বিজ্ঞান

আমাদের রক্তের গ্রুপ বিভিন্ন হয় কেন

আমাদের রক্তের গ্রুপ বিভিন্ন হয় কেন

মানুষসহ প্রায় প্রতিটি প্রাণীর রক্তের রঙ লাল। কিন্তু রঙ একই হওয়া সত্ত্বেও সব রক্ত একই প্রকার নয়। এখন প্রশ্ন জাগতেই পারে, আমাদের রক্তের গ্রুপ বিভিন্ন হয় কেন? অনেকেই বলবেন বিভিন্ন অ্যান্টিজেন, অ্যান্টিবডি থাকার জন্য এরকম হয়। তারপরেও প্রশ্ন উঠবে, এরকম বিভিন্ন অ্যান্টিজেন, অ্যান্টিবডি থাকার প্রয়োজনই বা হল কেন? সেই প্রশ্নের সঠিক উত্তর পেলেই জানা যাবে বিভিন্ন মানুষের বিভিন্ন রক্তের গ্রুপ হওয়ার কারণ। আসুন এখানে জেনে নিই আমাদের রক্তের গ্রুপ বিভিন্ন হয় কেন ।

চিকিৎসাবিজ্ঞানে রক্তের শ্রেণিবিভাগ করার জন্য অনেকগুলি ব্যবস্থা আছে – তার মধ্যে সব থেকে প্রচলিত ব্যবস্থা হল ‘ABO গ্রুপিং সিস্টেম’ এবং অপরটি হল ‘Rh সিস্টেম’ অথবা রিসাস (rhesus) সিস্টেম। এই দুটি সিস্টেমের উপর ভিত্তি করে মানুষের রক্তকে কয়েকটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়। ‘ABO গ্রুপিং সিস্টেম’ অনুযায়ী রক্ত চার প্রকারের হয়, যথা – A, B, AB ও O। অন্যদিকে ‘Rh পদ্ধতি’ অনুযায়ী রক্ত দুই প্রকারের হয়, যেমন – Rh-পজিটিভ ও Rh-নেগেটিভ।


এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com


 

আমরা সকলেই জানি রক্তের প্রধান উপাদান হল লোহিতকণিকা। এই লোহিতকণিকার কোষঝিল্লিতে এক বিশেষ ধরনের পলিস্যাকারাইড থাকে যা রক্তের গ্রুপ বা শ্রেণি নির্ধারণ করে যাদের ‘অ্যাগ্লুটিনোজেন’ বা ‘ব্লাড অ্যান্টিজেন’ বলা হয়। মানুষের লোহিতকণিকায় দু’ধরনের অ্যাগ্লুটিনোজেন থাকে, যথা – A ও B। একইভাবে রক্তরসেও থাকে দু’ধরনের ‘অ্যাগ্লুটিনিন’ বা ‘ব্লাড অ্যান্টিবডি’, যথা – a ও b। রক্তে এই অ্যান্টিজেন ও অ্যান্টিবডির উপস্থিতি বা অনুপস্থিতির উপর ভিত্তি করে রক্তকে চারটি গ্রুপে ভাগ করে হয়েছে —
• A শ্রেণি: এই প্রকার রক্তে অ্যান্টিজেন A ও অ্যান্টিবডি b উপস্থিত থাকে।
• B শ্রেণি: এই প্রকার রক্তে অ্যান্টিজেন B ও অ্যান্টিবডি a উপস্থিত থাকে।
• AB শ্রেণি: এই প্রকার রক্তে অ্যান্টিজেন A ও অ্যান্টিজেন B উভয়েই উপস্থিত থাকে কিন্তু কোনো অ্যান্টিবডি উপস্থিত থাকে না।
• O শ্রেণি: এই প্রকার রক্তে কোনো অ্যান্টিজেন উপস্থিত থাকে না, কিন্তু অ্যান্টিবডি a ও অ্যান্টিবডি b উভয়েই উপস্থিত থাকে।

এই যে রক্তের গ্রুপ নির্ণয়ের পদ্ধতি, তাকে বলা হয় ‘ABO ব্লাড গ্রুপিং সিস্টেম’। ১৯০১ সালে বিজ্ঞানী কার্ল ল্যাণ্ডস্টেইনার (Karl Landsteiner) এই পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। এই আবিষ্কারের জন্য ১৯৩০ সালে তিনি নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন।

এইসমস্ত অ্যান্টিজেন ও অ্যান্টিবডিগুলি ছাড়াও মানুষের রক্তে বিভিন্ন প্রকারের অ্যান্টিজেনগ্রুপ পাওয়া যায়। তাদের মধ্যে আরেকটি প্রচলিত অ্যান্টিজেনগ্রুপ হল রিসাস গ্রুপ অ্যান্টিজেন।রিসাস(Rhesus)Dঅ্যান্টিজেন যার উপস্থিতি বা অনুপস্থিতির উপর ভিত্তি করে পজিটিভ বা নেগেটিভ গ্রুপের রক্ত বলা হয়।   দুই সিস্টেম এর উপর ভিত্তি করে রক্তকে দুটি গ্রুপে ভাগ করে যায় —

• Rh-পজিটিভ: এই প্রকার রক্তে Rh ফ্যাক্টর (D অ্যান্টিজেন) উপস্থিত থাকে।
• Rh-নেগেটিভ: এই প্রকার রক্তে Rh ফ্যাক্টর (D অ্যান্টিজেন) উপস্থিত থাকে না।
এইভাবে যে রক্তের প্রকৃতি নির্ণয় করা হয়, সেই পদ্ধতির নাম ‘Rh গ্রুপিং সিস্টেম’। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য রিসাস অ্যান্টিজেন গ্রুপের কোনটিই রক্তে না থাকলে তাকে গোল্ডেন ব্লাড গ্রুপ বলা হয়।

সুতরাং, এই দুই পদ্ধতির সংমিশ্রণে আমাদের রক্তকে মোট ৮টি গ্রুপে ভাগ করা যায়। সেগুলি হল যথাক্রমে —
• A+ শ্রেণি: এতে অ্যান্টিজেন A, অ্যান্টিবডি b এবং Rh ফ্যাক্টর উপস্থিত থাকে।
• A- শ্রেণি: এতে অ্যান্টিজেন A ও অ্যান্টিবডি b থাকলেও Rh ফ্যাক্টর থাকে না।
• B+ শ্রেণি: এতে অ্যান্টিজেন B, অ্যান্টিবডি a এবং Rh ফ্যাক্টর উপস্থিত থাকে।
• B- শ্রেণি: এতে অ্যান্টিজেন B ও অ্যান্টিবডি a থাকলেও Rh ফ্যাক্টর থাকে না।
• AB+ শ্রেণি: এতে শুধু অ্যান্টিজেন A ও B এবং Rh ফ্যাক্টর উপস্থিত থাকে।
• AB- শ্রেণি: এতে শুধু অ্যান্টিজেন A ও B থাকলেও Rh ফ্যাক্টর থাকে না।
• O+ শ্রেণি: এই গ্রুপের রক্তে অ্যান্টিবডি a ও b এবং Rh ফ্যাক্টর উপস্থিত থাকে।
• O- শ্রেণি: এই গ্রুপের রক্তে অ্যান্টিবডি a ও b থাকলেও Rh ফ্যাক্টর উপস্থিত থাকে না।

১৯৪০ সালে বিজ্ঞানী ল্যাণ্ডস্টেইনার ও বিজ্ঞানী আলেকজাণ্ডার উইনার (Alexander Wiener) রিসাস বানরের রক্ত নিয়ে পরীক্ষা করে রক্তের Rh ফ্যাক্টর সম্পর্কে জানতে পারেন। এর আগে রক্ত পজিটিভ না নেগেটিভ, তা নিয়ে কারোরই কোনো ধারণা ছিল না।

এখন প্রশ্ন উঠতেই পারে, সকল মানুষের এক না হয়ে রক্তের গ্রুপ বিভিন্ন হয় কেন, এক হলেই অসুবিধা কী ছিল। এই বিষয়ে বিজ্ঞানীরা মনে করেন, বিভিন্ন সংক্রামক রোগের জীবাণু অর্থাৎ অ্যান্টিজেনের সাথে লড়াই করার জন্যই আমাদের শরীরে অ্যান্টিবডির আবির্ভাব ঘটেছিলো এবং এই অ্যান্টিজেন ও অ্যান্টিবডির উপস্থিতির ফলেই রক্তের বিভিন্ন শ্রেণিবিভাগের সৃষ্টি হয়েছে। বিজ্ঞানীদের মতে, রক্তের A গ্রুপ সবথেকে প্রাচীন এবং সবথেকে আগে এই গ্রুপটির উদ্ভব হয়েছিল এমনকি মানুষের উদ্ভবের আগেই তৈরি হয়েছিল। তারপরে প্রায় ৩৫ লক্ষ বছর আগে লোহিতকণিকার কোষঝিল্লিতে থাকা বহুশর্করা (polysaccharide) অণুর মিউটেশনের ফলে সেটি পরিবর্তিত হয়ে B গ্রুপটি সৃষ্টি হয়, এমনটাই মনে করে আজকের বিজ্ঞান। এরপরে মিউটেশমের ফলে সৃষ্টি হয় O গ্রুপ যেটিতে A অথবা B কোনো শর্করাই সক্রিয় নয় এবং শেষ পর্যন্ত দুটি শর্করার উপস্থিতি সৃষ্টি করে AB ব্লাড গ্রুপ। বিজ্ঞানীরা রক্তের গ্রুপ বিভিন্ন হয় কেন ব্যাখায়র জন্য বিবর্তনের তত্ত্ব হাজির করার কারণ হিসেবে দেখিয়েছেন আফ্রিকাসহ যেসব জায়গায় ম্যালেরিয়ার প্রকোপ বেশি সেইসব জায়গায় O গ্রুপের মানুষের সংখ্যা বেশি আর যেসব মানুষের রক্তের গ্রুপ O তাদের ম্যালেরিয়ায় অসুস্থ হওয়ার সম্ভবনা কম।

রক্তদান বা রক্ত গ্রহণের পূর্বে রক্তের গ্রুপ নির্ণয় করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এক শ্রেণির রক্ত অন্য শ্রেণির সঙ্গে মিশ্রিত হলে বিপরীত অ্যান্টিজেন ও অ্যান্টিবডির প্রভাবে রক্তের লোহিতকণিকাগুলি দলা পাকিয়ে যায়, ফলে রোগীর মৃত্যু অবধি ঘটতে পারে। Rh-ফ্যাক্টর আবিষ্কারের পূর্বে অ্যান্টিবডিবিহীন AB শ্রেণিকে ‘সর্বজনীন গ্রহীতা’ এবং অ্যান্টিজেনবিহীন O শ্রেণিকে ‘সর্বজনীন দাতা’ বলা হতো। মনে করা হতো, AB শ্রেণি প্রতিটি শ্রেণি থেকে রক্ত গ্রহণ করতে পারে এবং O শ্রেণি প্রতিটি শ্রেণিকে রক্ত দান করতে পারে। কিন্তু ‘Rh-ফ্যাক্টর’ আবিষ্কার হওয়ার পরে এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল বলে প্রমাণিত হয়েছে। কারণ দেখা গেছে O+ গ্রুপের রক্তাদাতা কখনোই A- গ্রুপের রক্ত গ্রহীতাকে রক্ত দিতে পারবে না। ফলে আধুনিককালে চিকিৎসার প্রতিটি ক্ষেত্রে রক্তের গ্রুপ নির্ণয়ের গুরুত্ব অপরিসীম। প্রসঙ্গত রক্তদাতা নির্বাচন সম্পর্কিত নিয়মাবলীও এই লিঙ্কে ক্লিক করে দেখে নিতে পারেন।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

বিধান রায় ছিলেন আদ্যোপান্ত এক রসিক মানুষ। তাঁর রসিকতার অদ্ভুত কাহিনী



বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন