পাহাড়ের প্রসঙ্গ উঠলেই পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির মনে প্রথমেই উঠে আসে দার্জিলিং-এর কথা। এখানে পাহাড়, অরণ্য, চা-বাগানের সৌন্দর্য একত্রে উপভোগ করবার দারুণ অবকাশ রয়েছে। এই দার্জিলিং-এ এমন কয়েকটি অফবিট জায়গা রয়েছে, সৌন্দর্যের বিচারে যাদের জুড়ি মেলা ভার। দার্জিলিং-এর কাছেই এক উপত্যকার মধ্যে অবস্থিত বিজনবাড়ি তেমনই একটি ছোট্ট পাহাড়ি গ্রাম। তার পাশ দিয়ে বয়ে চলা ছোটা রঙ্গিত নদী, তার চারপাশে আপেল, কমলালেবু, আনারস ইত্যাদির বাগান, মেঘমালায় আবৃত পাহাড়ের নৈসর্গিক পরিবেশ, বিচিত্র পাখির কলরব সব মিলিয়ে এই বিজনবাড়িতে যেন প্রকৃতি তার সৌন্দর্যের ডালি সাজিয়ে নিয়ে অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য। বিজনবাড়িতে চমৎকার ট্রেকিং-এর রুটও রয়েছে, যা এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা লাভের সুযোগ করে দিতে পারে। শহরের কোলাহল থেকে দূরে সবুজে ঘেরা এই নিস্তব্ধ পাহাড়ি পরিবেশ যে অবসর যাপনের জন্য উপযুক্ত তা বলাই বাহুল্য।
বিজনবাড়ি কোথায়
পশ্চিমবঙ্গের উত্তরে দার্জিলিং জেলার অন্তর্গত একটি ছোট পাহাড়ি গ্রাম এই বিজনবাড়ি। দার্জিলিং থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে ২৫০০ ফুট উচ্চতায় এই গ্রামটি অবস্থিত। এছাড়াও নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন থেকে বিজনবাড়ির দূরত্ব ৯৬ কিলোমিটার। আবার শিলিগুড়ি থেকে ৮৬ কিলোমিটার এবং বাগডোগরা থেকে প্রায় ৯১ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত বিজনবাড়ি। কালিম্পং থেকে এর দূরত্ব ৫৮ কিলোমিটার।
বিজনবাড়ি কীভাবে যাবেন
ট্রেনে করে যেতে হলে হাওড়া বা শিয়ালদহ বা বর্ধমান স্টেশন থেকে উত্তরবঙ্গের ট্রেন ধরে নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে নেমে সেখান থেকে গাড়ি বুক করে চলে যাওয়া যাবে বিজনবাড়ি। বাসে করে যেতে হলে শিলিগুড়িগামী বাস ধরে শিলিগুড়ি পৌঁছে সেখান থেকে গাড়ি বুক করে চলে যাওয়া যাবে বিজনবাড়ি। দার্জিলিং থেকে বিজনবাড়ির জন্য শেয়ার গাড়ি পাওয়া যায় তবে খুবই কম। আগে থেকে গাড়ি বুক করে না রাখলে সমস্যা দেখা দেয়। সবচেয়ে ভাল হয় যে হোমস্টেতে থাকবেন, তাদের সাথেই গাড়ির কথা বলে নেবেন। আকাশপথে অর্থাৎ বিমানে বিজনবাড়ি পৌঁছতে হলে বাগডোগরা বিমানবন্দরে নামতে হবে এবং সেখান থেকে গাড়ি বুক করে সরাসরি চলে যাওয়া যাবে বিজনবাড়ি। তবে মনে রাখতে হবে বিজনবাড়ি যাবার পথে কয়েক কিলোমিটার রাস্তা অত্যন্ত খারাপ। তাই বয়স্ক বা শারিরীকভাবে অসুস্থ মানুষ থাকলে সেইমত সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে।
বিজনবাড়িতে কোথায় থাকবেন
বিজনবাড়ি পর্যটনস্থল হিসেবে খুব জনপ্রিয় না হলেও স্যোশাল মিডিয়ার কারণে এই জায়গাটির নাম এক দশক ধরে ছড়িয়েছে। ফলে যারা অফবিট দার্জিলিং ট্যুরের পরিকল্পনা করে থাকেন, সেই তালিকাতে ঢুকে পড়েছে বিজনবাড়ি। এই কারণেই পর্যটকদের আনাগোনা এখানে কমবেশি লেগেই থাকে। এখানে থাকবার জন্য বড় হোটেল না থাকলেও অনেকগুলি হোমস্টে এবং গেস্ট হাউস রয়েছে। সবচেয়ে আকর্ষণীয় হল এখানকার বাঁশের তৈরি হোমস্টেগুলি। ছোটা রঙ্গিত নদীর একদম গা ঘেঁষেও রয়েছে হোমস্টে, ভিতরে রয়েছে সুইমিং পুলও। এছাড়াও সন্ধের পরে নদীর ধারে বনফায়ারও উপভোগ করবার ব্যবস্থা রয়েছে।
বিজনবাড়িতে কী দেখবেন

শৈলশহর দার্জিলিং থেকে কিছুদূরে স্বল্প জনপ্রিয় এই বিজনবাড়ি জায়গাটির সৌন্দর্য ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। এর একেবারেই গা ঘেঁষে বয়ে চলা ছোটা রঙ্গিত নদীটি ছোটবড় উপলখণ্ডে ধাক্কা খেয়ে কলকল শব্দে এগিয়ে চলেছে। তার চারপাশে ঘন সবুজ নিবিড় বনভূমির মায়া। এই উপত্যকায় এই ছোটা রঙ্গিতের ধারে কমলালেবু, আনারস, আপেল ইত্যাদি বাগানেরও হদিশ মেলে। কাঞ্চনজঙ্ঘা এখান থেকে দেখতে না পাওয়া গেলেও বিজনবাড়ির সৌন্দর্যে এতটুকু ঘাটতি পড়েনি। প্রকৃতি এখানেও তার অকৃপণ হস্তে সুন্দরের ডালি উজাড় করে দিয়েছে। বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে থাকা চা-বাগান যেন সবুজ গালিচা পেতে দিয়েছে মাটির বুকে। অপূর্ব স্নিগ্ধ এক সৌন্দর্যে ভরপুর এই বিজনবাড়ি। উপত্যকার এই নির্জন নিস্তব্ধ পরিবেশে দুদন্ড অবসর যাপন করলে এক দারুণ অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করা যায়। সেইসঙ্গে এখান থেকে যেসব ট্রেকিংয়ের রুট রয়েছে, সেগুলিতে ট্রেক করলে এক দুর্দান্ত রোমাঞ্চকর অনুভূতিও লাভ করা যেতে পারে। সন্ধেবেলা ছোটা রঙ্গিতের গা-লাগোয়া হোমস্টেগুলিতে তারাভরা আকাশের নীচে বনফায়ার, সঙ্গে চা বা কফি, নদীর জলতরঙ্গের শব্দ, ঝিল্লিরব—সব মিলিয়ে সত্যিই মনে হতে পারে এ এক স্বপ্নের দেশ।
বিজনবাড়িতে দ্রষ্টব্য জিনিসগুলি সম্পর্কে নিচে আলোচনা করা হল।
ছোটা রঙ্গিত নদী – বিজনবাড়ির অঞ্চলের সৌন্দর্যকে যেন অনেকখানি বাড়িয়ে দিয়েছে পাহাড়ি এই নদী ছোটা রঙ্গিত। এই নদী পুলবাজারের পাহাড়গুলিকে আলাদা করেছে। ছোটা রঙ্গিতের ধারেই অনেকগুলি পিকনিক স্পট রয়েছে। স্থানীয়দের কাছে এই পিকনিক স্পটগুলো বেশ জনপ্রিয়। এছাড়াও নদীর ধারেই কিছু খাবারের দোকানও গড়ে উঠেছে। এই নদীর চারপাশে ছড়িয়ে থাকা উপত্যকার মধ্যে কমলালেবু, আনারস, আপেল ইত্যাদি ফলের বাগান দেখা যায়। এছাড়াও নদী তীরবর্তী সেই উপত্যকা অঞ্চলে ধান, আলু, টমেটো, বাঁধাকপি ইত্যাদি শস্যেরও চাষাবাদ হয়। নদীর জল সেই চাষের কাজেও ব্যবহৃত হয়। জুন-জুলাই মাসে ধানচাষ করা হয় এবং জানুয়ারি মাসে ফসল কাটা হয়।
পুলবাজার ও পঞ্চগা মন্দির – বিজনবাড়ি এলাকার খুব কাছেই অবস্থিত এই পুলবাজার। এটি দার্জিলিং জেলার প্রাচীনতম এবং বৃহত্তম বাজার, যেখানে কৃষকেরা এসে তাদের উৎপাদিত সবজি বিক্রি করে এবং খামারের পশুর ব্যবসা করে। এটি সপ্তাহের শুক্রবার বসে। শুক্রবার নাগাদ বিজনবাড়িতে থাকলে একবার এই হাটে ঘুরে আসা যায়। স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রা খুব কাছ থেকে দেখার যেমন সুযোগ মিলবে এখানে তেমনি সস্তায় কিছু কেনাকাটাও করা যেতে পারে।
এই পুলবাজার অঞ্চলেই হিন্দুদের একটি মন্দির রয়েছে যেটি পঞ্চগা মন্দির নামে পরিচিত। মন্দিরটি ১৯৭১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এই মন্দির নির্মাণ করেছিলেন সর্দার মন বাহাদুর প্রধান এবং তাঁর স্ত্রী মিসেস হারকা কুমারী প্রধান। মন্দিরের ভিতরে শিব, দুর্গা, গণেশ এবং অন্যান্য অনেক দেবদেবীর মূর্তি দেখতে পাওয় যায়। উল্লেখ্য যে, মূর্তিগুলি কিন্তু সবই পাথরে খোদাই করা এবং উজ্জ্বল রং দিয়ে চিত্রিত। এই মূর্তিগুলি নির্মাণ করেছিলেন লাল প্রসাদ রায়।
রেশম চাষের খামার – পুলবাজার থেকে প্রায় ২ কিলোমিটার দূরত্বে রয়েছে একটি রেশম চাষের খামার। এটি মূলত পুলবাজার-জোরথাং রোডের ওপর অবস্থিত। সরকারী অর্থে এই খামার চলে। সেখানে তুঁতের ঝোপ এবং রেশম কীট থেকে পণ্য তৈরি হয়। পর্যটকেরা এখানে গিয়ে ইচ্ছে হলে রেশমগুটির চাষ সংক্রান্ত তথ্য জেনে নিতে পারেন।
বিজনবাড়ির হাইকিং ও ট্রেকিং রুট – বিজনবাড়ি থেকে অনেকগুলো হাইকিং রুট রয়েছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল সিঙ্গালিলা পাহাড়ের ট্রেকিং রুট। ঘন রডোডেনড্রন বনের মধ্যে দিয়ে ট্রেকিং করার সময় এখানের অসাধারণ ভিউ আপনাকে মুগ্ধ করবে।
এছাড়াও বিজনবাড়ি থেকে ঘুরে আসা যায় এমনকি পিকনিক করতেও যাওয়া যায় কাইজলয়, গোক, কাইঞ্জলিয়া, রিম্বিক, সাম্বক ইত্যাদি জায়গায়। এই কাইঞ্জলিয়া, রিম্বিক এগুলি হল, মূলত আদিবাসী গ্রাম। এছাড়াও বিজনবাড়ি থেকে ১৭ কিলোমিটার দূরে লোধোমায় অবস্থিত জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র রামমাম হাইডাল পাওয়ার স্টেশন দেখে আসা যেতে পারে। সেখানে দেখার সুযোগ মিলবে কীভাবে শক্তি উৎপাদনের জন্য প্রচন্ড বেগে প্রবাহিত জল বন্দী করা হয় । এখানে একদিকে আবার সুদৃশ্য কমলালেবুর বাগান এবং অন্যদিকে পাহাড়ের দৃশ্য দেখতে পাবেন। বিজনবাড়ি থেকে একটি ট্রেকিং রুট রয়েছে যা সিঙ্গালিলা রেঞ্জের দিকে চলে গেছে। এছাড়াও ট্রেক করে লোধোমা, রিম্বিক হয়ে শ্রীখোলা, গুরদুমের দিকে চলে যাওয়া যায়। বিজনবাড়ি থেকে আবার তিনচুলে, তাকদা, লামাহাট্টা, জোরথাং, সুকিয়া পোখরির দিকেও ঘুরে আসা যায়।
বিজনবাড়িতে কখন যাবেন
খুব একটা বেশি উচ্চতায় অবস্থিত না হওয়ার কারণে এখানে তাপমাত্রা বিশাল শীতল থাকে না। মূলত অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে অর্থাৎ শীতকাল বিজনবাড়ির যাওয়ার পক্ষে উপযুক্ত সময়। বিচিত্র রঙিন ফুলের সমাহারও সেসময় দেখা যায় উপত্যকায়। এছাড়াও মার্চ থেকে মে মাসের সময়টিও বিজনবাড়ির যাওয়ার জন্য মন্দ নয়। তবে বর্ষাকালে পাহাড়ি সবুজ উপত্যকার সৌন্দর্য দেখবার মতো হলেও, বর্ষার সময়ে পাহাড়ি রাস্তার অবস্থাও যেহেতু বিপদজনক হয়ে ওঠে তাই জুন-জুলাইয়ের সময়টা এড়িয়ে যাওয়াই ভাল। অনেক পাহাড়ি অঞ্চলে এই সময়ে ধস নামে।
সতর্কতা ও পরামর্শ
- বিজনবাড়ি যাবার পথে কয়েক কিলোমিটার রাস্তা অত্যন্ত খারাপ।
- মনে রাখবেন বিজনবাড়ির উচ্চতা অনেক কম হওয়ায় কাঞ্চনজঙ্ঘা এখান থেকে দেখতে পাওয়া যায় না।
- বিজনবাড়ি যাওয়ার পরিকল্পনা করলে শুক্রবার দিনটিকে মাথায় রেখে প্ল্যান করলে পুলবাজারে বসা দার্জিলিং-এর প্রাচীনতম এবং বৃহত্তম হাটটি দেখবার সুযোগ ঘটবে। স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রাকে খুব কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করা যাবে।
- ছোটা রঙ্গিত নদীর জলে প্লাস্টিক বা ওই জাতীয় কোন আবর্জনা ফেলে নদীর জলকে দূষিত করবেন না।
- প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র সঙ্গে রাখবেন। যদি ট্রেক করবার পরিকল্পনা থাকে তবে তো অবশ্যই দরকারী ওষুধ সঙ্গে নেবেন।
- বর্ষাকাল বাদ দিয়ে বিজনবাড়ি যাওয়ার পরিকল্পনা করা ভাল, কারণ বর্ষায় পাহড়ি রাস্তার অবস্থা বেশ বিপদজনক হয়ে ওঠে।
- বিজনবাড়ি যাওয়ার পথে হিমা ঝরণা, বিশ্বম্ভর শিলা, কয়েকটি অত্যন্ত সুন্দর চা-বাগান পেরিয়ে যেতে হয়। সেইসব জায়গাগুলিও পারলে যাওয়ার পথে নেমে গিয়ে দেখে নিতে পারেন।
সর্বশেষ সম্পাদনার সময়কাল – ২০২৪
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান