সববাংলায়

বোটানিক্যাল গার্ডেন ভ্রমণ | আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসু ইন্ডিয়ান বোটানিক গার্ডেন ভ্রমণ

হাওড়ার শিবপুরে অবস্থিত আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসু ইন্ডিয়ান বোটানিক গার্ডেন বা সংক্ষেপে বোটানিক্যাল গার্ডেন হল ভারতের অন্যতম প্রাচীন ও বৃহৎ উদ্ভিদ উদ্যান। বিশাল সবুজ প্রান্তর, শতাব্দীপ্রাচীন গাছ, বিরল সব গাছপালার সংগ্রহ – সব মিলিয়ে এটি প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে এক অনন্য আকর্ষণীয় জায়গা। কেন্দ্রীয় সরকার দ্বারা পরিচালিত ২৭০ একর জমি নিয়ে গড়ে ওঠা প্রায় দুই শতাধিক বছর প্রাচীন এই বাগান প্রাকৃতিক এবং ঐতিহাসিক ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ একটি অসামান্য পর্যটন কেন্দ্র।

বোটানিক্যাল গার্ডেন কোথায়

হাওড়া জেলায় অবস্থিত সবুজে ঘেরা বিস্তীর্ণ উদ্যান হল আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসু ইন্ডিয়ান বোটানিক গার্ডেন। এটি প্রায় ২৭৩ একর জুড়ে বিস্তৃত। কলকাতা শহরের ঠিক পাশেই, হাওড়ার শিবপুরে অবস্থিত এই উদ্যানের প্রধান আকর্ষণ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বটগাছ। এটি হাওড়া স্টেশন থেকে মাত্র সাড়ে তিন কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এবং কলকাতা থেকে এর দূরত্ব মাত্র ১৫ কিলোমিটার। এছাড়া বর্ধমান থেকে এর দূরত্ব প্রায় ১০০ কিলোমিটার এবং শিলিগুড়ি থেকে এর দূরত্ব প্রায় ৫৭০ কিলোমিটার।

বোটানিক্যাল গার্ডেনের ইতিহাস

১৭৮০-এর দশকে কলকাতাকে কেন্দ্র করে যখন বাণিজ্য, উপনিবেশ ও প্রশাসনের বিস্তার শুরু হচ্ছিল, তখনই ইউরোপীয় উদ্ভিদবিজ্ঞানীরা এই অঞ্চলে একটি বৃহৎ উদ্ভিদ উদ্যান তৈরি করার পরিকল্পনা নেন। সেই ভাবনা থেকেই ১৭৮৭ সালে হাওড়ার শিবপুরে প্রতিষ্ঠিত হয় এই ঐতিহাসিক বাগানটি, যা আজ আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসু বোটানিক্যাল গার্ডেন নামে পরিচিত। স্থানীয়দের মতে, প্রাচীনকালে এই অঞ্চল ছিল হুগলী নদীপথে চলা নাবিকদের চোখে এক গুরুত্বপূর্ণ চিহ্ন। বিশেষ করে বাগানের ভেতরে থাকা দ্য গ্রেট ব্যানিয়ান—যার বিস্তার দূর থেকে পুরো একটি অরণ্যের মতোই দেখাত। সেটি নাকি নাবিকদের পথ নির্দেশেও সাহায্য করত। নদীর দিক থেকে এই বিরাট বটগাছের ছায়া দেখে তারা বুঝতে পারতেন, শিবপুর–কলকাতার বন্দর এলাকা আর বেশি দূরে নয়।

বোটানিক্যাল গার্ডেন ভ্রমণ | আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসু ইন্ডিয়ান বোটানিক গার্ডেন ভ্রমণ | সববাংলায়
বোটানিক্যাল গার্ডেন । ছবি ইন্টারনেট

ব্রিটিশ আমলে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আনা বিরল গাছপালা, ঔষধি বৃক্ষ ও কৃষিজ উদ্ভিদের গবেষণাকেন্দ্র হিসেবে এই বাগানকে ব্যবহার করা হত। আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আমেরিকা থেকে আনা অনেক গাছ প্রথম ভারতীয় মাটিতে রোপিত হয় এই বাগানেই। তখনকার দিনে উদ্ভিদবিদ নাথানিয়েল ওয়ালিচ থেকে শুরু করে বহু ব্রিটিশ বিজ্ঞানী এখানে উদ্ভিদ সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং গবেষণার কাজ করেছেন। পরবর্তীকালে স্বাধীনতার পর বাগানের দায়িত্ব যায় বোটানিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া (BSI)–র হাতে। মহান বিজ্ঞানী আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসুর উদ্ভিদ–সংবেদনশীলতা নিয়ে গবেষণার কথা মাথায় রেখে উদ্যানটির নাম তাঁর নামে উৎসর্গ করা হয়।

বোটানিক্যাল গার্ডেনে কীভাবে যাবেন

ট্রেনে করে যেতে হলে প্রথমে কলকাতার হাওড়া স্টেশন বা শিয়ালদহ স্টেশনে নেমে স্টেশন থেকে বেরিয়েই ট্যাক্সি, অটো বা বাসে খুব সহজেই বোটানিক্যাল গার্ডেনের প্রধান গেটে পৌঁছে যাওয়া যায়। বাসে যেতে হলে কলকাতা ও হাওড়ার বিভিন্ন জায়গা থেকে শিবপুরগামী প্রচুর বাস চলে। এসব বাসে চেপে শিবপুর বটগাছ মোড়ে নেমে কয়েক মিনিট হাঁটলেই বোটানিক্যাল গার্ডেনের প্রবেশদ্বারে পৌঁছানো যায়। নিজেদের প্রাইভেট গাড়িতে যেতে হলে এনএইচ-১৬ বা এনএইচ-১৯ ধরে হাওড়ার দিকে প্রবেশ করলেই সাইনবোর্ড নির্দেশিত পথে সহজেই পৌঁছে যাওয়া যায় বাগানের সামনে।

বোটানিক্যাল গার্ডেনে কোথায় থাকবেন

বোটানিক্যাল গার্ডেনের আশেপাশে বিভিন্ন বাজেটের বেশ কিছু হোটেল বা গেস্টহাউস রয়েছে। শিবপুর, মন্দিরতলা, হাওড়া স্টেশন এলাকা এবং বিদ্যাসাগর সেতুর ধারে সুলভ মূল্যের হোটেল থেকে শুরু করে উচ্চমানের হোটেল সহজেই পাওয়া যায়। হোটেলে থাকলে আগে থেকে বুক করে রাখা ভালো। তবে কলকাতা, হাওড়া, হুগলী বা পার্শ্ববর্তী অঞ্চল থেকে ঘুরতে গেলে একদিনেই ঘোরা সম্ভব। তবে কাছাকাছি কোনও হোটেলে থেকেই হোক বা একদিনের জন্য ঘোরাই হোক, বোটানিক্যাল গার্ডেনে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা একবার হলেও অবশ্যই নেওয়া উচিত।

বোটানিক্যাল গার্ডেনে কী দেখবেন

বোটানিক্যাল গার্ডেনে দেখবার জন্য রয়েছে নানান রকম গাছপালা, যুগ যুগ ধরে বেড়ে ওঠা বিরল উদ্ভিদ, বিশাল সবুজ বাগান, গবেষণাগার, লেক এবং প্রকৃতির মধ্যে হাঁটার জন্য মনোরম পথ। এখানে ঘুরে বেড়াতে গেলে একদিকে যেমন দৃষ্টিনন্দন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আপনাকে স্বাগত জানাবে, অন্যদিকে ঔষধি গাছ থেকে শুরু করে বিশ্বের বিভিন্ন প্রজাতির ফুল–সব মিলিয়ে এটি সত্যিই একটি জীবন্ত উদ্ভিদ জাদুঘর। নির্দিষ্ট প্রবেশমূল্য দিয়ে প্রবেশ করতে হয় এবং সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৫টা পর্যন্ত বাগান খোলা থাকে।

প্রবেশমূল্যের টিকিটে বাগানের বেশিরভাগ অংশ ঘোরা যায়। তবে যেসব সংরক্ষিত ঘরে বিশেষ প্রদর্শনী বা সংগ্রহ রয়েছে, সেগুলোর জন্য আলাদা টিকিট লাগতে পারে। একবারেই সমস্ত কিছু দেখার জন্য প্রবেশের সময় টিকিট কাউন্টারে জেনে নিতে পারেন। বোটানিক্যাল গার্ডেনে যেগুলো অবশ্যই দেখা উচিত, সেগুলোর তালিকা নিচে দেওয়া হল।

গ্রেট বট গাছ (Great Banyan Tree)

এটি বোটানিক্যাল গার্ডেনের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এই বটগাছটি দেখতে গাছের চেয়ে বেশি একটি বনের মতোই মনে হয়। প্রায় ৩.৫ একর এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই বটগাছের হাজার হাজার প্রপ–রুট ছড়িয়ে পড়ে একে অদ্ভুত এক জীবন্ত ছাতার মতো রূপ দিয়েছে। মূল কাণ্ড না থাকলেও গোটা বৃক্ষটি নিজের শিকড়ের উপর দাঁড়িয়ে মাথা উঁচু করে আছে—এ এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা, যা দেখতে প্রতিদিন বহু মানুষ আসে।

গ্রিন হাউস ও কনজারভেটরি

এখানে রয়েছে নানা দেশের বিদেশি গাছপালা, যেগুলো বিশেষ তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও আলোয় সংরক্ষণ করা হয়। অর্কিড, ফার্ন, ট্রপিক্যাল ফুল, দুর্লভ পাতাবাহারসহ নানান প্রজাতির উদ্ভিদ এই কাচের গৃহে প্রদর্শিত হয়। যারা প্রকৃতি ও উদ্ভিদবিজ্ঞানে আগ্রহী, কনজারভেটরি তাদের জন্য স্বর্গ।

অর্কিড হাউস

রঙে, গঠনে ও সৌন্দর্যে একেকটি অর্কিড যেন প্রকৃতির তৈরি শিল্পকর্ম। অর্কিড হাউসে বিভিন্ন দেশের অসংখ্য বিরল অর্কিড দেখতে পাবেন। ফোটা অবস্থায় এই ঘরটি অসাধারণ সুন্দর হয়ে ওঠে।

পাম অ্যাভিনিউ

একটি লম্বা, সোজা রাস্তা—দুই পাশে সারি সারি সুউচ্চ পাম গাছ। বোটানিক্যাল গার্ডেনের সবচেয়ে ছবিতোলা–যোগ্য জায়গাগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। সূর্যালোকে পাম গাছের ছায়ারা রাস্তার উপর তাল মিলিয়ে পড়ে—এমন দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি না করলে যেন ভ্রমণ অসম্পূর্ণ।

হার্ব গার্ডেন

বিভিন্ন প্রকার ঔষধি গাছের বিশেষ সংগ্রহ এখানে দেখা যায়। আয়ুর্বেদিক চিকিৎসায় ব্যবহৃত বহু গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভিদ এখানে নামসহ প্রদর্শিত হয়, যা ছাত্রছাত্রী ও গবেষকদের বিশেষভাবে উপকারে আসে।

ওয়াটার গার্ডেন

এখানে রয়েছে জলজ উদ্ভিদের সংগ্রহ—পদ্ম, শাপলা, পানিফল, ওষধি জলজ উদ্ভিদসহ আরও অনেক কিছু। পাশাপাশি বাগানের ভেতরে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে রয়েছে কয়েকটি শান্ত লেক, যেখানে বসে বিশ্রাম নেওয়া, ছবি তোলা বা প্রকৃতির নির্জনতা উপভোগ করার সুযোগ রয়েছে।

ক্যাকটাস হাউস

মরুভূমি অঞ্চলের গাছপালা যেমন ক্যাকটাস ও সাকুলেন্ট এখানে সংরক্ষিত। বিভিন্ন আকৃতি, আকার ও ধরনের ক্যাকটাসের সংগ্রহ দেখে মনে হবে যেন অন্য গ্রহে চলে এসেছেন। যারা বাগান করতে ভালোবাসেন, তাদের কাছে এই অংশটি বিশেষ আকর্ষণীয়।

আরবরেটাম

বিশাল এলাকায় বিভিন্ন প্রজাতির বড় বড় গাছের সংগ্রহ। এটি গাছপ্রেমী মানুষদের জন্য সবচেয়ে শিক্ষণীয় অংশ। গাছের নাম, বৈশিষ্ট্য, উৎপত্তিস্থান সবকিছু বোর্ডে লেখা থাকে।

প্রজাপতি বাগান

এখানে আপনি বিভিন্ন প্রজাতির প্রজাপতির জীবনচক্র, তাদের বাসস্থান ও আচরণ সম্পর্কে জানতে পারবেন। রঙিন ডানাওয়ালা ছোট ছোট প্রজাপতি বাগানের ভেতরে উড়ে বেড়ানো—একটি অপূর্ব দৃশ্য।

প্রাচীন বৃক্ষ ও বিরল উদ্ভিদ সংগ্রহ

১৮ শতক থেকে লাগানো বহু পুরনো গাছ আজও দাঁড়িয়ে আছে বাগানের ভেতর। এর মধ্যে কিছু গাছের বয়স ২০০–২৫০ বছরেরও বেশি। এছাড়া আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা, এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়া মহাদেশের অনেক গাছই গার্ডেনে দেখার মতো।

ওপেন গ্রাউন্ড ও ওয়াকওয়ে

বাগানের ভেতরে রয়েছে দীর্ঘ ওয়াকওয়ে, সবুজ মাঠ ও বিশ্রামস্থল। পরিবার নিয়ে বসে সময় কাটানো, ছবি তোলা বা সাধারণভাবে প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটানোর জন্য এগুলো আদর্শ জায়গা।

বোটানিক্যাল গার্ডেনে কখন যাবেন

সারা বছর ধরেই বোটানিক্যাল গার্ডেনে মানুষ ঘুরতে যায়। দোলের দিন ছাড়া বছরের ৩৬৪ দিনই এই বাগান খোলা থাকে। প্রকৃতিপ্রেমী মানুষ বা সপরিবারে সব বয়সের মানুষের কাছেই জায়গাটি সমানভাবে জনপ্রিয়। বিশেষ করে প্রকৃতি ও জীববিজ্ঞান বিষয়ে প্রজেক্ট করা ছাত্রছাত্রীদের কাছে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ দর্শনীয় স্থান। মূলত শীতকালেই এখানে ভিড় সবচেয়ে বেশি হয়। অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত হাওড়ার আবহাওয়া ঠান্ডা ও মনোরম থাকে, ফলে এই সময়টায় বাগানটি ভিড়ে উপচে পড়ে।

সতর্কতা ও পরামর্শ

  • বোটানিক্যাল গার্ডেন সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে। টিকিট কাউন্টার বন্ধ হয় বিকেল ৪টা ৩০ মিনিটে।
  • দোলযাত্রা বাদে বছরের ৩৬৪ দিন বাগান খোলা থাকে।
  • ৫ বছরের উপরে সকলের জন্য প্রবেশমূল্য মাথা পিছু ১০ টাকা। ৫ বছরের নিচে কোনো প্রবেশমূল্য নেই। তবে বিশেষ গ্যালারি বা সংরক্ষিত অংশে গেলে আলাদা টিকিট লাগতে পারে।
  • বিশাল বাগান হাঁটতে হলে আরামদায়ক জুতো পরা ভালো। গ্রীষ্মকালে দুপুরের রোদ থাকে তীব্র, তাই সকালে বা বিকেলে গেলে সুবিধা হয়।
  • বর্ষায় এখানে গেলে সময়ে কিছু রাস্তা পিচ্ছিল হতে পারে। সেক্ষেত্রে সাবধানে হাঁটা প্রয়োজন।
  • বাগানে অ্যালকোহল সেবন, প্লাস্টিক ব্যবহার বা উচ্চশব্দে স্পিকার ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
  • ছবি তুলতে কোনো সমস্যা নেই, তবে ড্রোন ও বাণিজ্যিক শুটিংয়ের জন্য আলাদা অনুমতি প্রয়োজন।

সর্বশেষ সম্পাদনার সময়কাল – ২০২৫


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading