বঙ্গ সংস্কৃতিতে থিয়েটারের কথা যখনই আসে তখনই উঠে আসে অভিনেতা, নাট্যকার ও পরিচালক অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Ajitesh Bandopadhyay) নাম। তিনি আজীবন বাংলা থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। নাটকের প্রয়োজনে নিজেকে তিনি অনেকভাবে ভেঙেছেন, পুনরায় গড়েছেন। শম্ভু মিত্র এবং উৎপল দত্তের মতোই বাংলা নাট্য জগৎ তাঁর দাপুটে অভিনয়ের কথা কখনও ভুলতে পারবে না। স্বাধীনতা উত্তর যুগের বাংলা থিয়েটারের শক্তিশালি ব্যক্তিত্ব তিনি।
১৯৩৩ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া জেলার (তৎকালীন মানভূম) জয়পুর ব্লকের রোপোগ্রামে মামার বাড়িতে তাঁর জন্ম হয়। তাঁর নিজের বাড়ি ছিল পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম বর্ধমান জেলার রানীগঞ্জের কেন্দা গ্রামে। বাবা ভুবনমোহন কাজ করতেন কয়লাখনিতে। মায়ের নাম লক্ষ্মীরাণী দেবী। প্রথম জীবনে অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় লীলা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিয়ে করেন। তিনি নান্দীকার নাট্যদলের সদস্যা ছিলেন। কিন্তু তাঁদের সম্পর্ক বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। তবে তাঁদের বিচ্ছেদও হয়নি। পরবর্তীকালে রত্না বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে লিভ-ইন সম্পর্কে ছিলেন অজিতেশ। রত্না বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন অসিত বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রাক্তন স্ত্রী ও নান্দীকারের কর্মী।
এক নজরে অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবনী:
- জন্ম: ৩০ সেপ্টেম্বর, ১৯৩৩
- মৃত্যু: ১৩ অক্টোবর, ১৯৮৩
- কেন বিখ্যাত: অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলা থিয়েটারে এক উল্লেখযোগ্য নাম। তিনি অভিনেতা, নাট্যকার ও পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন। নান্দীকার নাট্যগোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। পরবর্তীকালে নান্দীকার থেকে বেরিয়ে এসে নতুন নাট্যদল নান্দীমুখ তৈরি করেন। তাঁর কিছু বিখ্যাত নাটক – ‘আন্তিগনে’, ‘তিন পয়সায় পালা’, ‘যখন একা’, ‘নানা রঙের দিন’, ‘শের আফগান’, ‘ভাল মানুষ’, ‘মঞ্জরী আমের মঞ্জরী’ ইত্যাদি। বাংলা চলচ্চিত্রে চরিত্র-অভিনেতা হিসেবে ‘হাটে বাজারে’, ‘ছুটি’, ‘অতিথি’, ‘কুহেলি’, ‘গণদেবতা’, ‘আজ কাল পরশুর গল্প’, ‘আরোহি’,’ মেঘ ও রৌদ্র’, ‘ঠগিনী’, ‘নিধিরাম সর্দার’, ‘হিরে মানিক’, ‘কপালকুণ্ডলা’-র মতো ছবিতে অভিনয় করেন তিনি।
- পুরস্কার: ১৯৭৬ সালে ৪২ বছর বয়সে অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় সঙ্গীত নাটক অ্যাকাডেমি পুরস্কারে সম্মানিত হন।
প্রথম জীবনে পরিচিত মহলে অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় অজিত নামেই খ্যাত ছিলেন। পাঁচ বছর বয়সে পুরুলিয়ার মধুবন বিদ্যালয়ে তাঁর পড়াশোনা শুরু হয়। পরে তিনি ভর্তি হন ঝালদার সত্যভামা উচ্চ বিদ্যালয়ে। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত সেখানে পড়ার পর কুলটি উচ্চ বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হন। এরপর তিনি আসানসোল কলেজে (বর্তমানের বিবি কলেজ) পরবর্তী পড়াশোনা শুরু করেন। কিন্তু সেখানে তিনি পড়াশোনা শেষ করেননি। বাংলা নাটকের প্রবাদপ্রতীম এই ব্যক্তিত্ব কলকাতায় চলে এসেছিলেন। গ্রাম বাংলায় পড়াশোনার সুযোগ বা সুবিধা, কোনওটিই তেমন ছিল না। তাই উচ্চতর শিক্ষার আকাঙ্ক্ষা তাঁকে টেনে এনেছিল মহানগরে। কলকাতায় এসে তিনি ভর্তি হন মহারাজা মণীন্দ্র চন্দ্র কলেজে। সেখান থেকে স্নাতক হন। তখন থেকেই অজিত হয়ে যান অজিতেশ। তাঁর থিয়েটারের প্রতি তীব্র অনুরাগেরও উৎপত্তি এই কলকাতা শহরেই। তবে শুরুটা কিন্তু হয়েছিল বেশ আগে – তাঁর গ্রাম্য ছাত্রজীবনে।
আসানসোলের ছোট ঘরের মধ্যে চৌকিকে মঞ্চ বানিয়ে নাটক করতেন ছোট্ট অজিত। সঙ্গে থাকত তাঁর ভাই-বোন ও বন্ধুরা। সেখান থেকেই শুরু। এর পর আসে ১৯৪২ সাল। ন’বছরের অজিত তখন স্কুলে পড়ছে। জাপানি বোমার ভয়ে ভীত ভুবনমোহন তাঁকে পাঠিয়ে দেন পুরুলিয়ার ঝালদায়। সেখানেই অজিতের প্রেম সম্পূর্ণ প্রস্ফুটিত হয় থিয়েটারের প্রতি। পাশাপাশি রাজনীতিতেও আগ্রহ বাড়তে থাকে তাঁর। অনুঘটকের কাজ করে গান্ধীজির লেখা। অজিত যখন অষ্টম শ্রেণিতে পড়েন, তখন বাবা চাকরিসূত্রে বদলি হন ঝরিয়ার কাছে চাসনালায়। সেখানে প্রবোধ বিকাশ চৌধুরীর পরিচালনায় পাথরডি রেলওয়ে ইনস্টিটিউটে ‘টিপু সুলতান’ নাটকে অভিনয় করেছিলেন তিনি। ১৯৪৭ সালে শিক্ষক ধীরেন ঘটকের অনুপ্রেরণায় মঞ্চস্থ করেন রবীন্দ্রনাথের ‘খ্যাতির বিড়ম্বনা’। এখানে ন’কড়ি চরিত্রে অভিনয় করে প্রচুর প্রশংসা কুড়োন তিনি। শিক্ষক আদিত্য মুখোপাধ্যায়ের নির্দেশনায় ‘রামের সুমতি’ নাটকেও অভিনয় করেন তিনি। এরপর কলকাতায় আসেন অজিতেশ। মণীন্দ্র কলেজে পড়ার পাশাপাশি শুরু করেন নাট্যচর্চা। থিয়েটারের প্রতি ভালবাসা ক্রমেই বাড়তে থাকে।
১৯৬০ সালে তিনি বিখ্যাত থিয়েটারের দল নান্দীকার প্রতিষ্ঠা করেন। অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় ছাড়া অসিত বন্দ্যোপাধ্যায়, সত্যেন মিত্র, অজয় গাঙ্গুলী, চিন্ময় রায়-সহ কয়েকজন প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই নান্দীকারের সক্রিয় সদস্য ছিলেন। কলকাতার মঞ্চে অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের যাত্রা শুরু সেখান থেকেই। তারপর থিয়েটার হয়ে যায় তাঁর ধ্যান জ্ঞান। যদিও এর মাঝে নিজের কলেজ এবং সাউথ পয়েন্ট স্কুলে কয়েক বছর শিক্ষকতা করেছিলেন তিনি। নান্দীকারে রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত, অসিত বন্দোপাধ্যায় এবং কেয়া চক্রবর্তীর মতো অভিনেতারা ছিলেন তাঁর বন্ধু, সহকর্মী। একসঙ্গে তাঁরা অনেক নাটক মঞ্চস্থ ও পরিবেশন করেন। গান্ধীজির লেখা থেকে রাজনীতিতে আগ্রহী হলেও পরবর্তীকালে তাঁর মতের পরিবর্তন ঘটে। অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় মনেপ্রাণে হয়ে ওঠেন একজন কমিউনিস্ট। তাঁর নাটকগুলির মধ্যেও এই মনোভাব কখনও কখনও ফুটে উঠত। কলেজ জীবনে পাতিপুকুর শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গেও তাঁর নাম জড়িয়েছিল। যদিও নাটক তাঁর কাছে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের হাতিয়ার কখনই হয়ে ওঠেনি। সচেতনভাবেই তিনি রাজনীতি আর সংস্কৃতিকে আলাদা রাখতেন। নাটকে তিনি রাজনীতিকে এনেছেন খুব সতর্কভাবে। বরং মানবিক মূল্যবোধের সঙ্গে সূক্ষ্ণ রাজনৈতিক চিন্তাধারাকে তিনি দর্শকের সামনে খুলে দিতেন।
নান্দীকারে থাকার সময় অনেক বিখ্যাত নাটক মঞ্চস্থ করেছিলেন অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর প্রথম নাটক ছিল ইবসেনের ‘ঘোস্টস’ নাটক অবলম্বনে ‘বিদেহী’। তারপর একাধিক মৌলিক ও বিদেশি নাটক অভিনীত হয়। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ‘দাও ফিরে সে অরণ্য’, ‘সেতুবন্ধন’, ‘চার অধ্যায়’, ‘প্রস্তাব’ ইত্যাদি। তবে ‘নাট্যকারের সন্ধানে ছ’টি চরিত্র’ নান্দীকারকে প্রবল জনপ্রিয়তা এনে দেয়। এটি ইতালীয় নাট্যকার লুইজি পিরানদেল্লো রচিত ‘সিক্স ক্যারেক্টার ইন সার্চ অফ অ্যান অথর’ অবলম্বনে লিখিত। এর বাংলা রূপান্তর করেছিলেন রূদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত। ১৯৬১ সালের ১২ নভেম্বর এটি মঞ্চস্থ হওয়ার পর প্রচুর প্রশংসা অর্জন করে। এরপর অজিতেশের নির্দেশনায় একের পর এক নাটক হতে থাকে। নান্দীকারে থাকাকালীন ‘আন্তিগনে’, ‘তিন পয়সায় পালা’, ‘যখন একা’, ‘নানা রঙের দিন’, ‘শের আফগান’, ‘ভাল মানুষ’, ‘মঞ্জরী আমের মঞ্জরী’ সহ একাধিক নাটক মঞ্চস্থ করেছিলেন তিনি। নাটক পরিচালনার সঙ্গে নাটকের গান লেখা, সুর দেওয়ার কাজও করতেন। বিদেশের বহু নাটকের সঙ্গে বাঙালি তাঁর জন্য পরিচিত হতে পেরেছে। তিনি ছিলেন ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র। সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ আর নাটকের প্রতি ভালবাসার কারণে বিদেশি বহু লেখকের নাটক তিনি পড়েন। আর তারপর সেগুলিকে নতুন রূপে সজ্জিত করে তৈরি করেন বাংলার ঘরের গল্প। ব্রেখট, ইবসেন, চেখভ, পিরানদেল্লো, ওয়েস্কার, পিন্টার সহ বিশ্বের বহু নাট্যকারের নাটক তাঁর মাধ্যমেই উঠে এসেছে বাংলার মঞ্চে।
নাটক ছিল তাঁর ভালবাসা। কিন্তু এই ভালবাসার জন্য তিনি সর্বস্ব ত্যাগ করতে প্রস্তুত ছিলেন না। তাঁর আত্মসম্মান বোধও ছিল অটুট। তাই ১৯৭৭ সালে অজস্র অভিমান বুকে নিয়েই নান্দীকার ছেড়েছিলেন তিনি। এরপর তৈরি করেছিলেন নতুন দল নান্দীমুখ। তাঁর দৌলতে অতি অল্প সময়ে নান্দীমুখ থিয়েটার জগতে জায়গা করে নিতে পেরেছিল। প্রথম দিকে নান্দীকারে তাঁর পুরনো নাটকগুলিই মঞ্চস্থ হত নান্দীমুখে। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ‘নানা রঙের দিন’, ‘তামাকু সেবনের অপকারিতা’, ‘প্রস্তাব’; আর অতি অবশ্যই ‘শের আফগান’। যখন তিনি মঞ্চে উঠতেন, সংলাপ বলতেন, দর্শকরা অভিভূত হয়ে যেত। অভিনেতা অজিতেশ যেন দর্শককে নাটকের মধ্যে ঢুকিয়ে নিতেন। তাঁর নাটক দর্শকাসন থেকে যেমন অশ্রু ঝরিয়েছে তেমন রাগে দর্শক ফুঁসেও উঠেছে। এমনই ছিল তাঁর অভিনয় প্রতিভা।
শুধু থিয়েটার নয়, রূপোলি পর্দাতেও তিনি মুগ্ধ করেছেন দর্শককে। বাংলা চলচ্চিত্রে চরিত্র-অভিনেতা হিসেবে ‘হাটে বাজারে’, ‘ছুটি’, ‘অতিথি’, ‘কুহেলি’, ‘গণদেবতা’, ‘আজ কাল পরশুর গল্প’, ‘আরোহি’,’ মেঘ ও রৌদ্র’, ‘ঠগিনী’, ‘নিধিরাম সর্দার’, ‘হিরে মানিক’, ‘কপালকুণ্ডলা’-র মতো ছবিতে অভিনয় করেন তিনি। হিন্দিতে তিনি ‘সমঝোতা’ নামে একটি ছবি করেন। অভিনয়ের জন্য কখনও তিনি কোনও কিছুর সঙ্গে আপস করেননি। তপন সিনহা পরিচালিত ‘হাটে বাজারে’ ছবিতে প্রতিপক্ষের ভূমিকায় যখন অভিনয় করার প্রস্তাব তাঁর কাছে আসে, তখন তিনি শিক্ষকতার পেশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। কারণ হিসেবে বলেছিলেন, তাঁর অভিনয় কৈশোর উত্তীর্ণ তরুণদের মনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই তিনি শিক্ষকতার পেশা থেকে দূরে থাকতে চান। নাটক ছিল তাঁর ধ্যানজ্ঞান। মঞ্চের পাশাপাশি তিনি রেডিও নাটক এবং যাত্রার সঙ্গেও সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। থিয়েটারের মতো যাত্রাতেও তাঁর অভিনয় দর্শককে মুগ্ধ করত।
১৯৭৬ সালে ৪২ বছর বয়সে তিনি সঙ্গীত নাটক অ্যাকাডেমি পুরস্কারে সম্মানিত হন। সমগ্র দেশে এই মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারের সর্বকনিষ্ঠ প্রাপকদের মধ্যে একজন অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়। ১৯৭০-এর দশকের গোড়ার দিকে, শম্ভু মিত্র তাঁকে “বর্তমান সময়ে বাংলার থিয়েটারের সবচেয়ে শক্তিশালী অভিনেতা” হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।
১৯৮৩ সালের ১৩ অক্টোবর মাত্র পঞ্চাশ বছর বয়সে অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যু হয়। বাংলা থিয়েটার হারায় তার এক উজ্জ্বল নক্ষত্রকে। তাঁর মতো অভিনেতার মৃত্যু বাংলা নাটকের জগতে একটি শূন্যতা তৈরি করেছিল যা আজও মোছেনি। বাংলার থিয়েটার জগৎ তাই আজও অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় একটি স্মরণীয় নাম।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান