প্রতিবছর প্রতিমাসের নির্দিষ্ট কিছু দিনে কিছু দিবস পালিত হয়। নির্দিষ্ট দিনে অতীতের কোনো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাকে স্মরণ করা বা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরী করতেই এই সমস্ত দিবস পালিত হয়। বিশ্বের পালনীয় সেই সমস্ত দিবসগুলি মধ্যে একটি হলো বিশ্ব শরণার্থী দিবস (World Refugee day)।
প্রতিবছর ২০ জুন বিশ্বজুড়ে শরণার্থীদের অবস্থা সম্পর্কে সচেতনতা গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে বিশ্ব শরণার্থী দিবস পালন করা হয়।
২০০১ সালের ২০ জুন প্রথম বিশ্ব শরণার্থী দিবস পালন করা হয়। ২০০০ সালের ৪ ডিসেম্বর রাষ্ট্রসঙ্ঘের সাধারণ অধিবেশনে অনুমোদিত হয় যে, ২০০১ সাল থেকে ২০ জুন ‘বিশ্ব শরণার্থী দিবস’ হিসেবে পালন করা হবে। ১৯৩৯ সাল থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত অর্থাৎ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শরণার্থীর সংখ্যা ক্রমশ বাড়তে থাকে। কিন্তু এই শরণার্থীদের প্রতি আশ্রয়দানকারী রাষ্ট্রের কী করণীয় বা শরণার্থীদের অধিকার কিংবা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এ সম্পর্কিত আইন বা সুস্পষ্ট কোনো দায়িত্ব বা কর্তব্য ইত্যাদি কোন কিছুই নির্দিষ্ট ছিল না। ১৯৪৮ সালে রাষ্ট্রসঙ্ঘের সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্রে (The Universal Declaration of Human Right) শরণার্থীদের মানবাধিকার প্রাপ্য বলে স্বীকার করা হলেও এ ব্যাপারে কোনো নির্দিষ্ট ব্যবস্থা ছিল না। ১৯৫০ সালে ১৪ ডিসেম্বর রাষ্ট্রসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে রাষ্ট্রসঙ্ঘের একটি স্বতন্ত্র অঙ্গ হিসেবে শরণার্থীদের জন্য একটি কার্যালয় খোলা হয়, ইউ এন এইচ সি আর ( Office of the the United Nations High Commissioner for Refugees), যা বিশ্বব্যাপী ইউএন শরণার্থী সংস্থা (UN Refugee Agency) নামে পরিচিত। এর কার্যক্রমকে আন্তর্জাতিক নিয়মের আওতায় আনার জন্য ১৯৫১ সালে একটি আন্তর্জাতিক শরণার্থী কনভেনশন রাষ্ট্রসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে স্বাক্ষরিত হয়,যা ‘রাষ্ট্রসঙ্ঘের শরণার্থী সনদ’ হিসেবে পরিচিত। এই সনদের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ২০০০ সালে রাষ্ট্রসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ২০ জুন ‘বিশ্ব শরণার্থী দিবস’ হিসেবে পালন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে পর্যন্ত পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি শরণার্থী বাস ছিল আফ্রিকায়। প্রতিবছর বিশ্বের নানা প্রান্তে হাজার হাজার মানুষ নিরাশ্রয় হয়ে এক দেশ থেকে অন্য দেশে আশ্রয় নিচ্ছে। এর মূলে রয়েছে যুদ্ধ, সন্ত্রাসবাদ, রাজনৈতিক- সামাজিক- অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট, ধর্ম, ভাষা, মতাদর্শের পার্থক্য, প্রাকৃতিক বিপর্যয়, ইত্যাদি নানা কারণ। যখন একদল ছিন্নমূল মানুষ এক দেশ থেকে অন্য দেশে আশ্রয় নেয় নিরাপদ জীবনের জন্য, তখনই তারা শরণার্থী বলে পরিচিত হয়। বর্তমান পৃথিবীতে শরণার্থীদের ক্রমবর্ধমান সংখ্যা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে যথেষ্ট চিন্তার কারণ। সাধারণত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে শরণার্থীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। শরণার্থীদের জীবনের করুণ অবস্থা সম্পর্কে সমস্ত স্তরের মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে এবং সরকার ও বিভিন্ন মানুষের সহায়তায় তাদের নিরাপদ জীবন ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করার জন্য বিশ্ব শরণার্থী দিবস পালন করার কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।
রাষ্ট্রসংঘ ও বিভিন্ন দেশের সরকার এবং বিভিন্ন সংগঠন এই দিনটিতে বিভিন্ন ইভেন্টের আয়োজন করে থাকে। আন্তর্জাতিক শরণার্থী এবং আভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত মানুষ (Internally displaced people) অর্থাৎ যারা দেশের মধ্যেই নানান কারণে নিজেদের বাসস্থান ত্যাগ করে অন্যত্র থাকতে বাধ্য হয় – উভয় ক্ষেত্রেই বিভিন্ন সাহায্য প্রদান এবং সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য বিবিধ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। এছাড়াও প্রতি বছর রাষ্ট্রসংঘের দ্বারা শরণার্থী শিবিরের জন্য একটি বিশেষ ‘থিম’ বা ‘প্রতিপাদ্য’ নির্বাচন করা হয়। ২০১৫ সালের প্রতিপাদ্য ছিল – ‘সাহসের সঙ্গে সবাই মিলিত হই’ (With courage let us all combine)। ২০১৬ সালের প্রতিপাদ্য ছিল – ‘আমরা একসঙ্গে শরণার্থীদের পাশে দাঁড়াবো’ (We stand together with refugees)। ২০১৭ সালের প্রতিপাদ্য ছিল – ‘আমাদের মানবতাবোধের উদযাপন করো শরণার্থীদের আলিঙ্গন করে’ (Embracing Refugees to celebrate our Common Humanity)। ২০১৮ সালের প্রতিপাদ্য ছিল – ‘আগের তুলনা আমাদের আরও বেশি করে শরণার্থীদের পাশে থাকা প্রয়োজন’ (Now More Than Ever, We Need to Stand with Refugees)। ২০১৯ সালের প্রতিপাদ্য ছিল – ‘বিশ্ব শরণার্থী দিবসে কিছু পদক্ষেপ নাও’ (Take A Step on World Refugee Day)। ২০২০ সালের প্রতিপাদ্য ছিল- ‘প্রতিটা পদক্ষেপ জরুরী কারণ সবার জীবনই গুরুত্বপূর্ণ’ (“Every Action Counts”, All Lives Matter)। ২০২১ সালের প্রতিপাদ্য ছিল -‘আমরা একসাথে শিখব, একসাথে সুস্থ হব, একসাথে আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠব'(Together we heal, learn and shine)। ২০২২ সালের প্রতিপাদ্য ছিল – যেকোন ব্যক্তির, যেকোন কারণে, যেকোন সময়ে নিরাপত্তা চাওয়ার অধিকার আছে (Whoever, Whatever, Whenever. Everyone has the right to seek safety)। ২০২৩ সালের প্রতিপাদ্য -বাঁচার আশা, বাড়ি থেকে দূরে (hope away from home)। ২০২৪ সালের প্রতিপাদ্য – এমন বিশ্বের আশা করা যেখানে শরণার্থীরা সর্বদা স্থান পাবে (Hope Away from Home: A World Where Refugees Are Always Included)।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান