সব

ওয়ারেন বুফে

২০০৮ সালে বিশ্বের ধনীতম ব্যক্তি হিসেবে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছিল এক মার্কিন ব্যবসায়ী এবং বিনিয়োগকারীর নাম, বিল গেটসকেও যিনি সম্পদের পরিমাণে পিছনে ফেলে দিয়েছেন। বর্তমান আমেরিকার বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ে কোম্পানির কার্যনির্বাহী কর্মকর্তা সেই মার্কিন ব্যক্তি ওয়ারেন বুফে (Warren Buffet)। ২০১৩ সালের পরিসংখ্যানে তাঁর দৈনিক উপার্জনের পরিমাণ ছিল তিন কোটি সত্তর লক্ষ ডলার আর ২০২১ সালের হিসেব অনুযায়ী তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০০০ কোটি মার্কিন ডলার। বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ের মালিকানা নিয়ে এই কোম্পানিকে বিশ্বসেরা দশটি কোম্পানির মধ্যে অন্যতম করে তোলেন ওয়ারেন বুফে। তাঁর সফলতার কাহিনী নিয়ে লেখা হয়েছে অনেক বই। ছোটবেলায় চুইংগাম, কোকাকোলা, এমনকি খবরের কাগজ বিক্রি করতে করতে আজ বিশ্বের প্রথম ধনী ব্যক্তির স্থানে বসার পিছনে উদ্যোগ, ধৈর্য্য আর দূরদৃষ্টি ছিল প্রবল আর তাই অনেকে ওয়ারেন বুফেকে বলেন ‘মির‍্যাকল অফ ওমাহা’।

১৯৩০ সালের ৩০ আগস্ট আমেরিকার নেব্রাস্কা প্রদেশের ওমাহা শহরে ওয়ারেন বুফের জন্ম হয়। তাঁর প্রকৃত নাম ওয়ারেন এডওয়ার্ড বুফে। তাঁর বাবা হাওয়ার্ড বুফে নেব্রাস্কার কংগ্রেসম্যান অর্থাৎ সংসদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং পেশাগতভাবে তিনি ছিলেন স্টকব্রোকার। ওয়ারেন বুফের মায়ের নাম লেইলা বুফে। হাওয়ার্ড এবং লেইলার তিন সন্তানের মধ্যে ওয়ারেন বুফে ছিলেন দ্বিতীয় পুত্র।

ওমাহা শহরের রোজ হিল এলিমেন্টারি স্কুলে ওয়ারেন বুফের প্রাথমিক শিক্ষা সম্পূর্ণ হয়। বারো বছর বয়সে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে বাবার বদলির কারণে তাঁর পরিবার চলে আসে ওয়াশিংটন ডি.সিতে। এখানে এসে তিনি ভর্তি হন অ্যালিস ডেল জুনিয়র হাইস্কুলে। ১৯৪৭ সালে ওয়ারেন বুফে পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং ১৯৪৯ সালে নেব্রাস্কা-লিঙ্কন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক উত্তীর্ণ হন। হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলে পড়াশোনা করার ইচ্ছে থাকলেও সেখানে ভর্তি হতে না পেরে ১৯৫১ সালে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর উত্তীর্ণ হন তিনি। স্কুলের পড়াশোনা চলাকালীন বুফে তাঁর বন্ধুর সঙ্গে একত্রে একটি স্পিনবল মেশিন কেনেন পঁচিশ ডলার মূল্যে আর সেটি এক নাপিতের দোকানের পাশে রেখে দেন। আগ্রহীরা টাকার বিনিময়ে এই স্পিনবল মেশিনে খেলতো আর সেই লাভের অঙ্ক জমিয়ে তারা আরো দুটো মেশিন কিনে ফেলে। একটা সময় পর পুরো ব্যবসাটা বুফে আর বন্ধু অপর একজনের কাছে বারোশো টাকায় বিক্রি করে প্রভূত লাভের মুখ দেখেন। স্কুলে পড়ার সময় পড়াশোনার পাশাপাশি চুইংগাম বিক্রি, কোকাকোলা বিক্রি এমনকি খবরের কাগজ বিক্রি করেও তিনি অর্থ উপার্জনের চেষ্টা করতেন আর এই সময়েই সাত বছর বয়সে ওমাহা পাবলিক লাইব্রেরিতে একটি বইয়ের পাতায় চোখ পড়ে তার যা তাঁর জীবনটাকেই পুরো বদলে দেয়। বইটার নাম ছিল ‘ওয়ান থাউজ্যাণ্ড ওয়েজ টু মেক থাউজ্যাণ্ড ডলার’। স্কুলজীবনে গণিতের জিনিয়াস ওয়ারেন বুফের মাথায় উদ্যোগপতি হওয়ার প্রবল আকর্ষণ তৈরি হয়। শোনা যায় এমন সব অঙ্ক তিনি নাকি নিমেষে করে ফেলতেন যা ক্যালকুলেটর ছাড়া অন্যরা কেউ করতেই সাহস পেতো না। মাত্র ১০ বছর বয়সে নিউ ইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জ পরিদর্শন করেন ওয়ারেন বুফে তাঁর বাবার সঙ্গে এবং তার পরের বছরই ‘সিটিজ সার্ভিস’ নামের একটি মার্কিন কোম্পানির তিনটি শেয়ার নিজের নামে আর তিনটি শেয়ার বোন ডরিসের নামে কিনে ফেলেন ওয়ারেন বুফে। শুনলে অবাক লাগে ১৯৪৫ সাল নাগাদ স্কুলজীবনে জমানো ১২০০ ডলার টাকা দিয়ে তিনি বাবার সঙ্গে অংশীদারী হিসেবে চল্লিশ একর মাপের একটি কৃষিখামার কিনেছিলেন। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, কলেজজীবন শেষ হলে তাঁর জমানো টাকার পরিমাণ ছিল প্রায় ৯৮০০ ডলার। এভাবেই ব্যবসা, লগ্নি ইত্যাদি বিষয়ে ওয়ারেন বুফের দক্ষতা ক্রমেই বাড়তে থাকে।

১৯৫১ সালে ওয়ারেন বুফে ‘বাফেট-ফক অ্যাণ্ড কোং’ নামক কোম্পানিতে বিনিয়োগ সেলসম্যান হিসেবে নিযুক্ত হয়ে কর্মজীবন শুরু করেন এবং এই সংস্থায় ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত কাজ করেন। এরপরে ১৯৫৪ সালেই তিনি যোগ দেন গ্রাহাম-নিউম্যান কর্পোরেশনে একজন নিরাপত্তা বিশ্লেষকের পদে এবং দুই বছর এই সংস্থায় কাজ করে ১৯৫৬ সালে ওয়ারেন বুফে বাফেট-পার্টনারশিপ লিমিটেড কোম্পানিতে সাধারণ অংশীদারী হিসেবে যোগ দেন। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বা ব্যবসার ক্ষেত্রে তাঁর গুরু ছিলেন বেঞ্জামিন গ্রাহাম যার কাছে বুফে বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তা হয়নি। ওয়ারেন বুফের অনুরোধ রাখেননি বেঞ্জামিন গ্রাহাম। ওয়াল স্ট্রিটে কাজ করার ইচ্ছা প্রকাশ করলে তাঁর বাবা সেই ইচ্ছায় সায় দেননি। ফলে ওমাহাতে ফিরে এসে কাজের জন্য স্টকব্রোকার হিসেবে কাজ করা শুরু করেন ওয়ারেন বুফে। এত প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও প্রথমদিকে কিন্তু মানুষের সঙ্গে মেলামেশা বা কথা বলার ক্ষেত্রে তাঁর যথেষ্ট জড়তা ছিল, আত্মবিশ্বাসের অভাব ছিল। সেইজন্য কাজের পাশাপাশি তিনি ডেল কার্নেগীর পাবলিক স্পিকিং কোর্সে ভর্তি হন এবং এই কোর্সের ফলে প্রাপ্ত ভরপুর আত্মবিশ্বাস আর ব্যবসায়িক জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে নাব্রাস্কা বিশ্ববিদ্যালয়ে ওয়ারেন বুফে একটি নৈশ-ক্লাস নিতে শুরু করেন যার বিষয় ছিল – বিনিয়োগের নীতি। শুনে আশ্চর্য হতে হয় যে সেই ক্লাসে তাঁর ছাত্রদের বয়স তাঁর থেকে দ্বিগুণ বেশি ছিল। ঠিক এইসময়েই তাঁর গুরু বেঞ্জামিন গ্রাহামের কাছ থেকে ব্যবসায় কাজের সুযোগ আসে এবং বাৎসরিক ১২০০০ ডলারের বিনিময়ে বুফে বেঞ্জামিন গ্রাহামের সঙ্গে কাজ করা শুরু করেন। এর পরের বছরের ঘটনাটাই ভবিষ্যতে বিস্ময় জাগাবে বিশ্ববাসীর চোখে। ১৯৭০ সালে বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ের কার্যনির্বাহী কর্মকর্তা এবং চেয়ারম্যান পদে আসীন হন বুফে। ১৯৫৬ সাল গ্রাহামের অবসর গ্রহণের পর তিনিও কাজ ছেড়ে সঞ্চিত এক লক্ষ চুয়াত্তর হাজার ডলার দিয়ে নিজের ব্যবসায়িক সংস্থা বাফেট পার্টনারশিপ খোলেন তিনি, এটাই পূর্বে কথিত বাফেট-পার্টনারশিপ লিমিটেড কোম্পানি। ১৯৫৯ সাল থেকে ক্রমেই তাঁর অংশীদারী ব্যবসার পরিমাণ বাড়তে থাকে। ১৯৬২ সাল নাগাদ সাতটি অংশীদারী ব্যবসার পাশাপাশি ওয়রেন বুফে আমেরিকার একজন অন্যতম কোটিপতিতে পরিণত হন। ১৯৫৫ সালে স্থাপিত হয়েছিল বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ে কোম্পানিটি। কিন্তু ১৯৬০ সাল নাগাদ এই কোম্পানির মোট পনেরোটি কাপড়কলের মধ্যে সাতটি বন্ধ হয়ে গেলে এবং বহু কর্মী ছাঁটাই শুরু হলে ওয়ারেন বুফে ১৯৬২ সাল থেকে এর স্টক কিনতে শুরু করেন। এমন ঐতিহ্যবাহী কোম্পানির পতনের ফলে শেয়ারের দাম ক্রমশ পড়ছিল এবং এই কোম্পানির সঙ্গে সঙ্গে সংলগ্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলিও ক্ষতির মুখে পড়ছিল। একটা সময় এত শেয়ার জমিয়ে ফেলেন বুফে যে কোম্পানির চেয়্যারম্যান স্ট্যানটন তাঁর কাছ থেকে শেয়ার পিছু সাড়ে এগারো ডলার মূল্যে সব শেয়ার কিনে নিতে চান। কিন্তু চুক্তিতে প্রতারণা লক্ষ করে তিনি নামে-বেনামে ঐ কোম্পানির এত শেয়ার কিনতে থাকেন যে বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ের সবথেকে বড়ো শেয়ার-হোল্ডারে পরিণত হন তিনি। আর এই ক্ষমতাবলে স্ট্যানটনকে সরিয়ে নিজের পছন্দের লোককে চেয়ারম্যান পদে বসান বুফে। কিন্তু কোম্পানির টেক্সটাইল ব্যবসা ভালো চলছিল না বলে ১৯৬৭ সালের দিকে বুফে ইনস্যুরেন্স কোম্পানিতে বিনিয়োগ করা শুরু করেন। কিন্তু ঐ কোম্পানির শেয়ারের মূল্য এক বছরে দ্বিগুন বৃদ্ধি পাওয়ায় ১৯৭৯ সালের শেষে ওয়ারেন বুফের সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় ৬২ কোটি ডলার। এভাবেই কোকাকোলা কোম্পানির শেয়ার কিনতে কিনতে কোম্পানির প্রায় সাত শতাংশ মালিকানা তাঁর কাছে চলে আসে। বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ে কোম্পানির মূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩০০ কোটি মার্কিন ডলার। ১৯৬৫ সাল থেকে শুরু করে প্রতি বছরই সেই কোম্পানির আগামী দিনের পরিকল্পনা আর কাজের পরিসর এবং বিগত দিনের কাজের মূল্যায়ন সম্বলিত তিরিশ পাতার চিঠি প্রকাশ করতেন বুফে তাঁর কোম্পানির শেয়ার হোল্ডারদের উদ্দেশ্যে। ১৯৮৫ সালে কোম্পানিটি বন্ধ হয়ে যায় এবং ২০১৪ সালে কোম্পানির শেয়ার-হোল্ডারদের উদ্দেশ্যে পাঠানো সেই চিঠিগুলির একটি সংকলন প্রকাশিত হয়।

২০০৬ সালে বুফে ঘোষণা করেছিলেন যে তাঁর সঞ্চিত সম্পদের প্রায় ৮৩ শতাংশ তিনি দান করবেন জনহিতকর কাজে। ঐ বছরই বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ে কোম্পানির এক কোটি ক্লাস-বি শেয়ার তিনি ‘বিল অ্যাণ্ড মেলিণ্ডা গেটস ফাউণ্ডেশন’কে দান করেন দাতব্য চিকিৎসা পরিষেবা দানের জন্য। দানের পরিমাণের বিচারে এটিই হয়তো পৃথিবীর সবথেকে বড়ো দান হতে পারে যার মূল্য প্রায় ৩০.৭ কোটি ডলার।

একেবারে সাধারণ জীবন-যাপনে অভ্যস্ত ওয়ারেন বুফে বর্তমানে ৮৮ বছর বয়সে নাব্রাস্কার সাধারণ একটি পাঁচ কামরার বাড়িতে স্ত্রী এবং তিন সন্তানের পরিমণ্ডলে দিন কাটাচ্ছেন।

এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।