ইতিহাস

বেল্লারি শামান্না কেশবন

স্বাধীন ভারতবর্ষের প্রথম জাতীয় গ্রন্থাগারিক ছিলেন বেল্লারি শামান্না কেশবন (Bellari Shamanana Keshavan)। তাঁকে ভারতের জাতীয় গ্রন্থপঞ্জি নির্মাণের জনক বলা হয়ে থাকে। কলকাতায় অবস্থিত জাতীয় গ্রন্থাগারের প্রথম ডিরেক্টর ছিলেন কেশবন। পরবর্তীকালে নিউ দিল্লিতে অবস্থিত ‘ইণ্ডিয়ান ন্যাশনাল সায়েন্টিফিক ডকুমেন্টেশন সেন্টার’-এর প্রথম ডিরেক্টর হন তিনি। দেশের উন্নতিকল্পে বিশেষ কৃতিত্বের জন্য ভারত সরকার ‘পদ্মশ্রী’ পুরস্কারে ভূষিত করেন বি. এস. কেশবনকে।

১৯০৯ সালের ১০ মে মাদ্রাজের মায়লাপোরাতে বেল্লারি শামান্না কেশবনের জন্ম হয়। বাল্য-শৈশব এবং কৈশোরের অনেকটা সময় তিনি মাদ্রাজেই অতিবাহিত করেছেন। পরবর্তীকালে তাঁর পরিবার মাইসোরে চলে এলে এখান থেকেই তাঁর পড়াশোনা শুরু হয়।

১৯২৭ সালে মাইসোর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে মহারাজা কলেজ থেকে কেশবন স্নাতক উত্তীর্ণ হন। এরপরে তিনি লণ্ডনে পাড়ি দেন উচ্চশিক্ষার জন্য এবং দীর্ঘ সাত বছর পরে লণ্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরাজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন তিনি এবং একইসঙ্গে গ্রন্থাগার বিজ্ঞানের উপর ডিপ্লোমা অর্জন করেন। একাধারে সংস্কৃত ও জার্মান ভাষায় দক্ষ ছিলেন কেশবন।

১৯৩৬ সালে দেশে ফিরে মাইসোর বিশ্ববিদ্যালয়েই ইংরাজি ভাষার অধ্যাপক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। অধ্যাপক হিসেবে তাঁর ব্যক্তিত্ব, পাণ্ডিত্য, সহানুভূতি সবই ছাত্র-ছাত্রীদের আকৃষ্ট করতো। ছাত্র-ছাত্রীমহলে তাঁকে অনেকেই ‘জীবন্ত-তার’ বলে ডাকতেন কারণ একদিন একটি লোককে রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় খোলা তড়িদাহিত তারে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া থেকে রক্ষা করেছিলেন তিনি। বেশ কিছুদিন অধ্যাপনা করার পরে ১৯৪৪ সালে তিনি দিল্লিতে সরকারি দপ্তরে কাজ করা শুরু করেন। কাউন্সিল ফর সায়েন্টিফিক অ্যাণ্ড ইণ্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ-এর সম্পাদক পদে আসীন ছিলেন কেশবন এবং তারপরে কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রকের তত্ত্বাবধানার দায়িত্বও সামলেছেন তিনি দক্ষ হাতে। ইতিমধ্যে স্বাধীন ভারতের সমস্ত প্রতিষ্ঠানই ঢেলে সাজাতে উদ্যোগী হয় ভারত সরকার। ১৯০৩ সালে ভাইসরয় লর্ড কার্জনের প্রতিষ্ঠিত ইম্পেরিয়াল লাইব্রেরীটিও নতুনভাবে সাজিয়ে তোলার কাজ শুরু হয়। পুরোনো কর্মকর্তারা সকলেই প্রায় পাকিস্তানে চলে যাওয়ায় ১৯৪৮ সালে কেশবনকে নিযুক্ত করা হয় গ্রন্থাগারিক হিসেবে। ফলে দিল্লি থেকে আবার কলকাতায় ফিরে আসেন তিনি। ১৯৫৩ সালে এই ইম্পেরিয়াল লাইব্রেরীর নতুন নামকরণ হয় ন্যাশনাল লাইব্রেরী। কেশবনের উদ্যোগে একসময়কার গভর্নরদের থাকার জায়গাটিতে গড়ে ওঠে নতুন করে এই ন্যাশনাল লাইব্রেরী এবং সেই বছর থেকেই সমস্ত ভারতীয় প্রকাশনার একটি করে কপি এখানে সংরক্ষিত করা শুরু হয়। ভারত এবং পাকিস্তানের সমস্ত প্রকাশনাকে যাতে বিভাজিত করে দেখা না হয় এবং উভয়ই যাতে এখানে সমান গুরুত্ব পায় সেই ব্যাপারে কেশবন যথেষ্ট অগ্রণী ভূমিকা নেন। একেবারে নতুন করে সজ্জিত গ্রন্থাগারটিতে প্রত্যেকটি প্রধান ভারতীয় ভাষার জন্য আলাদা আলাদা কক্ষ নির্মিত হয়। কেশবনের উদ্যোগেই ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে একটি প্রকাশনা অনুষ্ঠান উদ্‌যাপিত হয়। ১৯৬১ সালে প্রকাশ পায় কেশবনের লেখা ন্যাশনাল লাইব্রেরীর বিস্তৃত ইতিহাস।

ন্যাশনাল লাইব্রেরীর পক্ষ থেকে কেশবনই প্রথম জাতীয় স্তরে একটি গ্রন্থপঞ্জি নির্মাণের কথা ভাবেন এবং সেইমতো উদ্যোগ নেন। এই সূত্রেই ১৯৫৮ সাল থেকে প্রকাশিত হতে থাকে ‘ইণ্ডিয়ান ন্যাশনাল বিবলিওগ্রাফি’ নামের বিখ্যাত সেই জার্নাল। কপিরাইট আইনের অধীনে এই জার্নালের মাধ্যমে ন্যাশনাল লাইব্রেরী সমস্ত ভারতীয় প্রকাশনার তথ্য সংরক্ষণ করতে থাকে। ১৯৫৪ সালে সমস্ত ভারতীয় ভাষার সাহিত্যিক নিদর্শনগুলির সংরক্ষণ এবং সাহিত্য-চর্চার পরিসর বিস্তৃত করার লক্ষ্যে গড়ে ওঠে সাহিত্য অকাদেমি যার অধিকর্তা ছিলেন কৃষ্ণা কৃপালিনী। তাঁরই উদ্যোগে বিশ শতকের সমস্ত ভারতীয় প্রকাশনাগুলির গ্রন্থপঞ্জি নির্মাণের কাজ শুরু করে ন্যাশনাল লাইব্রেরী। এক্ষেত্রে সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন, মানবীবিদ্যার বিভিন্ন বিষয়ের উপর ভারতের নানা ভাষার দক্ষ ব্যক্তিত্বদের দিয়ে এই গ্রন্থপঞ্জি নির্মাণ প্রকল্প শুরু হয় যার ডিরেক্টর বা অধিকর্তা এবং একাধারে প্রধান সম্পাদক হিসেবে বেল্লারি শামান্না কেশবন কাজ করেন।

১৯৫৪ সালে সাহিত্য অকাদেমি গড়ে ওঠায় এই গ্রন্থপঞ্জিতে শুধুমাত্র ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত প্রকাশিত বইগুলিকেই রাখা হয়েছিল। ১৯৬২ থেকে ১৯৭৪ সালের মধ্যে ‘দ্য ন্যাশনাল বিবলিওগ্রাফি অফ ইণ্ডিয়ান লিটারেচার, ১৯০১-১৯৫৩’ এই শিরোনামে ঐ গ্রন্থপঞ্জির চারটি খণ্ড প্রকাশ করেন কেশবন। ১৯৯০ সালে শুধুমাত্র সাহিত্যকেন্দ্রিক গ্রন্থপঞ্জিটি প্রকাশ পায়। ভারতে বিশ শতকের প্রথমার্ধে কেশবনের সম্পাদনায় প্রকাশিত বইয়ের তালিকা উৎসাহী গবেষকদের যথেষ্ট সাহায্য করে থাকে। ১৯৫৬ সাল থেকে কেশবন সাম্প্রতিক ভারতীয় প্রকাশনাসমূহের একটি জাতীয় গ্রন্থপঞ্জি প্রকাশ করতে শুরু করেন যা ভারতের গ্রন্থতালিকা নির্মাণের ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে আছে। কেশবনের আরো দুটি বিখ্যাত কাজের মধ্যে প্রথমটি হল ‘হিস্ট্রি অফ প্রিন্টিং অ্যাণ্ড পাবলিশিং ইন ইণ্ডিয়া : এ স্টোরি অফ কালচারাল রি-অ্যাওয়েকেনিং’ যার প্রথম খণ্ড প্রকাশ পায় ১৯৮৪ সালে। কিন্তু খুব দ্রুত এই বইটি বাজার থেকে তুলে নেওয়া হয় এবং পুনরায় ১৯৮৫ সালে নতুন উপ-শিরোনাম যুক্ত করে প্রকাশিত হয় ‘সাউথ ইণ্ডিয়ান অরিজিনস অফ প্রিন্টিং অ্যাণ্ড ইটস এফ্লুরোসেন্স ইন বেঙ্গল’। এই বইয়ের সম্পাদনার ভার ছিল কেশবনের উপর। বইটির দ্বিতীয় এবং তৃতীয় খণ্ড প্রকাশ পায় যথাক্রমে ১৯৮৮ এবং ১৯৯৭ সালে। দ্বিতীয় খণ্ডের বিষয় ছিল কর্ণাটক, অন্ধ্রপ্রদেশ এবং কেরালার প্রকাশনার ইতিহাস এবং তৃতীয় খণ্ডে মূলত হিন্দি ও ঊর্দূ প্রকাশনার উপরেই জোর দেওয়া হয়। এই সমস্ত কাজটির পদ্ধতি বিষয়ে কেশবন একটি পরিভাষা ব্যবহার করেন ‘অ্যাকাডেমিক প্যারাসাইটোলজি’ অর্থাৎ বিদ্যায়তনিক পরজীবীবিদ্যা। এর মাধ্যমে কেশবন আসলে বলতে চেয়েছেন বইতে নিহিত বিষয়গুলি নিয়ে তিনি কোনো পৃথক গবেষণা করেননি, কেবল বিভিন্ন সূত্র থেকে, বই থেকে সংক্ষিপ্তসার, কাটিং, প্রবন্ধ, ব্রোশিওর, অনূদিত অংশগুলি যুক্ত করে সাজিয়ে তুলেছেন মাত্র। তৎকালীন ভারতে শুধু নয় বর্তমানকালেও এমন নিবিষ্ট কোষগ্রন্থ নির্মাণের মতো কাজ খুব কম মানুষই করার সামর্থ্য রাখেন। এই প্রকল্পের পাশাপাশি কেশবন একই পদ্ধতিতে ভারতে ছাপাখানা আবিষ্কারের আগে মানে বই ছাপা চালু হওয়ার আগে কীভাবে বই লেখা হতো তার উপরে গবেষণা করে একটি বই সম্পাদনা করেন যা ১৯৮৬ সালে প্রকাশ পায় ‘দ্য বুক ইন ইণ্ডিয়া : এ কম্পাইলেশন’ নামে। ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলায় এই বইটিই স্যুভেনির আকারে এনবিটি প্রকাশনা পুনর্মুদ্রণ করে এবং এর দ্বিতীয় সংস্করণটি প্রকাশ পায় ১৯৯২ সালে যেখানে অতিরিক্ত সংযোজন হিসেবে মুঘল যুগের পাণ্ডুলিপির প্রতিলিপি যুক্ত করা ছিল।

১৯৬৩ সালে ইণ্ডিয়ান ন্যাশনাল সায়েন্টিফিক ডকুমেন্টেশন সেন্টারের ডিরেক্টর পদে আসীন হন বেল্লারি শামান্না কেশবন। ঐ সংস্থাতেই তিনি ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত কাজ করেছেন। এই সংস্থায় থাকাকালীন ন্যাশনাল সায়েন্স লাইব্রেরি স্থাপন করেন তিনি, ইণ্ডিয়ান সায়েন্স অ্যাবস্ট্রাক্ট প্রকাশ করা শুরু করেন এবং এর পাশাপাশি ন্যাশনাল ইউনিয়ন ক্যাটালগ অফ সায়েন্টিফিক সিরিয়ালস-এর কম্পিউটার ডেটাবেস নির্মাণের প্রকল্প চালু করেন। ১৯৬৪ থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত ইউনেস্কোর অধীনে ‘ইন্টারন্যাশনাল অ্যাডভাইসরি কমিটি অন বিবলিওগ্রাফি, ডকুমেন্টেশন অ্যাণ্ড টার্মিনোলজি’, ‘এক্সপার্ট কমিটি ফর অর্গানাইজিং দ্য লাইব্রেরি অ্যাণ্ড ডকুমেন্টেশন ডিভিশন’-এর সদস্য ছিলেন কেশবন। ১৯৬৯ সালে অবসর গ্রহণের পরে এফআইডি, হু, ইউজিসি ইত্যাদি সংস্থার পরিকল্পক হিসেবেও নানা সময় ভারত সরকারের সহায়তা করেছেন তিনি। তাছাড়া ‘ইণ্ডিয়ান লাইব্রেরি অ্যাসোসিয়েশন’-এর সদস্য ছিলেন তিনি। গ্রন্থাগারিকের পেশাকে স্বাধীন ভারতে এক অন্যতর উচ্চমাত্রায় নিয়ে গিয়েছিলেন কেশবন।

তাঁর মৃত্যুর পরে পি.টি নায়ারের লেখা জীবনী ‘বি এস কেশবন : ফার্স্ট ন্যাশনাল লাইব্রেরিয়ান ইন ইণ্ডিয়া’ প্রকাশ পায় ২০০৫ সালে। বর্তমানে তাঁর নামেই সেকেন্দ্রাবাদে চালু হয়েছে কেশবন ইন্সটিটিউট অফ ইনফর্মেশন অ্যাণ্ড নলেজ ম্যানেজমেন্ট’।

১৯৬০ সালে দেশের জাতীয় গ্রন্থপঞ্জি নির্মাণের কাজে দক্ষতার জন্য ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী পুরস্কারে ভূষিত করে।

২০০০ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি বেল্লারি শামান্না কেশবন -এর মৃত্যু হয়।

  • সববাংলায় সাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য আজই যোগাযোগ করুন
    contact@sobbanglay.com

  • এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

    আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

শুধুমাত্র খাঁটি মধুই উপকারী, তাই বাংলার খাঁটি মধু খান


ফুড হাউস মধু

হোয়াটস্যাপের অর্ডার করতে এখানে ক্লিক করুন