জোসেফ লুই ল্যাগ্রাঞ্জ

জোসেফ লুই ল্যাগ্রাঞ্জ

জোসেফ লুই ল্যাগ্রাঞ্জ (Joseph Louis Lagrange) ছিলেন একজন ইতালীয় বিশুদ্ধ এবং ফলিত গণিতজ্ঞ। গণিতের পাশাপাশি তিনি বিশেষ অবদান রেখেছেন তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যা এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানেও। অষ্টাদশ শতকের দিকপাল গণিতজ্ঞদের মধ্যে ল্যাগ্রাঞ্জ অন্যতম। ১৭৮৮ সালে প্রকাশিত তাঁর লেখা বই ‘মেকানিক অ্যানালিটিক’( Mécanique analytique) মেকানিক্সের জগতে আকর গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হয়।

১৭৩৬ সালের ২৫ জানুয়ারি ইতালির সারডিনিয়া সাম্রাজ্যের অধীনস্থ তুরিন শহরে জোসেফ লুই ল্যাগ্রাঞ্জের জন্ম হয়। তাঁর বাবা জোসেফ ফ্রান্সিসকো ল্যাগ্রাঞ্জ ছিলেন তুরিনের কোষাধ্যক্ষ। মা টেরেসা গ্রসো ছিলেন ক্যাম্বিয়ানোর এক প্রভাবশালী চিকিৎসকের একমাত্র কন্যা। বাবার দিক থেকে ল্যাগ্ৰাঞ্জের ফরাসি যোগ খুবই স্পষ্ট এবং সেই প্রভাব ল্যাগ্ৰাঞ্জের ওপর যথেষ্ট ছিল। তাঁর প্রপিতামহ ছিলেন ফ্রান্সের অশ্ব বাহিনীর সেনাধ্যক্ষ। ল্যাগ্রাঞ্জ ছিলেন তাঁর বাবা মায়ের এগারো সন্তানের মধ্যে সবচেয়ে বড়।  

কর্মসূত্রে যথেষ্ট বিত্তশালী হলেও সেই অর্থে মোটেও সঞ্চয়ী ছিলেন না ফ্রান্সিসকো ল্যাগ্রাঞ্জ। অর্থাভাব পূরণে এবং নিতান্তই বাবার নির্দেশে আইন পড়তে ল্যাগ্রাঞ্জ তুরিন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। গ্রিক জ্যামিতি ও বীজগণিতের থেকে তাঁর পছন্দের  বিষয় ছিল ল্যাটিন। পরবর্তীকালে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেছিলেন, তাঁর বাবা ধনী হলে তিনি কখনোই গণিত নিয়ে পড়াশোনা করতেন না। 

বই  প্রকাশ করতে বা কিনতে এই ছবিতে ক্লিক করুন।

ল্যাগ্রাঞ্জের জীবনে গণিতের সূত্রপাত ঘটে আঠারো বছর বয়সে ইংরেজ জ্যোতির্বিদ এডমন্ড হ্যালির কাজের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে। পরবর্তী সময়ে তিনি তুরিনের বিখ্যাত পদার্থবিদ জিওভানি বেকারিয়ার সান্নিধ্যে আসেন এবং উচ্চতর গণিতশাস্ত্র নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। ১৭৫৪ সালে তিনি বাইনোমিয়াল থিওরেম (binomial theorem) এর ওপরে তাঁর প্রথম গবেষণা পত্রটি পাঠান প্রখ্যাত গণিতজ্ঞ জুলিও ফ্যাগনানোকে, যিনি সেই সময় কমপ্লেক্স নাম্বারের ওপরে কাজ করছিলেন। গবেষণা পত্রটি সেই অর্থে সাফল্য পায়নি এবং উপযুক্ত তত্ত্বাবধানের অভাব তাতে স্পষ্ট ছিল। প্রথম গবেষণা পত্রের ব্যর্থতায় হয়ে হতোদ্যম না হয়ে ল্যাগ্রাঞ্জ এরপরের  কাজ শুরু করেন টটোক্রোন (Tautochrone) নিয়ে। টটোক্রোন অর্থাৎ এমন একটি বক্র(curve) যার ওপরের আলাদা আলাদা বিন্দু অবস্থান থেকে একাধিক বস্তু যাত্রা শুরু করলে একই সময়ে বিনা ঘর্ষণে বক্রের নিম্নতম বিন্দুতে এসে পৌঁছায়। টটোক্রোনের ওপর তাঁর গবেষণা গাণিতিক ভেদ তত্ত্ব বা ভ্যারিয়েশন (calculus of variations)-এ নতুন মাত্রা দেয়। তাঁর এই গবেষণা পত্রটি তিনি পাঠান কিংবদন্তি গনিতজ্ঞ লিওনার্ড অয়লারকে। কুড়ি বছর বয়সী এক তরুণের মেধা এবং উদ্যম অয়লারের চোখ এড়ায়নি। ল্যাগ্রাঞ্জকে তিনি বার্লিনে এনে তাঁর সহায়ক করতে উৎসাহ প্রকাশ করলেও ল্যাগ্রাঞ্জ এই ব্যাপারে বিশেষ আগ্রহী ছিলেননা।

১৭৫৫ সালে ল্যাগ্রাঞ্জ তুরিনের রয়্যাল মিলিটারি একাডেমিতে ক্যালকুলাস এবং মেকানিক্স পড়ানো শুরু করেন। এখানেই কর্মসূত্রে তাঁর আলাপ হয় ফ্রাসোঁয়া দ্য ভিয়ের সঙ্গে। ১৭৫৬ সালে দ্য ভিয়ের সঙ্গে মিলে স্থাপন করেন সাইন্টিফিক সোসাইটি অফ তুরিন যেটি পরে রয়্যাল একাডেমি অফ সাইন্স নামে পরিচিতি পায়। তুরিনে থাকাকালীন এই সংস্থার জার্নাল মেলাঞ্জেস দে তুরিন(Mélanges de Turin)- এ তিনি তাঁর পরবর্তী গবেষণাগুলি  প্রকাশ করতে থাকেন। এই সময় তাঁর গবেষণার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল থিওরি অ্যান্ড নোটেশন অন ক্যালকুলাস অফ ভ্যারিয়েশনস, প্রপাগেসান অফ সাউন্ড, ল্যাগ্রাঞ্জিয়ান ফাংশান অন ফ্লুইড মেকানিক্স ইত্যাদি। ১৭৬৪ সালে ল্যাগ্রাঞ্জ তাঁর গবেষণাপত্রে চাঁদের দোলনের (libration of moon) কারণ ব্যাখ্যা করেন। তিনি ব্যাখ্যা করেন, চাঁদ তার নিজের কক্ষপথে ক্রমাগত ঘুরতে থাকে। তার এই কক্ষপথের আকৃতি এবং কক্ষপথের সাথে চাঁদের কৌণিক দূরত্বের কারণেই পৃথিবী থেকে চাঁদকে সর্বদা একইরকম দেখতে লাগে না। বছরের বিভিন্ন সময়ে চাঁদের আকৃতিও বিভিন্ন রকম লাগে।  তাঁর এই গবেষণার কারণে ফ্রেঞ্চ একাডেমি অফ সায়েন্স তাঁকে পুরস্কৃত করে। ১৭৬৬ সালে পুনরায় তিনি একই পুরস্কার লাভ করেন। এবার তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল বৃহস্পতি গ্রহের উপগ্রহ এবং তাদের কক্ষপথ। ইতিমধ্যে ল্যাগ্রাঞ্জের গবেষণা ও কাজ ইউরোপের বৈজ্ঞানিক মহলে সারা ফেলে দিয়েছে। বিশ্বসেরা গণিতবিদ অয়লার তাঁকে বার্লিন আসতে বহুবার অনুরোধ করলেও লাভ বিশেষ হয়নি। ল্যাগ্রাঞ্জ তাঁর পছন্দের শহর তুরিন ছাড়তে নারাজ। অবশেষে বিশিষ্ট পদার্থবিদ জ্যঁ দ্যে আলেম্বেরট (Jean d’Alembert) এর মধ্যস্থতায় রাজা দ্বিতীয় ফ্রেডরিক স্বয়ং এর একটি চিঠি ল্যাগ্রাঞ্জের কাছে পৌঁছায় যাতে লেখা থাকে বিশিষ্ট গণিতজ্ঞ জোসেফ লুই ল্যাগ্রাঞ্জকে ‘প্রুসিয়ান একাডেমি অফ সায়েন্স, বার্লিন’ – এর গণিত বিভাগের অধিকর্তার পদটি সামলাতে অনুরোধ করা হচ্ছে। এর আগে অয়লার এই পদের দায়িত্বে ছিলেন। এবার আর ল্যাগ্রাঞ্জের পক্ষে রাজার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করা সম্ভব হয়নি। জন্মভূমিতে কাজ শেষ করে তিনি পাড়ি দেন বার্লিনের উদ্দ্যেশ্যে। 

১৭৬৬ সালে যখন তিনি এই পদের দায়িত্ব নেন তখন তাঁর বয়স মাত্র তিরিশ। বার্লিনে আসার এক বছরের মধ্যেই ভিত্তরিয়া কন্টির সাথে বিবাহ সুত্রে আবদ্ধ হন। পরবর্তী কুড়ি বছর তিনি বার্লিনে ছিলেন। এই সময়ে তাঁর কাজগুলির মধ্যে উল্লখযোগ্য হলো ‘থ্রি বডি প্রবলেম’। তিনটি মহাজাগতিক বস্তুর ওপর পারস্পরিক মহাকর্ষ বলের প্রভাব এবং তাদের গতিবিধি সংক্রান্ত বিষয়ে তিনি এখানে আলোচনা করেন। এই গবেষণাপত্রের প্রথম অধ্যায়ে একেবারে সাধারণভাবে অয়লারের আবিষ্কৃত তিনটি সমরৈখিক বিন্দুর সমস্যার ব্যাপারে আলোচনা করেছেন বিজ্ঞানী ল্যাগ্রাঞ্জ। এর দ্বিতীয় অধ্যায়ে বৃত্তাকার কক্ষপথে পরিভ্রমণরত যে কোনও তিনটি নির্দিষ্ট ভরের বস্তুর ক্ষেত্রে সমরৈখিক ও সমপার্শ্বীয় এইরূপ দুটি বিশেষ স্থির-বিন্যাসের কথা বলেছেন তিনি। পাঁচটি বিশেষ বিন্দু রয়েছে যেখানে দুটি বৃহৎ ভরের সঙ্গে একটি ক্ষুদ্র ভরের মহাজাগতিক বস্তু একটি ধ্রুবক বিন্যাসে (Constant Design) পরিভ্রমণ করতে পারে। এই পাঁচটি বিন্দু ল্যাগ্রাঞ্জ বিন্দু (Lagrange Point) নামে পরিচত। এই বিন্দুগুলি মহাকাশ গবেষণায় ভীষণ কার্যকরী ভূমিকা নিয়েছে। ল্যাগ্রাঞ্জের ত্রি-বস্তু সমস্যাটি পরবর্তীকালে পুরস্কৃতও হয়েছিল।

ল্যাগ্রাঞ্জ বার্লিনে থাকাকালীন ফ্লুইড মেকানিক্স, নাম্বার থিওরি, প্রোবাবিলিটি, ডিফারেনশিয়াল ইকুয়েশন ইত্যাদি বিষয়ে গবেষণা করেন। এছাড়াও তিনি উইলসনের উপপাদ্যটি (Wilson’s theorem) প্রমাণ করেন যেখানে বলা হয়, “n” – কে একটি মৌলিক সংখ্যা তখনই বলা সম্ভব যদি {(n-1)! + 1 }(! অর্থাৎ ফ্যাক্টরিয়াল) কে n দিয়ে সম্পূর্ন ভাগ করা যায়। এই সময়েই তিনি তাঁর বই ‘মেকানিক অ্যানালিটিক’ লেখা শেষ করেন যেটি প্রকাশ পায় তিনি বার্লিন ছাড়ার পরে ১৭৮৮ সালে। নিউটন যুগ থেকে শুরু করে পরবর্তী একশো বছর পর্যন্ত মেকানিক্সের  সমস্ত গবেষণালব্ধ ফলাফল তিনি এই একটি বইতে লিপিবদ্ধ করেন যা গাণিতিক পদার্থবিজ্ঞানে অ্যানালিটিক্যাল মেকানিক্স নামে নতুন এক উপশাখার জন্ম দেয়। ল্যাগ্রাঞ্জের গবেষণা লব্ধ ফলাফলের ওপর ভিত্তি করেই এভারিস্তে গলো (Evariste Galois) গ্রুপ থিওরী (group theory) উপস্থাপন করেন যা গণিতে তাঁর এক যুগান্তকারী অবদান হিসেবে গণ্য হয়। 

এত অতিরিক্ত কাজের প্রভাব ল্যাগ্রাঞ্জের শরীর ও মনের ওপর পড়েছিল। বার্লিনে তাঁর শেষ সময় বিশেষ সুখকর ছিল না। তাঁর স্ত্রীর মৃত্যু হয় ১৭৮৩ সালে যা তাঁকে মানসিক দিক থেকে গভীরভাবে আহত করে। পরবর্তী দুই বছরে ল্যাগ্রাঞ্জের অন্যতম শুভাকাঙ্ক্ষী রাজা দ্বিতীয় ফ্রেডরিকের মৃত্যু হলে বার্লিনে তাঁর মানসিক অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়ে। এমতাবস্থায় সেখানে থাকা তাঁর পক্ষে কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। তিনি নিজের দেশ ইতালি ফেরত না গিয়ে বাকি জীবন ফ্রান্সে কাটানোর সিদ্ধান্ত নেন। 

১৭৮৭ সালে ল্যাগ্রাঞ্জ প্যারিসের একাডেমি অফ সায়েন্সের সদস্য নির্বাচিত হন। পরবর্তী সময়ে তিনি এই সংস্থায় পরিমাপ ও রাশির ওপর কাজ করতে শুরু করেন। এখানে তাঁর আলাপ হয় আধুনিক রসায়ন বিদ্যার জনক আঁতয় ল্যাভোঁসিয়ের সঙ্গে। ১৭৯২ সালে ল্যাগ্রাঞ্জ রেনে ফ্রাঁসোয়া ডি মনির সাথে আবার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। 

রোবস্পিয়ারের শাসনে এই সময়েই ফ্রান্সে সন্ত্রাসের রাজত্ব শুরু হয় যার ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে। বিজ্ঞানও এই রোষানল থেকে বাদ যায়নি। ১৭৯৪ সালে মহান বিজ্ঞানী ল্যাভোঁসিয়েকে গিলোটিনে হত্যা করা হয়। ল্যাগ্ৰাঞ্জের জীবনে এর প্রভাব প্রত্যক্ষ ভাবে না পড়লেও তাঁর মানসিক অবস্থা ছিল বেদনাদায়ক। ১৭৯৪ সালে তিনি “ইকোলে পলিটেকনিক” (École Polytechnique) নামের প্রতিষ্ঠানে পড়ানো শুরু করেন। এখানে শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা বিশেষ সুখকর ছিলনা।  তাঁকে এখানে বিভিন্ন সমালোচনার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। ‘থিওরি অফ অ্যানালিটিক্যাল ফাংশনস’ নামের তাঁর বইটি এই সময়ে প্রকাশিত হয়। নেপোলিয়ান স্বয়ং এই মহান গণিতজ্ঞকে সম্মান করতেন। ১৮০৮ সালে তিনি ফ্রান্সের সর্বোচ্চ সম্মান ‘লিজিয়ন অফ অনার’ দ্বারা সম্মানিত হন।

১৮১৩ সালের ১০ এপ্রিল ফ্রান্সের প্যারিস শহরে ৭৭ বছর বয়সে জোসেফ লুই ল্যাগ্রাঞ্জের মৃত্যু হয়।

আপনার মতামত জানান