বিজ্ঞানে বাঙালির অবদান বিশ্বজোড়া খ্যাতি ও স্বীকৃতি পেয়েছে। জগদীশচন্দ্র বসু, প্রফুল্লচন্দ্র রায়, মেঘনাদ সাহা এমন আরও অনেক নাম করা যায়। অথচ এঁরা ছাড়াও আরও বহু বাঙালি বৈজ্ঞানিক যাঁদের একনিষ্ঠ বিজ্ঞানসাধনা এবং বিজ্ঞানবিষয়ক লেখালিখি বিজ্ঞানের সমৃদ্ধ ভান্ডারকে সমৃদ্ধতর করে তুলেছিল কিন্তু কালের পরিহাসে, তাঁদের অনেকেই আজ বিস্মৃতির অন্তরালে বিলীয়মান প্রায়। ইতিহাসের হলদে পাতা থেকে ধুলো ঝেড়ে তাঁদের নাম তুলে আনতে হয়। এমনই একজন হলেন বাঙালি রসায়নবিদ পঞ্চানন নিয়োগী (Panchanan Neogi)। দীর্ঘজীবন তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজ, রাজশাহী কলেজ ইত্যাদি নামজাদা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করেছিলেন। রসায়ন বিজ্ঞানে প্রাচীন ভারতে ব্যবহৃত মৌল আকরিক লোহা ও তামার ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করে মূল্যবান গ্রন্থও রচনা করেন তিনি। তাঁর ‘আয়ুর্বেদ ও নব্য রসায়ন’ একটি মহামূল্যবান গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হয় আজও।
সাম্প্রতিক পোস্ট
১৮৮৩ সালের ৪ অক্টোবর ব্রিটিশ শাসনাধীন অবিভক্ত ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অন্তর্গত হুগলি জেলায় হোয়েড়া গ্রামে পঞ্চানন নিয়োগীর জন্ম হয়।
এন্ট্রান্স পরীক্ষায় পঞ্চানন নিয়োগী ১৫ টাকা এবং এফ.এ পরীক্ষায় ২০ টাকা বৃত্তি পেয়েছিলেন। কেবল বৃত্তিই নয়, এফ.এ পরীক্ষায় রসায়নে প্রথম স্থান লাভ করে তিনি সারদাপ্রসাদ পুরস্কার পেয়েছিলেন। হুগলিতে জন্ম হলেও পড়াশোনার জন্য পঞ্চানন চলে এসেছিলেন কলকাতায়। উনিশ শতকের শেষদিকে ব্যবসা-বাণিজ্যের যেমন প্রধানতম কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছিল, তেমনই শিক্ষারও এক আদর্শ পরিমন্ডল গড়ে উঠেছিল কলকাতায়। নামজাদা সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছিল এখানে। নবজাগরণের ঢেউ এসে নতুন ও মুক্তচিন্তার দ্বার খুলে দিয়েছিল এবং সেই রেনেসাঁ মূলত এই কলকাতা শহরকে কেন্দ্র করেই বিকশিত হয়ে উঠেছিল। ১৯০৩ সালে পঞ্চানন পদার্থবিদ্যা এবং রসায়নে অনার্সসহ বি.এ পাশ করেন এবং প্রথম বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করে উড্রো বৃত্তি, গঙ্গাপ্রসাদ সুবর্ণপদক এবং অমৃতলাল মিত্র পুরস্কার পেয়েছিলেন। এরপর ১৯০৪ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এম.এ পরীক্ষায় রসায়নবিদ্যায় প্রথম স্থান অধিকার করতে সক্ষম হয়েছিলেন। কলকাতায় এসে পঞ্চানন রসায়নশাস্ত্রে উচ্চ গবেষণা করবার জন্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিখ্যাত প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ বৃত্তি লাভ করেছিলেন। ১৮৬৬ সালে প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ নামে বোম্বাই শহরের এক ধনী পারসী কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বৃত্তি প্রদান করেন, যা আজও তাঁর নামেই চলে আসছে। বিখ্যাত রসায়নবিদ আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের অধীনে গবেষণা করেছিলেন তিনি। তাঁর গবেষণার মূল বিষয় ছিল প্রাচীন ভারতে রসায়ন বিজ্ঞানে মৌল আকরিক লোহা এবং তামার ইতিহাস সন্ধান। ১৯০৬ সালে গবেষণার জন্য গ্রিফিথ পুরস্কার দিয়ে পঞ্চানন নিয়োগীকে সম্মান জানানো হয়েছিল।
বলা যায়, ১৯০৭ সাল থেকে পঞ্চানন নিজের কর্মজীবন শুরু করেছিলেন। বর্তমান বাংলাদেশের রাজশাহী কলেজে রসায়ন শাস্ত্রের অধ্যাপনা দিয়ে শুরু করেছিলেন পঞ্চানন। এরপর আরও বহু নামজাদা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যাপনা করেছিলেন এবং এই অধ্যাপনার মাঝে ১৯১৮ সালে পঞ্চানন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গবেষণার জন্য পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর ১৯২১ সাল থেকে ১৯২৫ সাল পর্যন্ত চার বছর বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে এবং ১৯২৫ থেকে ১৯৪২ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সতরো বছর তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজে রসায়নের অধ্যাপনা করেছিলেন।
এত দীর্ঘ সময় অধ্যাপনার কাজের সঙ্গে নিযুক্ত থাকবার পর পঞ্চানন নিয়োগী মহারাজা মনীন্দ্রচন্দ্র কলেজের অধ্যক্ষের দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন।
পরাধীন ভারতবর্ষে দাঁড়িয়ে পঞ্চানন নিয়োগীর মত মানুষ প্রমাণ করে দিয়েছিলেন যে, উন্নতমানের যন্ত্রপাতি এবং গবেষণাগার ছাড়াও উৎকৃষ্টমানের গবেষণাকর্ম করা যেতে পারে। গভীর গবেষণার সাহায্যে প্রাচীন ভারতের ধাতুশিল্পের উৎকর্ষতা তিনি প্রমাণ করে দিয়েছিলেন। এই বিষয়ে তাঁর রচিত দুটি গ্রন্থ ‘আয়রন ইন এনসিয়েন্ট ইন্ডিয়া’ (১৯১৬) এবং ‘কপার ইন এনসিয়েন্ট ইন্ডিয়া’ (১৯১৮) বৈজ্ঞানিক মহলে খুবই মূল্যবান বিবেচিত হয়ে থাকে। এই গ্রন্থ দুটি ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কালটিভেশন অফ সায়েন্স প্রকাশ করেছিল। তবে এই ধাতুশিল্পের ইতিহাস ছাড়াও তিনি রসায়নের আরও বেশ কয়েকটি বিষয় নিয়ে গবেষণা করেছিলেন। তিনি জৈব নাইট্রাইট, নাইট্রো-প্যারাফিন্স ও অ্যামিন্স, দানাদার অ্যালুমিনিয়াম অক্সাইড ইত্যাদি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা করেছিলেন। তবে বিজ্ঞানে তাঁর অন্যতম স্মরণীয় কৃতিত্ব হল নতুন যৌগিক পদার্থ গেলিয়াম আবিষ্কার। এছাড়াও বিভিন্ন মৌলের রসায়ন বিষয়েও গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা করেছিলেন পঞ্চানন। তাঁর লেখা আরও দুটি গ্রন্থ হল ‘আয়ুর্বেদ ও নব্য রসায়ন’ এবং ‘বৈজ্ঞানিক-জীবনী’। এই শেষোক্ত গ্রন্থটিতে তিনি প্রাচীন ভারতের বহু প্রতিভাবান বিজ্ঞানসাধকের জীবনীও তুলে ধরেছিলেন।
অধ্যাপক পঞ্চানন নিয়োগী ইন্ডিয়ান কেমিক্যাল সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা-সদস্য ছিলেন। ১৯৩৫ সালে তিনি ইন্ডিয়ান ন্যাশানাল সায়েন্স আকাদেমির ফেলো নির্বাচিত হয়েছিলেন। আবার ১৯৪৩ সালে পাটনায় ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেসের রসায়ন বিভাগের সভাপতির পদ অলঙ্কৃত করেছিলেন।
১৯৫০ সালের ৫ জুন মাত্র ৬৬ বছর বয়সে এই মহান কিন্তু প্রায় বিস্মৃত বাঙালি বৈজ্ঞানিক পঞ্চানন নিয়োগীর মৃত্যু হয়।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।
তথ্যসূত্র
- ভারতীয় বৈজ্ঞানিক, নৃপেন্দ্রনাথ সিংহ, ওরিয়েন্ট বুক কোম্পানি, ১৯৫৬, পৃষ্ঠা :- ১২৪-১২৫
- সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত ও অঞ্জলি বসু সম্পাদিত, সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান, প্রথম খণ্ড, সাহিত্য সংসদ, কলকাতা, আগস্ট ২০১৬ পৃষ্ঠা :- ৩৮২
- https://web.archive.org/
- https://www.booksandpublishers.com/


আপনার মতামত জানান