সববাংলায়

জিঙ্গা স্টাইল : ব্রাজিলীয় ফুটবলের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ

জিঙ্গা হল ব্রাজিলীয় সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা ফুটবলের এক গুরুত্বপূর্ণ শৈলী হয়ে উঠেছে। জিঙ্গা বা Ginga শব্দের আক্ষরিক অর্থ Sway, যা ফুটবলে খেলোয়াড়দের অনন্য এবং বিশেষ পদক্ষেপকে নির্দেশ করে। এটি শুধু যে ফুটবলের একটি শৈলী তা নয়, জিঙ্গা একটি শিল্প। এই শিল্পকে প্রভাবিত করে দুইটি উপাদান। প্রথমটি হল “ক্যাপোইরা” নামক একটি মার্শাল আর্ট। এই ক্যাপোইরা আর্টের উদ্ভব হয়েছিল অ্যাঙ্গোলায়, যখন মূলত পর্তুগিজরা আফ্রিকানদের দাস হিসেবে এখানে নিয়ে আসে সেই সময়ই। ক্যাপোইরা’র মধ্যে লাথি মারা, হেডবাটিং, প্রতারণা করা এবং ফাঁকি দেওয়ার মতো দক্ষতা রয়েছে। উক্ত মার্শাল আর্ট বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব অনুষ্ঠানে দেখানো হতো।  বর্তমানে এই আর্টের বিস্তার আরোও অনেক বেশি। এই মার্শাল আর্ট বর্তমানে জনপ্রিয় নাচ অথবা খেলা হিসেবে সমগ্র বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। অপর একটি উপাদান হল সাম্বা নাচের রীতি। সাম্বা নাচ হল একটি একক নাচ, যা পায়ের কেরামতি বা নড়াচড়ার সাথে সাথে শরীর সোজা রেখে দাঁড়িয়ে সঞ্চালিত হয়।  ব্রাজিলীয় সংস্কৃতির এই দুই অন্যতম শক্তিশালী শৈলীর সংমিশ্রণেই উদ্ভব ঘটেছে জিঙ্গা শৈলীর। জিঙ্গা শৈলীটি ব্রাজিলীয় ফুটবলে একটি আন্দোলনের সৃষ্টি করেছে। ইহা ফুটবল খেলার একটি প্রভাবশালী নীতি এবং আক্রমণ – মনস্ক খেলায় ফোকাস করে।

উপরিউক্ত মতবাদ ছাড়াও জিঙ্গার উৎপত্তি বিষয়ে আরোও একটি তত্ত্ব বেশ প্রচলিত রয়েছে। তা হল – ব্রাজিল ছিল পর্তুগিজদের উপনিবেশ। পর্তুগিজরা আফ্রিকানদের দাস হিসেবে নিয়ে এসেছিল ব্রাজিলে। কিন্তু বেশিরভাগ আফ্রিকান দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ হতে চায়নি। সময় এবং সুযোগ বুঝে তারা পালিয়ে গিয়েছিল জঙ্গলে। ধীরে ধীরে জঙ্গলেই তারা বসতি গড়ে তুলেছিলে। আর এই জঙ্গলেই প্রথমবারের জন্য “জিঙ্গা” মার্শাল আর্টটির উদ্ভব ঘটে। মূলত পর্তুগিজদের হাত থেকে এবং বন্য জন্তুজানোয়ার দের হাত থেকে জীবন রক্ষার্থে তারা জিঙ্গা নামক যুদ্ধ শৈলীর ব্যবহার শুরু করে। ধীরে ধীরে নিজেদের মধ্যে তা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। পরবর্তীতে দাসত্ব প্রথার অবসান হলে তারা জঙ্গল ত্যাগ করে স্বাভাবিক সামাজিক জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। কিন্তু ব্রাজিলীয় আইন অনুযায়ী, তাদের সেই জিঙ্গা মার্শাল আর্ট  প্রদর্শন নিষিদ্ধ থাকায় তারা ধীরে ধীরে ফুটবলের শৈলীতে এর প্রচলন শুরু করে।

জিঙ্গা’র প্রয়োগের কিছু সাধারণ পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে জাগলিং, ড্রিবলিং এবং পায়ের সমস্ত অংশে বলকে নিয়ন্ত্রণ করা। এটি এমন এক অনন্য ধরনের শৈলী যেখানে উরু অথবা পায়ের পেছনের অংশ ব্যবহার করে বল এক খেলোয়াড় অন্য খেলোয়াড়কে পাস করে। এই শৈলী প্রথমদিকে ব্রাজিলে খুব জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং পরবর্তীতে ব্রাজিলীয় সংস্কৃতিতে মিশে যায়।

বিশ্বব্যাপী সর্বাধিক জনপ্রিয় খেলাগুলোর মধ্যে অন্যতম হল ফুটবল। আর এই ফুটবলের অন্যতম পীঠস্থান হলো দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ব্রাজিল। জনপ্রিয় খেলা ফুটবল ব্রাজিলের মানুষের আত্মার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে পড়েছে সেই সূচনা কাল থেকেই। ফুটবল সমগ্র বিশ্বে ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় হলেও এর খেলার ধরণ অথবা নিয়মকানুনে কোনোরূপ পরিবর্তন হলে তা এখনও সমালোচিত হয়। সবাই এই খেলার প্রাচীন রীতিনীতি এবং আদব কায়দা তথা প্রাচীনপন্থী ঐতিহ্য রক্ষা করে ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে এগিয়ে দিতে চায়। কিন্তু বিবর্তনের মতো নতুনত্ব বিভিন্ন ভাবে প্রবেশ করে ফুটবলের শৈলীতেও। তারই একটি গুরুত্বপূর্ণ নতুনত্ব হলো জিঙ্গা।

জিঙ্গা ব্রাজিলীয় ফুটবলের স্তম্ভ। ব্রাজিলের জাতীয় ফুটবল দল পাঁচবার ফুটবল বিশ্বকাপ জয় করেছে। তাদের এই জয়ে জিঙ্গা শৈলীর অবদান গুরুত্বপূর্ণ। জিঙ্গা শৈলী দক্ষিণ আমেরিকা, বিশেষ করে ব্রাজিলের রাস্তায় খুব আইকনিক। এটি স্ট্রিট ফুটবল বা ফুটসাল ব্রাজিলিয়ানদের জন্য অবিশ্বাস্যভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ব্রাজিলের বেশিরভাগ সেরা ফুটবলাররা ছোটবেলায় স্ট্রিট ফুটবল খেলেছেন। পেলে, রোনালদিনহো, নেইমার, কাকা কে নেই সেই তালিকায়! আন্তর্জাতিক ফুটবলে জিঙ্গাকে বিশেষভাবে জনপ্রিয় করেছেন, এমন কিছু দুর্দান্ত খেলোয়াড় হলেন পেলে এবং গ্যারিঞ্চা।

গ্যারিঞ্চা ছিলেন একজন অসাধারণ দক্ষতাসম্পন্ন সৃজনশীল খেলোয়াড়। তাঁর ড্রিবলিং করার অসাধারণ দক্ষতা ছিল। তিনি ফুটবলের জগতে একজন সেরা ড্রিবলার হিসেবে খ্যাত। জিঙ্গা শৈলীর প্রয়োগে পায়ের কৌশলে তিনি বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সহজেই প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়দের বোকা বানানোয় পটু ছিলেন, তাই তাকে “Joy of the People” ও বলা হয়। আর ব্রাজিলীয় ফুটবলের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড় পেলেও কিন্তু দূর্দান্ত ক্রীড়ানৈপুণ্যের পরিচয় দেন জিঙ্গা শৈলীর সঙ্গে ইউরোপীয় ফুটবল শৈলীর চমকপ্রদ মিশ্রণ ঘটিয়ে। তিনিও একজন দক্ষ ড্রিবলার ছিলেন। জয় বা পরাজয় নির্বিশেষে সুন্দর এবং মার্জিত খেলায় বিশ্বাসী ছিলেন তিনি। এই দুই মহান ফুটবল তারকা ছাড়াও সাম্প্রতিক ফুটবলার যেমন নেইমার, রোনালদিনহো, লুকাস মৌরা, অস্কার, পাওলো, হেনরিক গানসো প্রমুখরাও প্রতিনিয়ত জিঙ্গা শৈলী অনুশীলন করে চলেছেন। গত কয়েক দশকে ফুটবল হয়তো অনেক বিকশিত হয়েছে কিন্তু জিঙ্গা এখনও ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের প্রাণকেন্দ্রে রয়েছে।

যদিও প্রথমদিকে যখন জিঙ্গা শৈলীর প্রবেশ ঘটে ব্রাজিলীয় ফুটবলে তখন কিন্তু বিশ্বব্যাপী যথেষ্ট সমালোচনায় পড়তে হয় ব্রাজিলীয় ফুটবল দলকে। ১৯৫০ সালে ব্রাজিল যখন বিশ্বকাপ ফুটবলের আয়োজন করে তখন ইউরোপীয় ফুটবল শৈলীর সঙ্গে পার্থক্যের কারনে ব্রাজিলীয় ফুটবল দলকে প্রচুর সমালোচনার সম্মুখীন হতে হয়। তখন ব্রাজিলীয় ফুটবল দলের কোচ ইউরোপীয় ঐতিহ্যবাহী শৈলীকেই গ্ৰহণ করতে বাধ্য হয়। যদিও এটা ব্রাজিলীয় ফুটবলারদের পছন্দ হয়নি। মাঠে যদি কোনো খেলোয়াড় জিঙ্গার ব্যবহার করে সঙ্গে সঙ্গে তাকে অন্য কাউকে বল পাস করে দিতে হবে এমন নিয়মও কোচ চালু করে। কারন তখন আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে টিকে থাকতে গেলে এটাই ছিল একমাত্র উপায়। তথাপিও ফুটবলারগণ এর ব্যবহার করে খেলার মাঠে। ১৯৫০ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে উরুগুয়ের কাছে ব্রাজিলের পরাজয়ের কারন হিসেবে ইউরোপীয় দেশগুলো এই জিঙ্গা শৈলীর ব্যবহারকে দায়ী করেছে। এরপর, ১৯৫৮ এর বিশ্বকাপ ফুটবলে ব্রাজিলের সামনে দুইটি প্রধান বাধা ছিল। প্রথমত, তাদের প্রধান অস্ত্র তথা ব্রাজিলীয় ফুটবলের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শৈলী জিঙ্গা ছাড়াই খেলা। দ্বিতীয়ত, ব্রাজিল ছাড়া এই বছর বিশ্বকাপ ফুটবলে অংশগ্রহণকারী প্রতিটি দেশই শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠীর। এত সমস্যার পরেও ব্রাজিল দল ভালো পারফরম্যান্স করে। তাঁরা এই বছর ফুটবল বিশ্বকাপ জয় করে। এরপর থেকেই ব্রাজিলীয় ফুটবল তথা ব্রাজিলীয় জিঙ্গা শৈলী যে শুধু ইউরোপীয়দের দ্বারা প্রশংসিত হয়েছিল তা নয় বরং গৃহীতও হয়েছিল বটে।

বর্তমান ফুটবলে এই শৈলীর ব্যবহার বেশি লক্ষ্য করা যায়না বটে, কিন্তু আজও এই শৈলী ব্রাজিলীয় সংস্কৃতি থেকে একেবারে মুছে যায়নি।  তারা বিশ্ববাসীকে শিখিয়েছে এক নতুন ধরণে, এক নতুন নৈপুণ্যে ফুটবল খেলার। আর এভাবেই একটি প্রাচীন আত্মরক্ষামূলক মার্শাল আর্ট স্মরণীয় ভাবে বিশ্ব ফুটবলের দিশা এবং ঐতিহ্য বদলে দিয়েছে।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading