সববাংলায়

গেয়র্গ ওহ্‌ম

গেয়র্গ সাইমন ওহ্‌ম (Georg Simon Ohm) বা গেয়র্গ ওহ্‌ম ছিলেন একজন জনপ্রিয় জার্মান পদার্থবিজ্ঞানী ও গণিতবিদ। বিভিন্ন স্কুলে শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি অবিরত নিজের গবেষণাকর্ম চালিয়ে যান। এছাড়া তিনি রচনা করেন বিজ্ঞান বিষয়ক বেশ কিছু বিখ্যাত গ্রন্থ। তবে বিজ্ঞান জগতে তিনি চিরকাল অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবেন মূলত ‘ওহ্‌মের সূত্র’ আবিষ্কারের জন্য। এই সূত্র বৈদ্যুতিক সার্কিটের অন্যতম একটি জনপ্রিয় মৌলিক সূত্র। ওহ্‌মের এই সূত্র দ্বারা বৈদ্যুতিক সার্কিটে কারেন্ট, ভোল্টেজ, রেসিস্টেন্স নির্ণয় করা যায়।

১৭৮৯ সালের ১৬ মার্চ গেয়র্গ ওহ্‌মের জন্ম হয় তৎকালীন রোমান সাম্রাজ্যের এরলাঙ্গেনে (Erlangen) যা বর্তমানে জার্মানিতে অবস্থিত। তাঁর বাবার নাম জোহান উলফগ্যাং ওহ্‌ম এবং মায়ের নাম মারিয়া এলিজাবেথ বেক। ওহ্‌ম পরিবার খ্রিষ্টধর্মে বিশ্বাসী হলেও পোপের আধিপত্য তাঁরা মেনে চলতেন না। গেয়র্গ ওহ্‌মের বাবা পেশায় ছিলেন একজন তালাওয়ালা বা লকস্মিথ। তাঁর বাবার প্রথাগত কোনও শিক্ষা ছিল না, তবে তিনি নিজের একান্ত চেষ্টাতেই বিজ্ঞান সম্পর্কে নানা জ্ঞান অর্জন করেছিলেন। মাত্র দশ বছর বয়সেই গেয়র্গ ওহ্‌মের মায়ের মৃত্যু হয়। তাঁদের ছয় ভাইবোনের মধ্যে চারজন অল্প বয়সেই মারা যায়। গেয়র্গ ওহ্‌মের বড় ভাই মার্টিন ওহ্‌ম ছিলেন জার্মানির একজন বিশিষ্ট গণিতবিদ। তাঁর লেখা ‘ডাই রেইন এলিমেন্টার ম্যাথেমেটিক’ (Die Reine Elementar Mathematik) গ্রন্থে তিনি প্রথমবার ইউক্লিডের ‘চরম ও গড় অনুপাত’-কে ‘গোল্ডেন সেকশন’ বলে উল্লেখ করেন। পরবর্তীকালে ইউক্লিডের অনুপাত বোঝাতে এই শব্দবন্ধনই ব্যবহার করা হয়। আবার এই অনুপাতকে সোনালী অনুপাতও (Golden Ration) বলা হয়।

এক নজরে গেয়র্গ ওহ্‌মের জীবনী:

  • জন্ম: ১৬ মার্চ, ১৭৮৯
  • মৃত্যু: ৬ জুলাই, ১৮৫৪
  • কেন বিখ্যাত: গেয়র্গ ওহ্‌ম একজন জনপ্রিয় জার্মান পদার্থবিজ্ঞানী ও গণিতবিদ। তড়িৎ বিজ্ঞানে ওহ্‌মের সূত্র একটি জনপ্রিয় সূত্র যার দ্বারা তড়িৎ প্রবাহমাত্রা, বিভব পার্থক্য ও রোধের সম্পর্ক নির্ণয় করা হয়।
  • পুরস্কার ও স্বীকৃতি: রয়্যাল সোসাইটির পক্ষ থেকে তাঁকে ‘কোপলি মেডেল’ দেওয়া হয়। তড়িৎবিজ্ঞানের উপর তাঁর কাজকে সম্মান জানিয়ে বৈদ্যুতিক রোধ বা রেসিস্টেন্সের এসআই এককের নাম দেওয়া হয়েছে ওহ্‌ম।

গেয়র্গ ওহ্‌মের বাবাই তাঁদের দুই ভাইকে গণিত, পদার্থবিদ্যা, রসায়নবিদ্যা এবং দর্শন সম্পর্কে প্রাথমিক শিক্ষা দান করেন। তাঁর বাবা চেয়েছিলেন ওহ্‌ম ভাইরা বড় হয়ে পারিবারিক ব্যবসার দায়িত্ব নেবে। কিন্ত পরবর্তীকালে তিনি গেয়র্গ ওহ্‌ম ও মার্টিন ওহ্‌মের অসাধারণ মেধার পরিচয় পেয়ে নিজের সিদ্ধান্ত বদলান এবং দুই ভাইকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করার চেষ্টা করেন। গেয়র্গ ওহ্‌ম এগারো থেকে প্রায় পনের বছর বয়স পর্যন্ত ‘এরল্যাঙ্গেন জিমনেশিয়াম’- স্কুলে (Erlangen Gymnasium) পড়াশোনা করেন। তবে সেখানে বিজ্ঞানচর্চার তেমন বিশেষ কোনও সুযোগ ছিল না। পরবর্তীকালে গেয়র্গ ওহ্‌ম ‘এরল্যাঙ্গেন বিশ্ববিদ্যালয়’-এ (University Of Erlangen) ভর্তি হন। তবে মেধাবী ছাত্র গেয়র্গ ওহ্‌ম এই সময় পড়াশোনার থেকে নানান বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানে নিজের সময় বেশি অতিবাহিত করতেন। এই কারণে তাঁর বাবা আশাহত হন এবং তাঁকে সুইজারল্যান্ডে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনটি সেমিস্টারের পরীক্ষা দেওয়ার পর গেয়র্গ ওহ্‌মকে পড়াশোনা ছেড়ে সুইজারল্যান্ডে চলে যেতে হয়। সেখানে তিনি ১৮০৬ সালে ‘গটস্ট্যাট ব্রি নিদাউ’ মঠের (Gottstadt bei Nidaau) একটি স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। এই সময় তিনি শিক্ষকতার পাশাপাশি আবার নিজের পড়াশোনা শুরু করতে চান। তবে এখানে তিনি নতুন কোনও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি না হয়ে নিজেই পড়াশোনা চালিয়ে যান। এই বিষয়ে গেয়র্গ ওহ্‌ম সাহায্য পেয়েছিলেন জার্মানির বিখ্যাত গণিতবিদ কার্ল ক্রিস্টিয়ান ভন ল্যাংসড্রফের (Karl Christian von Langsdorf) থেকে। ল্যাংসড্রফের পরামর্শ অনুযায়ী তিনি কিছুদিন পর শিক্ষকতার চাকরি ছেড়ে দিয়ে ন্যুশ্যাটেলের (Neuchatel) একজন গৃহশিক্ষক হিসাবে কাজ করেন। এরপর তিনি আবার ‘এরল্যাঙ্গেল বিশ্ববিদ্যালয়’-এ ফিরে যান এবং নিজের পড়াশোনা শেষ করেন। ১৮১১ সালে তিনি ওই বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই ডক্টরেট ডিগ্রি পান।

গেয়র্গ ওহ্‌ম ১৮১৩ সালে বেমবার্গের (Bamberg) একটি অনামী বিদ্যালয়ে গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। এই স্কুলে শিক্ষকতা করার সময় তিনি নিজেকে প্রমাণ করার জন্য একটি জ্যামিতিক পাঠ্যপুস্তক রচনা করেন যার পাণ্ডুলিপি প্রুশিয়ার রাজা তৃতীয় উইলহেল্মের (Wilhelm III) কাছে পাঠান। রাজা এই বইয়ের পাণ্ডুলিপি দেখে অত্যন্ত খুশি হন এবং তাঁকে কোলনের জেসুইট জিমনেশিয়ামের (Jesuit Gymnasium of Cologne) স্কুলে অঙ্ক ও পদার্থবিদ্যা পড়ানোর জন্য একান্ত অনুরোধ করেন। এরপর ১৮১৭ সালে গেয়র্গ ওহ্‌ম ওই স্কুলের শিক্ষক হিসাবে যোগ দেন। এই স্কুলের গবেষণাগার ছিল খুবই উন্নতমানের। বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার জন্য আদর্শ এই গবেষণাগারে তিনি রেসিস্টেন্স, কারেন্ট ও ভোল্টেজের সম্পর্কের বিষয়ে আরও সূক্ষ গবেষণা করার সুযোগ পান।

১৮২৫ সালে গেয়র্গ ওহ্‌মের প্রথম গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয় যেখানে তিনি দেখান যে, তারের দৈর্ঘ্য বৃদ্ধির সাথে সাথে তার দ্বারা উৎপাদিত তড়িৎ চুম্বকীয় বল হ্রাস পায়। পরবর্তীকালে ওহ্‌ম আরও দুটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছিলেন। এরপর তিনি ১৮২৭ সালে বার্লিনে প্রকাশ করেন তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘ডি গ্যালভানিক কেট, ম্যাথামেথিক বিয়ারবাইট’ (Die galvanische Kette, mathematisch bearbeitet)। তড়িৎ প্রবাহ তত্ত্বে এই গ্রন্থের ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে। এই গ্রন্থেই তিনি দেখিয়েছেন যে, উষ্ণতা ও অন্যান্য ভৌত অবস্থা অপরিবর্তিত থাকলে কোনও পরিবাহীর মধ্য দিয়ে তড়িৎপ্রবাহমাত্রা ওই পরিবাহীর দুই প্রান্তের বিভব-প্রভেদের সমানুপাতিক হয়। এই সূত্রই পদার্থবিজ্ঞানে ‘ওহ্‌মের সূত্র’ (Ohm’s Law) নামে পরিচিত। এই সূত্রটিকে এইভাবে প্রকাশ করা হয় I= V/R। এখানে I দ্বারা তড়িৎ প্রবাহমাত্রা, V দ্বারা বিভব পার্থক্য বা ভোল্টেজ এবং R দ্বারা রোধ বা রেসিস্টেন্সকে বোঝানো হয়।

ওহ্‌ম নিজের গবেষণায় খুশি হলেও এই পরীক্ষা তাঁর জন্য সুখকর হয়নি বরং এই তত্ত্ব প্রকাশের পর তাঁকে নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। আসলে, সেই সময় জার্মান বিজ্ঞানীরা পরীক্ষামূলক পদার্থবিদ্যার চেয়ে তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানকে বেশি প্রাধান্য দিতেন; পাশাপাশি, ওহ্‌মের সূত্রের সঙ্গে ফরাসি বিজ্ঞানী অঁদ্রে-মারি অ্যাম্পিয়ারের (André-Marie Ampère) পরীক্ষার পার্থক্য রয়েছে এইসব কারণে নবাগত গেয়র্গ ওহ্‌মের এই সূত্রকে জার্মানির বিজ্ঞানীরা মানতেই চাননি। এছাড়া জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল (James Clerk Maxwell), জর্জ ক্রিস্টাল (George Chrystral) তাঁর সূত্রটিতে কিছু গবেষণামূলক ত্রুটি লক্ষ করেছিলেন। গেয়র্গ ওহ্‌ম আবার এই গবেষণার জন্য জিমনেশিয়াম স্কুলে তাঁর ঊর্ধ্বতন কর্তাদের কাছেও তিনি অপমানিত হন। আর এই কারণে তিনি জিমনেশিয়াম স্কুলের চাকরি ছেড়ে দেন। এরপর বহু কষ্ট করে ১৮৩৩ সালে তিনি নুরেমবার্গের পলিটেকনিক স্কুলে (Polytechnic School of Nuremberg) শিক্ষকতা করার একটা সুযোগ পান এবং দীর্ঘ ষোল বছর তিনি এই স্কুলেই শিক্ষকতা করেন।

গেয়র্গ ওহ্‌মের কাজ জার্মানিতে নিন্দিত হলেও ইংল্যান্ডের মানুষ তাঁর গবেষণালব্ধ ফলকে সাদরে গ্রহণ করে। ১৮৩৪ সালে মরটিজ ভন জ্যাকবি (Moritz von Jacobi) নিজের একটি প্রবন্ধে লেখেন কীভাবে ওহ্‌মের তত্ত্ব তাঁকে একটি ইলেকট্রনিক মোটর তৈরি করতে সাহায্য করেছিল। ইংল্যান্ডের বিখ্যাত ইলেকট্রিক ইঞ্জিনিয়ার উইলিয়াম স্টারজন (William Sturgeon) নিজের পত্রিকায় বিজ্ঞানী জ্যাকবির ওই কাজের কথা তুলে ধরেন। সাথে তিনি ওহ্‌মের সূত্রকেও সরলভাবে বর্ণিত করেন ওই পত্রিকায়। এরপর ইংল্যান্ডের বৈজ্ঞানিকরাও নিজেদের যন্ত্রে এই তত্ত্ব ব্যবহার করার চেষ্টা করেন এবং ক্রমে এই তত্ত্বটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। এরপর ইংল্যান্ডের বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পত্রিকাগুলি ওহ্‌মের তত্ত্ব বিষয়ক লেখালেখিতে ভরে যায়। ইংরেজ বিজ্ঞানী চার্লস হুইটস্টোন (Charles Wheatstone) ওহ্‌মের সূত্রগুলিকে সুন্দর ও বিস্তৃত ভাবে ব্যাখা করেন। তিনি নিজের গবেষণাগুলিকে ওহ্‌মের তত্ত্বের উপর বিশ্লেষণ করে দেখান। প্রাথমিকভাবে সমালোচনার পর জার্মানির গবেষকরা পুনরায় ওহ্‌মের সূত্রের পর্যালোচনা করে তাঁর কৃতিত্ব স্বীকার করে নেয়। এরপর সারা পৃথিবীতে ক্রমে তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। ১৮৪৯ সালে গেয়র্গ ওহ্‌ম ‘বেইট্রাজ জুর মলিকুলার-ফিজিক্স’ (Beitrage Zur Molecular-Physik) নামক আর একটি বই প্রকাশ করেন। এই বইটির প্রধান বিষয় ছিল আণবিক পদার্থবিদ্যা। অবশেষে ১৮৫২ সালে মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর অসাধারণ গবেষণার জন্য তাঁকে পরীক্ষামূলক পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসাবে নিযুক্ত করা হয়।

গেয়র্গ ওহ্‌মের গবেষণাকর্মকে স্বীকৃতি জানিয়ে রয়্যাল সোসাইটির পক্ষ থেকে তাঁকে ১৮৪১ সালে ‘কোপলি মেডেল’ দেওয়া হয়। আর পরের বছর রয়্যাল সোসাইটির বিদেশী সদস্যপদ প্রদান করা হয় তাঁকে। ১৮৪৫ সালে ‘ব্যাভারিয়ান অ্যাকাদেমি অফ সাইন্স অ্যান্ড হিউম্যানিটিস’র (Bavarian Academy of Sciences and Humanities) সদস্য পদও তাঁকে দেওয়া হয়। তড়িৎবিজ্ঞানের উপর তাঁর অসাধারণ কাজকে সম্মান জানিয়ে বৈদ্যুতিক রোধ বা রেসিস্টেন্সের এসআই এককের নাম দেওয়া হয়েছে ওহ্‌ম। গ্রিক বর্ণমালার চব্বিশতম অক্ষর ওমেগা (Ω) দ্বারা ওহ্‌মকে বোঝানো হয়।

১৮৫৪ সালে ৬ জুলাই জার্মানির মিউনিখে গেয়র্গ ওহ্‌মের মৃত্যু হয়।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading