ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস খুব নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করলে এমন অনেক মানুষের কথা উঠে আসবে বর্তমান সময় যাঁদেরকে তেমন একটা মনে রাখেনি। বিপ্লবী, সমাজসেবক অতুলচন্দ্র ঘোষ (Atul Chandra Ghosh) তাঁদেরই একজন। আইনজীবীর পেশা ছেড়ে দিয়ে স্বাধীনতার লড়াইতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন তিনি। মানভূম জেলা কংগ্রেস কমিটির সভাপতি হয়েছিলেন তিনি। তবে স্বাধীনতার পর মানভূমকে পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্ভুক্ত করবার জন্য যে লড়াই চালিয়েছিলেন এবং বঙ্গভূক্তি আন্দোলনের স্থপতি হিসেবে তাঁর নাম আজও স্বর্ণাক্ষরে লিখিত। মানভূমে সংগঠিত সত্যাগ্রহ ও ভাষা আন্দোলনেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন তিনি। পুরুলিয়া জেলা গঠনের ইতিহাস আলোচনায় অতুলচন্দ্র ঘোষের নাম করতেই হয়। গ্রামীণ শিল্পের উন্নতিকল্পে শিল্পাশ্রমের সহ-প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে গুরুদায়িত্ব পালন করেছিলেন অতুলচন্দ্র। স্বাধীনতা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের জন্য কারারুদ্ধও হতে হয়েছিল তাঁকে। এই বিস্মৃত সংগ্রামী মানুষটি ‘মানভূম কেশরী’ উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন।
১৮৮১ সালে ২ মার্চ বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব বর্ধমান জেলার খন্ডঘোষ গ্রামে অতুলচন্দ্র ঘোষের জন্ম হয়। তাঁর পিতার নাম ছিল মাখনলাল ঘোষ। তবে, পিতৃব্য হিতলাল ঘোষের কাছে অযোধ্যায় শৈশবের দিনগুলি কাটিয়েছিলেন তিনি। পরবর্তীকালে পুরুলিয়াতে তাঁর এক মেসোমশাই যিনি পেশায় উকিল ছিলেন তাঁর কাছে লালিত পালিত হন অতুলচন্দ্র।
বর্ধমানের মহারাজা স্কুল থেকে ১৮৯৯ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষা এবং পরে ১৯০১ সালে কলেজ থেকে এফ.এ পরীক্ষায় সফলভাবে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন তিনি। এরপর উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য কলকাতার মেট্রোপলিটন কলেজে ভর্তি হন। তবে ১৯০৪ সালে বি.এ-তে অকৃতকার্য হন। বি.এ পরীক্ষায় সফল না হতে পারার পিছনে পড়াশুনায় কম মনোযোগী হওয়াই ছিল প্রধান কারণ। আসলে তখন থেকেই স্বদেশের কাজকর্মের প্রতি আকর্ষণ, সক্রিয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ ইত্যাদিতেই বেশি সময় অতিবাহিত করতেন তিনি। ১৯০৮ সাল নাগাদ পুরুলিয়ায় আইন ব্যবসা শুরু করেন তিনি। আরও পরে, পুরুলিয়ার জিলা স্কুলের লাইব্রেরিয়ান-অ্যাকাউন্টেন্ট অঘোরচন্দ্র রায়ের কন্যা লাবণ্যপ্রভাকে বিবাহ করেছিলেন অতুলচন্দ্র।
স্বামী-স্ত্রী দুজনেই মহাত্মা গান্ধীর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। তাঁরা নিবারণ চন্দ্র দাশগুপ্তের অনুপ্রেরণায় সক্রিয় রাজনীতির জগতে পদার্পণ করেছিলেন। ১৯২০ সালে মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে যখন অসহযোগ আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল তখন স্বাধীনতা সংগ্রাম এক নতুন দিশা দেখতে পেয়েছিল। অতুলচন্দ্রও সেই সময়ে অর্থাৎ ১৯২১ সালে আইন ব্যবসা ছেড়ে দিয়ে মহাত্মা গান্ধীর আদর্শকে মাথায় নিয়ে দেশের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। অসহযোগ আন্দোলনে তিনি সক্রিয়ভাবে যোগদান করেছিলেন। তাঁর শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব এবং নেতৃত্বদানের দারুণ ক্ষমতার কারণে তিনি বেশ নাম করেছিলেন তখন। ১৯২১ সালে মানভূম কংগ্রেস প্রতিষ্ঠিত হলে নিবারণ চন্দ্র দাশগুপ্ত এবং অতুলচন্দ্র ঘোষ যথাক্রমে সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদক পদে নিযুক্ত হয়েছিলেন। এরপর ১৯২১ থেকে ১৯৩৫ সাল পর্যন্ত অতুলচন্দ্র বিহার প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটির সেক্রেটারির পদ অলঙ্কৃত করেছিলেন। আবার ১৯৩৫ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত মানভূম জেলা কংগ্রেস কমিটির সভাপতি হিসেবে মানভূম এবং তার নিকটবর্তী বহু এলাকায় গুরুত্বপূর্ণ সব কাজ করেছিলেন। মানভূমের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতৃত্বে তিনিই ছিলেন বলা যায়। এছাড়াও জেলা সত্যাগ্রহ কমিটির সেক্রেটারিও হয়েছিলেন অতুলচন্দ্র। জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত থেকে একেরপর এক গুরুত্বপূর্ণ সব পদের দায়িত্ব গ্রহণ ও যথাযথভাবে পালন করেছিলেন অতুলচন্দ্র।
নিবারণ চন্দ্র দাশগুপ্ত অসহযোগ আন্দোলনে যোগদান করে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। কারাবাস থেকে মুক্তি পাওয়ার পর তিনি অতুলচন্দ্রের সঙ্গে মিলে পুরুলিয়া জেলার তেলকল পাড়ায় ‘শিল্পাশ্রম’ তৈরি করেছিলেন। এই সংগঠনটি মানভূম জেলার স্বাধীনতা সংগ্রামের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল।
ব্রিটিশ সরকার ১৮৫৬ সালে গ্রামীণ চৌকিদারি আইন প্রবর্তন করে রাতের প্রহরার পরিসেবা প্রদানের জন্য গ্রামবাসীদের কাছ থেকে কর আদায়ের ব্যবস্থা করেছিল। গ্রামবাসীরা চৌকিদারদের অপছন্দও করতেন কারণ, সেই চৌকিদারেরা আসলে ব্রিটিশ সরকারের গুপ্তচর হিসেবে কাজ করত এবং স্থানীয় জমিদারদের রক্ষক ছিল। ১৯৩০ সালের ৮ এপ্রিল মহাত্মার গান্ধীর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা জাতীয় আইন অমান্য আন্দোলনের অংশ হিসাবে রাঁচিতে একটি বিশাল সভার আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে মানভূম জেলা সত্যাগ্রহ কমিটির সেক্রেটারি অতুলচন্দ্র ঘোষ জনগণকে চৌকিদারি কর প্রদান করা থেকে বিরত থাকতে আহ্বান জানিয়েছিলেন। এই অভিযান শেষ পর্যন্ত চৌকিদারদের পদত্যাগ করতে বাধ্য করেছিল।
আইন অমান্য আন্দোলনের সময় এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকার অপরাধে মানভূমের বেশ কয়েকজন নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। আইন অমান্য আন্দোলন ছাড়াও ১৯৪২ সালের ভরত ছাড়ো আন্দোলনেও সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন অতুলচন্দ্র এবং ১৯৪৫ সালে জাতীয় সপ্তাহ পালনের সময় জাতীয় পতাকা উত্তোলনের অপরাধে গ্রেপ্তার করা হয় তাঁকে।
এরপর মানভূমের ভাষা সমস্যাকে কেন্দ্র করে অতুলচন্দ্রের সঙ্গে জাতীয় কংগ্রেসের মতবিরোধ দেখা দেয়। আসলে, ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার পর মানভূমকে বিহার রাজ্যের একটি অংশ করা হয়েছিল, অথচ মানভূমে বাংলা ভাষাভাষি মানুষের সংখ্যা ছিল প্রচুর। কংগ্রেস জেলা কমিটির সভাপতি হিসেবে অতুলচন্দ্র ১৯৪৮ সালের ৩০ এপ্রিল বান্দোয়ান থানার জিতান গ্রামে একটি অধিবেশনে মানভূমকে পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্ভুক্ত করবার জন্য একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন। কিন্তু জাতীয় কংগ্রেস তাঁর প্রস্তাব প্রত্যাখান করে দেয়। আসলে ভাষার ভিত্তিতে প্রদেশ পুনর্গঠনের প্রসঙ্গে বাংলা ও হিন্দিভাষীদের মধ্যে কলহ লেগে যায়, শিল্পাশ্রমে প্রদেশ কংগ্রেস ভেঙে যায়। অতুলচন্দ্র ঘোষ, বিভূতি দাশগুপ্ত-সহ আরও অনেকে জাতীয় কংগ্রেস থেকে পদত্যাগ করে বেরিয়ে আসেন এবং ১৯৪৮ সালে তাঁরা মানভূমকে পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্ভুক্ত করবার উদ্দেশ্যে একটি গণআন্দোলন গড়ে তোলার জন্য লোকসেবক সংঘ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। অতুলচন্দ্র ঘোষ প্রথম থেকেই লোকসেবক সংঘের সভাপতি ছিলেন। তিনি জেলা জুড়ে ‘ভাষা সত্যাগ্রহ’ সংগঠিত করেন এবং ‘বঙ্গ সত্যাগ্রহ অভিযান’ নামে একটি লং মার্চেরও আয়োজন করেন। এই বঙ্গ সত্যাগ্রহের কন্ঠস্বর হয়ে ওঠে নিবারণ চন্দ্র দাশগুপ্তের প্রতিষ্ঠা করা ‘মুক্তি’ পত্রিকা, যেটির সম্পাদনার দায়িত্ব পরবর্তীকালে নিয়েছিলেন অতুলচন্দ্র। সেই পত্রিকায় স্পষ্ট করে জানানো হয় মাতৃভাষা রক্ষা করাই তাঁদের প্রথম এবং প্রধান কর্তব্য। বিহার সরকারের প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও শিক্ষা-সংক্রান্ত বিভিন্ন নীতির বিরোধিতা করে লোকসেবক সংঘ অতুলচন্দ্রের নেতৃত্বে মানভূম ভাষা আন্দোলন চালিয়ে যায়। ১৯৫০ থেকে ১৯৫২ সালের মধ্যে বহুবার সত্যাগ্রহ করেছিলেন তিনি। ভাষা সত্যাগ্রহের পক্ষে বহু মানুষ এসময় টুসু গান গেয়ে পথে নেমেছিলেন, যা টুসু সত্যাগ্রহ নামেও পরিচিত। ১৯৫৪ থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত এই টুসু সত্যাগ্রহ মানভূমের এই ভাষা আন্দোলনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। অবশেষে দীর্ঘ আন্দোলনের পরে ১৯৫৩ সালে রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন তাঁদের দাবিতে সম্মত হয় এবং ১৯৫৬ সালের ১ নভেম্বর মানভূম থেকেই পুরুলিয়া নামের একটি নতুন জেলা তৈরি হয় এবং তাকে পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। মানভূমের এই আন্দোলনে অতুলচন্দ্রের ভূমিকা ও অবদানের জন্য তাঁকে ‘মানভূম কেশরী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছিল।
এছাড়াও গান্ধীজির আদর্শে দীক্ষিত অতুলচন্দ্র ঘোষ গণতান্ত্রিক পঞ্চায়েতরাজ প্রতিষ্ঠা, গ্রামীণ শিল্পের উন্নতি, নিরক্ষরতা দূরীকরণ ইত্যাদি একাধিক সমাজসংস্কারমূলক কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন।
১৯৬১ সালে এই মহান স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং সমাজসংস্কারক অতুলচন্দ্র ঘোষের মৃত্যু হয়।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।
তথ্যসূত্র
- সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান (প্রথম খন্ড), সম্পাদক– সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত ও অঞ্জলি বসু, সাহিত্য সংসদ, কলকাতা, আগস্ট ২০১৬
- https://amritmahotsav.nic.in/
- https://www.indianetzone.com/
- https://en.m.wikipedia.org/
- https://www.anandabazar.com/


আপনার মতামত জানান