প্রাচীন শহর এই কলকাতার বুকে পুরনো নানা ঐতিহাসিক স্থাপত্যের ছড়াছড়ি। সেইসব স্থাপত্যগুলির মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হল পুরনো মন্দির, মসজিদ এবং গির্জাগুলি। কলকাতার প্রাচীনতম গির্জা হিসেবে পরিচিত আর্মেনিয়ান চার্চ (Armenian Church)। এটি কলকাতার বড়বাজার অঞ্চলের উত্তর-পশ্চিমকোণে আর্মেনিয়ান স্ট্রীটে অবস্থিত। এই গির্জা হোলি নাজারেথ চার্চ (Armenian Church of the Holy Nazareth) নামেও পরিচিত। ভারতবর্ষে আগত আর্মেনিয়ানদের এবং এই গির্জার ইতিহাস কিন্তু ব্রিটিশ শাসনেরও আগেকার। এই গির্জাটির যে কাঠামো বর্তমানে আমরা দেখতে পাই সেটিও একেবারে প্রথম কাঠামোটি নয়। কলকাতার আর্মেনিয়ানরা অ্যাপোস্টলিক চার্চ থেকে এই চার্চটির স্বতন্ত্রতা রক্ষার জন্য কলকাতা হাইকোর্টে মামলা পর্যন্ত করেছিলেন। কয়েক শতাব্দী প্রাচীন এই গির্জার ইতিহাসের মতোই তার স্থাপত্যও অন্ত্যন্ত আকর্ষণীয় ও মনোমুগ্ধকর।
ইতিহাস বলে, আর্মেনিয়ানরা ভারতবর্ষে খ্রিস্টধর্ম নিয়ে এসেছিল। ভারতে তারা ব্যবসায়ী হিসেবে এসেছিল এবং নিজেদের সম্প্রদায়ের বিস্তার ঘটিয়েছিল। বসতি স্থাপনের পর তাদের ঐতিহ্য এবং ধর্মেরও ক্রমে ক্রমে অনুপ্রবেশ ঘটতে থাকে এখানে। ধর্মরক্ষা এবং উপাসনার জন্য তারা সারা ভারতের বিভিন্ন স্থানে গির্জা প্রতিষ্ঠা করা শুরু করেছিল।
কলকাতায় বসতি স্থাপনকারী আর্মেনিয়ানদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত গির্জা ছিল এই আর্মেনিয়ান চার্চটি। বলা হয় যে, ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতে বসবাসকারী আর্মেনিয়ানদের সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন। চুক্তি স্বাক্ষরে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন স্যার জোসিয়া চাইল্ড এবং বাংলার আর্মেনিয়ান সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি ছিলেন খোজা সারহাদ এবং খোজা ফানুশ। সেই চুক্তি অনুসারে, ভারতের যেসব অঞ্চলে কমপক্ষে ৪০জন আর্মেনিয়ানের বাস সেই জায়গাগুলিতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে গির্জা তৈরি করতে হয়েছিল এবং সেই গির্জার ফাদারদের বেতন হিসেবে বার্ষিক ৫০ পাউন্ড করে অর্থ ধার্য করতে হয়। সেই চুক্তি মেনেই ১৭০৭ সালে (যদিও কেউ বলেন ১৭০৫ এবং কারও মতে ১৭০৮) কলকাতায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি একটি ছোট কাঠের চার্চ তৈরি করেছিল এবং উক্ত সালটিকেই তাই আর্মেনিয়ান চার্চের প্রতিষ্ঠাকাল হিসেবে ধরা হয়। সেই কাঠের ছোট গির্জাটি বর্তমান আর্মেনিয়ান চার্চের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে তৈরি করেছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি।
বিধ্বংসী এক অগ্নিকান্ডে গির্জা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পরে ১৭২৪ সালে আগা নাজার নামে একজন আর্মেনিয়ানদের পুরনো কবরস্থানে পবিত্র গির্জাঘরটি পুনরায় নির্মাণ করেছিলেন বলেই এটির অপর নাম নাজারেথ চার্চ। এই চার্চের স্থপতি ছিলেন, ইরানের একজন আর্মেনিয়ান, যার নাম লেভন গেভন্ড। গির্জাটি মাদার সী অব হোলি এচমিয়াডজিনের সঙ্গে ছিল সংযুক্ত। কলকাতার এই আর্মেনিয়ান চার্চ ‘মাদার চার্চ অফ দ্য ইন্ডিয়ান আর্মেনিয়ান’ নামেও পরিচিত। ১৭৩৪ সালে মি: ম্যানুয়েল হাজারমল এর সঙ্গে বেলফ্রি এবং স্টিপলটি যোগ করেন। ১৭৬৩ সালে গির্জাটি খোজা পেট্রোস আরাতুন সংস্কার ও অলঙ্কৃত করেছিলেন। দুটি বেদী তৈরি করেছিলেন তিনি। একটি বেদী তাঁর ভাই গর্গিন খানের স্মরণে তৈরি যিনি বাংলার নবাব মীরকাসেমের মন্ত্রী ও সেনাপতি ছিলেন এবং আরেকটি তাঁর নিজেরই স্মৃতিতে তৈরি।
পরবর্তীকালে ক্যাচিক আরাকিয়েল গির্জার অভ্যন্তরটি ডিজাইন করেন। পাদরিদের জন্য একটি মঠও তৈরি করে দিয়েছিলেন এবং কবরস্থানের চারদিকে উঁচু প্রাচীরও নির্মাণ করেছিলেন তিনি। পাদরিদের জন্য ঘর এবং বেলফ্রাইতে একটি ঘড়িও লাগানোর ব্যবস্থা করে দেন তিনি। যদিও ঘড়ি বসানো তিনি দেখে যেতে পারেননি, তার আগেই তাঁর মৃত্যু হয়েছিল।
১৯৯৫ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত আর্মেনিয়ানরা এচমিয়াডজিনের অ্যাপোস্টলিক চার্চ থেকে স্বতন্ত্র হওয়ার জন্য কলকাতা হাইকোর্টে আবেদন করে এবং বিচারপতি এস কে হাজারি তাদের স্বতন্ত্রতার আবেদন মঞ্জুর করে রায় দিয়েছিলেন।
কলকাতার এই আর্মেনিয়ান চার্চের স্থাপত্যশৈলীটি সাধারণ হলেও বেশ দৃষ্টিনন্দন। গির্জাটির বহিরঙ্গ এবং ভিতরেও চোখে পড়বে সাদা রঙ। গির্জার অভ্যন্তরটি সাদা এবং কালো মার্বেলের মিশ্রণে সজ্জিত। একটি সিঁড়ি রয়েছে যা গ্যালারির দিকে নিয়ে যায়। সেখানে গির্জার দেওয়ালগুলিতে দেখা যায় যীশুকে নিয়ে বিভিন্ন পেইন্টিং এবং ফ্রেস্কো। বেদীতে রয়েছে একটি ক্রশ, গসপেলের টেক্সট এবং যীশুর প্রেরিত বারোজন দূতের প্রতীক বারোটি মোমবাতি। বেদীটি ইংরেজ চিত্রশিল্পী এ.ই হ্যারিসের লাস্ট সাপার, হোলি ট্রিনিটি এবং ‘দ্য এনশরাউডিং অফ আওয়ার লর্ড’ শিরোনামের তিনটি চিত্র দিয়ে সজ্জিত। গির্জার আঙিনায় থাকা কবরস্থানটি ঐতিহাসিকভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই কবরস্থানে আরাথুন স্টিফেন-এর মতো বিশিষ্ট ব্যাক্তিদের কবরও খুঁজে পাওয়া যাবে। তবে সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক হল, সুকিয়াসের স্ত্রী রেজাবিবেহের কবর, যিনি কিনা ১৬৩০ সালে পরলোক গমন করেছিলেন। এই কবরটি একটি বিতর্ক উসকে দেয় যে, তবে কি জব চার্নকের কলকাতা আবিষ্কারের আগে থেকেই কলকাতায় আর্মেনিয়ানদের বসবাস ছিল? এ নিয়ে নিশ্চিত কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেননি ঐতিহাসিকেরা। এছাড়াও গির্জার চত্বরটি গাছপালায় ঘেরা, পরিচ্ছন্ন এবং সুন্দর। সেখানে আম গাছ, বেল গাছ-সহ আরও অন্যান্য গাছের সমাহার লক্ষ করা যায়।
আর্মেনিয়ান চার্চে খ্রিস্টধর্মের সঙ্গে সম্পর্কিত নানা উৎসব জাঁকজমকপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। যে উৎসবের কথা বিশেষভাবে বলতে হয়, যা খ্রিস্টানদের সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ উৎসব বলে বিবেচনা করা হয়, তা হল বড়দিন। সাধারণত ২৫ ডিসেম্বর বড়দিন পালন করা হলেও আর্মেনিয়ানরা কিন্তু বিশ্বাস করেন যে, প্রভু যীশু ৬ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেছিলেন। সেই কারণেই সমস্ত শহর ২৫ ডিসেম্বর ধুমধাম করে বড়দিন পালন করলেও, আর্মেনিয়ান চার্চে, আর্মেনিয়ান মানুষেরা ৬ জানুয়ারি এই উৎসব পালন করে থাকেন। এই আর্মেনিয়ান ক্রিসমাস উদযাপনে উচ্চপদস্থ বিভিন্ন আর্মেনিয়ান এসে যোগদান করেন। উৎসবের দিন সকালে আর্মেনিয়ান স্কুল ও কলেজের ছেলেমেয়েদের নিয়ে আর্মেনিয়ান চার্চের প্রধানের নেতৃত্বে হয় ডিভাইন লিটার্জি, যা মূলত প্রভুর বন্দনা ও প্রার্থনার এক অনুষ্ঠান। সেদিন বেদীটিকে সুন্দরভাবে সাজানো হয়। দক্ষ গায়ক প্রভু যীশুর প্রশংসাগীত গেয়ে থাকেন। আর্মেনিয়ান মানুষের দল গির্জায় উপস্থিত হয়ে প্রার্থনা করে এবং উৎসব উদযাপনে অংশ নেয়।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান