জামর (zamor) একজন সিদ্দি হাবশি বংশোদ্ভূত বিপ্লবী যিনি এগারো বছর বয়সে চট্টগ্রাম থেকে ক্রীতদাস হিসেবে ফরাসি দাস ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি হয়ে যান। পরে, তাঁকে কাউন্টেস ডু বেরির কাছে উপহার হিসেবে প্রদান করা হয়। তিনি একজন বাঙালি হিসেবে ফরাসি বিপ্লবে অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং গিরোন্ডিনদের দ্বারা বন্দী হয়েছিলেন। পরবর্তীকালে খ্রিস্ট ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার পর তাঁর নাম হয় লুই বেনেডিক্ট জামর।
১৭৬২ সালে বর্তমান বাংলাদেশেরর চট্টগ্রামে এক সিদ্দি পরিবারে জামরের জন্ম হয়। কিশোর বয়সেই জামরকে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ফরাসি দাস-ব্যবসায়ীরা ধরে নিয়ে যায়। সেই সময় চট্টগ্রাম ছিল প্রাচ্যের অন্যতম সেরা বন্দর। সারা পৃথিবী থেকে ব্যবসায়ীদের আনাগোনা লেগেই থাকত সেখানে। তখন দাস ব্যবসাও কোনো অস্বাভাবিক কিছু ছিল না। চট্টগ্রাম থেকে জামরকে ক্রীতদাস হিসেবে মাদাগাস্কার হয়ে ফ্রান্সে চালান করা হয়। প্রাসাদের দাস হিসাবে ফ্রান্সের রাজা পঞ্চদশ লুইয়ের কাছে তাঁকে বিক্রি করা হলেও, রাজা জামরকে তাঁর উপপত্নী কাউন্টেস ডু ব্যারিকে উপহার দিয়েছিলেন। ব্যারিই তাঁর নাম লুই-বেনেডিক্ট জামর রেখেছিলেন। সেখানেই ডু ব্যারির কাছে কাজ করতে করতে জামরের ফরাসি সাহিত্য, সংস্কৃতি বিশেষত জিন-জ্যাক রুশোর সৃষ্টির সঙ্গে পরিচয় ঘটে। বিপ্লবী দলের সঙ্গেও গোপনে যোগাযোগ হয় তাঁর।
ফরাসী বিপ্লব শুরু হলে জামর বিপ্লবীদের পক্ষ নিয়ে জ্যাকবিনদের সাথে যোগ দেন। তিনি তাঁর মালকিন কাউন্টেস ডু ব্যারিকে ঘৃণা করতেন এবং তাঁর বিলাসবহুল জীবনধারার কঠোর সমালোচক ছিলেন তিনি। জামর কাউন্টেসের বারংবার ইংল্যান্ড সফরের প্রতিবাদ করতেন এবং কাউন্টেসের সমাজের অভিজাত ব্যক্তিবর্গকে রক্ষা করার বিরুদ্ধে তাঁকে সতর্কও করেছিলেন। জননিরাপত্তা কমিটির একজন তথ্যদাতা হিসাবে ১৭৯২ সালে জামর সালে ইংল্যান্ড থেকে ফেরার পরে কাউন্টেসকে পুলিশ দ্বারা গ্রেপ্তার করিয়েছিলেন। কাউন্টেস জেল থেকে মুক্তি পেয়ে যান সহজেই এবং জেল থেকে বেরিয়ে জানতে পারেন তাঁর গ্রেপ্তারির পেছনে তাঁর ক্রীতদাস জামরের ভূমিকাই প্রধান। তিনি সঙ্গে সঙ্গে জামরকে তাঁর পরিবার থেকে বরখাস্ত করেন। কর্মচ্যুত হয়ে জামর বিপ্লবের পক্ষে তার সমর্থনে আরও সোচ্চার হন। তিনি কাউন্টেসের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ আনেন, যা অবশেষে তাঁকে গ্রেপ্তার, বিচার এবং গিলোটিন দ্বারা মৃত্যুদণ্ডের দিকে নিয়ে যায়।
প্যারিসের ল্যাটিন কোয়ার্টারের কাছে একটি বাড়ি কিনেছিলেন জামর। সেখানে তিনি কিছুদিন শিক্ষকতাও করেন। জীবনের শেষটা অপরিসীম দারিদ্র্যে কাটিয়েছিলেন জামর। অবশেষে ১৮২০ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি জামরের মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পর তাঁকে প্যারিসের এক অনামী কবরে সমাধিস্থ করা হয়।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান