ইতিহাস

ভ্লাদিমির লেনিন

ভ্লাদিমির লেনিন

রুশ বিপ্লবের এক মহান নেতা এবং বিংশ শতাব্দীর সোভিয়েত ইউনিয়নের এক প্রখ্যাত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ভ্লাদিমির লেনিন (Vladimir Lenin)। রাশিয়ার জারের শাসনের বিশৃঙ্খলা এবং অত্যাচার থেকে মুক্তি পেতে লেনিন মার্কসবাদে দীক্ষিত হন। কার্ল মার্কসের ভাবাদর্শে তিনিও চেয়েছিলেন এক শ্রেণি-বৈষম্যহীন মুক্ত সমাজ গড়তে। বৈপ্লবিক রাজনীতিবিদ এবং তাত্ত্বিক লেনিন ১৯১৭ থেকে ১৯২৪ সাল পর্যন্ত সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রথম প্রতিষ্ঠাতা হিসেব সরকারের প্রধানের পদে আসীন ছিলেন। তাঁর শাসনকালেই সোভিয়েত ইউনিয়ন একটি বৃহত্তর সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত হয়। কমিউনিস্ট মতাদর্শের একটি বিকল্প রূপ হিসেবে তাঁর মতবাদ পরবর্তীকালে ‘লেনিনবাদ’ নামে পরিচিত হয়। বুর্জোয়া শাসন কিংবা পুঁজিবাদকে অস্বীকার করে কৃষিনির্ভর অর্থনীতির সাহায্যে একটি সার্বভৌম কমিউনিস্ট রাষ্ট্র গঠনের ইচ্ছাই তাঁকে রুশ বিপ্লবের জন্য উদ্দীপিত করেছিল।

১৮৭০ সালের ২২ এপ্রিল রুশ সাম্রাজ্যের সিম্বির্স্কের (অধুনা উলিয়ানভস্ক) স্ট্রেলেতস্কায়া শহরে ভ্লাদিমির লেনিনের জন্ম হয়। তাঁর আসল নাম ভ্লাদিমির ইলিচ উলিয়ানভ লেনিন। তাঁর বাবা ইলিয়া নিকোলায়েভিচ উলিয়ানভ কাজান ইম্পেরিয়াল বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত ও পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক ছিলেন। তাঁর মা মারিয়া আলেকজান্দ্রোভনা ব্ল্যাঙ্কের সঙ্গে বিয়ের পরে ইলিয়া নিকোলায়েভিচ রাশিয়ার নোভগোরডে একটি চাকরি পান এবং পরবর্তীকালে সিম্বির্ক্সের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পরিচালক নিযুক্ত হন। ইলিয়া এবং মারিয়ার আট সন্তানের মধ্যে তৃতীয় সন্তান ছিলেন লেনিন। তাঁর এক দিদি অ্যানা এবং এক দাদা আলেকজাণ্ডার। এছাড়া তাঁর অপর ভাই-বোনদের মধ্যে ছিলেন ওলগা, দিমিত্রি ও মারিয়া। তাঁর বাবা-মা দুজনেই ছিলেন রক্ষণশীল খ্রিস্টান এবং রাজতন্ত্রের সমর্থক। প্রত্যেক বছর গ্রীষ্মকালে কোকুশকিনোর একটি গ্রামে ছুটি কাটাতে যেতেন তাঁরা সকলে। বাইরে কোথাও গেলে প্রায়ই দাবা খেলে সময় কাটাতেন লেনিন। ছোটোবেলা থেকেই তাঁর মধ্যে একটি প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব গড়ে ওঠে, সে কারণে নানাবিধ আউটডোর গেমস খেলতে ভালোবাসতেন তিনি। পরবর্তীকালে ১৮৯৮ সালে নাদেজহদা ক্রুপস্কয়াকে বিবাহ করেন লেনিন।


এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com


 

তাঁর আগ্রাসী ব্যবহারের জন্য ছোটবেলায় স্কুল থেকে বিতাড়িত হন ভ্লাদিমির লেনিন । এমনকি রক্ষণশীল সিম্বির্স্ক ক্লাসিকাল জিমন্যাসিয়াম থেকেও পরে তাঁকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। ১৮৮৬ সালে লেনিনের পনেরো বছর বয়সে তাঁর বাবা মারা যান। ঐ সময়েই তাঁর দাদা আলেকজাণ্ডার সেন্ট পিটার্সবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে বোমা নিক্ষেপ করে স্বৈরতন্ত্রী জার তৃতীয় আলেকজাণ্ডারকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। এই পরিকল্পনার কথা দ্রুত ফাঁস হয়ে যায় এবং রুশ পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন আলেকজাণ্ডার, বিচারে তাঁর ফাঁসি হয়। একইসঙ্গে বাবা আর প্রিয় দাদার মৃত্যুতে শোকগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও পড়াশোনা চালিয়ে যান ভ্লাদিমির লেনিন । স্নাতক স্তরে স্বর্ণপদক অর্জন করেন তিনি এবং কাজান বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন আইন বিষয়ে পড়ার জন্য। ১৮৮৭ সালে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পরে এই প্রতিষ্ঠানেরই একটি সংগঠনের প্রতিনিধি নির্বাচিত হন লেনিন। ঐ বছরই ডিসেম্বর মাসে জারের নির্দেশে ছাত্র সমাজ নিষিদ্ধ হয় যার বিরুদ্ধে এক বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার কারণে পুলিশ লেনিনকে গ্রেপ্তার করে এবং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাঁকে বহিষ্কার করা হয়। বিচার বিভাগীয় মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে তাঁর পরিবারকে কোকুশকিনো অঞ্চলে নির্বাসন দেওয়া হয়। এখানেই নিকলাই চেরনিশেভস্কির ‘হোয়াট ইস টু বি ডান?’ উপন্যাসটি পড়ে মুগ্ধ হয়ে যান লেনিন। তাছাড়া এই সময়পর্বেই তিনি পড়ে ফেলেন কার্ল মার্কসের ‘দাস ক্যাপিটাল’ বইটিও। এরপর ১৮৪৮ সালে প্রকাশিত কার্ল মার্কস ও ফ্রেডরিক এঙ্গেলসের পত্রিকা ‘কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো’-র একটি রুশ অনুবাদ করেন তিনি। ক্রমেই লেনিন মার্কসবাদের প্রতি আরও গভীরভাবে আকৃষ্ট হয়ে পড়েন এবং বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। ১৮৯৩ সালে রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে এসে থাকতে শুরু করেন তিনি। 

১৮৯৯ সালে প্রকাশ পায় তাঁর লেখা একটি বৈপ্লবিক বই ‘রাশিয়ায় পুঁজিবাদের বিকাশ’ (Development of Capitalism in Russia)। তাঁর নির্বাসনকালের মধ্যেই রাশিয়ান মার্কসবাদী জুলিয়াস মার্টোভের সঙ্গে ‘ইস্ক্রা’ নামে একটি পত্রিকা তৈরি করেন যা পরে রাশিয়ার কমিউনিস্ট মতাদর্শের অন্যতম ধারক, বাহক হয়ে ওঠে। এই সময়পর্বেই ভ্লাদিমির ইলিচ উলিয়ানভ থেকে তিনি ‘ লেনিন ’ ছদ্মনামে পরিচিত হন। ১৯০০ সালে তাঁর নির্বাসন শেষ হলে সমগ্র রাশিয়া এবং ইউরোপের বেশ কিছু জায়গায় ভ্রমণ করেন লেনিন । ১৯০৬ সালে রাশিয়ার ‘সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক লেবার পার্টি’র সভাপতি নির্বাচিত হন লেনিন। ১৯০১ সালে চেরনিশেভস্কির উপন্যাস অবলম্বনে লেনিনের লেখা ‘কী করিতে হইবে?’ নামের একটি রাজনৈতিক পুস্তিকায় তিনি স্পষ্টই উল্লেখ করেছিলেন যে বিপ্লবের জন্য প্রলেতারিয়েতদের দায়িত্বগুলি কী হওয়া উচিত। এই পুস্তিকাতেই তিনি যুক্তি দিয়ে বুঝিয়েছিলেন যে রাশিয়ার সমাজে সামন্তবাদ থেকে যদি পুঁজিবাদের স্তরকে পেরিয়ে সমাজতন্ত্রের পথে চলে যাওয়া যায় তাহলেই বিপ্লব সূচিত হবে। ১৯১৬ সালে প্রকাশিত ‘ঔপনিবেশিকতা- পুঁজিবাদের উচ্চতর স্তর’ (Imperialism : The Highest Stage of Capitalism) বইতে লেনিন প্রথম মার্কসের অর্থনৈতিক তত্ত্বের উল্লেখ করেন এবং তা সমর্থন করেন। মার্কসের উদ্বৃত্ত মূল্যের তত্ত্বটিকে সামনে এনে তিনি শ্রমিক ও মালিকের তথা শ্রমিক ও রাষ্ট্রের সম্পর্কটিকে পুনর্মূল্যায়ন করতে নির্দেশ দেন। সাম্রাজ্যবাদকে তথা পুঁজিবাদকে প্রতিহত করার একমাত্র উপায় হিসেবে ঐ পুস্তিকায় লেনিন বলেছিলেন উপনিবেশ অঞ্চলগুলি থেকে তাদের বাজারগুলিকে ধ্বংস করে দেওয়ার কথা। তাছাড়া তিনি আরও বলেন যে একটি সমাজতান্ত্রিক দেশ সর্বদাই গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে চলা উচিত। মার্কস ও এঙ্গেলসের মত তিনিও বলেন যে প্রোলেতারিয়েতরাই হয়ে উঠবে রাষ্ট্রের সর্বেসর্বা। সনাতন কমিউনিস্টদের মত নাস্তিক লেনিন মনে করতেন যে ধর্ম আসলে একটি ভ্রম মাত্র। তাঁর মতে রাশিয়াতে শিল্প ও পুঁজির বিকাশের ফলেই অসংখ্য কৃষক নিজেদের জমি ছেড়ে শহরের দিকে পা বাড়িয়েছেন এবং তারাই নাগরিক জীবনে গড়ে তুলেছে ‘প্রলেতারিয়েত’ শ্রেণি। তিনি বিশ্বাস করেছিলেন এই সর্বহারা বা প্রলেতারিয়েতদের মধ্যেই একদিন গণচৈতন্য জাগ্রত হবে যা জারতন্ত্রের পতন ঘটাবে।  

১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে ক্রমেই রাশিয়ার সমাজ, অর্থনীতি একেবারে ভেঙে পড়ে। একের পর এক যুদ্ধে সৈন্যরা হারতে থাকে। এই ঘটনাবলীই ১৯১৭ সালের ফেব্রুয়ারি বিপ্লবে ইন্ধন জুগিয়েছিল। ইতিমধ্যে লেনিন সুইজারল্যাণ্ডে চলে গিয়েছিলেন, কিন্তু ১৯১৭ সালের এপ্রিল মাসেই রাশিয়ায় ফিরে আসেন। বিশ্বযুদ্ধের প্রভাবে সঙ্কটাপন্ন অর্থনীতিতে রাশিয়ায় তখন দুর্ভিক্ষ শুরু হয়েছে জারের শাসনে। এর মধ্যেই ঘটে যায় ফেব্রুয়ারি বিপ্লব। জার দ্বিতীয় নিকোলাসের পতন ঘটে এবং আলেকজাণ্ডার কেরেনস্কির মধ্যপন্থী সাংবিধানিক নেতৃত্বে একটি অস্থায়ী সরকার ক্ষমতায় আসে। এই অস্থায়ী সরকারের বিরুদ্ধে সরব হন লেনিন। রাশিয়ার পেট্রোগ্রাদে ফিরে লেনিন ‘এপ্রিল থিসিস’ নামে একটি সাংবিধানিক খসড়া তৈরি করেছিলেন যেখানে এই অস্থায়ী সরকারকে বুর্জোয়া বলে চিহ্নিত করে তিনি ঘোষণা করেন যে জারের শাসনের থেকে এই সরকার কোন অংশেই পৃথক নয়। রাশিয়ায় দরকার জনগণের শাসন, প্রকৃত গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা। ১৯১৭ সালেরই অক্টোবর মাসে রাশিয়ায় ঘটে যায় আরেকটি যুগান্তকারী ঘটনা – অক্টোবর বিপ্লব বা বলশেভিক বিপ্লব। অস্থায়ী সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে লেনিন প্রতিষ্ঠা করেন ‘রাশিয়ান সোশ্যালিস্ট ফেডারেটিভ সোভিয়েত রিপাবলিক’। এই নতুন সরকারের প্রধান হন লেনিন স্বয়ং। ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গেই জার্মানির সঙ্গে শান্তি স্থাপন করেন লেনিন এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে অব্যাহতি নেন। সুইজারল্যাণ্ড থেকে রাশিয়ায় ফিরে আসার জন্য জার্মান সরকার যেমন লেনিনকে সহায়তা করেছিলেন, তার পরিবর্তে এই শান্তিস্থাপনই হয়ত আশা করেছিলেন তারা। এছাড়া জমিদারদের থেকে বলপূর্বক জমি অধিগ্রহণ করে দরিদ্র কৃষকদের মধ্যে জমি বন্টন করেছিলেন তিনি। প্রথম কয়েক দশক ধরে বলশেভিক বিরোধীদের বিরুদ্ধে গৃহযুদ্ধ চালাতে হয়েছে লেনিনকে, একইসঙ্গে দুর্ভিক্ষের কবল থেকেও রক্ষা করতে হয়েছে রাশিয়াবাসীকে। পূর্বের জারের মতো সকল কৃষকদের তিনি বাধ্য করেছিলেন সেনাবাহিনীকে খাবার যোগান দিতে। বহু মানুষ এই গৃহযুদ্ধে অনাহারে মারা যায়, রাশিয়ার অর্থনীতি ভেঙে পড়ে। অবশেষে গৃহযুদ্ধে রাশিয়ার বলশেভিক দল জয়ী হয় এবং ১৯২২ সালে লেনিন বিশ্বের প্রথম কমিউনিস্ট দেশ হিসেবে সোভিয়েত ইউনিয়ন গঠন করেন। এই সময় বিদ্রোহ দমন করে লেনিন নতুন এক অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়ন করেন যা বিধ্বস্ত রাশিয়াকে খুব দ্রুত আর্থিক ও সামাজিকভাবে সবল করে তোলে।

১৯২৪ সালের ২১ জানুয়ারি সেরিব্রাল স্ট্রোকজনিত কোমায় থাকাকালীন ভ্লাদিমির লেনিনের মৃত্যু হয়।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

বিধান রায় ছিলেন আদ্যোপান্ত এক রসিক মানুষ। তাঁর রসিকতার অদ্ভুত কাহিনী



বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন