মহাকাশের পার্কিং স্পট হিসেবেই পরিচিত এই ল্যাগ্রাঞ্জ বিন্দু (Lagrange Point)। যে কোনও গ্রহের চারপাশে নির্দিষ্ট বিন্দুতে মহাকাশে পাঠানো যে কোনও বস্তু কিছুক্ষণের জন্য অবস্থান করতে পারে। আসলে পাশাপাশি অবস্থিত দুটি গ্রহের মধ্যবর্তী এই শূন্যস্থানে দুটি বৃহৎ ভরের বস্তুর মহাকর্ষীয় আকর্ষণ বল তাদের মধ্যবর্তী অংশে একটি ক্ষুদ্র বস্তুর চলাচলের জন্য প্রয়োজনীয় কেন্দ্রাভিমুখী বলের (Centripetal Force) যোগান দেয়। এই পয়েন্টগুলিতে প্রয়োজনীয় জ্বালানি খরচ কমিয়ে যে কোনও মহাকাশযান কিছুক্ষণ থামতে পারে। এই বিন্দুগুলিই মহাকাশে ল্যাগ্রাঞ্জ বিন্দু নামে পরিচিত। এই ল্যাগ্রাঞ্জ বিন্দুতে দুটি বৃহৎ মহাজাগতিক বস্তুর মহাকর্ষীয় বল (Gravitational Force) এবং কেন্দ্রাতিগ বল (Centrifugal Force) একে অপরের ভারসাম্য বজায় রাখে।

L1 থেকে L5 এই পাঁচটি ল্যাগ্রাঞ্জ বিন্দু আসলে দুটি বৃহৎ ভরের বস্তুর মধ্যবর্তী একই কক্ষীয় সমতলে (Orbital Plane) অবস্থিত। সূর্য এবং পৃথিবীর মধ্যেও ঠিক একইভাবে পাঁচটি ল্যাগ্রাঞ্জ বিন্দু রয়েছে, আবার একইভাবে পৃথিবী ও চাঁদের মধ্যেও L1 থেকে L5 পর্যন্ত ল্যাগ্রাঞ্জ বিন্দু রয়েছে। এই পাঁচটি বিন্দুর মধ্যে প্রথম তিনটি বিন্দু অর্থাৎ L1, L2 ও L3 সাধারণভাবে নিকটবর্তী দুটি বৃহৎ বস্তুর কেন্দ্রের মধ্য দিয়ে অঙ্কিত রেখার উপর অবস্থিত। কিন্তু বাকি দুটি বিন্দু অর্থাৎ L4 ও L5 ঐ দুই বৃহদাকার বস্তুর কেন্দ্রবিন্দুর সাহায্যে গঠিত একটি সমবাহু ত্রিভুজের তৃতীয় শীর্ষবিন্দু হিসেবে কাজ করে। এই দুটি বিন্দু স্থিতিশীল যার ফলে যে কোনও বস্তু ঐ দুই বৃহদাকার বস্তুর সঙ্গে আবদ্ধ একটি ঘূর্ণায়মান স্থানাঙ্ক ব্যবস্থায় তার চারপাশে প্রদক্ষিণ করতে পারে। যখন ঐ দুই বৃহদাকার মহাজাগতিক বস্তুর ভরের অনুপাত যথেষ্ট বেশি হয়, সেই সময় L4 ও L5 বিন্দুগুলি স্থিতিশীল বিন্দু হিসেবে তাদের নিজেদের দিকে বস্তুকে আকর্ষণ করার প্রবণতা দেখায়। সূর্যের সাপেক্ষে বহু গ্রহের এই দুই নির্দিষ্ট ল্যাগ্রাঞ্জ বিন্দুতে রয়েছে ট্রোজান গ্রহাণু (Trojan Asteroid)। এই রকম ট্রোজান গ্রহাণু বৃহস্পতি গ্রহের ক্ষেত্রে লক্ষাধিক রয়েছে বলে বিজ্ঞানীদের ধারণা। সূর্য ও পৃথিবীর সাপেক্ষে কিংবা পৃথিবী ও চাঁদের সাপেক্ষে বেশিরভাগ কৃত্রিম উপগ্রহ L1 ও L2 বিন্দুতে অবস্থিত থাকে। মহাকাশ অনুসন্ধানের সুবিধার জন্যেই মূলত এই ল্যাগ্রাঞ্জ বিন্দুগুলির কল্পনা ও আবিষ্কার করা হয়েছে। চিত্র – ১ দেখলে বিন্দুগুলির অবস্থানটা ভাল করে বোঝা যাবে।
