সববাংলায়

আবদুস সাত্তার খান

বিভাগঃ , ,

বাংলাদেশের একজন বিখ্যাত বিজ্ঞানী আবদুস সাত্তার খান (Abdus Sattar Khan)। বিশ্বের মহাকাশ গবেষণার প্রধান কেন্দ্র নাসায় প্রায় চার দশক ধরে গবেষণা করেছেন তিনি এবং তার পাশাপাশি ইউনাইটেড টেকনোলজি, অ্যালস্টম প্রভৃতি সংস্থাতেও গবেষণা করেছেন এই বিজ্ঞানী। তাঁর নিরলস গবেষণার ফসল হিসেবে তিনি এমন চল্লিশটিরও বেশি সংকর ধাতু উদ্ভাবন করেছেন যা মহাকাশযান, জেট বিমানের ইঞ্জিনের ওজন অনেকখানি কমানো সম্ভব হয়েছে এবং ট্রেনের ইঞ্জিনে এর ব্যবহার ট্রেনের গতিকে কয়েকগুণ বাড়িয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে। এই সমস্ত নব উদ্ভাবিত সংকর ধাতু উচ্চ তাপ সহনশীল। এছাড়া মার্কিন বিমান বাহিনীর জন্য এফ-১৫ ও এফ-১৬ নামের যুদ্ধ বিমান তৈরির কাজেও নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছিলেন আবদুস সাত্তার খান। বিমান নির্মাণ প্রক্রিয়াতে এই সংকর ধাতুর উদ্ভাবন ও ব্যবহারের সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে ‘ইউনাইটেড টেকনোলজিস স্পেশাল অ্যাওয়ার্ড’-এ ভূষিত করা হয়। তবে শুধুই বিজ্ঞানচর্চা বা গবেষণা নয়, ১৯৯১ সালের বন্যায় তিনি নিজের উদ্যোগে একষট্টি হাজার ডলার অর্থ সংগ্রহ করে রেড ক্রসের মাধ্যমে বাংলাদেশে বন্যাদুর্গতদের সাহায্য করেছিলেন।

১৯৪১ সালে অধুনা বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর থানার অন্তর্গত খাগাটুয়া গ্রামে এক মধ্যবিত্ত পরিবারে আবদুস সাত্তার খানের জন্ম হয়। মাত্র আট বছর বয়সে তাঁর বাবা মারা যান। ফলে পরিবারে নেমে আসে অনিশ্চয়তা এবং আর্থিক সমস্যা। বাধ্য হয়ে আবদুস সাত্তারকে সঙ্গে নিয়ে তাঁর মা চলে যান তাঁর বাপের বাড়িতে। মামারবাড়িতেই আবদুস সাত্তারের কৈশোর অতিবাহিত হয়েছে। বাল্যকালে প্রায় প্রতিদিনই দাদু-দিদার কাছে গল্প শুনে রাত্রে ঘুমোতে যাওয়ার এক অভ্যাস গড়ে উঠেছিল তাঁর। একদিকে তাঁর দাদু-দিদার মুখে শোনা নীতিমালার গল্প শুনে তাঁর মধ্যে চারিত্রিক দৃঢ়তা গড়ে উঠেছিল এবং অন্যদিকে তাঁকে বড় করে তোলার জন্য মায়ের অপরিমেয় পরিশ্রম জ্ঞানলাভের পথে তাঁর স্পৃহা আরও বাড়িয়ে তুলেছিল।

মামার বাড়িতে থাকার সময়েই স্থানীয় গ্রাম্য বিদ্যালয়ে আবদুস সাত্তারের প্রাথমিক শিক্ষাজীবন শুরু হয়। তারপর তাঁকে ভর্তি করা হয় রতনপুর আবদুল্লাহ্‌ হাই স্কুলে। এই স্কুল থেকে প্রথম বিভাগে মাধ্যমিক উত্তীর্ণ হয়ে কুমিল্লার ভিক্টোরিয়া কলেজে ভর্তি হন আবদুস সাত্তার। এরপরে ১৯৬২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স সহ বিজ্ঞানে স্নাতক উত্তীর্ণ হন তিনি। ১৯৬৩ সালে ঐ বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই রসায়নশাস্ত্রে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। দুই ক্ষেত্রেই প্রথম বিভাগে প্রথম স্থান অর্জন করেছিলেন আবদুস সাত্তার খান। ১৯৬৪ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার জন্য একটি বৃত্তি পেয়ে বিদেশ চলে যান তিনি এবং ১৯৬৮ সালে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করে দেশে ফিরে আসেন।

এর আগে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পরেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে প্রভাষক পদে যোগ দিয়েছিলেন। অক্সফোর্ড থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করে দেশে ফেরার পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐ বিভাগেই সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কাজে যোগ দেন আবদুস সাত্তার খান। এই পদেই ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত তিনি অধ্যাপনা করে গিয়েছেন। ১৯৭৩ সালেই বাংলাদেশ ছেড়ে ধাতু বিদ্যা বিষয়ে গবেষণার জন্য তিনি চলে যান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। এর মাঝে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নির্মম অত্যাচারের দৃশ্য নিজে দেখেছেন তিনি। অনেকে বলেন ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংস আক্রমণ ও গণহত্যার সময়ে তাঁরও প্রাণ যেতে পারতো। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে এক বছর মতো অধ্যাপনা করেছিলেন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। এরপর তিনি আমেরিকা যাত্রা করেন।

প্রথমে সংকর ধাতু নিয়ে গবেষণার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্গত এ.এম.এস গবেষণাগারে যোগ দেন আবদুস সাত্তার। তাঁর গবেষণা কেন্দ্রীভূত ছিল এমন কিছু সংকর ধাতু উদ্ভাবনের মধ্যে যা জেট বিমানের ইঞ্জিনের উচ্চ তাপমাত্রা সহ্য করতে পারবে। সেই সময় নানা জায়গায় জেট বিমান নির্মাণের খরচ কমানো বা ঘর্ষণের ফলে তার পিস্টনের ক্ষয় রোধ করা কিংবা বিমানের গতি বাড়ানোর জন্য নানা গবেষণা হচ্ছিল। আবদুস সাত্তারের গবেষণাও সেই লক্ষ্যেই শুরু হয়। আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে আড়াই বছর গবেষণা করে দশটিরও বেশি সংকর ধাতু তৈরি করতে সক্ষম হন তিনি। এই সব সংকর ধাতুই উচ্চ তাপ সহনশীল। গ্যাস টারবাইন ব্লেডই হোক বা জেট ইঞ্জিন এই সংকর ধাতুগুলি সবক্ষেত্রেই খুবই উপযোগী হয়ে ওঠে।

এরপরে ১৯৭৬ সালে নাসার লুইস রিসার্চ সেন্টারে গবেষণা শুরু করেন তিনি। এখানেও তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল মহাকাশযানে ব্যবহারের উপযোগী সংকর ধাতু নির্মাণ। এই গবেষণার সাফল্য হিসেবে নিকেল ও অ্যালুমিনিয়ামের একটি উন্নতমানের সংকর ধাতু উৎপন্ন হয় যা বিমানের জ্বালানির খরচ কমাতে এবং এর কার্যক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। এছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে থাকাকালীন মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের তরফে এফ-১৫ ও এফ-১৬ নামের দুটি যুদ্ধবিমান নির্মাণের কাজেও সহায়তা করেছিলেন আবদুস সাত্তার খান। তাঁর উদ্ভাবিত সমস্ত প্রকার সংকর ধাতুই ইঞ্জিনের বহিরাবরণকে ঘর্ষণজাত ক্ষয় থেকে রক্ষা করে এবং ইঞ্জিনের ওজন কমাতে সাহায্য করে যার ফলে বিমানের গতি আরও বেড়ে যায়। তাঁর এই গবেষণার ভবিষ্যৎ সাফল্য বুঝতে পেরে ‘প্রাট অ্যাণ্ড হুইটনি’ নামের একটি বিমান নির্মাণ সংস্থা আবদুস সাত্তার খানকে প্রভূত অর্থ সাহায্য করে। ক্যাথোডিক আর্ক পদ্ধতিতে তাপীয় অবসাদ (thermal fatigue) ও ক্ষয় প্রতিরোধী প্রলেপ দিয়ে উন্নতমানের জেট ইঞ্জিন নির্মাণে সক্ষম হয় প্রাট অ্যাণ্ড হুইটনি সংস্থা যার মূলে আবদুস সাত্তার খানের উদ্ভাবনী শক্তি কাজ করেছে। মার্কিন প্রদেশের মিলিটারি টেকনোলজি সংস্থার হয়ে গবেষণার ফলে নিকেল দ্বারা গঠিত এমন কিছু সংকর ধাতু তৈরি করতে সক্ষম হন আবদুস সাত্তার খান যা পরে এফ-১৫ ও এফ-১৬ নামের দুটি যুদ্ধবিমান নির্মাণের কাজে ব্যবহৃত হয়। ‘অ্যালয়-ওয়াই’ নামে পরিচিত এই সংকর ধাতু উদ্ভাবনের জন্য তিনি ‘ইউনাইটেড টেকনোলজিস স্পেশাল অ্যাওয়ার্ড’-এ ভূষিত হন। নাসা ইউনাইটেড টেকনোলজির মতে এই আবিষ্কার বিংশ শতাব্দীর বিমান গবেষণায় অন্যতম শ্রেষ্ঠ আবিষ্কার। ‘পপুলার সায়েন্স’ নামে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিজ্ঞান বিষয়ক সাময়িক পত্রিকাও ১৯৯০ সালের জুন সংখ্যায় আবদুস সাত্তার খানের এই আবিষ্কারকে বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ আবিষ্কার হিসেবে চিহ্নিত করে।

এরপরে সুইজারল্যাণ্ডের ‘অ্যালস্টম’ সংস্থায় গবেষক হিসেবে যোগ দেন তিনি। এই সংস্থায় কাজ করে মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যে প্রভূত উদ্ভাবন করে ২৫টি আবিষ্কারের পেটেন্ট নিজের নামে নথিভুক্ত করতে সমর্থ হন আবদুস সাত্তার খান। টারবাইনের জন্য অধিক কর্মক্ষম ব্লেড ও ট্রেনের গতি বাড়ানোর জন্য উপযোগী সংকর ধাতু নির্মাণ বিষয়েই এখানে গবেষণা করেছিলেন তিনি। এছাড়া তিনি যে সকল বাণিজ্যিক পণ্যের বিষয়ে গবেষণা করে সাফল্য লাভ করেছেন তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল – উন্নতমানের জেট ইঞ্জিন নির্মাণ খরচ বাঁচানোর জন্য ন্যানো-ক্যাটালিস্ট। সুইজারল্যাণ্ডের অ্যালস্টমে কাজের সময় তাঁর উদ্ভাবিত জারণরোধী প্রলেপযুক্ত যন্ত্রাংশ অত্যাধুনিক জি-১১ গ্যাস টারবাইনে ব্যবহার করা হয়। সবশেষে অত্যাধুনিক জি-২৫ বা ২৬ নং গ্যাস টারবাইনে ব্যবহারের উপযোগী ক্ষয়রোধী তড়িৎ-লেপনযোগ্য প্রলেপ উদ্ভাবন করেছেন তিনি।

এগুলি সবই বাণিজ্যিকভাবে সফল আবিষ্কার এবং আরও অন্যান্য গবেষণার সাফল্যের কারণে ১৯৯৬ সালে গ্রেট ব্রিটেনের রয়্যাল সোসাইটি অফ কেমিস্ট্রির সদস্য নির্বাচিত হন আবদুস সাত্তার খান এবং ২০০৫ সালে এই সংস্থার চার্টার্ড বিজ্ঞানীর পদে আসীন হন তিনি। এছাড়াও আমেরিকান সোসাইটি অফ মেটালের সদস্যপদও পেয়েছিলেন তিনি। ১৯৯৪ সালে দ্রুতগতি সম্পন্ন বিমান ও রকেট নির্মাণের ক্ষেত্রে অত্যাধুনিক হাইড্রোকার্বন ক্যাটালিসিস প্রক্রিয়া উদ্ভাবনের জন্য তাঁকে ‘ইউনাইটেড টেকনোলজিস রিসার্চ সেন্টার অ্যাওয়ার্ড অফ এক্সিলেন্স’-এ ভূষিত করা হয়। ফ্লোরিডা স্টেট ইউনিভার্সিটির মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে সম্মানীয় অধ্যাপক হিসেবে কাজে নিযুক্ত ছিলেন আবদুস সাত্তার খান। সেখানে নিজের উদ্যোগে কার্বন ন্যানো প্রযুক্তির উপর গবেষণার জন্য ‘সেন্টার ফর এক্সিলেন্স ইন ন্যানোমেটিরিয়ালস’ নামে সংস্থা গড়ে তুলতে চেষ্টা করেছিলেন। ‘বাংলাদেশি অ্যাসোসিয়েশন অফ ফ্লোরিডা’র প্রতিষ্ঠাতা আবদুস সাত্তার খান ১৯৯১ সালের বন্যায় নিজের উদ্যোগে ৬১ হাজার ডলার অর্থসংগ্রহ করে রেড ক্রসের মাধ্যমে বাংলাদেশে বন্যাদুর্গতদের সাহায্য করেছিলেন।

২০০৮ সালের ৩১ জানুয়ারি ৬৭ বছর বয়সে আবদুস সাত্তার খানের মৃত্যু হয়।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading