উনিশ শতকে বাংলার নবজাগরণ সম্ভব হয়েছিল সেইসময়কার কিছু চিন্তাবিদ, মনীষী ব্যক্তিত্বের নেতৃত্বে। সেই বঙ্গীয় রেনেসাঁর একজন পুরোধা ব্যক্তি ছিলেন ডেভিড হেয়ার (David Hare)। বাংলাদেশে পাশ্চাত্য শিক্ষা বিশেষত ইংরেজি ভাষায় শিক্ষাদানের বিস্তার ঘটাতে প্রভূত প্রয়াস করেছিলেন তিনি। মূলত একজন শিক্ষা-সংস্কারক হিসেবেই তাঁকে বঙ্গদেশের সারস্বতসমাজ শ্রদ্ধা জানিয়ে এসেছে। একজন ঘড়ি ব্যবসায়ী ডেভিড হেয়ার এদেশকে ভালবেসে, এদেশের তরুণ প্রজন্মকে পাশ্চাত্যদেশীয় শিক্ষার আলোয় উদ্ভাসিত করে তুলতে চেয়েছিলেন। সেই শিক্ষাবিস্তারের লক্ষ্যে হিন্দু কলেজ, হেয়ার স্কুল-এর মতো সব উচ্চমানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণের কাজে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন তিনি। শিক্ষাক্ষেত্রের একজন প্রশাসকের মতো কেবল উপরমহলে বসে হুকুম জারি করেননি তিনি, বরং প্রতিটি ছাত্রের প্রতি ছিল তাঁর সুনজর। উনিশ শতকের বঙ্গে পাশ্চাত্য শিক্ষার যথাযথ পথ তৈরি করে শিক্ষাব্যবস্থার মানোন্নয়ন করেছিলেন ডেভিড হেয়ার। তাঁর মতো মুক্তচিন্তার মানবতাবাদী, জনকল্যাণকারী মানুষ বঙ্গীয় রেনেসাঁকে ত্বরান্বিত করতে সহায়তা করেছিল।
১৭৭৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি স্কটল্যান্ডে ডেভিড হেয়ারের জন্ম হয়। যে পরিবারে তিনি জন্মেছিলেন, সেই পরিবার ঘড়ি তৈরির কাজ করত, সেই কারণেই অনেক অল্প বয়সেই ঘড়ি প্রস্তুতের কাজে হেয়ারের হাতেখড়ি হয়েছিল। অনেক ইউরোপীয় একসময় জীবিকার তাগিদে ভারতে এসেছিলেন, উনিশ শতকে ডেভিড হেয়ারও অনেকটা সেই কারণেই ভারতবর্ষে আসেন। ১৮০০ সালে কলকাতায় এসে তিনি ঘড়ির ব্যবসা শুরু করেছিলেন। তখন তাঁর বয়স মাত্র ২৫ বছর। এই ব্যবসাতে তখন তেমন কোন প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল না, ফলে হেয়ারের ব্যবসা বেশ রমরমিয়ে চলতে থাকে। প্রভূত ধনসম্পত্তি তিনি অর্জন করেন। ব্যবসাসূত্রেই, তাঁর দোকানে আসা এদেশের অনেক গণ্যমান্য মানুষের সঙ্গে পরিচয় হতে শুরু করে হেয়ারের এবং তাদের মাধ্যমেই এদেশের সাধারণ মানুষের কথা জানতে, বুঝতে পারেন। তখন থেকেই কেবল ব্যবসা করে অর্থোপার্জনে আর সন্তুষ্ট থাকতে পারছিলেন না তিনি। এদেশের মানুষের অবস্থার কথা শুনে তাদের প্রতি তাঁর হৃদয়ে অদ্ভুত এক সহমর্মিতা, সহানুভূতির সঞ্চার হয়। তিনি অনুভব করেন সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও এদেশের মানুষের অগ্রগতি না-হওয়ার প্রধান কারণ পাশ্চাত্য শিক্ষার অভাব। তাঁর মতো করে সেসময় খুব কম মানুষই এমনটা অনুভব করেছিলেন। এদেশে পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেই শুরু হয়েছিল ডেভিড হেয়ারের এক অন্য লড়াই।
এক নজরে ডেভিড হেয়ার-এর জীবনী:
- জন্ম: ১৭ ফেব্রুয়ারি, ১৭৭৫
- মৃত্যু: ১ জুন, ১৮৪২
- কেন বিখ্যাত: ডেভিড হেয়ার বাংলায় নবজাগরণের পথ সুগম করেছিলেন ইংরাজি শিক্ষা বিস্তারের মাধ্যমে। হিন্দু স্কুল, হেয়ার স্কুল ইত্যাদি স্থাপনে তাঁর অবদান অপরিসীম। ঘড়ির ব্যবসা করতে স্কটল্যান্ড থেকে ভারতে এলেও তিনি স্থানীয় মানুষকে ভালবেসে তাদের উন্নতিসাধনে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।
১৮১৪ সালে রেনেসাঁর আরেক পুরোধা ব্যক্তি রামমোহন রায় কলকাতায় এলে তাঁর সঙ্গে ডেভিড হেয়ারের দারুণ ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ডেভিড হেয়ার ১৮১৬ সালে রামমোহন ও তাঁর বন্ধুদের একটি সভায় যোগ দিয়েছিলেন। সেই সভার উদ্দেশ্য ছিল মূর্তিপূজা লুপ্ত করে দেওয়ার জন্য একটি সমিতি গঠন করা। তখন ডেভিড হেয়ার জানিয়েছিলেন, এই মুহুর্তে এদেশে ইংরেজি স্কুল স্থাপন করা বেশি প্রয়োজন। রামমোহন এবং ডেভিড হেয়ার দুজনেই এদেশে ইংরেজি শিক্ষাদানের যথাযথ ব্যবস্থা নিয়ে মাথা ঘামাতে শুরু করেন। এই ইংরেজি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিষয়ে ডেভিড হেয়ার সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি হাইড ইস্ট এবং বৈদ্যনাথ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গেও আলোচনা করেছিলেন। হাইড ইস্ট ডেভিড হেয়ারের এই উদ্যোগকে সমর্থন করলে অনেক দেশীয় ভদ্রলোকও এতে উৎসাহ বোধ করেন। অবশেষে ১৮১৭ সালে কলকাতা শহরে ডেভিড হেয়ার-সহ আরও অনেকের প্রচেষ্টায় হিন্দু কলেজ গড়ে ওঠে যা ১৮৫৫ সাল থেকে প্রেসিডন্সি কলেজ নামে পরিচিত। এই সূত্রেই হিন্দু কলেজের জনপ্রিয় শিক্ষক এবং উনিশ শতকের একজন নামজাদা ব্যক্তিত্ব ডিরোজিওর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ পরিচয় গড়ে উঠেছিল তাঁর। যখন হিন্দু সনাতন ধর্মবিরোধী এবং ছাত্রদেরও সেই পথে চালিত করবার কান্ডারি হিসেবে অভিযুক্ত করে ডিরোজিওকে হিন্দু কলেজ থেকে বিতাড়নের প্রসঙ্গ উঠেছিল, তখন ডেভিড হেয়ার কিন্তু সে প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছিলেন, কারণ তিনি জানতেন ডিরোজিও একজন সুযোগ্য শিক্ষক। তিনি হিন্দু কলেজের ঠিক উল্টোদিকেই ১৮১৭ সালে একটি স্কুল গঠন করেন, ১৮৬৭ সালে যেটির নাম রাখা হয় হেয়ার স্কুল।
কেবল নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হলেই তো হল না, তার জন্য প্রয়োজন যথাযথ পাঠ্যপুস্তিকা। সেই পাঠ্যপুস্তিকা প্রকাশের জন্য গড়ে ওঠে কলকাতা স্কুল বুক সোসাইটি। স্কুল বুক সোসাইটির পাশাপাশি গড়ে ওঠে কলকাতা স্কুল সোসাইটি। ১৮২১ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে ডেভিড হেয়ার এই সমিতির ইউরোপীয় সম্পাদকের পদে যোগদান করেন এবং আমৃত্যু এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। তাঁর সহকারী ছিলেন গৌরমোহন বিদ্যালঙ্কার। এই পদে বসে পরীক্ষা পদ্ধতি সংক্রান্ত কতকগুলি পরিবর্তন করেছিলেন তিনি। সোসাইটির কোষাধ্যক্ষের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া হয়ে যাওয়ায় যখন সোসাইটি মহাসংকটে পড়েছিল, তখন নিজে ৬০০০ টাকা সোসাইটিতে দান করে দুর্দিনে তার পাশে ছিলেন ডেভিড হেয়ার।
বঙ্গদেশের শিক্ষাক্ষেত্রে বিপ্লব আনতে গিয়ে নিজের ঘড়ির ব্যবসা থেকে সরে এসেছিলেন ডেভিড হেয়ার। ১৮২০ সালে তিনি ঘড়ির ব্যবসা গ্রে নামে তাঁর সহকারীর হাতে তুলে দেন। এই গ্রে সম্ভবত হেয়ারের একজন আত্মীয়ই ছিল। ১৮২১ সালে কলকাতায় সংস্কৃত কলেজ স্থাপনের পরিকল্পনা হয় এবং ১৮২৩ সালে সেই প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি গৃহনির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। সেই সময় ডেভিড হেয়ারের চেষ্টাতেই কলেজের স্থান সমস্যা মিটে গিয়েছিল। কুসংস্কার দূরীকরণের জন্য ইংরেজি শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলেন হেয়ার। তবে ছাত্রদের ইংরেজি শিক্ষাপ্রদানে সহায়তা করেই ক্ষান্ত ছিলেন না তিনি। অবসরে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে নিজে তিনি ছাত্রদের সঙ্গে কথা বলতেন। ছাত্রদের অন্যায় কাজকে সহ্য করতেন না, এমন করে তার প্রতিবিধান করতেন যে দ্বিতীয়বার সেই অন্যায় আর সে করত না। এছাড়াও যদি কোন ছাত্র স্কুলে অনুপস্থিত থাকত তবে তিনি সেই ছাত্রের বাড়ি লোক পাঠিয়ে তার খবর নিতেন। হাতে তাঁর একটি বেত থাকত, যা দিয়ে ছাত্রদের ভয় দেখালেও কখনও কাউকে বেত্রাঘাত করেননি তিনি। তিনি মানুষের টুকটাক স্বাস্থ্যসেবার কাজও করতেন। তাঁর পালকিতে নাকি নানারকম ঔষধ বোঝাই থাকত। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের “সেই সময়’ উপন্যাসে ডেভিড হেয়ারের যে চরিত্র আঁকা হয়েছে, তাতে দেখা যায়, এক অসুস্থ ছাত্রের বাড়ি নিজে গিয়ে তার শুশ্রূষার ব্যবস্থা করছেন। বাস্তবিকই এতটাই মানবদরদী মানুষ ছিলেন হেয়ার। ভারতবাসীকে নিজের দেশবাসীর মতোই যে তিনি মনে করতেন, তাঁর কাজকর্মের দিকে তাকালে, সে বিষয়ে সন্দেহ থাকে না।
কেবল ইংরেজি নয়, পাশ্চাত্য বিজ্ঞানের প্রসারেও ডেভিড হেয়ার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। কলকাতা মেডিকেল কলেজ স্থাপিত হলে হেয়ার প্রথম থেকেই এই প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার ছিলেন। যদিও কুসংস্কারাচ্ছন্ন হিন্দুদেরকে চিকিৎসাবিজ্ঞান পড়তে রাজি করানো অত সহজ কাজ ছিল না। কিন্তু সমস্ত বাধা হেয়ারের প্রয়াসে দূরীভূত হয়েছিল। তিনি পাঠদানের সময় কখনও কখনও স্বয়ং উপস্থিত থাকতেন। ছাত্রদের সঙ্গে অবাধে মেলামেশা করতেন। প্রথমদিকে মেডিকেল কলেজে মূলত হিন্দু কলেজ ও হেয়ার স্কুলের ছাত্ররা পড়তে আসত, যাদের সঙ্গে হেয়ারের সম্পর্কও ছিল খুব ঘনিষ্ঠ, ফলে বাধা এলেও তা অতিক্রম করা গিয়েছিল সহজেই। তবে কেবলমাত্র চিকিৎসাবিজ্ঞানই নয়, ডেভিড হেয়ার চেয়েছিলেন বিজ্ঞানের আরও নানা শাখায় ছাত্ররা জ্ঞানলাভ করুক। সেই কারণে মেডিকেল কলেজেই তাঁর উদ্যোগে উদ্ভিদবিদ্যা, রসায়নবিদ্যা ইত্যাদি বিজ্ঞানের আরও নানা শাখার পড়াশোনা শুরু হয়েছিল। কেবল ছাত্রদেরই নয়, স্কুলের শিক্ষকদেরও মেডিকেল কলেজে পড়বার জন্য উৎসাহিত করতেন হেয়ার। হেয়ার স্কুলের শিক্ষক সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জির পিতা দুর্গাচরণ ব্যানার্জিকে মেডিকেল কলেজে পড়ার সুযোগ করে দিয়েছিলেন হেয়ার। মেডিকেল কলেজের ছাত্রদের যাতে তাত্ত্বিক জ্ঞানলাভের সঙ্গে সঙ্গে রোগনির্ণয়, চিকিৎসার নানা ধাপ ইত্যাদি হাতেকলমে শিখতে সুবিধা হয়, তারজন্যেও নানা প্রয়াস চালিয়েছিলেন ডেভিড হেয়ার।
১৮৩৮ সালে যখন কলকাতায় ‘অ্যাকুইজিশন অব জেনারেল নলেজ’ নামে সমিতি স্থাপিত হয়, হেয়ার কিন্তু তার সঙ্গেও জড়িত ছিলেন এবং সেই সমিতির পরিদর্শক মনোনীত হয়েছিলেন।
ডেভিড হেয়ার নেটিভ ফিমেল এডুকেশনের জন্য লেডিস সোসাইটি (১৮২৪ সালে গঠিত)-এর গ্রাহক ছিলেন এবং সোসাইটির দ্বারা অনুষ্ঠিত পর্যায়ক্রমিক পরীক্ষায় উপস্থিত থাকতেন।
শিক্ষার বিষয় ছাড়াও আরও অন্য বিষয়েও ডেভিড হেয়ারের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। যেমন ১৮৩৫ সালে টাউন হলে সুপ্রিম কোর্টের সদর দেওয়ানী আদালতে জুরির সাহায্যে বিচারের বিষয়ে একটি সভা হয়েছিল এবং সেই সভার পক্ষ থেকে যে কমিটি গঠিত হয়েছিল, হেয়ার সেই কমিটিরও সদস্য মনোনীত হয়েছিলেন। আবার প্রাদেশিক আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে বিলাতের আদালতে আবেদন করার অধিকার হরণ করে সেই সময় একটি আইন গৃহীত হয়। সেই আইনের প্রতিবাদ করে টাউন হলে যে সভা হয়েছিল, হেয়ার উপস্থিত ছিলেন সেখানেও। সরকারের বিভিন্ন কাজে ইংরেজি ভাষা প্রচলনের দাবিতে যে আন্দোলন হয়েছিল ডেভিড হেয়ার সেই আন্দোলনেও অংশ নিয়েছিলেন। এছাড়াও এগ্রিকালচার ও হর্টিকালচার সোসাইটি, এশিয়াটিক সোসাইটির মতো প্রতিষ্ঠানগুলির সঙ্গেও ডেভিড হেয়ার যুক্ত ছিলেন। ভারতীয়দের কুলি হিসেবে মরিশাস দ্বীপে পাঠানোর বিরুদ্ধে সংঘটিত জনসভায় এর বিরোধিতা করেছিলেন হেয়ার।
ডেভিড হেয়ার যখন অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন তখন তাঁরই এক ছাত্র ডাক্তার প্রসন্নকুমার মিত্র হেয়ারের চিকিৎসা করেন। তবে সমস্ত প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হয় এবং অবশেষে ১৮৪২ সালের ১ জুন এই মহান ব্যক্তিত্ব ডেভিড হেয়ারের মৃত্যু হয়।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।
তথ্যসূত্র
- ‘প্রসঙ্গ ডেভিড হেয়ার’, সংকলন ও সম্পাদনা :- বিনয়ভূষণ রায়, অঙ্কুর প্রকাশন, কলকাতা, মার্চ, ১৯৬০
- ‘ডেভিড হেয়ার’, প্যারীচাঁদ মিত্র (অনুবাদ :- ব্রজদুলাল চট্টোপাধ্যায়, সম্পাদনা :- সুশীলকুমার গুপ্ত), সম্বোধি পাবলিকেশনস প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, কার্তিক, ১৩৬১
- https://en.m.wikipedia.org/
- https://scroll.in/


আপনার মতামত জানান