সূর্য এবং পৃথিবীর মধ্যবর্তী ল্যাগ্রাঞ্জ বিন্দুগুলিকে এখানে বোঝানো হয়েছে। স্পষ্টত দেখা যাচ্ছে L1, L2 এবং L3 বিন্দু তিনটি একটি সরলরেখা অবস্থিত, কিন্তু অন্যদিকে L4 এবং L5 বিন্দু দুটি রয়েছে একটি কল্পিত সমবাহু ত্রিভুজের শীর্ষবিন্দু হিসেবে।
আনুমানিক ১৭৫০ সালে জ্যোতির্বিজ্ঞানী লিওনার্ড অয়লার তিনটি সমরৈখিক ল্যাগ্রাঞ্জ বিন্দু L1, L2 ও L3 আবিষ্কার করেন। তার প্রায় এক যুগ পরে ইতালিয়-ফরাসি গণিতবিদ জোসেফ লুইস ল্যাগ্রাঞ্জ বাকি দুটি বিন্দু আবিষ্কার করেন। ১৭৭২ সালে জোসেফ ল্যাগ্রাঞ্জ একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন যার শিরোনাম ছিল ‘এসে অন দ্য থ্রি-বডি প্রবলেম’। এই গবেষণাপত্রের প্রথম অধ্যায়ে একেবারে সাধারণভাবে তিনটি বিন্দুর সমস্যার ব্যাপারে আলোচনা করেছেন বিজ্ঞানী ল্যাগ্রাঞ্জ। এর দ্বিতীয় অধ্যায়ে বৃত্তাকার কক্ষপথে পরিভ্রমণরত যে কোনও তিনটি নির্দিষ্ট ভরের বস্তুর ক্ষেত্রে সমরৈখিক ও সমপার্শ্বীয় এইরূপ দুটি বিশেষ স্থির-বিন্যাসের কথা বলেছেন তিনি। পাঁচটি বিশেষ বিন্দু রয়েছে যেখানে দুটি বৃহৎ ভরের সঙ্গে একটি ক্ষুদ্র ভরের মহাজাগতিক বস্তু একটি ধ্রুবক বিন্যাসে (Constant Design) পরিভ্রমণ করতে পারে। ল্যাগ্রাঞ্জের ত্রি-বস্তু সমস্যাটি পরবর্তীকালে পুরস্কৃতও হয়েছিল। পাঁচটি বিন্দুর মধ্যে L1, L2 ও L3 অস্থিতিশীল। এখন প্রতিটি বিন্দুর বিশেষত্ব নিয়ে আলোচনা করা যাক।
- L1 বিন্দু : কল্পিত দুটি বৃহৎ ভর M1 এবং M2-এর মধ্যবর্তী একটি নির্দিষ্ট রেখার উপরে এই ল্যাগ্রাঞ্জ বিন্দু অবস্থিত। এখানে উক্ত দুই বৃহৎ ভরের মহাকর্ষীয় আকর্ষণ বল একত্রিত হয়ে একটি ভারসাম্য তৈরি করে। যে বস্তু পৃথিবীর তুলনায় সূর্যকে বেশি কাছ থেকে প্রদক্ষিণ করে তার কক্ষীয় পর্যায়কাল সাধারণত পৃথিবীর তুলনায় কম হয়, কিন্তু এটি পৃথিবীর নিজস্ব মহাকর্ষীয় আকর্ষণের প্রভাবকে উপেক্ষা করে। যদি সেই বস্তুটি প্রত্যক্ষভাবে পৃথিবী ও সূর্যের মধ্যে অবস্থিত হয়, তবে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ বস্তুটির উপর সূর্যের মাধ্যাকর্ষণের টানকে কিছুটা প্রতিহত করবে এবং সেই জন্যেই বস্তুটির কক্ষীয় পর্যায়কাল বৃদ্ধি পাবে। পৃথিবীর যত কাছে সেই বস্তুটি অবস্থিত হবে, তত এই প্রভাব বেশি দেখা যাবে। এই L1 বিন্দুতে বস্তুর কক্ষীয় পর্যায়কাল আর পৃথিবীর কক্ষীয় পর্যায়কাল প্রায় সমান হয়ে যায়। এই বিন্দু থেকে পৃথিবীর দূরত্ব প্রায় ১৫ লক্ষ কিলোমিটার বা ০.০১ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল একক।
- L2 বিন্দু : দুটি বৃহৎ ভরের বস্তুর মধ্য দিয়ে কল্পিত রেখার উপর অবস্থিত এই বিন্দুটি যা ঐ দুই বস্তুর মধ্যে যেটির আকার ছোট তাকে অতিক্রম করে যায়। এখানে এই বিন্দুতে কোনও বস্তুর কেন্দ্রাতিগ বলের সঙ্গে ঐ দুই বৃহৎ ভরের বস্তুর মাধ্যাকর্ষণ শক্তি ভারসাম্য বজায় রাখে। সূর্য থেকে পৃথিবীর বিপরীত দিকে কোনও বস্তুর কক্ষীয় পর্যায়কাল পৃথিবীর তুলনায় বেশি হয়। পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণের থেকেও বেশি আকর্ষণের কারণে ঐ বস্তুর কক্ষীয় পর্যায়কাল কমে যায় এবং L2 বিন্দুতে ঐ কক্ষীয় পর্যায়কাল পৃথিবীর সমান হয়। L1 বিন্দুর মতোই L2 বিন্দুও পৃথিবী থেকে ১৫ লক্ষ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, পৃথিবী ও সূর্যের মধ্যবর্তী L2 বিন্দুতে অবস্থিত রয়েছে জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ।
- L3 বিন্দু : দুটি বৃহৎ ভরের বস্তুর মধ্য দিয়ে কল্পিত রেখার উপরে এই ল্যাগ্রাঞ্জ বিন্দু অবস্থিত যা আসলে দুটি বস্তুর মধ্যে বৃহত্তরটিকে অতিক্রম করে যায়। সূর্য ও পৃথিবীর মধ্যে L3 বিন্দুটি আসলে সূর্যের বিপরীত দিকে অবস্থিত যা পৃথিবীর কক্ষপথের সামান্য বাইরে এবং সূর্যের কেন্দ্রের সামান্য কাছাকাছি অবস্থিত। সূর্যও যেহেতু পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ দ্বারা প্রভাবিত হয়, তাই সূর্যের দেহ-মধ্যস্থ ব্যারিসেন্টারের (Barycentre) চারপাশে প্রদক্ষিণ করে সে। সূর্যের মাধ্যাকর্ষণের সাপেক্ষে পৃথিবীর মত দূরত্বে অবস্থিত কোনও বস্তুর কক্ষীয় পর্যায়কাল হবে এক বছরের কাছাকাছি, কিন্তু অদ্ভুতভাবে সূর্যের বিপরীত দিকে অবস্থিত এই L3 বিন্দুতে কোনও বস্তুর কক্ষীয় পর্যায়কাল একই হবে।
- L4 ও L5 বিন্দু : দুটি বৃহৎ ভরের বস্তুর কেন্দ্রদ্বয়কে সংযোগকারী রেখাকে ভিত্তি করে যে দুটি সমবাহু ত্রিভুজ অঙ্কন করা যায় তার তৃতীয় শীর্ষবিন্দুতে এই দুইটি ল্যাগ্রাঞ্জ বিন্দু অবস্থিত। আদপে দেখা যায়, দুটি বস্তুর মধ্যে বৃহত্তর বস্তুর কক্ষপথের সাপেক্ষে L4 কিংবা L5 বিন্দুটি ৬০০ কোণে এগিয়ে অথবা পিছিয়ে রয়েছে। এই দুই বিন্দুর প্রকৃত অবস্থান বোঝা যাবে উপরের ছবিটি দেখলে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, দুটি বস্তুর ভরের অনুপাত যখন ২৪.৯৬ এর বেশি হবে তখন L4 ও L5 বিন্দু দুটি স্থিতিশীল বিন্দু হিসেবে কাজ করে। অন্যদিকে সান-আর্থ সিস্টেম (Sun-Earth System), সান-জুপিটার সিস্টেম (Sun-Jupiter) এবং আর্থ-মুন (Earth-Moon System) সিস্টেমের ক্ষেত্রে এই দুই বিন্দুর স্থিতিশীলতা লক্ষ করা যায়। অন্যদিকে L1, L2 ও L3 বিন্দু তিনটি অস্থিতিশীল ভারসাম্যের অবস্থানযুক্ত। কোনও বস্তু এই তিনটি বিন্দুর চারদিকে প্রদক্ষিণ করলে কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই বস্তু কক্ষচ্যুত হবে, তাই কোনও প্রাকৃতিক মহাজাগতিক বস্তুকে বা কোনও মহাকাশযানকে এই তিনটি বিন্দুতে দেখা যায় না। স্থিতিশীলতার কারণে বেশিরভাগ প্রাকৃতিক মহাজাগতিক বস্তুকে L4 ও L5 বিন্দুতে অবস্থান করতে দেখা যায়। এই বিন্দুতে অবস্থিত বস্তুগুলিকে সাধারণভাবে ‘ট্রোজান গ্রহাণু’ বলা হয়। বিখ্যাত গ্রিক মহাকবি হোমারের লেখা মহাকাব্য ‘ইলিয়াড’-এ বর্ণিত পৌরাণিক ট্রোজান যুদ্ধের প্রসঙ্গ থেকে এই নামটি এসেছে। বৃহস্পতির সামান্য আগে L4 বিন্দুতে অবস্থিত গ্রহাণুগুলিকে ‘গ্রিক ক্যাম্প’ এবং L5 বিন্দুতে অবস্থিত গ্রহাণুগুলিকে ‘ট্রোজান ক্যাম্প’ বলা হয়। যেহেতু সৌরজগতে সূর্য এবং বৃহস্পতিই সবথেকে বৃহদায়তন বস্তু, তাই সবথেকে বেশি পরিমাণে সান-জুপিটার ট্রোজান গ্রহাণুরই (Sun-Jupiter Trojan Asteroid) অস্তিত্ব পাওয়া যায়।
সূর্য-পৃথিবী এবং পৃথিবী-চাঁদের ল্যাগ্রাঞ্জ বিন্দু বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মহাকাশযান ও কৃত্রিম উপগ্রহ স্থাপনের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। ১৯৭৮ সালে প্রথম ‘ইন্টারন্যাশনাল সান-আর্থ এক্সপ্লোরার ৩’ (International Sun-Earth Explorer 3) সূর্য-পৃথিবী ব্যবস্থার L1 বিন্দুতে স্থাপিত হয় সৌর ঝড় বা অন্যান্য গোলযোগ পর্যবেক্ষণের জন্য। ২০১৫ সাল থেকে এই বিন্দুতে অবস্থান করছে ডিসকভার (DSCOVR) নামের একটি কৃত্রিম উপগ্রহ যা মহাকাশভিত্তিক সৌর টেলিস্কোপ হিসেবে কাজ করে। ২০২২ সালের ২৪ জানুয়ারি L2 বিন্দুর কাছাকাছি হ্যালো কক্ষে স্থাপিত হয়েছে ‘জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ’। একইভাবে ২০১৮ সালে ‘কুইকাও’ (Queqiao) নামে একটি যোগাযোগ-স্থাপনকারী উপগ্রহ (Communication Satelite) পৃথিবী ও চাঁদের মধ্যে L2 বিন্দুতে স্থাপিত হয়েছে।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান