বিজ্ঞান

মহাকাশ কালো কেন

আমরা অনেকেই হয়তো ভাবি যে মহাকাশও হয়তো আমাদের এই পৃথিবীর আকাশের মতো নীল। কিন্তু জ্যোতির্বিদরা এবং মহাকাশচারীরা তাঁদের পর্যবেক্ষণে দেখেছেন যে মহাকাশের রঙ লাল-নীল-সবুজ কোনোটাই নয় বরং কালো। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের দ্বারা আলোর বিচ্ছুরণের জন্যে আমাদের দিনের বেলার আকাশকে নীল দেখায়, এই বিষয়ে বিশদে জানতে দেখুন এখানে। এমনকি চাঁদে যেখানে বায়ুমণ্ডল নেই সেখানে দিনেরবেলাতেও আকাশের রং কালো। রাতে যেন সূর্যের অনুপস্থিতিতে দেখা দেয় গোটা মহাবিশ্ব। দূরের নক্ষত্র যারা দিনের আলোয় কাছের নক্ষত্র সূর্যের আলোয় লুকিয়ে থাকে তারা সামনে চলে আসে তবুও অন্ধকার যে ঘোচে না। আসলে, যুগ যুগ ধরে এই প্রশ্নটাই মানুষ করে এসেছে – মহাকাশ কালো কেন?  

মহাকাশ কালো কেন প্রশ্নটা বিশ্বের তাবড় তাবড় বিজ্ঞানীদের ভাবিয়েছে। তাঁদের মধ্যে আছেন দিক্‌পাল জ্যোতির্বিদ জোহানেস কেপলার, এডমান্ড হ্যালি এবং চিকিৎসক ও জ্যোতির্বিদ হাইনরিখ অলবার্স। উল্লেখিত এই বিজ্ঞানীদের মধ্যে শেষের জন অর্থাৎ জার্মান চিকিৎসক ও জ্যোতির্বিদ হাইনরিখ অলবার্স ১৮২৩ সালে এই প্রশ্নটি তোলার জন্যে খুব বিখ্যাত হয়ে উঠেছিলেন। তিনি যেটা জিজ্ঞেস করেছিলেন তা হল— এই মহাবিশ্ব যদি অসীম, স্থির এবং চিরকাল একই রকম থাকে তবে যেদিকেই তাকাই না কেন সেদিকেই আমাদের দৃষ্টি কোনো না কোনো তারাতে গিয়ে ঠেকবে। আর সেক্ষেত্রে তো রাতের আকাশ অন্ধকার থাকার তো কোনো কথা নয় বরং তা চারিদিক আলোকিত থাকত, তারাদের মাঝে এতটা অন্ধকার স্থান থাকত না। তাহলে, রাতের আকাশ অন্ধকার কেন? আর এই জিজ্ঞাসার জন্য তিনি এতটাই বিখ্যাত হয়ে উঠেছিলেন যে তাঁর নামানুসারেই ওই হেঁয়ালির নাম রাখা হয় ‘অলবার্সের হেঁয়ালি (Olbers’ paradox)’।

এর বহুকাল আগে ১৬১০ সালে জ্যোতির্বিদ কেপলার মনে করেছিলেন যে মহাকাশ কালো কেন – এই বিষয়টিকে সীমাহীন মহাবিশ্বে থাকা অসীম সংখ্যক নক্ষত্রের ধারণার বিরুদ্ধে এক যুক্তি হিসাবে তুলে ধরেছিলেন। যুগে যুগে এই ধাঁধা বা হেঁয়ালিকে সমাধান করার চেষ্টা করা হয়েছে। একটা মতে বলে হয়েছে যে, নক্ষত্রদের গড় আলোকিত জীবনকাল খুবই ছোট যার ফলে কোনো দূরবর্তী নক্ষত্রের থেকে আলো আসার আগেই তার মৃত্যু ঘটে যায়। আরেক মতে মহাবিশ্ব এতটাই নবীন যে দূরবর্তী নক্ষত্রের আলো এখনো আমাদের কাছে এসে পৌঁছায়নি।কিন্তু এই সব সমাধান কোনো কাজে আসেনি।  

তবে ওই হেঁয়ালিটির সবচেয়ে সুন্দর সমাধান করা হয়েছে এই বলে যে, আমাদের মহাবিশ্বের বয়স অসীম নয়। বর্তমানে এর বয়স গণনা করা হয়েছে ১৩৭০ কোটি বছর যা প্রায় ১৪০০ কোটির কাছাকাছি। অর্থাৎ এর চেয়ে পুরনো  তারার আলো পাওয়া অসম্ভব। অনেক দূর দূরান্তের তারার আলো আমাদের কাছে এসেও পৌঁছায় না। আরেকটা ব্যাপার হল, এডুইন হাবল আমাদের জানিয়েছেন যে আমাদের মহাবিশ্ব স্থির নয় বরং ক্রমাগত সম্প্রসারিত হচ্ছে। জন্মলগ্ন থেকেই অর্থাৎ ‘বিগ-ব্যাং’-এর পর থেকেই ক্রমাগত সম্প্রসারণশীল। আর এর ফলে দূরের তারাগুলি আরও দূরে চলে যাচ্ছে। তাদের থেকে আসা আলোও আর পাওয়া যাচ্ছে না। তারা কীভাবে দূরে সরে যাচ্ছে তা বোঝা যায় ডপলার ক্রিয়া (Doppler Effect)-র মাধ্যমে। সেই সব তারাদের থেকে আসা আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য বড় দেখা যাচ্ছে এবং তাদের আলো ক্রমশ বর্ণালির লাল অংশের দিকে সরে যাচ্ছে। আর এর থেকেই ডপলার ক্রিয়া প্রয়োগ করে বলা সম্ভব হচ্ছে যে এই সব নক্ষত্রগুলো আমাদের থেকে দূরে চলে যাচ্ছে। ওলবার্সের হেঁয়ালির উত্তর স্টেডি স্টেট থিওরি (Steady State Theory) অর্থাৎ যে তত্ত্বে মহাবিশ্বকে অসীম, স্থির এবং অপরিবর্তনীয় দেখায় তা দিতে পারেনি, দিতে পেরেছে সম্প্রসারণশীল, সসীম হিসেবে মহাবিশ্বকে দেখানো বিগ ব্যাং তত্ত্ব (Big Bang Theory) (চিত্র ১)। 

চিত্র ১

আবার আমাদের দৃষ্টিশক্তিরও একটা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আমরা সে সমস্ত তারার আলোই দেখতে পাব যাদের থেকে আসা আলো আমাদের দৃশ্যমান বর্ণালীর (visible spectrum) মধ্যে হবে। দৃশ্যমান বর্ণালীর বাইরে যে সমস্ত রশ্মি আছে যেমন গামা রশ্মি, এক্স-রশ্মি, অতিবেগুনি রশ্মি, অবলোহিত রশ্মি, অণুতরঙ্গ ইত্যাদি রশ্মিগুলি যা মহাবিশ্বে ছড়িয়ে আছে তা সরসরি ধরা পড়ে না আমাদের চোখে। মহাবিশ্বে ছড়িয়ে থাকা মহাজাগতিক অণুতরঙ্গ পটভূমি বিকিরণকে (cosmic microwave background radiation) আমরা দেখতে পাই না অথচ তা বিদ্যমান।

আসলে মহাকাশের রঙ প্রসঙ্গে ওলবার্স ঠিক হেঁয়ালিই উপস্থাপন করেছিলেন। আসলে, আমরা মহাকাশের চারদিকেই আলোকিত দেখতাম যদি আমাদের অণুতরঙ্গ এবং অন্যান্য না-দেখতে পাওয়া তরঙ্গগুলি দেখার চোখ থাকত।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়



তাঁর সম্বন্ধে জানতে এখানে ক্লিক করুন