ইতিহাস

জর্জ স্টিফেনসন

জর্জ স্টিফেনসন (George Stephenson) ছিলেন একজন ব্রিটিশ মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার যাঁর হাত ধরেই প্রথম ‘স্টিম লোকমোটিভ’ বা রেল ইঞ্জিন আবিষ্কার হয়। এছাড়াও তিনিই বিশ্বে প্রথম ইন্টারসিটি রেলওয়ে লাইন তৈরি করেন। জর্জ স্টিফেনসনকে তাই ‘ফাদার অফ রেলওয়ে’ (Father of Railway) বলা হয়ে থাকে।

১৭৮১ সালের ৯ জুন ইংল্যান্ডের নরদাম্বারল্যান্ডের (Northumberland) ওয়াইলাম-এ (Wylam) জর্জ স্টিফেনসনের জন্ম হয়। আঠারো শতকে এই পাড়াটি ছিল নিউক্যাসেলের সবথেকে দরিদ্র কয়লাখনি শ্রমিকদের পাড়া। এ পাড়ার সবথেকে দরিদ্র দম্পতি ছিল রবার্ট এবং মাবেল স্টিফেনসন। তাঁরা ছিলেন নিরক্ষর।স্টিফেনসন দম্পতির দ্বিতীয় সন্তান জর্জ স্টিফেনসন। তাঁর বাবা উইলাম কয়লাখনির পাম্পিং ইঞ্জিনের ফায়ারম্যান ছিলেন। বাবার স্বল্প আয়ের কারণে জর্জের স্কুলে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় টাকা তাঁদের কাছে ছিল না। তাঁদের পরিবারের বেশির ভাগ দিন কাটত আধ পেটা খেয়ে, কখনও বা না খেয়ে। অথচ জর্জ স্টিফেনসনকে দেখে তা বোঝার উপায় ছিল না। তাঁর বাবা-মা এবং ভাই, সকলেই অপুষ্টির শিকার ছিল। কিন্তু স্টিফেনসন  বলিষ্ঠ, সুঠাম ছিলেন।

অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে স্টিফেনসন আট বছর বয়সে জীবিকার খোঁজে নেমে পড়েন। প্রথম দিকে তিনি ভেড়া চড়ানো এবং ক্ষেতে খামারে কাজ করতেন।  মাত্র দশ বছর বয়সে স্টিফেনসন কয়লাখনিতে কাজ শুরু করেন। খনি থেকে উত্তোলিত কয়লাভর্তি গাড়ি ট্রাম রাস্তা অবধি চালিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয় তাঁকে। ঘোড়ায় টানা এই গাড়ির চালক হিসেবে স্টিফেনসনের দক্ষতা দেখে সকলে চমৎকৃত হয়। স্টিফেনসন যখন ১৫ বছরের কিশোর, তখনই তাঁর চেহারা ছিল রীতিমতো সমীহ করার মতো। তিনি খনির লিফটে কাজ করতেন। ১৭ বছর বয়সে ইঞ্জিনম্যান হিসেবে চাকরি পান স্টিফেনসন। অতিরিক্ত অর্থ আয় করার জন্য ইঞ্জিনম্যানের কাজের বাইরেও টুকটাক কাজ করতেন। এই সময় তিনি একটি নৈশ স্কুলে ভর্তি হন। এক বছরের মাথায় নিজের প্রখর মেধার কারণে পড়তে, লিখতে এবং অঙ্ক করতে শিখে গেলেন। তিনি ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত নিরক্ষর ছিলেন। ১৮০২ সালে ১৯ বছর বয়সে স্টিফেনসন বিয়ে করেন ফ্রান্সেস হেন্ডারসনকে। পরবর্তী দুই বছরের মধ্যে দুই সন্তান রবার্ট এবং ফ্রান্সেসের জন্ম হয়। সংসারের ব্যয় নির্বাহের জন্য স্টিফেনসন  অবসর সময়ে জুতো সেলাই, ঘড়ি মেরামত করা, কাপড় সেলাইয়ের কাজ করে অতিরিক্ত আয় করতে থাকেন। শিশুকন্যা ফ্রান্সেস জন্মের তিন সপ্তাহ বাদে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। কিছুদিন পর ১৮০৬ সালে স্ত্রী ফ্রান্সেসও মারা যান।

স্টিফেনসন বাড়তি আয়ের উদ্দেশ্যে স্কটল্যান্ডে চলে যান। সেখানে যন্ত্রপাতি পরিচালনা এবং মেরামত করার কাজ শিখছিলেন তিনি। ১৮১৩ সালে এক দুর্ঘটনায় তাঁর বাবা রবার্ট অন্ধ হয়ে গেলে তিনি আবার দেশে ফিরে আসেন। ঐ দুর্ঘটনায় খনির একটি প্রধান যন্ত্রও বিকল হয়ে পড়ে। স্টিফেনসন সেটি সচল করতে সক্ষম হন। ফলে খনিতেই ইঞ্জিন রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পেয়ে যান। আর তখন থেকেই শুরু হয় তাঁর ভাগ্য পরিবর্তন। যাতে কয়লা পরিবহন সহজ হয়, সেজন্য স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা তৈরি করার নিরন্তর প্রচেষ্টা শুরু করেন তিনি।

১৮১৪ সালে তাঁর প্রচেষ্টা প্রথম সাফল্য লাভ করে। কয়লা বহনের ট্রাম এবং বাষ্প ইঞ্জিন সংযুক্ত করে বিশেষ ইঞ্জিনিয়ারিং দক্ষতায় তিনি তৈরি করলেন পৃথিবীর প্রথম বাণিজ্যিক ট্রেন। সে সময়কার প্রচলিত বাষ্প ইঞ্জিনের থেকে অনেক বেশ দ্রুতগতির এই রেলইঞ্জিনের নাম দেন ‘ব্লুচার’ (blucher)। প্রুশিয়ান সেনাপতি ব্লুচার, ‘ওয়াটারলু’র যুদ্ধে ঝড়ের বেগে নিজের সৈন্যদের নিয়ে প্রবেশ করেছিলেন, যা নেপোলিয়নকে পরাজিত করতে সহায়তা করেছিল। তাই ব্লুচারের সম্মানেই এই ট্রেনের নামকরণ করা হয়। ব্লুচারের সর্বোচ্চ গতি ছিল ঘন্টায় ৪ মাইল, যা ঘোড়ায় টানা গাড়ির তুলনায় অনেক কম। কিন্তু আট চাকার এই রেল ইঞ্জিন একসঙ্গে ৩০ টন কয়লা বহনে সক্ষম ছিল। ফলে ঘোড়ায় টানা গাড়ি ব্যবহারের ইতি ঘটে। এই কয়লা টানার ট্রেন তৈরির পর স্টিফেনসন খনির শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ ল্যাম্প তৈরির কাজ শুরু করেন। খনির ভেতরে সাধারণত নানাপ্রকার দাহ্য গ্যাস নির্গত হয়। ফলে, এই দাহ্য গ্যাস শ্রমিকদের ব্যবহার করা উন্মুক্ত শিখা বিশিষ্ট ল্যাম্পের আগুনের সংস্পর্শে এলে মাঝে মাঝেই বিস্ফোরণ ঘটতো। স্টিফেনসন এমন একটি ল্যাম্প তৈরি করলেন, যার শিখা উন্মুক্ত নয় এবং বিস্ফোরণের ঝুঁকিও নেই।

এদিকে, কিছুদিন আগেই তৎকালীন ব্রিটেনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী হামফ্রে ডেভি একই ধরণের ল্যাম্প প্রস্তুত করেছিলেন। কিন্তু স্টিফেনসন সে কথা জানতেন না। ফলে দুর্ভাগ্যক্রমে সকলে ধরে নেয় যে স্টিফেনসন ডেভির কৌশল চুরি করেছেন। মামলা রজু হল তাঁর বিরুদ্ধে। অনিচ্ছাকৃতভাবে নিজের ‘দোষ’ স্বীকার করে শাস্তির হাত থেকে রক্ষা পেলেন তিনি। ১৮১৯ সালে সান্ডারল্যান্ডে একটি ৮ মাইল দীর্ঘ রেলওয়ে স্থাপন করেন স্টিফেনসন। একে বলা হয় পৃথিবীর প্রথম সম্পূর্ণ মেশিননির্ভর রেলওয়ে। এক্ষেত্রে রেললাইন নির্মাণে প্রথম ঢালাই লোহা ব্যবহার করা হয়েছিল। স্টিফেনসন এটিকে নিজের নামে পেটেন্ট করিয়ে নিলেন। পরের বছর তিনি প্রধান টেকনিশিয়ান হিসেবে স্টকটন-ডার্লিংটন রেলওয়ে (Stockton and Darlington railway) নির্মাণের কাজ পান। এই রেলওয়েই হল পৃথিবীর প্রথম পাবলিক রেলওয়ে। ১৮২৫ সালে এটি চালু হয়, যা স্টিফেনসন নিজে কিছুদিন চালান।

ইতিমধ্যে তিনি ইংল্যান্ডের এক মস্ত ধনী হিসেবে পরিচিত হয়েছেন। ছেলে রবার্টকে নিয়ে চালু করলেন নিজের রেলওয়ে ইঞ্জিন তৈরির কোম্পানি ‘লোকোমোশন’ (Locomotion)। তাঁর কোম্পানিটিই ছিল পৃথিবীর প্রথম রেলওয়ে নির্মাণ কোম্পানি।উত্তর ইংল্যান্ডে যখন স্টিফেনসনের রেলওয়ে কোম্পানি লোকোমোশনের জয়জয়কার, দক্ষিণে তখন অন্য একজন রেলওয়ে নির্মাণ শুরু করে দিয়েছেন। তাঁর নাম ব্রুনেল। কয়েক বছরের মধ্যে ব্রুনেল আর স্টিফেনসনের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হয়ে রায়। উত্তরে স্টিফেনসনের  একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল, কিন্তু দক্ষিণে ব্রুনেল নিজের আধিপত্য বিস্তার করতে পারছিলেন না স্টিফেনসনের জন্য। মূলত রেললাইনের মাপ নিয়ে তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হয়। লাইনের দুই পাতের মধ্যকার দূরত্ব কতটুকু হবে, তাই নিয়ে বেশ ক’বছর চললো দ্বন্দ্ব। শেষ পর্যন্ত স্টিফেনসনের মাপটাই স্বীকৃতি পায়। আর ব্রিটিশ সরকার তাঁকে লিভারপুল (Liverpool) থেকে ম্যানচেস্টার (Manchester) পর্যন্ত দীর্ঘ রেলওয়ে নির্মাণের কাজ দেয়। ১৮২৯ সালে ইংল্যান্ডে একটি রেল প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করা হয়। বিভিন্ন কোম্পানির মোট ১০টি রেল ইঞ্জিন সে প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। প্রতিযোগিতায় জিততে ইঞ্জিনটিকে ছয় টন ভার বহন করে ছুটে যেতে হত। ইংল্যান্ড ছাড়াও ইউরোপের অনেক দেশ এবং আমেরিকা থেকে আগত হাজারো মানুষকে বিস্মিত করে, স্টিফেনসনের নতুন সৃষ্টি ‘রকেট’ (তাঁর নতুন রেল ইঞ্জিনটির নাম) ছুটলো ঘন্টায় ৩৬ মাইল বেগে। তখনকার প্রেক্ষাপটে এই গতিবেগ ছিল অত্যন্ত দ্রুত। তাই এই প্রতিযোগিতায় জয়লাভ করে পুরো ইংল্যান্ড জুড়ে তারকা খ্যাতি লাভ করেন স্টিফেনসন।

তাঁর এই সাফল্যের ফলে আমেরিকাও তাঁকে কাজের জন্য আমন্ত্রণ জানায়। কিন্তু স্টিফেনসন ইংল্যান্ডেই কাজ করতে থাকেন। তিনি প্রচুর অর্থ আয় করতে লাগলেন। তিনি রেলওয়ের জন্য খোঁড়াখুঁড়ি করতে গিয়ে আবিষ্কার করেন ৩টি কয়লা খনি। এই খনিগুলো থেকে কয়লা উত্তোলন করে প্রভূত অর্থ সম্পদের অধিকারী হন তিনি। নিজের রাজকীয় প্রাসাদ তৈরি করেন। 

তিনি ছিলেন ১৮৪৭ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘ইনস্টিটিউশন অফ মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার’ (Institution of Mechanical Engineers) এর প্রথম প্রেসিডেন্ট। তাঁর জন্মস্থান, ওয়েস্ট মুরের কটেজ পরবর্তীকালে মিউজিয়ামে পরিণত হয়। এছাড়াও ডারবিশায়ারে (Derbyshire) চেষ্টারফিল্ডে (Chesterfield) চেষ্টারফিল্ড মিউজিয়ামে তাঁর স্মৃতিতে একটি গ্যালারি রয়েছে। তাঁর নামাঙ্কিত একটি কলেজ ও স্কুল রয়েছে। চেষ্টারফিল্ড রেলওয়ে স্টেশনে তাঁর একটি ব্রোঞ্জ মূর্তি স্থাপিত হয়েছে। ১৯৯০ সাল থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত ‘ব্যাঙ্ক অফ ইংল্যান্ড’ (Bank of England) – এর  E -‌ সিরিজের ৫ পাউন্ডের নোটে তাঁর প্রতিকৃতি অঙ্কিত ছিল।

তিনি ১৮৩৫ সালে দ্বিতীয়বার বিয়ে করেছিলেন। কিন্তু ১৮৪৫ সালে তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী কোনো সন্তান না রেখেই মারা যান। সে বছরই আবার বিয়ে করেন স্টিফেনসন।

১৮৪৮ সালের ১২ আগস্ট তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৮‌ বছর।  ডার্বিশায়ারের চেস্টারফিল্ডে তাঁকে সমাহিত করা হয়। 

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।