ধর্ম

দেবীর বোধন

দুর্গাপূজার মহাষষ্ঠীতে যেটা হয় তা হল বোধন। ‘বোধন’ শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হল ‘বোধ’+ ‘অনট্‌’ ধাতু – অর্থাৎ জাগ্রত করা – অপরা জগতের ‘ধী’শক্তি দিয়ে পরাজাগতিক মহাশক্তিকে বোধিত্বে অর্থাৎ জাগ্রত অবস্থায় অধিষ্ঠিত করা, প্রতিষ্ঠিত করা।

সত্য যুগে দেবী আদ্যাশক্তি মহামায়া দুর্গার বসন্তকালে বোধন করেছিলেন রাজর্ষি সুরথ। তাঁর সঙ্গী ছিলেন সমাধি বৈশ্য। সময়টি ছিল চৈত্র মাসের শুক্ল পক্ষ। একে আমরা বাসন্তী পূজা বলি। দেবীর বোধনের আলোচনা পাওয়া যায় মৎস্যপুরাণ, মার্কেণ্ডয়পুরাণ, শ্রীশ্রীচণ্ডী, দেবীপুরাণ, কালিকাপুরাণ এবং দেবী ভাগবতে।

পরবর্তী যুগে অর্থাৎ ত্রেতা যুগে রাবণও চৈত্র মাসে দেবী দুর্গার বোধন এবং আরাধনা করতেন। কিন্তু রামায়ণের কাহিনী অনুসারে লঙ্কা থেকে সীতাকে উদ্ধারের জন্য যে রাম-রাবণের অবশ্যম্ভাবী যুদ্ধ, সেখানে রাবণকে বধ করার জন্য রামচন্দ্রকে দেবীর শরণাপন্ন হতে হয়। দেবাদিদেব মহাদেবকে কঠোর তপস্যায় তুষ্ট করে রাবণ বর লাভ করেছিলেন। দেবী দুর্গার বিভিন্ন রূপের একনিষ্ঠ সাধক ও পূজারি ছিলেন রাবণ। যুদ্ধক্ষেত্রে মহাকালী স্বয়ং রাবণকে নিজের কোলে স্থান দেন। এ হেন রাবণকে বধ কী করে হবে? রাম পড়লেন দুশ্চিন্তায়। দেবরাজ ইন্দ্রদেবও দুশ্চিন্তায়। এ দিকে  রাবণের বিনাশ ঘটবে রামের  হাতে, এই হল দৈববাণী। তাই দেবতারা প্রজাপতি ব্রহ্মার শরণ নিলেন। তখন মহামায়া একাক্ষরী আদ্যাদেবী মা দুর্গা সমাধিনিদ্রায় নিদ্রিতা। ব্রহ্মা স্বয়ং তাঁর পুজো করে তাঁকে তুষ্ট করে উপায় জিজ্ঞাসা করলেন। দেবী বললেন, রামচন্দ্রকে ‘বোধন’ করতে হবে। তবেই রাবণকে বধ করার জন্য তিনি রামকে সাহায্য করবেন। বসন্তকালের সঙ্গে ত্রেতা যুগে যুক্ত হল শরৎকাল – অর্থাৎ অকালে হল দেবীর বোধন, তাই এ হল অকালবোধন

রামকে দেবীর নির্দেশের কথা বললেন ব্রহ্মা ও ইন্দ্র। যদিও সময়টা শরৎকাল – রামচন্দ্র নিজের হাতে দেবী দুর্গার মূর্তি তৈরি করে পুজো করলেন, অকালে বা অসময়ে প্রকট হওয়ার জন্য দেবী দুর্গার আরাধনা করলেন। ব্রহ্মা স্বয়ং দুর্গার বোধনপূজা করেন। পূজার প্রারম্ভে স্বয়ং প্রজাপতি পদ্মযোনি ব্রহ্মা দেখেছিলেন সাগরের বালুকাবেলার অনতিদূরে গভীর অরণ্যের প্রান্তসীমায় একটি বিল্ববৃক্ষের নীচে একটি আট থেকে দশ বছরের বালিকা আপন মনে খেলছে। ব্রহ্মা ধ্যা্নস্থ হয়ে জানলেন, সেই বালিকাই স্বয়ং গৌরী – কন্যকা। ব্রহ্মা চোখ মেলতেই সেই বালিকা ওই বিল্ববৃক্ষে লীন হয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে ব্রহ্মা স্থির করলেন, দেবী দুর্গার সেই বোধনের পূজার্চনা হবে ওই বিল্ববৃক্ষের নীচে। তাই আজও দেবীর বোধনের পূর্বে বিল্বশাখা বা বিল্ববৃক্ষকে পূজা করে তা প্রতিষ্ঠিত করতে হয় দেবীর মৃন্ময়ী বিগ্রহের মহাঘটে। শুরু হয় ‘বোধন’-এর আরাধনা, বেজে ওঠে শঙ্খ, ঢাক।

সববাংলায় পড়ে ভালো লাগছে? এখানে ক্লিক করে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ভিডিও চ্যানেলটিওবাঙালি পাঠকের কাছে আপনার বিজ্ঞাপন পৌঁছে দিতে যোগাযোগ করুন – contact@sobbanglay.com এ।


তথ্যসূত্র


  1. মহিষাসুরমর্দিনী দুর্গা, দেব সাহিত্য কুটীর প্রাইভেট লিমিটেড।
  2. দুর্গা দেবীর তথ্য প্রশ্ন ও মন্ত্র সাধারণ জ্ঞান, প্রেমেন্দ কুমার সাহা, অর্পিতা প্রকাশনী।
  3. দুর্গা পূজা পদ্ধতি, নন্দী কেশ্বর পুরাণোক্ত, বুক চয়েস।

২ Comments

২ Comments

  1. অরবিন্দ বন্দ‍্যোপাধ্যায়

    অক্টোবর ৫, ২০১৯ at ০৯:১৬

    খুবই ভালো ক‍রেছেন, লেখাটি দিয়ে। কিন্তু, সবিনয়ে জানাই, এটি গতকাল ষষ্ঠীর দিন প্রকাশিত হওয়াই বাঞ্ছনীয় ছিল। অনধিকার চর্চার জন্য ক্ষমাপ্রার্থী।

  2. Pingback: শ্মশানভূমিতে দুর্গাপূজা | সববাংলায়

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।