সববাংলায়

মেথি

সারা পৃথিবী জুড়েই খাবার রান্নার সময় স্বাদ বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন মশলা ব্যবহার করার রীতি আছে। মেথি (Fenugreek) সেরকমই একটি মশলা যার ব্যবহার সেই প্রাচীনকাল থেকে রান্নায় হয়ে আসছে। প্রধানত মশলা হিসেবে মেথির জনপ্রিয়তা হলেও পথ্য এবং খাবার হিসেবেও এর ব্যবহার দেখা যায়। ভারতবর্ষের মূলত গ্রাম বাংলায় রান্নায় বিভিন্নভাবে মেথিকে ব্যবহার করার রীতি প্রচলিত রয়েছে। বাঙালি খাদ্যাভ্যাসে পাঁচফোড়নের অন্যতম একটি ফোড়ন হিসেবে যেমন মেথিদানার ব্যবহার রয়েছে, তেমনি মেথি পাতা শাক হিসেবেও খাওয়ার প্রচলন রয়েছে৷ দক্ষিণ ইউরোপ, ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল, মধ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপ, পশ্চিম এশিয়া, ভারত এবং উত্তর আফ্রিকায় মেথি চাষ করা হয়। মেথি একবর্ষজীবী গাছ। বছরে একবার মাত্র ফুল ও ফল হয়। 

ইরাকের প্রাচীন শহর তেল হালালে চার হাজার খ্রিষ্টপূর্বাব্দে প্রথম মেথি ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়। এছাড়া তাম্র যুগের শহর ইজরায়েলের লাচিসেও মেথি ব্যবহারের নিদর্শন মেলে। মিশরের ফ্যারাও তুতেনখামেনের সমাধিতেও শুষ্ক মেথি ব্যবহারের প্রত্যক্ষ প্রমাণ মিলেছে।

প্রথম শতাব্দীতে রোমানদের মধ্যে মদকে সুস্বাদু করার জন্যে মেথি মেশানোর অভ্যাস লক্ষ করা যায়। আবার সমসাময়িক ইজরায়েলের গ্যালিলি শহরে মেথিকে প্রধান খাদ্য শস্য হিসেবে ব্যবহারের উল্লেখ পাওয়া যায় ইহুদি রোমান সেনাপতি জোসেফাসের লেখা  ‘ওয়ারস অফ জ্যুস ‘(Wars of Jews) বইটিতে। দ্বিতীয় শতকে লিখিত ইহুদীদের মৌখিক আইন ‘মিসনাহ’-তে (Misnah) মেথির হিব্রু প্রতিশব্দ ‘তিলতান’ (Tiltan) এর উল্লেখ মেলে।

ভারতে মেথির প্রচলন কীভাবে শুরু হল তা নিয়ে কোন সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া না গেলেও মনে করা হয় ভারতে এর ব্যবহার অতি প্রাচীনকাল থেকেই হয়ে আসছে। প্রাচীন ভারতের কাশ্মীর, পাঞ্জাব এবং উচ্চ গাঙ্গেয় সমভূমি অঞ্চলে মেথি চাষের প্রমাণ মিলেছে। 

মিশরে মৃতদেহকে মমিতে রূপান্তরিত করার জন্য যে ধরণের রাসায়নিক দ্রব্যের ব্যবহার করা হত তার মধ্যে মেথি ছিল অন্যতম উপাদান৷ প্রাচীনকালে মিশরীয়রা মেথিকে ওষুধ হিসাবে গণ্য করত।  আবার গবাদি পশুর খাদ্য হিসাবেও ব্যবহৃত হত মেথি। কেবল মিশরে নয়, গ্রিস ও রোমেও মেথির ব্যবহার ওষুধ রূপে করা হত। গ্রিক চিকিৎসক হিপোক্রেটিস মেথিকে প্রশান্তিদায়ক ভেষজ ( soothing herb) হিসাবে ব্যবহার করতেন। গ্রিক অধিবাসীরা যে কোনও সংক্রমণের নিরাময় হিসাবে মেথির ব্যবহার করত।  রোমানরা মেথিকে জ্বর, শ্বাসকষ্ট এবং অন্ত্রের সমস্যাগুলির চিকিৎসার জন্য ব্যবহার করত। এছাড়া ক্ষত নিরাময়ের জন্যও মেথির ব্যবহার ছিল৷ 

প্রথম ইহুদি-রোমান যুদ্ধের সময় ফুটন্ত তেলে মেথি মিশিয়ে মিশ্রণটি কেল্লার দেওয়ালে লাগিয়ে দেওয়া হত। মিশ্রণটি অত্যধিক তৈলাক্ত হওয়ায় কেল্লার দেওয়াল বেয়ে অনুপ্রবেশকারীরা ভিতরে প্রবেশ করতে পারত না। এভাবে বহিঃশত্রুর শহরে প্রবেশ আটকানো হত। ইহুদি ধর্মের অন্যতম পবিত্র দিন ‘রোশ হাসনাহের’  সময় প্রায়ই খাবারের সাথে মেথি পরিবেশন করা হয়। ইহুদিরা মনে করে মেথিসহ খাবার আসন্ন শুভ সময়ের ইঙ্গিতবাহী। 

ব্যবহারের দিক থেকে মেথিকে মূলত খাদ্য, পথ্য এবং মশলা এই তিনভাগে ভাগ করা যায়। 

খাদ্য – খাদ্য হিসেবে মূলত মেথির পাতাকে শাক হিসেবে খাওয়ার চল রয়েছে। এছাড়া আটা বা ময়দার সাথে মেথির দানা মিশিয়ে মেথির পরোটা খাওয়ার অভ্যাসও ইদানিং জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।  মিশর এবং ইথিওপিয়ায় পাঁউরুটি তৈরিতে মেথি ব্যবহার করা হয়। সুইজারল্যান্ডে আবার সুইস চিজের স্বাদ বৃদ্ধিতে ব্যবহৃত হয়। আমেরিকায় আবার স্যুপ এবং স্টুতে মিশিয়ে খাওয়া হয়।

পথ্য – ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য মেথিকে পথ্য হিসেবে ব্যবহার করা হয়৷ মেথি রক্তে শর্করার পরিমাণ কমাতে অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা গ্রহণ করে। এছাড়া মহিলাদের ঋতুস্রাব চলাকালীন পেটে ব্যথা কমাতেও সাহায্য করে। চীনের মহিলারা এই কারণে মেথি ব্যবহার করে থাকেন। চীনে এটি ‘হুলুবা’ নামে পরিচিত। মেথি, সন্তান প্রসবের পর মহিলাদের শরীরে স্তন দুগ্ধের পরিমাণ বাড়ায়। প্রাচীন মিশরে প্রসবকালীন বেদনা কমাতে ও স্তন দুগ্ধের পরিমাণ বৃদ্ধি করতে মেথির ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেছে। আধুনিক সময়ে দাঁড়িয়েও মিশরীয় মহিলারা প্রসবকালীন বেদনা কমাতে মেথির ব্যবহার করে থাকেন। তাঁরা মেথিপাতা সহযোগে ‘হিলবা’ নামক একটি চা পান করেন এই ব্যথা কমাতে। টেস্টোস্টেরন এবং ইস্ট্রোজেন হরমোনের ক্ষরণ বাড়িয়ে মেথি যৌন উত্তেজনা বাড়ায়, রক্তে খারাপ কোলেস্টেরলের পরিমাণ কমায়। অ্যাজমা বা হাঁপানি রোগের চিকিৎসাতেও মেথি অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা নেয়।

মেথির পুষ্টিগুণের কথা বলে শেষ করা যাবে না । মেথিতে রয়েছে ফ্যাট, কার্বোহাইড্রেট,ম্যাঙ্গানিজ, কপার, প্রোটিন, ম্যাগনেশিয়াম। এছাড়াও এতে সামান্য পরিমাণে কোলিন, ইনোসিটল, বায়োটিন, বি-ভিটামিনস, জিংক, পটাশিয়াম, সেলেনিয়াম, ফোলেট, ফসফরাস এবং সামান্য পরিমানে আইসোলিউসিন নামক অ্যামাইনো অ্যাসিডের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। মেথিতে প্রচুর পরিমানে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট থাকে। ফলে এটি ফ্যাট মেটাবলিজম, ক্ষিদে নিয়ন্ত্রণ এবং হজমে সাহায্য করে। মেথি ইনসুলিন হরমোনকে নিয়ন্ত্রণ করে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।

মশলা – বর্তমানে ভারতে সর্বাধিক পরিমানে মেথি উৎপাদন করা হয়। মেথিদানা মশলা হিসেবে কিংবা এর পাতা শাক হিসেবে ভারতীয়দের খাদ্যাভ্যাসে জড়িয়ে আছে।  শুকনো মেথিপাতা কাসৌরি মেথি নামে পরিচিত যা রান্না করা খাবারে স্বাদ বৃদ্ধির জন্য ভারতীয়রা ব্যাপকভাবে ব্যবহার করে থাকে। 

মেথির বীজ ডাল বা তরকারিতে মশলা হিসেবে ঘরে ঘরে ব্যবহৃত হয়। এর সুবাস খাদ্যকে আরও সুস্বাদু করে তোলে। এই গাছের পাতা ভেষজ হিসেবে ব্যবহার করা হয় এবং মশলা ও খাবারের স্বাদের জন্যও ব্যবহার করা হয়। মেথিগাছে পাতা প্রোটিন, খনিজ এবং ভিটামিন সি সমৃদ্ধ হওয়ায় এর খাদ্যগুন ও পুষ্টিগুন যথেষ্ট সমৃদ্ধ। মেথির নিজস্ব একটি গন্ধ আছে। তাই এটিকে ম্যাপেল সিরাপ বা ভ্যানিলার বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

সংস্কৃত সাহিত্যে  প্রাচীন ভারতে মেথি ব্যবহারের উল্লেখ পাওয়া যায়। রাজা বিক্রমাদিত্যের গল্পে মেথিকে স্বাদবর্ধক হিসেবে ব্যবহারের বর্ণনা পাওয়া যায়। ১৪৫০ সালে প্রকাশিত ‘রজানিঘন্টু’  বইতে কাশ্মীরের কবি নরহরি মেথির গুণাবলী ব্যাখ্যা করেছেন। আবার চালুক্য রাজ তৃতীয় সোমেশ্বর তাঁর ‘মানাসোল্লাস’ গ্রন্থে রান্নায় মেথির ব্যবহার নিয়ে আলোচনা করেছেন। মুঘল রান্নাতেও যে মেথির ব্যবহার ছিল তার নিদর্শন মেলে ‘আইন- ই-আকবরী’ গ্রন্থে। এই গ্রন্থে তৎকালীন সময়ে মেথির বাজারদরের উল্লেখ পাওয়া যায়। এক হাজার সালের আগে প্রাচীন কবি নকুল তাঁর ‘অশ্ব চিকিৎসা’ গ্রন্থে ঘোড়াকে উজ্জীবিত করতে ঘোড়ার খাদ্যে মেথির ব্যবহার সম্পর্কে আলোচনা করেছেন ।

সব মিলিয়ে একথা বলতেই হবে মেথি কেবল পাঁচফোড়নের অন্যতম একটি ফোড়ন নয়, বিশ্ব জুড়ে সর্বাধিক ব্যবহৃত মশলার মধ্যে অন্যতম এক মশলা। কেবলমাত্র রান্নায় স্বাদ বৃদ্ধির জন্যই এই মশলাটিকে যুগে যুগে গোটা পৃথিবী আপন করে নেয়নি, পথ্য হিসেবে তার অসামান্য ভেষজ গুণের জন্যও মেথি সারা বিশ্ব জুড়ে আজও সমানভাবে সমাদৃত।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading