সববাংলায়

উমাশংকর দীক্ষিত

ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাস অসংখ্য মানুষের অবদানে অলঙ্কৃত। অনেকেই রাজনীতির ক্ষেত্রে স্বাধীনতার পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী দুই সময়কালই প্রত্যক্ষ করেছেন, উমাশংকর দীক্ষিত (Uma Shankar Dixit) তাঁদের মধ্যে অন্যতম। স্বাধীনতা সংগ্রামের একজন অন্যতম নেতা ছিলেন তিনি, কিন্তু ভারতীয় রাজনীতিতে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ কাজ মূলত স্বাধীনতা পরবর্তী সময়তেই। বহু সাংবিধানিক গুরুত্বপূর্ণ উচ্চপদের দায়িত্ব তিনি সামলেছেন অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে। দেশের স্বাস্থ্য এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মতো পদে তিনি বহাল ছিলেন এবং খুবই বিচক্ষণতার সঙ্গে সেই কর্তব্য পালন করেছিলেন। এছাড়াও দুই রাজ্যের রাজ্যপাল হিসেবেও কাজ করেছিলেন তিনি। বিশ শতকের একেবারে গোড়ার দিকে জন্মগ্রহণ করেছিলেন উমাশংকর, ফলে তাঁর বেড়ে ওঠা বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনার সমসময়ে। তিনি ছিলেন একজন জনদরদী মানুষ। মেয়েদের পড়াশোনার জন্য কলেজ স্থাপনের মতো মহৎ কাজও করেছিলেন উমাশংকর দীক্ষিত। ইন্দিরা গান্ধীর ঘনিষ্ঠ এই প্রতিভাবান রাজনীতিবিদকে ভারত সরকার ‘পদ্মবিভূষণ’ সম্মানে ভূষিত করে।

১৯০১ সালের ১২ জানুয়ারি উত্তরপ্রদেশের উন্নাও জেলার উগু গ্রামে উমাশংকর দীক্ষিতের জন্ম হয়। তাঁর বাবা রাম স্বরূপ এবং মায়ের নাম শিব পেয়ারী। উমাশংকরের পুত্র বিনোদ দীক্ষিত ছিলেন ভারতীয় প্রশাসনিক পরিষেবার (Indian Administrative Service বা IAS) একজন সদস্য। বিনোদ দীক্ষিত বিবাহ করেছিলেন শীলা দীক্ষিতকে। ১৯৯৮ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত টানা তিনবার শীলাদেবী দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হন। শীলা দীক্ষিতের পুত্র অর্থাৎ উমাশংকর দীক্ষিতের নাতি সন্দীপ দীক্ষিত পূর্ব দিল্লি থেকে কংগ্রেসের হয়ে সংসদের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। লতিকা সৈয়দ ছিলেন উমাশংকর দীক্ষিতের নাতনি।

প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করবার পর কানপুরের ক্রাইস্ট চার্চ কলেজ থেকে পড়াশোনা সমাপ্ত করেছিলেন উমাশংকর।
স্বাধীনতা সংগ্রাম যখন অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি তৈরি করেছে গোটা ভারতবর্ষে, সেই মহালগ্নে উমাশংকর দীক্ষিত জন্মগ্রহণ করেছিলেন। হৃদয়ে জাতীয়তাবাদ, দেশের প্রতি ভালোবাসা যাঁর প্রবল স্বাধীনতার লড়াইয়ের আঁচ তাঁকে স্বাভাবিকভাবেই স্পর্শ করবে। উমাশংকর দীক্ষিতের ক্ষেত্রেও তেমন ঘটনা ঘটেছিল। তিনি ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন, ফলে মোট চারবার ব্রিটিশ সরকার তাঁকে কারারুদ্ধ করেছিল। উমাশংকর দীক্ষিত যখন স্নাতক স্তরের প্রথম বর্ষের ছাত্র তখন তিনি অসহযোগ আন্দোলনে যোগদান করেন। তিনি সাংবাদিক, স্বাধীনতা সংগ্রামী, সমাজসেবী গণেশ শঙ্কর বিদ্যার্থীর সহযোগী ছিলেন। কানপুর জেলা কংগ্রেস কমিটির সভাপতি যখন ছিলেন গণেশ শঙ্কর বিদ্যার্থী, তখন উমাশংকর সেই কমিটির সেক্রেটারি পদে বহাল ছিলেন। স্বামী বিবেকানন্দ, রামতীর্থ এবং গান্ধীজীর চিন্তাধারা তাঁর জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। কারাগারে গিয়ে তিনি স্ব-অধ্যয়নের মাধ্যমে বিভিন্ন বিষয়ে যথেষ্ট জ্ঞান অর্জন করেছিলেন। তিনি মতিলাল নেহেরু এবং জওহরলাল নেহেরুর সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিলেন। 

স্বাধীনতার পরেও তিনি নেহেরুর সংস্পর্শে ছিলেন এবং সেই সূত্রেই পরবর্তীকালে ১৯৬৯ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস বিভক্ত হওয়ার সময় উমাশংকর ইন্দিরা গান্ধীর পক্ষে ছিলেন। ১৯৭১ সালে ইন্দিরা গান্ধীর মন্ত্রীসভায় তিনি যোগদান করেছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি ইন্দিরা সরকারের পূর্ত ও আবাসন মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭১ সালের ১৯ মে থেকে ১৯৭৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত উমাশংকর দীক্ষিত ভারতবর্ষের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রীর পদে থাকাকালীন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তারপরেই ইন্দিরা গান্ধীর সরকার তাঁকে সেই পদ থেকে স্থানান্তরিত করে ভারতবর্ষের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব প্রদান করেন। উমাশংকর ভারতের দশম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন। ১৯৭৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৯৭৪ সালের ১০ অক্টোবর পর্যন্ত তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ অলঙ্কৃত করেছিলেন। ১৯৭৫ সালে উমাশংকর পেয়েছিলেন নৌ-পরিবহন এবং পরিবহন মন্ত্রীর দায়িত্ব। কেন্দ্রীয় সরকারের নগর নির্মাণ দপ্তরের দায়িত্বও তিনি পেয়েছিলেন। ১৯৭০ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছর উমাশংকর অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস কমিটির কোষাধ্যক্ষ হিসেবে কাজ করেন। মোট তিনবার রাজ্যসভার সদস্য হয়েছিলেন উমাশংকর দীক্ষিত। প্রথমবার ১৯৬১ সালের ২৬ এপ্রিল থেকে ১৯৬৪ সালের ২ এপ্রিল পর্যন্ত, দ্বিতীয়বার ১৯৬৪ সালের ৩ এপ্রিল থেকে ১৯৭০ সালের ২ এপ্রিল পর্যন্ত এবং তৃতীয়বার ১৯৭০ সালের ৩ এপ্রিল থেকে ১৯৭৬ সালের ২ এপ্রিল পর্যন্ত রাজ্যসভার সদস্যপদ অলঙ্কৃত করেছিলেন উমাশংকর। তিনি দুটি রাজ্যের রাজ্যপাল হিসেবেও নির্বাচিত হয়েছিলেন। কর্ণাটক রাজ্যের সপ্তম রাজ্যপাল হিসেবে উমাশংকর ১৯৭৬ সালের ১০ জানুয়ারি থেকে ১৯৭৭ সালের ২ আগস্ট পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেছিলেন। অপরদিকে তিনি পশ্চিমবঙ্গের দ্বাদশ রাজ্যপাল ছিলেন এবং ১৯৮৪ সালের ২ অক্টোবর থেকে ১৯৮৬ সালের ১২ আগস্ট পর্যন্ত প্রায় দুবছর এই পদ অলঙ্কৃত করেছিলেন। উমাশংকর দীক্ষিত বেশ কিছু বছর ‘ন্যাশনাল হেরাল্ড’ সংবাদপত্রের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন। 

উমাশংকর দীক্ষিত এমন একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন যিনি জনসেবামূলক কাজে সমানভাবে ব্রতী হয়েছিলেন। নিজের গ্রাম উগুতে তিনি তাঁর মায়ের স্মরণে মেয়েদের পড়াশোনার জন্য একটি ইন্টারমিডিয়েট কলেজ স্থাপন করেছিলেন। এমন মানবদরদী, জনসেবায় সমর্পিত প্রাণ দক্ষ রাজনীতিবিদ উমাশংকরকে ভারত সরকার সম্মান জানাতে দ্বিধা করেনি। ১৯৮৯ সালে ভারত সরকার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার ‘পদ্মবিভূষণ’ সম্মানে তাঁকে ভূষিত করেছিল। 

১৯৯১ সালের ৩০ মে দীর্ঘ অসুস্থতার পরে ৯০ বছর বয়সে নয়া দিল্লিতে উমাশংকর দীক্ষিতের মৃত্যু হয়। 


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading