ইতিহাস

আবদুর রহমান বিশ্বাস

আবদুর রহমান বিশ্বাস

বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি তথা দক্ষ ও সুপরিচিত রাজনীতিবিদ আবদুর রহমান বিশ্বাস (Abdur Rahman Biswas)। ১৯৯১ সাল থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদে বহাল ছিলেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে তিনি রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষদে পাকিস্তানের প্রতিনিধিত্ব করেন।

১৯২৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার বরিশাল জেলার শায়েস্তাবাদে আবদুর রহমান বিশ্বাসের জন্ম হয়। পরবর্তীকালে রাজনীতিবিদ রাশেদ খান মেননের ভাইঝি হনসে আরা রহমানকে বিবাহ করেন আবদুর রহমান বিশ্বাস। তাঁদের পাঁচ পুত্র যথাক্রমে এহ্‌তেশামুল হক নাসিম, শামসুদ্দোজা কামাল বিশ্বাস, জামিলুর রহমান শিবলি বিশ্বাস এবং মুইদুর রহমান রোমেল বিশ্বাস। অন্যদিকে তাঁদের আরও দুই কন্যা ছিল যাদের নাম আঁখি বিশ্বাস ও রাখি বিশ্বাস।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই ইতিহাস বিষয়ে সাম্মানিক সহ স্নাতক এবং পরে স্নাতকোত্তর উত্তীর্ণ হন আবদুর রহমান বিশ্বাস। তাছাড়া তিনি আইন বিষয়েও একটি ডিগ্রি লাভ করেছিলেন।

পরবর্তীকালে প্রথমে তিনি একটি স্থানীয় ব্যাঙ্কের সভাপতি পদে আসীন হন এবং সেই সংস্থার হয়ে শিক্ষামূলক বিভিন্ন উদ্যোগের পৃষ্ঠপোষকতা করেন। ১৯৫০-এর দশকে তিনি পেশাদারিভাবে আইনচর্চা শুরু করেন। ১৯৭০-এর দশকে দুবার বরিশাল আইনজীবি সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হন তিনি। পরে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবি হিসেবেও কাজ করেছেন আবদুর রহমান বিশ্বাস।

আইয়ুব খানের শাসনামলে মুসলিম লীগে যোগদানের পর আবদুর রহমান বিশ্বাস তাঁর রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন। ১৯৬২ এবং ১৯৬৫ সালে পূর্ব পাকিস্তানের আইনসভার প্রতিনিধি নির্বাচিত হন। ১৯৬৭ সালে তিনি রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষদে পাকিস্তানের প্রতিনিধিত্ব করেন। তিনি ১৯৭৭ সালে বরিশাল পৌরসভার চেয়ারম্যান হন। ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচনে সংসদের সদস্য হন তিনি। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মন্ত্রীসভায় বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী পদে নির্বাচিত হন আবদুর রহমান বিশ্বাস এবং পরে রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তারের অধীনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী দলের সহ-আধিকারিক পদে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে আবদুর রহমান বিশ্বাস সংসদের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন। কিছুদিন পরেই তিনি সংসদের অধ্যক্ষ নির্বাচিত হন। ঐ বছরই ১০ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদে আসীন হন আবদুর রহমান বিশ্বাস। রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার কার্যকালের বেশিরভাগ সময় আবদুর রহমান নোবেলজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী আবদুস সালাম, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী, নওয়াজ শরিফ, নেপালের প্রধানমন্ত্রী জিগমে সিংয়ে ওয়াংচুক, ভুটানের রাজা এবং মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মহাথির বিন মহম্মদ সহ বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং তাঁদের সঙ্গে সময় কাটিয়েছেন। বাংলাদেশের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে আবদুর রহমান দেশের সামরিক ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সমস্যার মোকাবিলা করেছেন।

১৯৯৪ সালের মাঝামাঝি থেকে বিএনপি সমর্থিত জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও আওয়ামী লীগ সমর্থিত বাংলাদেশ ছাত্রলীগের মধ্যে সংঘর্ষের ফলে দলীয় অফিস, সংবাদপত্রের অফিস এবং সরকারি নানা ভবনে আগুন লাগানো হয়। ফলে সমগ্র দেশ জুড়ে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। এরই মধ্যে আওয়ামী লীগের শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বিরোধী দল ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির জন্য নির্ধারিত জাতীয় নির্বাচন বর্জনের প্রতিশ্রুতি দেয়। সেই নির্বাচনে খালেদা জিয়ার বিএনপি দল দ্বিতীয় মেয়াদে পুনর্নির্বাচিত হলে তিনটি প্রধান বিরোধী দল একে বয়কট করে। ২৬ মার্চ ক্রমবর্ধমান বিরোধিতার মুখে নব নির্বাচিত সরকার ত্রয়োদশতম সাংবিধানিক সংশোধনী বিল পাস করে অন্তর্বর্তীকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নিয়োগের পথ সুগম করে। ১৯৯৬ সালের ২৮ মার্চ তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিলটিকে আইনে পরিণত করে তাতে স্বাক্ষর করেন আবদুর রহমান বিশ্বাস। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন এই আইনকে সম্মতি জানিয়েছিল। ফলস্বরূপ আবদুর রহমান নব নির্বাচিত আইনসভা ভেঙে দেন এবং খালেদা জিয়ার পদত্যাগের সঙ্গে সঙ্গে সাবেক প্রধান বিচারপতি হাবিবুর রহমানকে একটি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে নিযুক্ত করা হয় যা ১৯৯৬ সালের ১২ জুন জাতীয় নির্বাচনের সভাপতিত্ব করার জন্য প্রস্তুত ছিল।

১৯৯৬ সালের ১৯ মে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে আবদুর রহমান বিশ্বাস সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল আবু সালেহ মহম্মদ নাসিমকে আদেশ করেন যেন তিনি সত্বর বগুড়া সেনানিবাসের কমান্ডার মেজর জেনারেল মোরশেদ খান এবং বাংলাদেশ রাইফেলসের আধা-সামরিক বাহিনীর উপপ্রধান ব্রিগেডিয়ার মীরন হামিদুর রহমানকে বাধ্যতামূলক অবসর গ্রহণের নির্দেশ দেন। এই দুই অফিসারই দেশের তৎকালীন অবস্থার বিরুদ্ধে অসন্তোষজনিত মন্তব্য প্রকাশ করেছিল। রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি মনে করতেন এরা সম্ভবত বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির সঙ্গে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত। জেনারেল নাসিম এই নির্দেশ মানতে না চাইলে পরদিনই তাঁকে বরখাস্ত করেন আবদুর রহমান বিশ্বাস। রাষ্ট্রীয় বেতার ও টেলিভিশন নিয়ন্ত্রণের জন্য সৈন্য পাঠান তিনি। সেদিনই দুপুরের দিকে জেনারেল নাসিম বগুড়া, ময়মনসিংহ এবং যশোর বিভাগের সৈন্যদের ঢাকার দিকে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দেন। অন্যদিকে রাষ্ট্রপতির অনুগত নবম পদাতিক বিভাগের মেজর জেনারেল ইমামুজ্জামান বগুড়া ও যশোর বিভাগের সেনাদের নদী পেরোতে না দেওয়ার জন্য আরিচা বন্দরের যমুনা নদী থেকে সমস্ত ফেরি ও নৌকা ইত্যাদি সরিয়ে দেন। ইতিমধ্যে আবদুর রহমান বিশ্বাস ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করার জন্য ট্যাঙ্কসহ সৈন্যদের একটি দল পাঠান। এর ফলে ময়মনসিংহ বিভাগের সেনাবাহিনী ঢাকায় প্রবেশে বাধা পায়। অন্যদিকে রাষ্ট্রপতির অনুগত ৩৩ নং পদাতিক বিভাগের জেনারেল অফিসার কমান্ডিং মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন রাষ্ট্রপতির প্রাসাদ ভবনকে সুরক্ষিত রাখার জন্য ব্রিগেডিয়ার শাহ একরামের নেতৃত্বে ঢাকায় গড়ে তোলেন ১০১ পদাতিক ব্রিগেড। রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে যে এভাবে সামরিক অভ্যুত্থান পরিচালনা করা সম্ভব নয়, তা বুঝতে পেরেছিলেন জেনারেল নাসিম। পরে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং ঢাকা সেনানিবাসের আর্মি সেন্ট্রাল লাইব্রেরির পিছনে আর্মি মেসে তাঁকে বন্দি রাখা হয়। পরে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এলে নাসিমকে আনুষ্ঠানিক অবসর দেওয়া হয়। ১৯৯৬ সালের ৯ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি পদ থেকে অব্যাহতি নেন আবদুর রহমান বিশ্বাস এবং তাঁর পরে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হন শাহাবুদ্দিন আহমেদ। রাষ্ট্রপতি পদ থেকে অবসর নেওয়ার পরে আবদুর রহমান বিশ্বাস সম্পূর্ণভাবে রাজনীতি থেকে সরে আসেন। ২০০৬ সালে বরিশালে তাঁর বাড়িতে আওয়ামী লীগ কর্মীরা আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল বলে জানা যায়। তবে কোনওক্রমে তিনি ও তাঁর পরিবার বেঁচে গিয়েছিলেন।

২০১৭ সালের ৩ নভেম্বর ঢাকার ইউনাইটেড হাসপাতালে শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যার কারণে আবদুর রহমান বিশ্বাসের মৃত্যু হয়।      


এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com


 

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

সববাংলায় তথ্যভিত্তিক ইউটিউব চ্যানেল - যা জানব সব বাংলায়