নয়, তাঁর কাজের পরিধি ছিল আরো বিস্তৃত। পরিবেশ নিয়েও তিনি যথেষ্ট সচেতন ছিলেন। যে সমস্ত পরিবেশবিদরা প্রচলিত জ্ঞানের ভিত্তিতে পরিবেশ সংরক্ষণ করছেন, তাদের একটি তালিকা তৈরি করার সময় তিনি সন্ধান পান পরিবেশবিদ যাদব পেনাংয়ের। আসামের বাসিন্দা যাদব পেনাং আসামের একশো একর ঘন বনাঞ্চলকে গন্ডার ও হাতির জন্য সংরক্ষিত করেছিলেন।


প্রাকৃতিক খাঁটি মধু ঘরে বসেই পেতে চান?

ফুড হাউস মধু

তাহলে যোগাযোগ করুন – +91-99030 06475


 


স্নাতকস্তরে উদ্ভিদবিদ্যাই যেহেতু সুধা ভট্টাচার্যের বিষয় ছিল, তাই তিনি চেয়েছিলেন ‘ভলভক্স’ শৈবালের উপর কাজ করতে। কিন্তু মেডিকেল ইনস্টিটিউটে চাকরিসূত্রে যোগদান করায় মানবদেহে রোগসৃষ্টিকারী জীবাণু বিষয়ে তাঁকে বেশি মনোনিবেশ করতে হয়। কিছু বিদেশি গবেষণাপত্র পড়ে তিনি ‘কাইনেটোপ্লাস্টিড’ যেমন লিশম্যানিয়া এবং ট্রিপানোসোমার ওপর কাজ করার জন্য খুব আগ্রহী হয়ে পড়েন। কিন্তু আশির দশকে ভারতবর্ষে আণবিক জীববিদ্যা নিয়ে গবেষণা করা খুবই দুরূহ ছিল। গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত রাসায়নিক পদার্থ বিদেশ থেকে চড়া আমদানি শুল্ক দিয়ে আমদানি করতে হতো। তাই বাধ্য হয়েই প্রাথমিকভাবে এই গবেষণার আশা ছাড়তে হয় সুধাকে। এইসময় তাঁর বন্ধু ড. শিব পিল্লাই তাঁকে এন্টামিবা হিসটোলাইটিকার উপর গবেষণা করার পরামর্শ দিয়ে বলেন যে, ভারত তথা সারা বিশ্বে এন্টামিবার ওপর সেরকম উল্লেখযোগ্য কাজ হয়নি।

এন্টামিবা হিসটোলাইটিকার প্রকোপ ভারতের পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলিতে খুবই বেশি। পানীয় জল এবং খাদ্যদ্রব্যের মাধ্যমে এটি আমাদের শরীরে প্রবেশ করে। তারপর অন্ত্রে প্রবেশ করলে এটি ট্রফোজয়েট (Trophozoyate) গঠন করে অন্ত্রের কোষগুলিকে বিনষ্ট করতে থাকে। এমনকি যদি এই পরজীবী যকৃতে প্রবেশ করে, যকৃত-কোষকেও তা বিনষ্ট করে দেয় যার ফলে মানবদেহে আমাশয় রোগ দেখা হয়। কখনো কখনো এটি যকৃত ও অন্ত্রের কোষকে এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত করে যে মলের সঙ্গে রক্ত পর্যন্ত বেরোতে পারে। কিন্তু সেকালে এন্টামিবা হিস্টোলাইটিকা নিয়ে গবেষণার উপযোগী পরিকাঠামো ভারতবর্ষের কোনো গবেষণাগারেই ছিল না আর পরীক্ষার নমুনা হিসেবে প্রয়োজন ছিল বিশুদ্ধ এন্টামিবা। এন্টামিবা-আক্রান্ত মানুষের অন্ত্র বা যকৃত থেকে তা সংগ্রহ করতে গেলে অন্য ব্যাকটেরিয়া বা প্রোটোজোয়া তার মধ্যে মিশে থাকে, বিশুদ্ধ এন্টামিবা পাওয়া যায় না। আবার অন্যদিকে বিশুদ্ধ কালচার মিডিয়ামে এন্টামিবা উৎপন্ন করাও সম্ভব ছিল না ভারতে। কিন্তু সুধা ভট্টাচার্য হাল ছাড়বার পাত্রী নন। এই সময় জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি অধ্যাপনা করার সুযোগ পেয়ে তিনি নিজের উদ্যোগে সেখানে একটি গবেষণাগার প্রতিষ্ঠা করেন এবং গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় রাসায়নিক পদার্থ ও যন্ত্রপাতি বিদেশ থেকে নিঃশুল্কে আমদানি করতে তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী তাঁকে বিশেষ অনুমতি দেন। এন্টামিবা হিস্টলাইটিকা নামক পরজীবীর ওপর গবেষণা তাঁকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এনে দেয়। পরীক্ষাগারে তিনি পরজীবিটির গোলাকার ডিএনএ-এর মধ্যে রাইবোজোমাল আরএনএ (rRNA)-র উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন। শুধু তাই নয় পরজীবীটির জিনোমে বিভিন্ন রেট্রোট্রান্সপোশন্সের উপস্থিতি দেখেন। আরডিএনএ(rDNA) এর দ্বিত্বকরণ পদ্ধতির সাহায্যে আরডিএনএ(rDNA)-র অভ্যন্তরে রেপ্লিকেশনের স্থানটি খুঁজে পেয়ে যান সুধা। রেপ্লিকেশনের সূচনাস্থানটি শনাক্ত করতে পারলে কিভাবে এবং কি হারে পরজীবীটি বংশবিস্তার করছে তার ধারণা পাওয়া যায়। rRNA এবং r প্রোটিনের উপস্থিতি রাইবোজোমাল বায়োজেনেসিসের ঠিক পরবর্তী ধাপ অর্থাৎ ট্রান্সক্রিপশন নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতিকে নির্দিষ্ট করে। রেট্রোট্রান্সপশন্সের উপর তাঁর কাজ রেট্রোট্রান্সপজিশনের উপস্থিতি প্রমাণ করে। জিনের মধ্যে বারংবার ক্রসিং ওভার চলতে থাকলে বিভিন্ন ধরণের রেট্রোট্রান্সপজিশন তৈরি হয় আর তখনই রেট্রোট্রান্সপশন্সের মধ্যে বহুরূপতা বা পলিমরফিজম (Polymorphism) দেখা যায়। শুধু তাই নয় রেট্রোট্রান্সপশন্সের কোন কোন স্থানে বহুরূপতা হতে পারে সেই পরীক্ষাও গবেষণাগারে করেছিলেন সুধা ভট্টাচার্য।

২০০৭ সালে স্বামী ড: অলোক ভট্টাচার্যের সঙ্গে যুগ্মভাবে ‘আইডেন্টিফিকেশন অ্যাণ্ড ফাংশনাল ক্যারেকটারাইজেশান অফ এ নভেল লাইসিন-রিচ প্রোটিন ফ্রম এন্টামিবা হিস্টলাইটিকা’ নামে একটি বই লেখেন সুধা ভট্টাচার্য।

কাজের স্বীকৃতি হিসাবে নানা সম্মান ও পুরস্কার পেয়েছেন সুধা ভট্টাচার্য। বিশ্ব-ব্যাঙ্ক থেকে ১৯৮৫ সালে রবার্ট ম্যাকনামারা ফেলোশিপ লাভ করেন তিনি। ১৯৮৭ সালে ‘রকফেলার বায়োটেকনোলজি কেরিয়ার ডেভেলপমেন্ট’ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন তিনি। ১৯৯৩ সালে তিনি ‘গুহ রিসার্চ কনফারেন্স’-এর সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালে এবং ২০০১ সালে তিনি পেয়েছেন ‘ফোগার্টি ইন্টারন্যাশনাল কোলাবোরেশন পুরস্কার’। ২০০১ সালে ‘ইণ্ডিয়ান অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্স’-এর এবং ২০০৮ সালে ‘ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্স’-এর সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। এছাড়া ২০১৪ সালে ‘ন্যাশনাল সায়েন্স অ্যাকাডেমি’ও সদস্যপদ প্রদান করে সুধা ভট্টাচার্যকে। ২০১৫ সালে জে. সি. বোস ফেলো হিসেবে সম্মানিত হন সুধা। ‘স্কুল অফ এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স’-এর ডিন হিসেবে ২০১০ সাল থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত নিযুক্ত থাকাকালী সংস্থার বহুল উন্নতিসাধন করেছিলেন তিনি। ব্যাঙ্গালোরে অবস্থিত ‘ইণ্ডিয়ান ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্স’-এর অধীনে ‘অ্যানিম্যাল অ্যাণ্ড প্লান্ট সায়েন্স কমিটি’র বিভাগীয় সদস্যা সুধা ভট্টাচার্য। এছাড়াও ‘ইণ্ডিয়ান ন্যাশনাল সায়েন্স অ্যাকাডেমি’র (INSA) বিভাগীয় কমিটি, ‘কাউন্সিল অফ সাইন্টিফিক অ্যাণ্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ’-এর (CSIR) প্রাণীবিজ্ঞান ও জৈবপ্রযুক্তিবিজ্ঞান বিভাগের রিসার্চ কমিটি, ‘সায়েন্স অ্যাণ্ড ইঞ্জিনিয়ারিং রিসার্চ বোর্ড’ (SERB) নিয়ন্ত্রিত ‘অ্যানিম্যাল সায়েন্স প্রোগ্রাম অ্যাডভাইসারি কমিটি’ ইত্যাদির সদস্যপদ লাভ করেছেন সুধা ভট্টাচার্য।

বর্তমানে তিনি ‘সত্যেন্দ্রনাথ বোস ন্যাশনাল সেন্টার ফর বেসিক সায়েন্স’-এর পরিচালন সমিতি, নতুন দিল্লির ‘ইনস্টিটিউট অফ প্যাথোলজি’র সায়েন্টিফিক অ্যাডভাইসারি কমিটি এবং জে. বায়োসায়েন্সের সম্পাদকীয় দপ্তরের সদস্যা।

  • এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

    আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com

  • সববাংলায় সাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য আজই যোগাযোগ করুন
    contact@sobbanglay.com

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

আধুনিক ভ্রূণ বিদ্যার জনক পঞ্চানন মাহেশ্বরীকে নিয়ে জানুন



ছবিতে ক্লিক করে দেখুন ভিডিও