সববাংলায়

ডাকব্যাক ও সুরেন্দ্রমোহন বসু

আমাদের বাজারচলতি অনেক জনপ্রিয় পণ্য উৎপাদক কোম্পানির সঙ্গে বাঙালির ইতিহাস ও ঐতিহ্যেরও নিবিড় যোগাযোগ রয়েছে। আজও মানুষ সেইসব পণ্যকে সমানভাবে ভরসা করে এবং সেই নির্দিষ্ট কোম্পানিও তাদের পণ্যের গুণমান নিয়ে সদাসচেতন। বাঙালির গর্বের ইতিহাস জড়িত তেমনই একটি কোম্পানি হল ডাকব্যাক (Duckback), যারা ওয়াটারপ্রুফ বুট, রেনকোট, ব্যাগ ইত্যাদির মতো পণ্যের নির্মাতা ও বিক্রেতা। ভারতবিখ্যাত এমনকি বিদেশেও সম্মানের সঙ্গে প্রচলিত এই ব্র্যান্ডটির পিছনেও কিন্তু রয়েছেন একজন বাঙালি, নাম সুরেন্দ্রমোহন বসু (Surendra Mohan Bose)। স্বদেশী আন্দোলনের যুগে ব্রিটিশ বাণিজ্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দেশীয় ওয়াটারপ্রুফ পণ্যের বাজার তৈরি করে এক অনবদ্য নজির গড়েছিলেন তিনি। তবে কেবল ইংরেজদের সঙ্গে টক্কর দেওয়াই তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না, এই কোম্পানি তৈরি করে তিনি সাধারণ মানুষেরও বিশেষত ভারতীয় সৈন্যদের প্রভূত উপকার করেছিলেন। বাঙালির সফল ব্যবসার একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন সুরেন্দ্রমোহন বসু।

এদেশে পাকাপোক্তভাবে ঘাঁটি গেড়ে বসার পর ব্রিটিশরা ইংল্যান্ড থেকে ভারতবর্ষের বাজারে ওয়াটারপ্রুফ বিভিন্ন পণ্য আমদানি করে আনতেন এবং খুব চড়া দামে তা ভারতীয়রা ক্রয় করতে বাধ্য হতেন। এতটাই উচ্চমূল্যের ছিল সেইসব বিদেশী পণ্য যে, অধিকাংশ ভারতীয়ের পক্ষেই তা ক্রয় করা সম্ভব হত না। আরও একটি জটিল এবং মর্মবিদারক সমস্যাও ছিল৷ বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচার সামগ্রী রেনকোট, গামবুট ইত্যাদি চড়া দামের জন্য  ভারতীয় সৈন্যরা বৃষ্টির মধ্যে ওয়াটারপ্রুফ জ্যাকেট ও কাদামাটিতে সঠিকভাবে চলার উপযুক্ত গামবুট ছাড়াই যুদ্ধ করতে গিয়ে প্রাণ হারাতেন। এই পরিস্থিতি চোখের সামনে দেখেও কেউ এই সমস্যার বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারছিলেন না। আবার অন্যদিকে ভারতীয় বাজারও দামী বিদেশী পণ্যে ছেয়ে গিয়েছিল। তবে স্বদেশী আন্দোলনের যুগে ভারতীয়দের জাতীয়তাবোধে উদ্বুদ্ধ করে তোলবার জন্য এবং সমস্তরকম ব্রিটিশ অপশাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করবার জন্য কিছু চিন্তানায়ক, কর্মঠ, জেদি মানুষ এগিয়ে এসেছিলেন। আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র যেমন আত্মনির্ভরশীল জাতির কথা বলেছিলেন এবং বেঙ্গল কেমিক্যালস তৈরি করে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য দেশীয় ব্যাবসা বাণিজ্যের পথ দেখিয়েছিলেন। সেই পথে হেঁটেছিলেন অনেকেই। সেই স্বদেশী আন্দোলনের যুগে ইংরেজদের সঙ্গে ওয়াটারপ্রুফ এবং টেক্সটাইল ব্যবসায় পাল্লা দিয়ে যাবতীয় সমস্যা দূরীকরণের কথা যিনি চিন্তা করেছিলেন তিনি একজন বাঙালি, নাম সুরেন্দ্রমোহন বসু।

এই সুরেন্দ্রমোহন বসু নিজে ছিলেন একজন কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এর ছাত্র হিসেবে তিনি ওয়াটারপ্রুফিং কৌশল সম্পর্কেও গভীর মনোযোগ সহকারে অধ্যয়ন করেন। যে বিষয় নিয়ে তিনি পড়াশোনা করতেন সেই বিষয়টির কারণেই জলরোধক বস্তু সম্পর্কে এক স্বচ্ছ ধারণা তৈরি হয়ে গিয়েছিল তাঁর। বার্কলে এবং স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছিলেন তিনি। বিদেশ থেকে ডিগ্রি নিয়ে এবং ওয়াটারপ্রুফিং কৌশল শিখে দেশে ফেরেন তিনি। তখন সারা দেশজুড়ে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের আগুন ছড়িয়ে পড়েছিল। সুরেন্দ্রমোহন নিজেও সেই আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন এবং সক্রিয় ভূমিকাও পালন করেন। ফলত উত্তরপ্রদেশের হামিরপুরে ব্রিটিশের হাতে বন্দী হন তিনি। কারাবাসের সময়তেই দেশের বাজারে ব্রিটিশদের একাধিপত্য এবং ভারতীয় সৈন্যদের বৃষ্টিতে অসুবিধার কথা ভেবেই নিজস্ব একটি ওয়াটারপ্রুফ পণ্যের ব্র্যান্ড তৈরি করার স্বপ্ন দেখেছিলেন সুরেন্দ্রমোহন। তখন আবার প্রথম বিশ্বযুদ্ধও চলছিল এবং ব্রিটিশরা যুদ্ধের জন্য লাগাতার সৈন্য পাঠাচ্ছিল।

কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর আর হাত গুটিয়ে বসে থাকেননি সুরেন্দ্রমোহন। যে স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন তার বাস্তবায়নের কাজ শুরু করে দিয়েছিলেন। ১৯২০ সালে তিনি একক মালিকানায় তাঁর এই কোম্পানি শুরু করেছিলেন। তাঁর এই দৃঢ় পদক্ষেপ ভারতীয় বাজারে ব্রিটিশ একাধিপত্যকে রীতিমতো চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিল। তবে এ তো কেবলমাত্র একটি ব্যবসারই সূত্রপাত শুধু নয় বরং সেই স্বদেশী আন্দোলনের যুগে এ-যেন ব্রিটিশ অনাচারের বিরুদ্ধে এক তীব্র প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ। পরবর্তীতে ১৯৩২ সালে সুরেন্দ্রমোহনের অন্য তিনভাই অজিতমোহন, যোগেন্দ্রমোহন এবং বিষ্ণুপদ ব্যবসায়ীক অংশীদার হিসেবে এই কোম্পানিতে যোগদান করলে সুরেন্দ্রৃমোহন এটিকে একটি প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানিতে পরিণত করেন। প্রথমে সুরেন্দ্রমোহনদের দক্ষিণ কলকাতার নজর আলী লেনের বাড়ি থেকে কোম্পানি শুরু হয়েছিল। পরে কোম্পানির জনপ্রিয়তা ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকলে এবং পণ্যের চাহিদাও বাড়তে থাকায় সুরেন্দ্রমোহন একটি বন্ধ রাবার কারখানা ক্রয় করেন এবং ১৯৩৮ সালে উৎপাদনের সমস্ত কার্যক্রম পানিহাটিতে স্থানান্তর করেন।  যদিও এই কোম্পানিটি ডাকব্যাক নামেই খ্যাত, কিন্তু কোম্পানির নাম ছিল অন্য। ১৯৪০ সালে কোম্পানিটিকে বেঙ্গল ওয়াটারপ্রুফ ওয়ার্কস নামে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে স্থাপন করা হয়েছিল। এই কোম্পানি খুবই স্বল্পমূল্যে কিন্তু উন্নত গুণমানের ওয়াটারপ্রুফ সামগ্রী বাজারে ছড়িয়ে দিয়েছিল। ফলে চড়া দামের বিদেশী পণ্যের বাজার আপনা থেকেই পড়তে শুরু করেছিল। সুরেন্দ্রমোহনের কোম্পানি কেবলমাত্র রেনকোট বা গামবুটই নয়, ওয়াটারপ্রুফ রেলওয়ে হোল্ডল, জুতোর ওপর পরার ওভারশু, বন্দুকের কভার ইত্যাদি ছাড়াও ফাইটার প্লেনের পাইলটদের পরার অ্যান্টি-গ্র্যাভিটি শ্যুট, বরফের ব্যাগ, এয়ার বালিশ, মাইনিং বুট ইত্যাদিও তৈরি করে থাকে। যত দিন এগিয়েছে পণ্যে আরও বৈচিত্র্য আনতে শুরু করেছিল ডাকব্যাক। নোটবুক, টিফিন বাক্স, জলের বোতল, স্কুলব্যাগ ইত্যাদি সামগ্রীও তারা তৈরি করতে শুরু করে।

১৯৪৮ সালে সুরেন্দ্রমোহন বসুর মৃত্যুর পর তাঁর ছয় সন্তানের মধ্যে সবচেয়ে বড় দেবব্রত এই কোম্পানির উত্তরাধিকারী হন। এই দেবব্রত আবার ইংল্যান্ডে রাবার প্রযুক্তি অধ্যয়ন করেছিলেন। ৬০-এর দশকের মাঝামাঝি এই দেবব্রতের সময়তেই কোম্পানি শিল্পী রণেন অয়ন দত্তের ডিজাইন করা ডাকব্যাগের লোগোটি পেয়েছিল। দেবব্রত দীর্ঘসময় ধরে চেষ্টা করেছিলেন, অবশেষে এক সন্ধ্যায় রণেন অয়ন দত্ত লোগোর কাজটি সম্পন্ন করেন। লোগোতে চারফোঁটা জলবিন্দু লক্ষ করা যায়। হাঁসের মসৃণ পিঠে জল দাঁড়াতে পারে না, সেখান থেকেই ডাকব্যাক শব্দটির উদ্ভব এবং এই ওয়াটারপ্রুফ কোম্পানিটির জন্য তা একেবারেই সার্থক নাম। ১৯৮২ সালে এই কোম্পানির নাম সামান্য বদলে হয়েছিল বেঙ্গল ওয়াটারপ্রুফ লিমিটেড। আবার ২০১৪ সালে কোম্পানিটি যখন ওমপ্রকাশ সাক্সেনার অধীনে চলে যায় তখন এর নাম হয় ডাকব্যাক ওয়াটারপ্রুফ ওয়ার্কস প্রাইভেট লিমিটেড।

অমিত ভট্টাচার্যের ‘স্বদেশী এন্টারপ্রাইজ ইন বেঙ্গল : ১৯২১-১৯৪৭’ গ্রন্থের দ্বিতীয় খন্ড অনুযায়ী ১৯৪১ সালে ডাকব্যাক কোম্পানি পণ্য বিক্রয় করে ৪০.৪২ লক্ষ টাকা আয় করেছিল। ১৯৬০ সালে টাকার অঙ্কটি বেড়ে হয়েছিল ৬০.০৫ লক্ষ এবং ১৯৬৭ সালে তা পৌঁছেছিল ১.১৮ কোটিতে। তবে মনে করা হয় কোম্পানির সুবর্ণ সময় ছিল ১৯৮৯ সাল থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত। সেই সময়ে কোম্পানির টার্নওভার ১৮ কোটি থেকে ৫১ কোটিতে উত্তীর্ণ হয়েছিল।

৯০-এর দশকে উদারীকরণের পরে ব্যবসায় মন্দা শুরু হয়েছিল। সেই সময় কঠিন প্রতিযোগিতা ছিল। চীনা পণ্যের কাছে ডাকব্যাক তাদের খুচরো বাজার হারাতে শুরু করেছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাবারেরও দাম বেড়েছিল। ২০০৯-১০ সালের দিকে রাবারের দাম ৫৫ টাকা প্রতি কেজি থেকে বেড়ে হয় ২৮০ টাকা। এছাড়াও কার্যকরী মূলধনের ঘাটতি দেখা দিয়েছিল এবং তারই পাশাপাশি পারিবারিক কলহ, কোম্পানির ভবিষ্যত নিয়ে কোনও পরিকল্পনা না থাকায় অব্যবস্থাপনা দেখা দেওয়া, ইত্যাদি কারণে কোম্পানিটি বিক্রি হয়ে গিয়েছিল। কোম্পানির মালিকানা কিনে নেন এই কোম্পানির একসময়কার আর্থিক পরামর্শদাতা ওমপ্রকাশ সাক্সেনা। মিস্টার সাক্সেনা জানিয়েছিলেন যে, টেকওভারের সময় বেঙ্গল ওয়াটারপ্রুফের প্রায় ৮৫ কোটি টাকা ঋণ ছিল। ১০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে কোম্পানিকে ঋণমুক্ত করে ২০১৪ সালে ডাকব্যাকের মালিকানা বদল হয়। ডাকব্যাক ইন্ডিয়া লিমিটেডের অধীনে নিবন্ধিত কোম্পানির এখন দুটি কারখানা রয়েছে, একটি রাঁচিতে এবং অন্যটি উত্তর চব্বিশ পরগণার বারাসাতে। এছাড়াও দিল্লীতে একটি শাখা এবং কলকাতায় তিনটি উৎপাদন ইউনিট রয়েছে। মাঝে কোম্পানিটির ব্যবসায় খানিক নিম্নগতি লক্ষ করা গেলেও ২০১৮-১৯ অর্থবছরে কোম্পানির টার্নওভার ছিল ৭৫ কোটি টাকা।

ভারতীয় বাজারে ব্রিটিশদের একচেটিয়া আধিপত্যের বিরুদ্ধে এক বাঙালির এমন সপাট জবাব এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের এক নব দিগন্ত উন্মোচনের এই ইতিহাস সত্যিই গর্বের।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading