সববাংলায়

৮ মে | বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস

প্রতি বছর প্রতি মাসের নির্দিষ্ট কিছু দিনে বিভিন্ন দেশে কিছু দিবস পালিত হয়। নির্দিষ্ট দিনে অতীতের কোনো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাকে স্মরণ করা বা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরি করতে এই সমস্ত দিবস পালিত হয়। বিশ্বের পালনীয় সেই সমস্ত দিবসগুলোর মধ্যে একটি হল বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস (World Thalassemia Day)।

প্রতি বছর ৮‌ মে‌ সারা বিশ্বে বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস হিসেবে পালিত হয়। সমগ্র বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশেই এই দিনটি পালন করা হয়। মূলতঃ এই জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে যারা মারা গেছে তাদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে এবং এই রোগটির বিরুদ্ধে জনসচেতনতা গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে এই দিনটি পালন করা হয়ে থাকে।

২০০৯ সালে প্রথম বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস পালন করা হয়। থ্যালাসেমিয়া ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন (Thalassemia International Federation)  অথবা সংক্ষেপে TIF এর উদ্যোগে বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস পালন করা শুরু হয়। থ্যালাসেমিয়া একটি রক্তঘটিত রোগ (blood disorder), এই রোগের ফলে শরীরে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা কমে যায়। সাধারণত তিন ধরনের থ্যালাসেমিয়া হয় – আলফা থ্যালাসেমিয়া, বিটা থ্যালাসেমিয়া ও থ্যালাসেমিয়া মাইনর। সাধারণভাবে আলফা থ্যালাসেমিয়া কম তীব্র, এক্ষেত্রে রোগের উপসর্গ মৃদু বা মাঝারি প্রকৃতির হয়। অন্যদিকে বিটা থ্যালাসেমিয়ায় রোগের তীব্রতা বা প্রকোপ অনেক বেশি, এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। থ্যালাসেমিয়া হলে রক্তে লোহিত রক্তকণিকা ও হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ খুব কমে যায়, যার ফলে আ্যনিমিয়া বা রক্তাল্পতা দেখা দেয়।

থ্যালাসেমিয়া একটি জিনগত রোগ। বাবা এবং মা দুজনেই থ্যালাসেমিয়ার বাহক হলে তাদের সন্তানের মধ্যে থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। এই রোগের লক্ষণ সমূহ হল – দুর্বলতা, ক্লান্তি, হাড় ভঙ্গুর হয়ে যাওয়া, ফ্যাকাশে ত্বক, স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়া, সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়া, শরীরে আয়রন জমা হওয়া, হার্টের সমস্যা ইত্যাদি। থ্যালাসেমিয়ার ধরন এবং রোগীর শারীরিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে এই রোগের চিকিৎসা।

এই রোগের চিকিৎসার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল – ব্লাড ট্রান্সফিউশন, বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট মেডিকেশন এবং সাপ্লিমেন্ট আয়রন চিলেশন(supplement iron chelation) অর্থাৎ বিশেষ ওষুধের সাহায্যে শরীর থেকে আয়রন বের করে নেওয়া। অনেক সময় অস্ত্রোপচার করে প্লীহা ও গল ব্লাডার বাদ দিতে হয়। তবে মাইনর থ্যালাসেমিয়াতে সাধারণত চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না। অন্যান্য ক্ষেত্রে নিয়মিত রক্ত সঞ্চালন এর প্রধান চিকিৎসা। বারবার রক্ত নেওয়ার ফলে একটি বিপজ্জনক পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া হল শরীরে অতিরিক্ত আয়রন বা লৌহ জমে যাওয়া। এর জন্য আয়রন সিলেশন থেরাপির প্রয়োজন পড়ে।

আফ্রিকা, ভূমধ্যসাগরীয় দেশগুলো এবং এশিয়ার দেশগুলোতে থ্যালাসেমিয়া রোগীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। পুরুষ এবং মহিলা উভয়ই এই রোগে আক্রান্ত হতে পারে। থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধ করা সম্ভব। মানুষের সচেতনতা এই রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে। এর জন্য বিয়ের পূর্বে থ্যালাসেমিয়া পরীক্ষা অবশ্য কর্তব্য। এছাড়াও গর্ভস্থ ভ্রূণ পরীক্ষার মাধ্যমে থ্যালাসেমিক শিশু নির্ণয় এবং প্রয়োজনে গর্ভপাত করানো যেতে পারে। থ্যালাসেমিয়া রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ মূলক ব্যবস্থা নেওয়া, এর চিকিৎসা এবং জনসচেতনতা তৈরি করা বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস পালনের অন্যতম লক্ষ্য।

থ্যালাসেমিয়া দিবসে  এই মারণ রোগে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা ব্যবস্থা আরও উন্নত করা এবং তাদের দৈনন্দিন জীবনযাপন আরও উন্নত এবং সুস্থ করে তোলার জন্য বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। প্রতিদিন যে সমস্ত থ্যালাসেমিয়া রোগীরা বেঁচে থাকার জন্য প্রতিনিয়ত লড়াই করে যাচ্ছে, তাদের উদ্দেশ্যে বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস পালন করা হয়। বিভিন্ন সংস্থা এবং স্বাস্থ্যকর্মীরা এই দিনটি উপলক্ষে বিভিন্ন আলোচনা সভা আয়োজন করে থাকে। এছাড়াও থ্যালাসেমিয়া ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন -এর পক্ষ থেকে প্রতি বছর বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবসের একটি বিশেষ থিম বা বিষয় নির্বাচন করা হয়।

বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবসের থিম বা প্রতিপাদ্য

  • ২০২৫ – থ্যালাসেমিয়ার জন্য একসাথে: সম্প্রদায়গুলিকে একত্রিত করা, রোগীদের অগ্রাধিকার দেওয়া (Together for Thalassemia: Uniting Communities, Prioritising Patients)
  • ২০২৪ – জীবনকে ক্ষমতা দেওয়া, অগ্রগতিকে আলিঙ্গন করা: সকলের জন্য ন্যায়সঙ্গত এবং নাগালের মধ্যে থ্যালাসেমিয়ার চিকিৎসা। (Empowering Lives, Embracing Progress: Equitable and Accessible Thalassaemia Treatment for All)
  • ২০২৩ – সচেতন থাকো, ভাগ করে নাও, যত্ন নাও : থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্তদের সেবা করা সম্পর্কে অজ্ঞানতাকে দূর করা  (Be Aware. Share. Care: Strengthening Education to Bridge the Thalassaemia Care Gap)
  • ২০২২ – সচেতন থাকো, ভাগ করে নাও, যত্ন নাও : থ্যালাসেমিয়া সম্পর্কে জ্ঞান বাড়াতে বিশ্বজুড়ে থাল্যাসেমিয়ায় আক্রান্তদের সাথে একযোগে কাজ করা (Be Aware. Share. Care: Working with the global community as one to improve thalassemia knowledge)
  • ২০২১ – বিশ্বব্যাপী থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্তদের স্বাস্থ্য বৈষম্য সম্পর্কে সচেতন করা” (Addressing Health Inequalities Across the Global Thalassaemia Community”)
  • ২০২০ – থ্যালাসেমিয়ার জন্য একটি নতুন যুগের সূচনাঃ রোগীদের জন্য সুচিকিৎসা সহজলভ্য ও সস্তা করার জন্য সার্বিক প্রচেষ্টা (The dawning of a new era for thalassaemia: Time for a global effort to make novel therapies accessible and affordable to patients)
  • ২০১৯ – ভাল মানের থ্যালাসেমিয়া চিকিৎসার জন্য সর্বজনীন সুবিধাঃ রোগীর সঙ্গে সংযোগ (Universal access to quality thalassaemia healthcare services: building bridge with and for patient)
  • ২০১৮ – থ্যালাসেমিয়ার অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতঃ দেশের অনুশীলন, অগ্রগতি এবং রোগীদের অধিকারের স্বীকৃতি (thalassemia past, present and future: country  practices, progress and growing recognition of patients right)
  • ২০১৭ – সংযুক্ত হোন! এক সুন্দর দিনের জন্য জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিয়ে থ্যালাসেমিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করুন।(Get connected! Share knowledge and experience and fight for a better tomorrow in  thalassemia)

সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading