ইতিহাস

এডওয়ার্ড জেনার

এডওয়ার্ড জেনার (Edward Jenner) ছিলেন একজন ব্রিটিশ চিকিৎসক এবং বিজ্ঞানী। তিনিই প্রথম ভ্যাকসিনের আবিষ্কার করেন। তাঁর আবিষ্কৃত গুটিবসন্ত রোগের ভ্যাকসিন ছিল পৃথিবীর প্রথম ভ্যাকসিন।

এডওয়ার্ড জেনার ১৭৪৯ সালের ১৭ মে ইংল্যান্ডের গ্লৌচেস্টারশায়ারের (Gloucestershire) বার্কেলেতে (Berkeley) জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন তাঁর বাবা-মায়ের নটি সন্তানের মধ্যে অষ্টম সন্তান। তাঁর বাবার নাম ছিল রেভারেন্ড স্টিফেন জেনার। তিনি ছিলেন বার্কলের যাজক। সেজন্যই এডওয়ার্ড জেনারের প্রাথমিক শিক্ষা যথেষ্ট ভাল ভাবেই হয়েছিল। তবে তাঁর বাবা তাঁর ৫ বছর বয়সে মারা যান এবং তিনি তাঁর এক ভাইয়ের কাছে বড় হতে থাকেন। এই ভাইও যাজক ছিলেন।

তিনি ছোটবেলায় ক্যাথারিনের (Katherine) উটন আন্ডার এজ (Wotton-Under-Edge) শহরের লেডি বার্কলেজ স্কুলে (Lady Berkley’s School) এবং পরবর্তীকালে সাইরেন্সেস্টার (Cirencester) স্কুলে শিক্ষা লাভ করেন। এই সময় তিনি গুটি বসন্তে আক্রান্ত হন এবং এর জন্য তাঁকে ভ্যারিওলেশন (variolation) (প্রাচীন পদ্ধতিতে টিকাদান) করা হয় যা তাঁর স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে  সারা জীবন প্রভাব ফেলেছিল। মাত্র ১৪ বছর বয়সে তিনি ড্যানিয়েল লুডলোর (Daniel Ludlow) কাছে শিক্ষা লাভ করেন। তখন ড্যানিয়েল লুডলো সাউথ গ্লৌচেস্টারশায়ারের একজন নামকরা সার্জেন ছিলেন। পরবর্তী কালে এডওয়ার্ড জেনারও এখানকার শল্যচিকিৎসক বা সার্জেন হন। ১৭৭০ সালে ২১ বছর বয়সে তিনি জন হান্টার এবং অন্যান্য সার্জেনদের কাছে এ্যানাটমী এবং সার্জারির বিষয়ে শিক্ষা লাভ করেন লন্ডনের ‌ সেন্ট জর্জ  হসপিটাল থেকে।

১৭৭৩ সালে জেনার নিজের জন্মস্থানে ফিরে আসেন একজন খ্যাতনামা ডাক্তার হিসেবে এবং বার্কলেতে চিকিৎসা শুরু করেন। জন হান্টারই  তাঁকে ন্যাচারাল হিস্ট্রির সঙ্গে পরিচয় করান এবং রয়্যাল সোসাইটিতে (royal society) যোগদানের প্রস্তাব দেন। ১৭৮৮ সালে এডওয়ার্ড জেনার কোকিল পাখির বাসার ব্যাপারে তাঁর পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা ও গবেষণা প্রকাশ করেন। এই গবেষণার ফলে তিনি রয়্যাল সোসাইটির ‘ফেলো’ নির্বাচিত হন। কি করে কোকিল পাখির সদ্যোজাত বাচ্চারা যে পাখির বাসায় থাকে তার ডিমগুলো নিচে ফেলে দেয় – এই ব্যাপারটি তিনি বিশ্লেষণ করেছিলেন। ১৭৮৮ সালে তাঁর গবেষণা ‘ফিলোসফিক্যাল‌ ট্রানজাকশনস অফ দ্য রয়্যাল সোসাইটি’-তে (‘philosophical transactions of the royal society’) প্রকাশিত হয়। পরবর্তীকালে পক্ষীবিশারদ জেমিমা ব্ল্যাকবার্ন এ বিষয়ে তাঁর মতকেই সুপ্রতিষ্ঠিত করেন। প্রাণীবিদ্যায় জেনারের আগ্রহ তাঁকে পরবর্তীকালে গুটিবসন্তের ভ্যাকসিন তৈরি করতে সাহায্য করেছিল।

১৭৮৮ সালের মার্চ মাসে জেনার ক্যাথরিন কিংসকোটকে বিবাহ করেছিলেন। ১৮১৫ সালে যক্ষ্মারোগে তাঁর স্ত্রীর মৃত্যু হয়েছিল। ১৭৯২ সালে তিনি সেন্ট অ্যান্ড্রুস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমডি ডিগ্রী লাভ করেন। জেনার একটি দল তৈরি করেছিলেন যার নাম ছিল ‘ফ্লিস মেডিকেল সোসাইটি’ (‘Fleece medical society’)। চিকিৎসা শাস্ত্রের বিভিন্ন বিষয়ের ওপর বিভিন্ন গবেষণাপত্র পড়া হত এখানে। এই সময় তিনি আ্যনজিনা পেক্তরিস অপথ্যালমিয়া, কার্ডিওভালভুলার ডিজিজ(anginapectoris, ophthalmia, cardiac valvular disease) এর ওপর গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছিলেন।

১৭৯৬ সালে তিনি গুটিবসন্তের টিকা আবিষ্কার করে বিশ্বে স্মরণীয় হয়ে রয়েছেন। এই সময় গুটিবসন্ত রোগে প্রচুর মানুষ মারা যেত। ভ্যারিওলা ভাইরাস বসন্ত রোগের কারণ। এই ভাইরাসের একটি প্রকার গরুর দেহে গোবসন্ত সৃষ্টি করে আরেকটি মানবদেহে বসন্ত রোগের সৃষ্টি করে। গোবসন্তের ভাইরাস মানব দেহকে কাবু করতে পারেনা, কিন্তু মানবদেহে গোবসন্তের ভাইরাস থাকলে মানবদেহে বসন্ত রোগের সৃষ্টিকারী ভাইরাস কার্যকরী হতে পারেনা – ‌এই ধারণাকে ব্যবহার করে এডওয়ার্ড জেনার গুটিবসন্তের টিকা আবিষ্কার করেছিলেন। এজন্য তাঁকে টিকা আবিষ্কার এর জনক বলা হয়। জেনার লক্ষ্য করেছিলেন যে, গোবসন্তে আক্রান্ত এক গোয়ালিনীর শরীর গুটি বসন্তের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে। জেনার বিষয়টি পরীক্ষা করে দেখার সিদ্ধান্ত নেন। জেমস ফিলিপ নামে আট বছর বয়সের একটি বাচ্চা ছেলের দেহে তিনি ক্ষত সৃষ্টি করে সেখানেই গোবসন্ত থেকে সংগৃহীত তরল লাগিয়ে দেন। বাচ্চাটির ক্ষতস্থান সাময়িকভাবে ফুলে উঠলেও কিছুদিনের মধ্যেই সবকিছু ঠিক হয়ে যায়। কিছুদিন পর বাচ্চাটির দেহে একইভাবে তিনি গুটিবসন্তের জীবাণু প্রবেশ করান। এর ফলে বাচ্চাটি অল্প অসুস্থ হয়ে কয়েকদিনের ভিতরে আবার সুস্থ হয়ে ওঠে। তিনি লক্ষ্য করেন যে, শিশুটিকে  গুটিবসন্ত আক্রান্ত করতে পারছে না। তিনি বুঝতে পারলেন এভাবে গুটিবসন্তের কবল থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষকে বাঁচানো সম্ভব। তিনিই প্রথম সফলভাবে গুটিবসন্তের টিকা আবিষ্কার করেন। পরবর্তীকালে এই টিকা পদ্ধতি আরো উন্নত হয়েছে এবং বিভিন্ন ছোঁয়াচে রোগের ক্ষেত্রে সফলভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। (প্রসঙ্গত টিকা কিভাবে কাজ করে জানার জন্য এখানে দেখতে পারেন।) এই টিকাদান পদ্ধতি প্রথমে ব্রিটেনে এবং পরবর্তীকালে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। এমনকি নেপোলিয়ান তাঁকে এই জন্য পুরস্কৃত করেন এবং সমস্ত ফরাসি সৈনিকদের টিকা গ্রহণ করান। ১৯৮০ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ঘোষণা করে যে গুটিবসন্ত রোগটি পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণভাবে নির্মূল হয়েছে। এটি সম্ভব হয়েছে  জেনার সাহেবের আবিষ্কৃত প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ করে।

১৭৯৮ সালে জেনার একটি বই প্রকাশ করেন বইটির নাম ছিল ‘এন এনকোয়ারি ইন্টু দ্য কজেস এন্ড এফেক্টস অফ দ্য ভ্যারিওলা ভ্যাকসিন’ (‘An enquiry into the  causes and effects of the variolae vaccine’) ভ্যাকসিন আবিষ্কারের সময় তাঁর ক্রমাগত গবেষণার ফলে নিয়মিত চিকিৎসাদান সম্ভব হচ্ছিল না। ১৮০২ সালে পার্লামেন্টের তরফ থেকে দশ হাজার পাউন্ড তাঁকে দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীকালে ১৮০৬ সালে আরো কুড়ি হাজার পাউন্ড দেওয়া হয়েছিল তাঁর গবেষণা চালিয়ে যাওয়ার জন্য। ১৮০২ সালে তিনি আমেরিকান অ্যাক্যাডেমি অফ আর্টস অ্যান্ড সায়েন্সেস (American academy of arts and sciences) এবং রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস (Royal Swedish academy of sciences) এর সম্মানজনক বিদেশি সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন। ১৮০৩ সালে তিনি জেনারিয়ান  সোসাইটির (Jennerian society) সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। এই সোসাইটির উদ্দেশ্য ছিল  গুটিবসন্তের টিকা সবার কাছে পৌঁছে দেওয়া। ১৮০৮ সালে সরকারি সাহায্য নিয়ে প্রতিষ্ঠা করা হয় ন্যাশনাল ভ্যাকসিন স্টাবলিশমেন্ট। কিন্তু মতবিরোধের কারণে পরে তিনি পরিচালক পদ থেকে সরে দাঁড়ান। পরবর্তীকালে তিনি ন্যাচারাল হিস্ট্রির ওপর তাঁর গবেষণা চালিয়ে যান। এর ফলস্বরূপ ১৮২৩ সালে তিনি তাঁর ‘অবজারভেশন অন্ দ্য মাইগ্রেশন অফ বার্ড’ গবেষণাপত্রটি রয়্যাল সোসাইটিতে পেশ করেন।এডওয়ার্ড জেনারকে রোগ প্রতিরোধ বিদ্যার জনক বলা হয়। ১৮২১ সালে জেনার রাজা চতুর্থ জর্জের প্রধান চিকিৎসক হিসেবে নিযুক্ত হন। এছাড়াও এই সময়ে তিনি বার্কলের মেয়র ও ‘জাস্টিস অফ দি পিস’ (justice of the the peace)এর পদেও নিযুক্ত হন। ২০০২ সালে বিবিসি এডওয়ার্ড জেনারকে ১০০  গ্রেটেস্ট ব্রিটেনস (‘100 greatest Britons’) এর তালিকায় স্থান দেয়।

১৮২৩ সালে ২৫শে জানুয়ারি এডওয়ার্ড জেনার সন্ন্যাস রোগে আক্রান্ত হন এবং তাঁর শরীরের ডান দিক সম্পূর্ণ পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে যায়। এই অবস্থার আর উন্নতি ঘটেনি। অবশেষে নিজের জন্মস্থানেই ১৮২৩ সালের ২৬ জানুয়ারি তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৩ বছর।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।