কালবোশেখির ঝড়, সাইক্লোন, টর্নেডো, টাইফুন ইত্যাদি বিপজ্জনক ঝড় তথা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কথা তো আমরা সকলেই জানি। কিন্তু এই পৃথিবীর আকাশে মাটি থেকে অনেক অনেক উপরেও মানুষের অজান্তেই নানা সময় বিধ্বংসী ঝড় দেখা দেয়। সূর্যের মধ্যেও অহরহ সৌর ঝড় চলে একথা বিজ্ঞানীরা আমাদের জানিয়েছেন। কিন্তু জানেন কী পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের ম্যাগনেটোস্ফিয়ার স্তরেও এমন ভয়ানক ঝড় দেখা যায় মাঝে মধ্যেই। আর সেই ঝড়কেই বিজ্ঞানীরা নাম দিয়েছেন জিও-ম্যাগনেটিক স্টর্ম বা ভূ-চৌম্বকীয় ঝড় (Geo-Magnetic Storm)। এই ঝড়ের বীভৎসতা এত বেশি যে এর ফলে সমস্ত প্রকার উপগ্রহ, বৈদ্যুতিন যোগাযোগ, টেলিগ্রাফ ও টেলিফোন সংযোগ ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। তাহলে চলুন বিশদে জেনে নেওয়া যাক জিও-ম্যাগনেটিক স্টর্ম সম্পর্কে।
পৃথিবীর চারপাশের শূন্য পরিবেশে সৌরবায়ুর থেকে বিশাল পরিমাণ শক্তির আদান-প্রদানের ফলে পৃথিবীর চৌম্বকমণ্ডলে (Magnetosphere) একপ্রকার বিঘ্ন দেখা দেয়। সৌরবায়ুর তারতম্যের ফলে পৃথিবীর চৌম্বকমণ্ডলে স্রোত, প্লাজমা এবং চৌম্বকীয় ক্ষেত্রের ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে যায় আর একেই বিজ্ঞানের পরিভাষায় ‘জিও-ম্যাগনেটিক স্টর্ম’ বা ভূ-চৌম্বকীয় ঝড় বলা হয়। সাধারণভাবে পৃথিবীর এই চৌম্বকমণ্ডল সূর্যের থেকে ছিটকে আসা বিভিন্ন ধরনের কণার হাত থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করে। যখন করোনাল মাস ইজেকশন (Coronal Mass Ejection) বা একটি অতি দ্রুতগতির তরঙ্গ সূর্য থেকে পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসে, তা প্রথমে এসে ধাক্কা মারে পৃথিবীর এই চৌম্বকক্ষেত্রে। যদি আগত সৌর চৌম্বকক্ষেত্রটি দক্ষিণমুখী হয়, তাহলে তা পৃথিবীর স্বাভাবিক উত্তরমুখী চৌম্বকক্ষেত্রের সঙ্গে ব্যাপকভাবে সংঘর্ষ বাধায়। এর ফলেই চৌম্বকমণ্ডলে যে পরিবর্তন ঘটে তার দরুন সৌরবায়ুর কণা পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্র বরাবর নিচে নামতে থাকে এবং মেরুপ্রদেশের কাছে এসে তা বায়ুমণ্ডলকে আঘাত করে। সৌরবায়ুর তারতম্যের প্রভাবেই পৃথিবীতে ভূ-চৌম্বকীয় ঝড় দেখা দেয়। এই ঝড় কয়েক ঘন্টা থেকে কয়েক দিন পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
জিও-ম্যাগনেটিক স্টর্মের কারণে ভূপৃষ্ঠে ক্রিয়াশীল পৃথিবীর চৌম্বকীয় ক্ষেত্রের শক্তি অনেকাংশে কমে যেতে পারে, এই অবনমন বা শক্তিক্ষয় ৬ থেকে ১২ ঘন্টা পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে যা কয়েক দিন পরে পুনরায় আগের অবস্থায় ফিরে আসে। এখন প্রশ্ন হল এই করোনাল মাস ইজেকশন কী? সূর্যের সৌরমুকুটের (Corona) থেকে নির্গত ব্যাপক পরিমাণ প্লাজমা এবং চৌম্বকক্ষেত্রের বহিঃক্ষরণকে সংক্ষেপে সিএমআই (CMI) বা করোনাল মাস ইজেকশন বলে। সূর্যের অভ্যন্তরে থাকা উচ্চমাত্রার আয়নিত গ্যাসকে প্লাজমা (Plasma) বলা হয় আর সূর্যের একেবারে বহিস্তরটিকে (Outermost Part) সৌরমুকুট বা ‘করোনা’ বলা হয়। সূর্যের এই বহিস্তরটি শক্তিশালী চৌম্বকক্ষেত্র দ্বারা গঠিত। যদি এই সব চৌম্বকক্ষেত্রগুলি বন্ধ হয়ে যায়, সৌরমণ্ডল থেকে তাৎক্ষণিক বিশাল বুদবুদের মত গ্যাস ও চৌম্বকক্ষেত্র নির্গত হতে শুরু করবে যা একত্রে তৈরি করে ‘করোনাল মাস ইজেকশান’। বিজ্ঞানীরা পরিসংখ্যান দিয়ে জানাচ্ছেন যে একটি বিশালাকায় সিএমই তার মধ্যে দশ লক্ষ টন ভরের পদার্থ (matter) ধারণ করতে পারে। এছাড়া এই সিএমই-র গতিবেগ ন্যূনতম ২৫০ কিমি. প্রতি সেকেন্ড থেকে শুরু করে ৩০০০ কিমি. প্রতি সেকেন্ড পর্যন্ত হতে পারে।
১৯৩১ সালে সিডনি চ্যাপম্যান (Sydney Chapman) এবং ভিন্সেঞ্জো সি এ ফেরারো (Vincenzo C. A. Ferraro) প্রথম ‘এ নিউ থিওরি অফ ম্যাগনেটিক স্টর্মস’ বইতে এই জিও-ম্যাগনেটিক স্টর্ম সম্পর্কে বিশদে আলোচনা করেন। তাঁরা সেখানে বলেন যে সূর্য থেকে সৌর-রশ্মি নির্গমনের সঙ্গে সঙ্গেই একপ্রকার প্লাজমা মেঘ নিঃসৃত হয় যাকে বর্তমানে ‘করোনাল মাস ইজেকশন’ বলে। তাঁদের মতে এই প্লাজমা পৃথিবীতে আসতে প্রায় ১১৩ দিন সময় লাগতো, কিন্তু বর্তমানে বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন যে এই প্লাজমা পৃথিবীতে আসতে মাত্র ১-৫ দিন সময় লাগে। তাঁদের এই গবেষণাকে আদর্শ মেনে পরবর্তীকালে ক্রিস্টিয়ান বার্কল্যান্ড নামে আরেক বিজ্ঞানী ক্যাথোড রশ্মি মোক্ষণ নলের (Cathode Ray Tube) সাহায্যে ভূ-চৌম্বকীয় ঝড়ের প্রমাণ আবিষ্কার করেন। তিনি এও বলেন যে এই ঝড়ের মতই একপ্রকার সদৃশ ঘটনার দরুন মেরুপ্রদেশে মেরুজ্যোতি (auroras) দেখা যায়।
একটি জিও-ম্যাগনেটিক ঝড়ের বিশ্লেষণ করার জন্য বিজ্ঞানীরা ব্যবহার করেন বিঘ্ন-ঝড় সময় সূচক (Disturbance-Storm Time Index) যাকে সংক্ষেপে ডিএসটি ইনডেক্সও (Dst Index) বলা হয়। বিজ্ঞানীরা বলছেন যে কোনও জিও-ম্যাগনেটিক স্টর্মের তিনটি দশা থাকে – প্রাথমিক (Initial), প্রধান (Main) এবং আরোগ্য দশা (Recovery)। এই দশাগুলির পরিমাপ করা হয় ন্যানো টেসলা (Nano-Tesla) এককে। যেমন – প্রাথমিক দশায় ডিএসটি ২০ ন্যানো টেসলা থেকে ৫০ ন্যানো টেসলা পর্যন্ত বাড়তে পারে। প্রধান দশায় এর মান -৫০ ন্যানো টেসলার থেকেও কমতে থাকে। আর ঝড়ের সূত্রপাত হলে ডিএসটি সূচকে এর মান ন্যূনতম -৫০ থেকে -৬০০ ন্যানো টেসলা পর্যন্ত হতে পারে বলে মনে করেন বিজ্ঞানীরা। এই প্রধান দশার সময়কাল মূলত ২-৮ ঘন্টা পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। এই জিও-ম্যাগনেটিক স্টর্ম বা ভূ-চৌম্বকীয় ঝড়ের তীব্রতা মাপার জন্য তিন ধরনের পদ্ধতি আছে – কে সূচক (K-index), এ সূচক (A-index) এবং জি-স্কেল (G-Scale)। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় সামুদ্রিক ও বায়ুমণ্ডলীয় প্রশাসন (National Oceanic and Atmospheric Administration) এই জি-স্কেল পদ্ধতি নির্ধারণ করেছে যেখানে সবথেকে কম শক্তিশালী ঝড়কে জি-১ (G-1) স্তরের ঝড় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক সমীক্ষাকেন্দ্র (U.S Geological Survey) জানিয়েছে যে এই ভূ-চৌম্বকীয় ঝড় বা জিও-ম্যাগনেটিক স্টর্ম দূরবর্তী বেতার যোগাযোগ ব্যবস্থা, জিপিএস (Global Positioning System) নির্ভর যন্ত্রাদির প্রভূত ক্ষতি করে। এছাড়া উপগ্রহের ক্ষতিও হতে পারে এই ঝড়ের কারণে, ঝড় চলাকালীন মহাকাশচারী এবং অধিক-উচ্চতায় থাকা বিমানচালকেরা তীব্র মাত্রার তেজস্ক্রিয়তার সম্মুখীন হতে পারেন। ভূ-চৌম্বকীয় ঝড়ের কারণে পৃথিবীতে নানা জায়গায় বৈদ্যুতিন সংযোগে সমস্যা হতে পারে, ভোল্টেজের দ্রুত হ্রাস-বৃদ্ধিজনিত কারণে বৈদ্যুতিন যন্ত্রাদির ব্যাপক ক্ষতি হতে পারে।
১৮৫৯ সালে জানা যায় এমনই এক ভূ-চৌম্বকীয় ঝড়ের প্রভাবে পৃথিবীর টেলিগ্রাম পরিষেবা চূড়ান্তভাবে বিঘ্নিত হয়েছিল এবং টেলিগ্রাম পরিচালকেরা বৈদ্যুতিন শক পেয়েছিলেন। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন প্রতি ১১ বছর অন্তর নতুন সৌরচক্র (Solar Cycle) শুরু হওয়ার কারণেই মূলত এই জিও-ম্যাগনেটিক স্টর্ম দেখা যায়। বিশেষভাবে বলতে হলে, সৌর-সর্বনিম্নের (Solar Minimum) কারণেই পৃথিবীর চৌম্বকমণ্ডলে তাৎক্ষণিক আলোড়ন তৈরি হয় যা জিও-ম্যাগনেটিক স্টর্ম হিসেবে পরিচিত। সৌরচক্রের এই প্রাকৃতিক ঘটনায় সৌর সর্বনিম্ন বা সোলার মিনিমাম এবং সৌর-সর্বোচ্চ বা সোলার ম্যাক্সিমাম এই দুইটি বিষয় পৃথিবীর উপরেও বিরাট প্রভাব ফেলে এবং একইসঙ্গে ভূ-চৌম্বকীয় ঝড়ের মতই সৌরচক্রও মহাজাগতিক বায়ুমণ্ডল, উপগ্রহের আচরণ ইত্যাদির উপর প্রভাব বিস্তার করে থাকে।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান