ইতিহাস

অ্যানি ফ্রাঙ্ক

অ্যানি ফ্রাঙ্ক(Anne Frank) একজন পনেরো বছর বয়সী ইহুদি বালিকা যে বিশ্ব সাহিত্যে খ্যাত হয়ে আছে তার লেখা ডায়েরি “Anne Frank : The diary of a young girl’ এর জন্য। বিশ্বের ৭০টিরও বেশি ভাষায় অনূদিত এই বইটি ইহুদীদের উপর হিটলারের অত্যাচারের এক অন্যতম প্রামাণ্য গ্রন্থ। মাত্র ১৫ বছর বয়সে জার্মানির কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে তার মৃত্যু হয়।

১৯২৯ সালে ১২ জুন জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট শহরে ইহুদি পরিবারে জন্ম হয় অ্যানি ফ্রাঙ্কের। অ্যানির পুরো নাম ছিল অ্যানেলিজ মেরি ফ্রাঙ্ক (Anneliese Marie Frank)। তার বাবার নাম ছিল অটো হেনরিক ফ্রাঙ্ক(Auto Heinrich Frank)। তিনি ছিলেন একজন সম্পন্ন ব্যবসায়ী। তার মায়ের নাম এডিথ( Edith)। অ্যানির বড় বোনের নাম মার্গট(Margot)। মার্গট ছিল খুবই শান্ত, বাধ্য, বুদ্ধিমতী এবং সুন্দরী। ফ্রাঙ্ক পরিবার অ্যানির জন্মের সময় ফ্রাঙ্কফুর্টের (Frankfurt) ডর্নবুস (Dornbusch) এলাকার ৩০৭ নম্বর মারব্যাকওয়েগ(Marbachweg) – এ একটি দোতলা বাড়িতে ভাড়া থাকতেন। ১৯৩১ সালে এই পরিবারটি ২৪ নং গ্যাংহোফারস্ট্রাসে(Ganghoferstrasse) চলে আসে। এই অঞ্চলটিতে উদারপন্থী ও শৌখিন মানুষের বসবাস ছিল। এই দুটি বাড়িই এখন অ্যানির স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে সংরক্ষিত আছে।

১৯৩৩ সালে জার্মানিতে  হিটলারের নাৎসি পার্টি জয়লাভ করার পর হিটলার জার্মানির চ্যান্সেলর নিযুক্ত হন। এই সময় অটো ফ্রাঙ্ক আমস্টারডাম (Amsterdam)-এ একটি কোম্পানিতে কাজ করার জন্য চলে আসেন। কোম্পানির নাম ছিল অপেকটা ওয়ার্কস। ১৯৩৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ফ্রাঙ্ক পরিবার নেদারল্যান্ডে আবার একত্রিত হয়। নেদারল্যান্ডের আসার পর মার্গট পাবলিক স্কুলে এবং অ্যানি মন্টেসরি স্কুলে ভর্তি হয়। এই স্কুলে বেশকিছু বন্ধুও হয়ে যায় তাদের। ১৯৩৯ সালে অ্যানির দুই মামা আমেরিকায় চলে গেলে অ্যানির দিদিমা তাদের সঙ্গে থাকতে শুরু করেন। ১৯৪০ সালের মে মাসে জার্মানরা নেদারল্যান্ড দখল করে নিলে অটো ফ্রাঙ্ক চেষ্টা করেন আমেরিকায় চলে যাওয়ার জন্য। কিন্তু তাঁর সে চেষ্টা সফল হয়নি।

১৯৪২ সালের ১২ জুন ছিল অ্যানির ১৩তম জন্মদিন। এই দিন অ্যানি তার বাবা-মার কাছ থেকে একটি লাল ও সাদা রঙের ডায়েরি উপহার পেয়েছিল। এছাড়াও আরও অনেক উপহার সে পেয়েছিল। তার বন্ধু-বান্ধবরাও তাকে সেদিন নানা উপহার দিয়েছিল। এই জন্মদিন তার যথেষ্ট আনন্দের সঙ্গে কেটেছিল। ডায়েরি পেয়ে সে ঠিক করলো এই ডায়েরিতে সে তার দিনলিপি লিখে রাখতে শুরু করবে। তার মনে হয়েছিল তার মনের সমস্ত কথা সে নিঃসংকোচে এই ডায়েরিতে লিখতে পারবে। এই ভাবেই ১৯৪২ সালের ২০ জুন থেকে সে তার ডায়েরি বা দিনলিপি লিখতে শুরু করে। সে তার ডায়রিকে ‘কিটি’ (Kitty) নামে সম্বোধন করতো। ফ্রাঙ্ক পরিবারে পড়াশোনার প্রতি যথেষ্ট আগ্রহ ছিল। অ্যানির বাবা এবং মা দুজনে মেয়েদের পড়ার ব্যাপারে উৎসাহিত করতেন। অ্যানি এবং তার দিদি দুজনেই পড়াশোনায় যথেষ্ট মেধাবী এবং বুদ্ধিমতী ছিল। অ্যানির বুদ্ধিমত্তা ও সাবলীল লেখনী তার ডায়েরিকে সুখপাঠ্য করে তুলেছিল। হল্যান্ড আসার পর ইহুদিদের ওপর নানান বিধিনিষেধ আরোপিত হয় সেইসময়। ইহুদিদের কেনাকাটার জন্য নির্দিষ্ট দোকান ছিল। সেখান থেকে তাদের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই কেনাকাটা করতে হত। একমাত্র নৌকা ছাড়া আর কোন যানবাহনে তারা উঠতে পারতনা। এমনকি থিয়েটার, সিনেমা, টেনিস কোর্ট, সুইমিং পুল সবই ছিল তাদের জন্য নিষিদ্ধ। ইহুদিদের জন্য স্কুলও ছিল নির্দিষ্ট। এখানে শুধুমাত্র ইহুদিরাই পড়াশোনা করত। অ্যানি ফ্রাঙ্ক ও তার দিদি ইহুদি স্কুলে পড়াশোনা করত।

এর মধ্যে দলে দলে ইহুদিদের ধরে নিয়ে যাওয়া হয় কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে। অ্যানির দিদি মার্গটের নামে এর মধ্যেই সমন আসে। এরপরই ফ্রাঙ্ক পরিবার একটি অফিসের পরিত্যক্ত অংশে আত্মগোপন করে। যদিও বেশ কিছুদিন আগে থেকেই তারা আত্মগোপনের জন্য তৈরি হচ্ছিল। কিন্তু সমন এসে যাওয়ায় তড়িঘড়ি করে আত্মগোপন করতে তারা বাধ্য হয়। এই সময় তারা একটি ভুয়ো খবর ছড়িয়ে দেয় যে, তারা সুইজারল্যান্ডে চলে গেছে। তাদের সঙ্গে ওই একই গোপন আস্তানায় থাকতে শুরু করে আর একটি পরিবার ও এক দাঁতের ডাক্তার। মোট ৮ জন ওই বাড়িটিতে একইসঙ্গে আত্মগোপন করেছিল। অ্যানির বাবার ব্যবসার মালিক ও কয়েকজন কর্মচারী গোপনে তাদের বিভিন্ন ব্যাপারে সাহায্য করত। তাদের গুপ্ত আস্তানায় ঢোকার মুখে একটি বইয়ের তাক রাখা থাকতো যাতে বাইরে থেকে বোঝা না যায় সেখানে একটি দরজা আছে। এই আতঙ্কের বন্দীদশায় অ্যানির সঙ্গী হয়ে উঠেছিল তার ডায়েরি। প্রতিদিনের নানান ঘটনা লিপিবদ্ধ করত সে এই ডায়েরিতে। প্রতিমুহূর্তে ধরা পড়ে যাওয়ার আতঙ্ক তাদের তাড়া করে বেড়াত। কথা বলতে হত ফিসফিস করে, এমনকি আলোও জ্বালা যেত না, যাতে বাইরে থেকে বোঝা না যায় যে ভেতরে কেউ থাকে। অ্যানি ফ্রাঙ্ক তার ডায়েরিতে ফুটিয়ে তুলেছে বন্দী জীবনের একাকীত্ব, হতাশা। বাড়িটিতে আত্মগোপনকারী মানুষেগুলোর বিভিন্ন চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, তাদের সঙ্গে নিজের সম্পর্ক- প্রভৃতিও তুলে ধরেছে তার দিনলিপির প্রতিটি ছত্রে। মায়ের সঙ্গে তার মন কষাকষি, দিদির সঙ্গে তার সম্পর্ক, বাবার প্রতি তার নির্ভরতা ও ভালোবাসা, এমন কি নিজের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলোও তার লেখায় প্রকাশ পেয়েছে। সেই সঙ্গে ফুটে উঠেছে কিশোরী মনের নানান পরিবর্তন, ভালোলাগা, ছেলেদের প্রতি তার মনোভাব, নিজের রূপ সম্পর্কে সচেতনতা ইত্যাদি। আবার চারপাশের পরিবেশ, যুদ্ধের প্রতি তার মনোভাব, মানবিকতা ইত্যাদি ব্যাপারে তার লেখায় পরিণত মানসিকতার পরিচয় পাওয়া যায়। এই ডায়েরিতে সে লিপিবদ্ধ করেছে তার ভবিষ্যতের স্বপ্ন ও পরিকল্পনা।

কিন্তু তার সেই কল্পনা বাস্তবায়িত করতে সে পারেনি। অ্যানি ১৯৪৪ সালের ১ আগস্ট শেষবারের মতো তার দিনলিপি লেখে। ১৯৪৪ সালের ৪ আগস্ট হিটলারের বাহিনীর কাছে ধরা পড়ে যায় তারা। কোন এক গুপ্তচরের মাধ্যমে হিটলার বাহিনী তাদের গুপ্ত আস্তানা সম্পর্কে জেনে যায়। ধরা পড়ার পর তাদের দক্ষিণ নেদারল্যান্ডসের ওয়েস্টবরকে (Westbork) পাঠানো হয়। বাবাকে আলাদাভাবে নিয়ে যাওয়া হয় এবং মা ও মেয়েদের অন্য জায়গায় পাঠানো হয়। মা ও মেয়েদের নিয়ে যাওয়া হয় পোল্যান্ডের আউশভিৎজ(Auschwitz)এ। সেখান থেকে অ্যানি ফ্রাঙ্ক ও তার দিদিকে নিয়ে যাওয়া হয় বারগেন-বেলসেনে (Bergen-Belsen)। অকথ্য অত্যাচার, নোংরা পরিবেশে, ক্ষুধার্ত ও রোগগ্রস্ত অবস্থায় তারা অবশেষে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। ১৯৪৫ সালে ফেব্রুয়ারি বা মার্চ মাসে ‘সারাক্ষণ বকবক করা’ মেয়েটি নিস্তব্ধ হয়ে যায়। এরপর তাদেরকে লাশের স্তুপের সঙ্গে ফেলে দেওয়া হয়। ১৯৪৫ সালের জুলাই মাসে ‘রেডক্রস’ অ্যানি ও তার দিদির মৃত্যুর ব্যাপারটি নিশ্চিত করে।

অ্যানির মৃত্যুর কিছুদিন পরে হিটলারের পরাজয় ঘটে, এবং ইহুদীরা মুক্তি পায়। কিন্তু ফ্রাঙ্ক পরিবারের একমাত্র অ্যানি ফ্রাঙ্কের বাবা অটো ফ্রাঙ্ক ছাড়া আর সকলেই এই নির্মম অত্যাচারে প্রাণ হারায়। মুক্তি পাওয়ার পর তিনি আমস্টারডামের ফিরে আসেন। এখানে তার কোম্পানির অস্ট্রিয়ান সেক্রেটারি মিপ সেজ (Miep Gies) তার হাতে অ্যানি ফ্রাঙ্কের ডায়েরি ও কিছু কাগজপত্র তুলে দেয়। সবাইকে যখন হিটলারের সৈন্যরা গোপন আস্তানা থেকে ধরে নিয়ে যায় তখন তিনি অ্যানি ফ্রাঙ্কের ডেস্ক থেকে এগুলো সংগ্রহ করে নিজের কাছে রেখে দিয়েছিলেন। ১৯৪৭ সালে প্রথম এটি ডাচ ভাষায় ‘রিয়ার আ্যনেক্স’ (Rear Annex) নামে প্রকাশিত হয়। প্রথমদিকে আমেরিকান প্রকাশকরা এটি প্রকাশের ব্যাপারে আগ্রহ দেখাননি। কিন্তু পরবর্তীকালে ১৯৫২ সালে ‘দ্য ডায়েরি অফ আ ইয়ং গার্ল’ নামে প্রকাশিত হয় এবং অসম্ভব জনপ্রিয়তা লাভ করে। অ্যানি ফ্রাঙ্ক চেয়েছিল এমন কিছু করতে যাতে মৃত্যুর পরেও তাকে সবাই মনে রাখে।মৃত্যুর পর প্রকাশিত তার এই ডায়েরি তাকে একজন প্রতিভাবান সাহিত্যিক হিসেবে বিশ্বসাহিত্যে চিরস্মরণীয় করে রেখেছে।

পরবর্তীকালে এই বইটি ৭০ টিরও বেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি বিক্রিত বই গুলির মধ্যে অন্যতম। এই বইটি নিয়ে বহু নাটক ও সিনেমা তৈরি হয়েছে। অ্যানি ফ্রাঙ্কের আত্মগোপনে থাকার জায়গাটি এখন একটি মিউজিয়ামে পরিণত হয়েছে। অ্যানি ফ্রাঙ্কের  বাড়িটি সর্বসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। আমস্টারডামে একটি স্কুল রয়েছে তার নামে। মাদাম তুঁসো ওয়াক্স মিউজিয়ামে অ্যানি ফ্রাঙ্কের একটি মূর্তি রয়েছে। ১৯৪২ সালে যে উল্কাটি আবিষ্কৃত হয়েছিল তার নাম রাখা হয় ‘৫৫৩৫ অ্যানিফ্রাঙ্ক’। ১৯৯৭ সালে ফ্রাঙ্কফুর্টে তার নামে একটি স্কুল খোলা হয়।

স্বরচিত রচনা পাঠ প্রতিযোগিতা, আপনার রচনা পড়ুন আপনার মতো করে।

vdo contest

বিশদে জানতে ছবিতে ক্লিক করুন। আমাদের সাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য যোগাযোগ করুন। ইমেল – contact@sobbanglay.com

 


Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।