সববাংলায়

উসেইন বোল্ট

বিভাগঃ ,

অলিম্পিকজয়ী জামাইকার দৌড়বিদ উসেইন বোল্ট (Ussain Bolt) পৃথিবীর সর্বকালের সেরা দ্রুততম মানুষ বলে খ্যাত। একশো মিটার, দুশো মিটার এবং রিলে দৌড়ে তিনি মোট এগারোবার বিশ্বরেকর্ড করেছেন এবং পরপর নিজের রেকর্ড ক্রমান্বয়ে অতিক্রম করেছেন। অলিম্পিক প্রতিযোগিতায় আটটি স্বর্ণপদকজয়ী উসেইন বোল্ট সংবাদমাধ্যমে ‘লাইটনিং বোল্ট’ নামে অধিক পরিচিত। ২০০৮ সালের বেজিং অলিম্পিক থেকে ২০১৬ সালের রিও-ডি-জেনিরোর গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক সবেতেই একাধিক স্বর্ণপদক এবং রেকর্ডের অধিকারী উসেইন বোল্ট পৃথিবীর দ্রুততম জীবিত মানুষ।

১৯৮৬ সালের ২১ আগস্ট জামাইকার ট্রিলনি পারিশের শেরউড কনটেন্ট অঞ্চলে উসেইন বোল্টের জন্ম হয়। তাঁর পুরো নাম উসেইন সেন্ট লিও বোল্ট। তাঁর বাবা ওয়েলেসলি একজন মুদি দোকানদার ছিলেন এবং তাঁর মা জেনিফার বোল্ট তাঁকে সাহায্য করতেন। ছোটোবেলা থেকেই ক্রিকেট খেলা আর দৌড়োনো ছিল বোল্টের নেশা। ভাই সাদেকি আর বোন শেরিনকে নিয়ে একত্রে বোল্ট খেলতে খেলতেই পুরো শৈশব অতিবাহিত করেছেন।

উসেইন বোল্টের প্রাথমিক শিক্ষা সম্পূর্ণ হয় ওয়ালডেন্সিয়া প্রাইমারি স্কুলে। তারপর উইলিয়াম নিব মেমোরিয়াল হাই স্কুলে ভর্তি হন বোল্ট। প্রথম স্কুল থেকেই দৌড়ে তাঁর দক্ষতা প্রকাশ পেতে থাকে। মাত্র বারো বছর বয়সে একশো মিটার দৌড়ে বোল্ট স্কুলের সবথেকে দ্রুততম দৌড়বিদে পরিণত হন। পরে উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াকালীন প্রশিক্ষক পাবলো ম্যাকনিল উসেইন বোল্টের এই দৌড়ে দক্ষতা লক্ষ করে তাঁকে অ্যাথলেটিক্সের প্রশিক্ষণ দিতে থাকেন। ২০০১ সালে বোল্ট প্রথম হাই স্কুল চ্যাম্পিয়নশিপে দুশো মিটার দৌড়ে রৌপ্য পদক লাভ করেন। ২০০২ সালে মাত্র পনেরো বছর বয়সে জামাইকার কিংস্টনে আয়োজিত ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপে যোগ দিয়ে দুশো মিটার দৌড় প্রতিযোগিতায় সর্বকনিষ্ঠ বিশ্ব-চ্যাম্পিয়ন হিসেবে স্বর্ণপদক লাভ করেন। এরপর থেকেই দৌড়ে তাঁর অসামান্য দক্ষতার কারণে ‘লাইটনিং বোল্ট’ নামেই খ্যাতি ছড়িইয়ে পড়ে উসেইন বোল্টের। ২০০২ সালেই দৌড়ে তাঁর দক্ষতা দেখে ‘ইণ্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অফ অ্যাথলেটিক্স ফাউণ্ডেশন’-এর পক্ষ থেকে ‘উদীয়মান তারকা’র সম্মান অর্জন করেন। ২০০৪ সালে এথেন্স অলিম্পিকের জন্য জামাইকার দলের হয়ে উসেইন বোল্টকে দৌড়তে বলা হয়। কিন্তু পায়ের উরুতে আঘাত লাগার কারণে দুশো মিটার দৌড়ের প্রথম ধাপেই তিনি বাদ পড়ে যান। ২০০৭ সালে বোল্ট দীর্ঘ তিরিশ বছর ধরে বয়ে চলা দৌড়ের রেকর্ড ভেঙে দেন। জাপানের ওসাকায় আয়োজিত ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপে ডোনাল্ড কুয়েরির আগের রেকর্ড ভেঙে দুটি রৌপ্য পদক অধিকার করেন বোল্ট। এর ফলে দৌড়কেই পেশা এবং কর্মজীবন হিসেবে বেছে নেন উসেইন বোল্ট, ভবিষ্যতে এটাই তাঁর পরিচয় হয়ে উঠবে।

২০০৮ সালে বেজিং অলিম্পিকে একশো মিটার এবং দুশো মিটার দৌড়ে প্রথমবার যোগ দেন উসেইন বোল্ট। মাত্র ৯.৬৯ সেকেণ্ডে একশো মিটার দৌড় শেষ করে বোল্ট নতুন এক বিশ্ব-রেকর্ড গড়ে তোলেন। এছাড়াও ঐ বেজিং অলিম্পিকেই তিনি পরপর তিনটি রেকর্ড ভেঙে তিনটি স্বর্ণপদক অর্জন করেন। দৌড়ই তাঁর একমাত্র পেশা হয়ে ওঠে, অলিম্পিক রেকর্ড ভাঙার স্বপ্নে বোল্ট আজীবন মশগুল থেকেছেন। শুধু অন্যের নয়, নিজের পূর্বতন রেকর্ডকেও ক্রমান্বয়ে ছাপিয়ে গেছেন তিনি। ২০১২ সালে গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক গেমস অনুষ্ঠিত হয়েছিল লণ্ডনে যেখানে একশো মিটার দৌড়ে পুনরায় আরেকটি স্বর্ণপদক লাভ করেন উসেইন বোল্ট। প্রতিদ্বন্দ্বী ইয়োহান ব্লেককে খুব সামান্য সময়ের ব্যবধানে পিছনে ফেলে মাত্র ৯. ৬৩ সেকেণ্ডে জয়লাভ করেন তিনি এবং নতুন এক অলিম্পিক রেকর্ড সৃষ্টি করেন। দুশো মিটার দৌড়েও জয়লাভ করে আরেকটি স্বর্ণপদক পান বোল্ট এবং সবশেষে আরো একটি রেকর্ড মিলিয়ে একটি অলিম্পিকে তিনটি বিশ্বরেকর্ডের স্রষ্টা হিসেবে সমগ্র বিশ্বে বিখ্যাত হয়ে ওঠেন তিনি। তবে শুধুই জয়লাভ নয়, বোল্টের ক্রীড়াজীবনে পরাজয়ও একইভাবে ছিল, যদিও তা প্রকট হয়নি সাফল্যের ঝলকানিতে। সবার প্রথমে ২০১৩ সালে একশো মিটার ওয়ার্ল্ড-টাইটেল প্রতিযোগিতায় বোল্ট পরাজিত হন। ২০১৫ সালে নাসসাউ আইএএএফ ওয়ার্ল্ড রিলেতে তিনি জিততে পারেননি। পায়ের পেশিতে চোটের কারণে সেই বছর অস্ট্রাভা গোল্ডেন স্পাইক ইভেন্ট এবং নিউ ইয়র্ক অ্যাডিডাস গ্র্যাণ্ড প্রিক্স-এর দুশো মিটার দৌড় প্রতিযোগিতায় যোগ দিতে পারেননি উসেইন বোল্ট। ২০১৬ সালের গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকেও একশো মিটার দৌড়ে সোনা জেতেন বোল্ট। এই খেলায় মাত্র ৯. ৮১ সেকেণ্ডে প্রতিদ্বন্দ্বী জাস্টিন গ্যাটলিনকে পরাজিত করেন তিনি। তারপর ক্রমেই দুশো মিটার দৌড়ে ১৯.৭৮ সেকেণ্ডে দৌড়ে জয়লাভ করেন উসেইন বোল্ট। বিবিসি চ্যানেলকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন যে, অ্যাথলেটিক্সের প্রতি দর্শকদের আকৃষ্ট করে তুলেছেন তিনি। তাঁর কারণেই এখন বহু মানুষ এই খেলাগুলি দেখতে চায়। ফলে বোঝাই যায় কতটা আত্মবিশ্বাসী ছিলেন উসেইন বোল্ট। রিও-ডি-জেনিরোতে আয়োজিত অলিম্পিকে ২০১৬ সালে ৪ × ১০০ মিটারের রিলে দৌড়ে বোল্টের সহযোদ্ধা ছিলেন ব্লেক, আসাফা পোয়েল এবং নিকেল অ্যাশমেড। মাত্র ৩৭.২৭ সেকেণ্ডে এই রিলে দৌড়ে প্রতিনিধিত্ব করে জামাইকার পক্ষ থেকে স্বর্ণপদক জিতে সাড়া ফেলে দেন তিনি।

শুধুই দৌড় নয়, ফুটবলের প্রতিও বোল্টের ছিল অসীম আগ্রহ। তিনি অনেক সাক্ষাৎকারেই জানিয়েছেন পেশাদারিত্বের সঙ্গে তাঁর ফুটবল খেলার ইচ্ছের কথা। সেই ইচ্ছেমতো উসেইন বোল্ট ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেড দলের হয়ে বার্সেলোনার বিরুদ্ধে ফুটবল খেলবেন বলে স্থির করেন, কিন্তু উরুর পেশির আঘাতের কারণে সেই খেলা বাতিল হয়ে যায়। ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেড ছিল বোল্টের প্রিয় ক্লাব। তারপর ২০১৮ সালে অস্ট্রেলিয়ার গ্রীষ্মকালীন এ-লিগে যোগ দিয়ে দুটি গোল করেছিলেন তিনি। কিন্তু তারপর আর কোনো চুক্তিতে রাজি হননি বোল্ট। ক্রিকেটের প্রতিও আসক্ত ছিলেন বোল্ট। তাঁর নিজের কথায়, তিনি দৌড়বিদ না হলে প্রকৃতই একজন ক্রিকেটার হতেন। নিজের আত্মজীবনীতে বোল্ট জানিয়েছেন যে জন্মগতভাবে তিনি স্কোলিওসিস রোগে আক্রান্ত ছিলেন যাতে তাঁর শিরদাঁড়া সামান্য বাঁকা ছিল এবং যে কারণে তাঁর ডান পা অপর পায়ের তুলনায় দৈর্ঘ্যে সামান্য ছোটো ছিল।

২০১৬ সালের ২৮ নভেম্বর তাঁর এই তিনটি অলিম্পিকে স্বর্ণপদক জয়কে কেন্দ্র করে বেঞ্জামিন টার্নার এবং গেব টার্নার পরিচালিত একটি তথ্যচিত্র মুক্তি পায় ‘আই অ্যাম বোল্ট’ নামে। তাছাড়া বিভিন্ন টিভি অনুষ্ঠানেও তাঁকে অবতীর্ণ হতে দেখা গেছে।

২০১৭ সালে ওয়ার্ল্ড অ্যাথলেটিক্স চ্যাম্পিয়নশিপে দৌড়োবার সময়েই উসেইন বোল্ট প্রতিবন্ধকতা অনুভব করেন। একশো মিটার দৌড়ে তৃতীয় স্থান অর্জন করেন যা এতদিনের ক্রীড়া-জীবনে অভাবনীয় ইন্দ্রপতন বলা চলে। এমনকি ৪ × ১০০ মিটার দৌড়ে এতদিনকার গড়ে তোলা সাফল্যের ইতিহাস ভেঙে ফেলে পরাজিত হন বোল্ট। পায়ের সমস্যা এতটাই প্রবল হয়ে দেখা দেয় যে তাঁর দলের সদস্যদের সাহায্যে তাঁকে গন্তব্য-রেখা অতিক্রম করতে হয়। ফলে ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে উসেইন বোল্ট অ্যাথলেটিক্স থেকে অবসর নেন।

ক্রীড়াজীবন থেকে অবসর নেওয়ার পরে কখনো সঙ্গীত প্রযোজক হিসেবে, আবার কখনো বা উদ্যোগপতি হিসেবে নতুন নতুন ক্ষেত্রে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন বোল্ট। ২০১৮ সালে তিনি অপর এক উদ্যোগপতির সঙ্গে একত্রে ‘বোল্ট মোবিলিটি’ নামে একটি সংস্থা চালু করেন যা মূলত বৈদ্যুতিন স্কুটার নির্মাণ করে থাকে। তাঁর একটি আত্মজীবনীও প্রকাশ পেয়েছিল অনেক আগে ২০১০ সালে, বইটির নাম ‘মাই স্টোরি: ৯.৫৮: বিইং দ্য ওয়ার্ল্ডস ফাস্টেস্ট ম্যান’। এরপরে যদিও ২০১৩ সালে এই বইটিকেই পরিমার্জিত করে বোল্ট লেখেন ‘ফাস্টার দ্যান লাইটনিং: মাই অটোবায়োগ্রাফি’।

মোট এগারো বার বিশ্ব-চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন বোল্ট। একশো মিটার দৌড়ে ৯.৫৮ সেকেণ্ডে, দুশো মিটার দৌড় ১৯.১৯ সেকেণ্ডে সম্পূর্ণ করে বিশ্ব-রেকর্ড গড়েছেন তিনি। সমগ্র ক্রীড়া-জীবনে বহু সম্মান ও উপাধিতে ভূষিত হয়েছেন উসেইন বোল্ট। ২০০৮, ২০১২ এবং ২০১৬ সালের অলিম্পিকে যোগ দিয়ে তিনি ‘ট্রিপল ট্রিপল’ পদকের রেকর্ড গড়েন, মোট নয়টি স্বর্ণপদক লাভ করেন তিনটি শ্রেণিতে। ২০০৮ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত মোট ছয়বার আইএএএফ ওয়ার্ল্ড অ্যাথলিট অফ দ্য ইয়ার হিসেবে নির্বাচিত হন তিনি এবং ঐ সময়পর্বের মধ্যেই চারবার ‘লরাস ওয়ার্ল্ড স্পোর্টসম্যান অফ দ্য ইয়ার’ খেতাবে ভূষিত হন বোল্ট। ২০০৯ সালে মাত্র তেইশ বছর বয়সে তিনি সর্বকনিষ্ঠ ক্রীড়াব্যক্তিত্ব হিসেবে ‘অর্ডার অফ জামাইকা’-র সম্মান লাভ করেন যা তৎকালীন সময়ে ব্রিটেনের নাইটহুড পুরস্কারের সমকক্ষ ছিল। মোট উনিশটি গিনেস বুক ওয়ার্ল্ড রেকর্ডের অধিকারী উসেইন বোল্ট মাত্র সর্বোচ্চ ১.৬১ সেকেণ্ডে কুড়ি মিটার পথ দৌড়ে সম্পূর্ণ করতে পারতেন।

বর্তমানে জামাইকার কিংস্টনে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটান এবং ব্যবসার কাজে নিজের সংস্থার উন্নতিকল্পে মনোনিবেশ করেছেন উসেইন বোল্ট।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading