ইতিহাস

ইউক্লিড

বিখ্যাত গ্রিক গণিতবিদ ইউক্লিড (Euclid) বিশ্বের ইতিহাসে পরিচিত জ্যামিতির জনক বা জ্যামিতির প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে। জ্যোতির্বিজ্ঞানী টলেমির সময়কালেই আলেকজান্দ্রিয়ায় তিনি তাঁর গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাগুলি করেছেন। তাঁর লেখা ‘হিজ এলিমেন্টস’ বইটির গুরুত্ব গণিতশাস্ত্রে অনস্বীকার্য। একটা সময় পর্যন্ত গণিতের প্রধান বই হিসেবে পাঠ্য ছিল ইউক্লিডের এই বইটি। ফলে উনিশ শতকের শেষ দিক থেকে বিশ শতকের শুরুর দিক পর্যন্ত গণিতের ক্ষেত্রে ইউক্লিড এবং তাঁর এই বইয়ের জনপ্রিয়তা ছিল তুঙ্গে। সামান্য কিছু স্বতঃসিদ্ধের উপর ভিত্তি করে তিনি ইউক্লীডিয় জ্যামিতির নতুন এক ধারা তৈরি করেন। এছাড়াও গাণিতিক দৃষ্টিকোণ, শঙ্কুর প্রস্থচ্ছেদ, বৃত্তীয় জ্যামিতি, সংখ্যা তত্ত্বের উপরও কাজ করেছেন ইউক্লিড।

ইউক্লিডের জীবন সম্পর্কে খুব কমই জানা যায়। তবু মনে করা হয় ৩২৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দ নাগাদ ইউক্লিডের জন্ম হয়েছিল। কিন্তু ঠিক কোথায় তাঁর জন্ম হয়, সে কথা আজও জানা যায়নি। তাঁর সময়ের বা তাঁর পরবর্তীকালের খুব কম বিজ্ঞানী বা গণিতবিদ তাঁর কথা উল্লেখ করেছেন, একমাত্র আর্কিমিডিস ছাড়া। গ্রিক ভাষায় ‘ইউক্লিড’ নামের অর্থ হল সুবিখ্যাত। ইউক্লিডের মৃত্যুর আট শতাব্দী পরে ৪৫০ খ্রিস্টাব্দে প্রোক্লাস সি নামের এক ব্যক্তি ইউক্লিডের জীবন বিষয়ে ‘কমেন্টারি অন দ্য এলিমেন্ট’ নামক একটি ইতিহাস গ্রন্থে সংক্ষিপ্ত কিছু তথ্যের উল্লেখ করেন। তবে আরবি লেখকদের বর্ণনায় তাঁর জন্ম হয়েছিল টায়ার শহরে। ধরে নেওয়া হয় যে তিনি যদি আলেকজান্দ্রিয়ার মানুষ হন, তাহলে সম্রাট আলেকজাণ্ডার এই শহর তৈরি করার প্রায় বছর দশেক পরে তিনি এখানে আসেন। সেদিক থেকে ৩২২ খ্রিস্টপূর্বাব্দ নাগাদ তিনি আলেকজান্দ্রিয়ায় এসেছিলেন বলে অনুমিত হয়। সেক্ষেত্রে আলেকজান্দ্রিয়ার বিখ্যাত সেরাপিয়াম, সুপ্রাচীন গ্রন্থাগারের কথাও সম্ভবত তিনি জানতেন। হয়তো বা এই গ্রন্থাগারে বসে তিনি পড়াশোনাও করে থাকবেন। এমনকি প্রোক্লাসের সেই লেখা থেকে জানা যায় যে, টলেমি ইউক্লিডকে নাকি প্রশ্ন করেছিলেন জ্যামিতি বোঝার কোনো দ্রুত উপায় আছে কিনা যার উত্তরে ইউক্লিড বলেছিলেন জ্যামিতি বুঝতে হলে রাজপথে আসা যাবে না। যদিও এই ঘটনার বাস্তবতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন ঐতিহাসিকেরা। প্রোক্লাসের মতে প্লেটোর ছাত্রদের থেকে ইউক্লিডের বয়স কম ছিল। প্লেটোর ছাত্র এক্সোডাসের বহু উপপাদ্যকে তিনি নিজে হাতে বিন্যস্ত করেছিলেন এবং থিয়েটেটাসের বহু কাজকে অকাট্য যুক্তি দিয়ে প্রামাণ্য করে তুলেছিলেন ইউক্লিড। আবার বয়সের দিক থেকে আর্কিমিডিস এবং ইরাটোস্থেনিসের তুলনায় বড়ো ছিলেন ইউক্লিড। ইরাটোস্থেনিসের কিছু কিছু লেখায় তাঁকে প্লেটোর মতবাদ ও দর্শনে বিশ্বাসী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অনেক লেখক আবার মনে করেন যে ইউক্লিডের জন্ম হয়েছিল মেগারায়, কিন্তু সে তথ্য একেবারেই ভ্রান্ত।

ইউক্লিড কে ছিলেন বা তাঁর অস্তিত্ব ঠিক কোন সময়পর্বে ছিল এই প্রশ্নের উত্তরে ঐতিহাসিক ইটার্ড তিনটি সম্ভাবনার কথা বলেন। প্রথমত, হয়তো ইউক্লিড কোনো ঐতিহাসিক চরিত্র ছিলেন যিনি ‘দ্য এলিমেন্টস’ নামে বিখ্যাত বইটি লেখেন। দ্বিতীয়ত, এমনও হতে পারে যে আলেকজান্দ্রিয়ায় কর্মরত একদল গণিতবিদের নেতা ছিলেন ইউক্লিড। তাঁরা সকলে মিলেই সম্ভবত ‘দ্য কমপ্লিট ওয়ার্কস অফ ইউক্লিড’ বইটি লিখেছিলেন। ইউক্লিডের মৃত্যুর পরে তারাই হয়তো ইউক্লিডের নামে আরো বই লিখেছেন। সবশেষে তৃতীয় সম্ভাবনাটি হল, ইউক্লিড কোনো ঐতিহাসিক চরিত্র নয়, কিন্তু মেগারার ইউক্লিড একজন ঐতিহাসিক চরিত্র ছিলেন যার থেকে আলেকজান্দ্রিয়ার ঐ গণিতবিদেরা ইউক্লিড নামে তাঁদের রচনা ও গবেষণা প্রকাশ করেছিলেন। এই তিনটি সম্ভাবনা নিয়েই ঐতিহাসিক মহলে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। অনেকেই মনে করেন যে ইউক্লিড আলেকজান্দ্রিয়ার বিখ্যাত ‘অ্যাকাডেমি’র ছাত্র ও পরবর্তীকালে শিক্ষক ছিলেন। ফলে প্লেটোর সঙ্গে তাঁর সান্নিধ্য ঘটেছে একথা ধরে নেওয়া যায়। তাঁর ‘ডিডোমনা’ বইতে মোট ৯৫টি উপপাদ্যের উল্লেখ করেন যা সবই কতগুলি স্বতঃসিদ্ধের উপর দাঁড়িয়ে আছে।     

গণিত বিষয়ক গ্রন্থ ‘দ্য এলিমেন্টস’ই ছিল ইউক্লিডের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ও বহুচর্চিত একটি কাজ। এই বইয়ে আলোচিত বিষয়গুলি পরবর্তী প্রায়  দুই হাজার বছর গণিতবিদ্যার জগতকে প্রভাবিত ও নিয়ন্ত্রিত করেছিল। ১৪৮২ সালে ভেনিসে প্রথম লাতিন ভাষায় লেখা এই বইটি প্রকাশিত হয় এবং পরে ১৫৭০ এর একটি ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হয়। এই বইতেই প্রথম তিনি আয়তক্ষেত্র, রম্বস, রম্বয়েড ইত্যাদি সামতলিক চিত্রের সংজ্ঞা দেন। বইটি শুরুই হচ্ছে কিছু সংজ্ঞা এবং পাঁচটি অনুমান দিয়ে যাকে ‘পস্টুলেট’ (Postulate) বলা হয়। প্রথম অনুমান হল, যে কোনো দুটি বিন্দুর মধ্যে একটি সরলরেখা অঙ্কন করা সম্ভব। এই অনুমানগুলিতে বিন্দু, রেখা, বৃত্ত ইত্যাদির অস্তিত্ব স্বীকার করে নেওয়া হয় এবং পরবর্তীকালে এগুলি থেকেই অন্যান্য সামতলিক জ্যামিতিক চিত্রের উৎপত্তি হবে একথা বলা হয়। চতুর্থ অনুমানে বলা হয় যে, সমস্ত সমকোণই সমান এবং সর্বশেষ অর্থাৎ পঞ্চম অনুমানে ইউক্লিড বলেছেন যে অন্য একটি সরলরেখার সমান্তরালে কোনো বিন্দু থেকে কেবলমাত্র একটিই সরলরেখা অঙ্কন করা সম্ভব। এর মধ্যে দিয়েই ইউক্লীডিয় জ্যামিতির জন্ম হয়। উনিশ শতকের আগে পর্যন্ত এই অনুমানগুলিকে মান্যতা দেওয়া হতো সমগ্র বিশ্বে এবং তার পরে নতুনভাবে ইউক্লিডের ধারণার বিপরীতে নতুন এক জ্যামিতি তৈরি হয়। এই রচনা আসলে ১৩টি ছোট ছোট খণ্ডে বিভাজিত। প্রথম থেকে ষষ্ঠ খণ্ডের মূল আলোচ্য বিষয় সমতল জ্যামিতি। এর মধ্যে প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ডের মূল বিষয় ত্রিভুজ, সমান্তরাল সরলরেখা, সামান্তরিক, আয়তক্ষেত্র, বর্গক্ষেত্র অঙ্কন ও তার বৈশিষ্ট্য এবং তৃতীয় খণ্ডে আলোচিত হয়েছে বৃত্তের ধর্ম বিষয়ে। পঞ্চম খণ্ডে অনুপাত, সমানুপাত নিয়ে আলোচনা করেছেন ইউক্লিড। এরপরে এই বইয়ের সপ্তম থেকে নবম খণ্ডে দেখা যায় সংখ্যাতত্ত্বের নানাবিধ আলোচনা। দুটি সংখ্যার গরিষ্ঠ গুণনীয়ক নির্ণয়ের পদ্ধতি বর্ণনা করেছেন এখানে ইউক্লিড। ‘এলিমেন্টস’-এর অষ্টম খণ্ডটি আবর্তিত হয়েছে জ্যামিতিক ক্রমকে কেন্দ্র করে এবং এর দশম খণ্ডের বিষয় হল অমূলদ সংখ্যা যা নিয়ে তাঁর আগে দার্শনিক থিয়েটেটাসও কিছু কাজ করেছিলেন। ইউডোক্সাসের প্রণীত অনুপাতের নতুন সংজ্ঞার সমর্থনে এই খণ্ডে ইউক্লিড কিছু কিছু উপপাদ্যের প্রামাণ্য অংশে বদল ঘটান। সবশেষে বইয়ের একাদশ থেকে ত্রয়োদশ খণ্ডে ইউক্লিড ত্রিমাত্রিক জ্যামিতির নানা বিষয় আলোচনা করেছেন। অষ্টতল্ক, ঘনক, গোলক বা পিরামিড ইত্যাদি ঘনবস্তুর বিষয়ে ইউক্লিডের আলোচনা ছিল অত্যন্ত যুক্তিনিষ্ঠ। তবে একাদশ খণ্ডে তিনি মূলত পূর্বতন খণ্ডগুলির জন্য প্রয়োজনীয় মৌলিক কিছু সংজ্ঞা বিধৃত করেছেন। ৪৬৭টি প্রস্তাবনা যুক্তি দিয়ে বিশ্লেষণ করেছেন তিনি। ইউক্লিডই প্রথম বলেছিলেন যে বৃহত্তম মৌলিক সংখ্যা নির্ণয় করা একেবারেই অসম্ভব যা আজও সমানভাবে সত্য। স্কুল পাঠ্য জ্যামিতির ভিত্তি তৈরি করেছিল তাঁর এই ‘এলিমেন্টস’ বইটি। বিখ্যাত বিজ্ঞানী আইনস্টাইন তাঁর জ্যামিতি বিদ্যার প্রতি আকৃষ্ট হয়েই আপেক্ষিকতা তত্ত্বে ইউক্লিডীয় জ্যামিতিকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে জার্মান গণিতজ্ঞ রিম্যান ইউক্লিডের জ্যামিতিকে অগ্রাহ্য করে সম্পূর্ণ নতুনভাবে গড়ে তোলেন অ-ইউক্লিডীয় জ্যামিতি। আধুনিক জ্যামিতির বিভিন্ন প্রতর্কেও ইউক্লিডের বেশ কিছু ধারণাকে স্বীকার করা হয়নি।

‘দ্য এলিমেন্টস’ ছাড়াও আরো অনেকগুলি বই লিখেছিলেন ইউক্লিড যার মধ্যে অন্যতম হল ৯৪টি প্রস্তাবনা সম্বলিত ‘ডিডোমনা’ তথা ‘ডেটা’ শীর্ষক বইটি। এছাড়াও অন্যান্য বইগুলি হল – ‘অন ডিভিশনস’, ‘অপটিক্স’, ‘সারফেস লোকাই’ (Surface Loci), ‘পোরিজ্‌মস’ (Porisms), ‘দ্য বুক অফ ফ্যালাসিস’, ‘এলিমেন্টস অফ মিউজিক’, ‘কনিকস’ ইত্যাদি। এর মধ্যে প্রথম দুটি বই ছাড়া আর কোনো বইই পাওয়া যায় না। তবে ইউক্লিডের পরবর্তীকালের বিভিন্ন গণিতবিদের লেখাপত্রে নানা অংশে এই বইগুলির উল্লেখ পাওয়া যায়। ইউক্লিডের ‘অপটিক্স’ বইটি ছিল গ্রিক ভাষায় লেখা প্রথম বই যেখানে পরিপ্রেক্ষিত (Perspective) বিষয়ে আলোচনা করা হয়। তাছাড়া কীভাবে একটি সামতলিক চিত্রকে প্রদত্ত অনুপাত অনুযায়ী বিভাজিত করা যায় সে ব্যাপারে বিস্তৃত বর্ণনা রয়েছে ‘অন ডিভিশনস’ বইতে। তাঁর লেখা ‘পোরিজ্‌মস’ বইটিতে মোট ১৭১টি উপপাদ্য এবং ৩৮টি স্বতঃসিদ্ধের উল্লেখ করেছিলেন ইউক্লিড। ঐতিহাসিক প্রোক্লাসের লেখায় ইউক্লিডের ‘দ্য বুক অফ ফ্যালাসি’র উল্লেখ পাওয়া যায়।

তাঁর স্মৃতিতে ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি তাঁদের মহাকাশযানের নামকরণ করেছে ইউক্লিড স্পেসক্র্যাফট। এছাড়া মহাজগতে একটি তুচ্ছ ক্ষুদ্র গ্রহকে ইউক্লিডের সম্মানে ‘ইউক্লাইডস’ নামে ভূষিত করেছে নাসার বিজ্ঞানীরা।

আনুমানিক ২৬৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ইউক্লিডের মৃত্যু হয়।            


এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com


 

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

সববাংলায় তথ্যভিত্তিক ইউটিউব চ্যানেল - যা জানব সব বাংলায়