সববাংলায়

জিল্লুর রহমান

বিভাগঃ ,

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস পঞ্চাশের দশক থেকে শুরু করে যেভাবে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের দিকে অগ্রসর হয়েছে, সেই ইতিহাসে জিল্লুর রহমান (Zillur Rahman) অসংখ্য কৃতী মানুষের মধ্যে অন্যতম একজন। ২০০৯ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের তৃতীয় রাষ্ট্রপতি পদে আসীন ছিলেন তিনি। বাংলাদেশের রক্তাক্ত ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে রাজনীতিতে তাঁর হাতেখড়ি হয়েছিল বলা চলে। তারপর ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের একজন সংগঠক হিসেবে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন জিল্লুর রহমান । বহুবার আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদের দায়িত্ব সামলেছিলেন তিনি দক্ষতার সঙ্গে। রাজনৈতিক জীবনে একাধিকবার কারাবাস করতে হয়েছিল তাঁকে। তাঁর সময়তেই বাংলাদেশ বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম স্কাউট দেশে পরিণত হয়েছিল। আইনের ডিগ্রিও লাভ করেছিলেন তিনি এবং আইনজীবী সমিতিরও সাধারণ সম্পাদকের পদ অলঙ্কৃত করেছিলেন জিল্লুর রহমান । বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন ২১ জন অভিযুক্ত ব্যক্তিকে ক্ষমা করেছিলেন জিল্লুর রহমান।

১৯২৯ সালের ৯ মার্চ কিশোরগঞ্জ জেলার ভৈরব উপজেলায় দাদুর বাড়িতে জিল্লুর রহমানের জন্ম হয়। তাঁর বাবা মেহের আলী মিয়া ছিলেন একজন নামজাদা আইনজীবী। এছাড়াও মেহের আলী ময়মনসিংহ লোকাল বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন এবং জেলা বোর্ডের সদস্যপদও অলঙ্কৃত করেছিলেন। জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভি রহমান (Ivy Rahman) ছিলেন আওয়ামী লীগের নারী সংক্রান্ত বিষয়ের সম্পাদক। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঢাকায় আওয়ামী লীগের একটি সমাবেশে গ্রেনেড হামলায় আইভি আহত হন এবং তিনদিন পর তাঁর মৃত্যু হয়। আইভি এবং জিল্লুরের এক পুত্র ও দুই কন্যার নাম যথাক্রমে নাজমুল হাসান পাপন, তানিয়া বখত ও তানিমা বখত। জিল্লুরের পুত্র নাজমুল হাসান বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি, বেক্সিমকো ফার্মার ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং একজন সাংসদ ছিলেন। 

জিল্লুর রহমানের প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয়েছিল নিকটবর্তী ভৈরব মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এরপর ভৈরব কে. বি হাইস্কুলে অধ্যয়নের জন্য ভর্তি হন তিনি এবং ১৯৪৬ সালে এই স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় সাফল্যের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন জিল্লুর। এরপর ১৯৪৭ সালে ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট অফ আর্টস বা আই. এ-তে সাফল্য পান তিনি। ইতিহাসের প্রতি ভীষণ আগ্রহ ছিল জিল্লুরের। ১৯৫২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাম্মানিক ইতিহাস নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন তিনি এবং ১৯৫২ সালে ইতিহাসে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। ১৯৫৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই ইতিহাসে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন তিনি। আইনের প্রতি অগাধ উৎসাহ থেকেই পরবর্তীকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন নিয়ে পড়াশোনা করে এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন জিল্লুর। পরবর্তীকালে ষাটের দশকে ঢাকা জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। 

ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজের ছাত্র থাকাকালীন ১৯৪৭ সালের সিলেট গণভোটের প্রচারের সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের ঘনিষ্ঠ হন জিল্লুর। ১৯৫২ সাল নাগাদ বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা দেওয়ার জন্য গোটা বাংলাদেশ তোলপাড় করে শুরু হয়েছিল ভাষা আন্দোলন। জিল্লুর রহমান ছাত্রাবস্থায় সক্রিয়ভাবে সেই আন্দোলনে যোগদান করার মাধ্যমেই বলা যায় রাজনীতিতে পদার্পণ করেছিলেন। ১৯৫২ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় (আম গাছের নিচে) অনুষ্ঠিত এক ছাত্র সমাবেশে তিনি সভাপতিত্ব করেন। জিল্লুর রহমান ছিলেন এগারোজন ছাত্র-নেতার মধ্যে একজন যাঁরা ১৯৫২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি ফজলুল হক হল ও ঢাকা হলের মাঝখানে পুকুর পাড়ে জমায়েত হয়ে ১৪৪ ধারার নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। 

১৯৫৩ সালে জিল্লুর রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলের ছাত্র ইউনিয়নের সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন। ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের জন্য তাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। কিন্তু ঘোষণার পরে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এই বহিষ্কারের আদেশ প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়।

১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির ভাইস-চেয়ারম্যান পদে নিযুক্ত হয়েছিলেন তিনি। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি পদের দায়িত্ব পেয়েছিলেন জিল্লুর। ১৯৫৬ সালে আওয়ামী লীগের কিশোরগঞ্জ মহকুমা শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন জিল্লুর। ১৯৬২ সালে তিনি স্বৈরাচারী আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৬৬ সালে ছয় দফা আন্দোলন এবং ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানসহ সকল গণ আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন জিল্লুর রহমান। 

পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে তিনি ১৯৭০ সালের পাকিস্তানের জাতীয় নির্বাচনে জয়ী হন তিনি এবং জাতীয় পরিষদের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয় এবং জিল্লুর সেই স্বাধীনতা লড়াইয়ের একজন সক্রিয় সংগঠক হিসেবে কাজ করেন। প্রথমে চট্টগ্রামে এবং পরে ভারতবর্ষের কলকাতায় স্থাপিত তৎকালীন গোপন রেডিও স্টেশন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র এবং মুজিবনগর সরকারের অঙ্গ সংগঠন ‘জয় বাংলা’ প্রকাশনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। পাকিস্তান সরকার তাঁর অনুপস্থিতিতে তাঁকে কুড়ি বছরের কারাদণ্ড দিয়েছিল এবং তাঁর সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়। 

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর জিল্লুর রহমান ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। বাংলাদেশ গণপরিষদের সদস্য হিসাবে জিল্লুর রহমান বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। তিনি ১৯৭৩ সালে জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭৪ সালে জিল্লুর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৭৫ সালে পলিট ব্যুরো এবং বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির (বাকশাল) সদস্য হন তিনি। বাকশালের চারজন সচিবের একজন ছিলেন জিল্লুর। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান ও তাঁর পরিবারকে নির্মমভাবে হত্যার পর সেনা সরকার তাঁকে দীর্ঘ ৪ বছর কারাগারে বন্দি করে রাখে।

১৯৮১ সালে তিনি আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ১৯৮৬ সালে জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন জিল্লুর এবং একই বছর পুনরায় কারারুদ্ধ হন তিনি। ১৯৯২ সালে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন তিনি। ১৯৯৬ সালে পুনরায় জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন।

১৯৯৬ থেকে ২০০১ সালের মধ্যে তিনি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন এবং একই সঙ্গে তিনি জাতীয় সংসদে উপনেতার দায়িত্বও সামলান। ১৯৯৭ সালে পুনরায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন জিল্লুর। ২০০১ সালে আরেকবার জাতীয় সংসদের সদস্যপদের জন্য নির্বাচিত হন তিনি।

২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি দেশে রাষ্ট্রীয় জরুরি অবস্থা জারি হওয়ার পর এবং  ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে কারারুদ্ধ করার পর জিল্লুর রহমান এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দলটিকে দক্ষতার সঙ্গে নেতৃত্ব দেন। দলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে তিনি তাঁর রাজনৈতিক বিচক্ষণতা ও প্রজ্ঞা দিয়ে পার্টিকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে এবং দেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে অপরিসীম অবদান রেখেছিলেন তিনি। ২০০৮ সালে জাতীয় সংসদের সদস্য হন জিল্লুর রহমান এবং জাতীয় সংসদের উপনেতা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিল্লুর রহমান বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন এবং ২০০৯ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি তিনি বাংলাদেশের ১৯তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। ২০০৯ সালের মে মাসে ঢাকা চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে একটি বৈঠকে তিনি বৈশ্বিক মন্দা সম্পর্কে সতর্কতার আহ্বান জানান এবং বিশ্বায়নের গুরুত্বের উপর জোর দেন। বাংলাদেশের চিফ স্কাউট ছিলেন জিল্লুর এবং তাঁর সময়েই বাংলাদেশ বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম স্কাউট দেশ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। রাষ্ট্রপতি হিসেবে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর সর্বোচ্চ কমান্ডার ছিলেন তিনি এবং সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকীকরণের আহ্বান জানিয়েছিলেন। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর বিমান বাহিনীর মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নের আহ্বান জানান তিনি। 

২০১২ সালে তিনি রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য ইসলামি দেশগুলিকে মায়ামমারের উপর চাপ সৃষ্টি করতে বলেছিলেন। ২০১২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে কিউবার রাষ্ট্রদূত তার পরিচয়পত্র পেশ করার পর জিল্লুর কিউবার সঙ্গে বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের আহ্বান জানান। সংসদে অংশগ্রহণ না করার জন্য এবং দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন না করার জন্য তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল এবং বিরোধী দলের সমালোচনা করেছিলেন। 

রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন ২১ জন অভিযুক্ত ব্যক্তিকে বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ করে ক্ষমা করেছিলেন জিল্লুর রহমান। ১৯৭২ থেকে ২০০৮ সালের মধ্যে তাঁর পূর্বসূরিরা মোট চারটি ক্ষমা প্রদর্শন করেছিলেন। জিল্লুর রহমান যাদেরকে ক্ষমা করেছিলেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন এএইচএম বিপ্লব যিনি একজন আইনজীবীকে হত্যার জন্য দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন। আওয়ামী লীগের নেতা এবং লক্ষ্মীপুর পৌরসভার মেয়র আবু তাহেরের পুত্র বিপ্লবকে তাঁর অনুপস্থিতিতে দায়রা আদালত মৃত্যুদণ্ড দিলেও পরে বিপ্লবের মায়ের আবেদনে রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান ২০১১ সালের জুলাই মাসে বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ করে সেই মৃত্যুর আদেশ রদ করেন এবং বিপ্লবকে ক্ষমা করে দেন। পরবর্তীকালে ২০১২ সালে আরও দুজনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের মেয়াদ কমিয়ে দশ বছর করে দিয়েছিলেন তিনি। 

৯ মার্চ গুরুতর ফুসফুসের সংক্রমণের কারণে ঢাকার কম্বাইন্ড মিলিটারি হসপিটালে ভর্তি করা হয় জিল্লুর রহমানকে। কিন্তু অবস্থার ক্রমশ অবনতি হতে থাকলে তাঁকে পরদিন অর্থাৎ ১০ মার্চ এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের সাহায্যে সিঙ্গাপুর নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানকার মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

কিডনি এবং শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যার কারণে বহুদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর অবশেষে ২০১৩ সালের ২০ মার্চ সন্ধ্যা ৬টা ৪৭ মিনিটে ৮৪ বছর বয়সে জিল্লুর রহমানের মৃত্যু হয়।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading