দেবী মহামায়ার দশমহাবিদ্যা রূপের প্রথম রূপটিই দেবী কালী । তিনি শক্তি-উপাসনার প্রধান আরাধ্য দেবী। তাঁর মূর্তিতে আমরা দেখি শিবের বুকের উপর পা দিয়ে দেবী কালী দাঁড়িয়ে আছেন, তাঁর চার হাতের একটি হাতে উদ্যত খড়্গ আর অপর একটি হাতে কাটা নরমুণ্ড ঝুলছে। বাকি দুটি হাতে তিনি আশীর্বাদ দিচ্ছেন এবং বরাভয় প্রদান করছেন। দেবী কালীর বাহন শিয়াল দেবীর হাতে ধরা নরমুণ্ডটি থেকে রক্ত পান করছে। দেবীর রক্তমাখা জিভ বেরিয়ে এসেছে বাইরের দিকে, যেন তিনি এই জগত সংসার সংহার করে আকণ্ঠ রক্ত পান করবেন। দেবীর গলায় নরমুণ্ডের মালাও দেখা যায়। এমন ভয়াল ভয়ংকরী দেবীর মূর্তিই সাধারণভাবে বিভিন্ন তন্ত্রশাস্ত্রে কল্পনা করা হয়েছে। শাক্তরা কালীকে মনে করেন ‘করালবদনী’। কিন্তু তাই বলে সর্বত্র কালীর এমন রূপ দেখা যায় না। দেবী মহামায়ার দশমহাবিদ্যায় যেমন দশটি পৃথক রূপে দেবী আবির্ভূতা হন, ঠিক তেমনই দেবী কালী কোথাও অষ্টরূপী, আবার কোথাও নবরূপে তিনি ধরা দেন। কোথাও শান্ত, সমাহিত মূর্তি, আবার কোথাও তিনি উগ্রচণ্ডা। কালীর একেক রূপের মাহাত্ম্য এবং মূর্তির গঠন একেক রকম।
স্বয়ং দেবী দুর্গারই আরেক রূপ হলেন দেবী কালী । মনে করা হয় ‘কালী’ নামের উৎপত্তি হয়েছে ‘কাল’ থেকে যার অর্থ সময় বা মৃত্যু। আবার অনেকে কালীর গায়ের কালো রঙের কারণেই এরূপ নামকরণ হয়েছে বলে মনে করেন। বহুকাল ধরে বাংলার বুকে কৃষবর্ণা দেবী কালীর পূজা হয়ে আসছে। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন স্থানে যে সব কালীমন্দির গড়ে উঠেছে, সেখানেও একেক নামে কালীকে ডাকা হয়। কোথাও তিনি ব্রহ্মময়ী, কোথাও ভবতারিণী; কোথাও তিনি করুণাময়ী, আবার কোথাও তারা নামেই তিনি পরিচিতা। খেয়াল করলে দেখা যাবে, তারাপীঠের কালীমূর্তির যে রূপ, দক্ষিণেশ্বরের কালীর রূপ তেমন নয়; কিংবা কালীঘাটের কালীমূর্তির সঙ্গে হালিশহরের রামপ্রসাদী কালী মন্দিরের মূর্তির মিল পাওয়া যায় না। মূর্তি নির্মাণে এই পার্থক্যের মূল কারণ তন্ত্রশাস্ত্রে কালীর রূপ বর্ণনা। ব্রহ্মযামল তন্ত্র এবং তোড়ল তন্ত্র মতে বলা হয়েছে দেবী কালীর আটটি রূপ রয়েছে – দক্ষিণাকালী, শ্মশানকালী, ভদ্রকালী, রক্ষাকালী, গুহ্যকালী, মহাকালী, সিদ্ধকালী এবং চামুণ্ডা। আবার মহাকাল সংহিতায় কালীর আরো কিছু রূপের উল্লেখ পাওয়া যায়। যেমন – কালকালী, কামকলাকালী, ধনদাকালী এবং চণ্ডিকাকালী। তবে সাধারণভাবে তোড়ল তন্ত্রে বর্ণিত আটটি রূপকেই প্রামাণ্য ধরা হয়।
দক্ষিণাকালীকে রামপ্রসাদ ‘শ্যামা মা’ বলে উল্লেখ করেছিলেন তাঁর গানে। ‘কালোরূপে দিগম্বরী’ এই দক্ষিণাকালীর মূর্তিই আমরা বেশিরভাগ জায়গায় দেখে থাকি। দেবী করালবদনী, মুক্তকেশী এবং এই দেবীর গলায় থাকে মুণ্ডমালা, হাতে থাকে নরমুণ্ড। ঘন কালো তাঁর গায়ের রঙ। ত্রিনয়নী দেবীর কোমরে দেখা যায় মানুষের কাটা হাতের তৈরি কটিবন্ধনী। তাঁর ডান হাতে বরাভয় প্রদান করেন তিনি। দক্ষিণাকালীর এই রূপকেই আমরা ‘শ্যামা কালী’ বলে চিনি। মনে করা হয় দক্ষিণ দিকের অধিপতি যম কালীর এই রূপ দেখে ভয় পেয়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন বলেই কালীর এরূপ নামকরণ হয়েছে।
সাধারণ গৃহস্থের ঘরে সেভাবে পূজিতা হন না সিদ্ধকালী। তিনি সালংকারা এবং তাঁর দুটি হাত রয়েছে। তন্ত্র সাধকেরা সিদ্ধকালীর আরাধনা করে থাকেন। তাঁকে অনেকে ব্রহ্মরূপা ভুবনেশ্বরী বলেও কল্পনা করা হয়েছে।
সাধকদের কাছে আরাধ্য দেবী কালীর আরেকটি রূপ হল গুহ্যকালী। দুই হাত বিশিষ্টা দেবীর রক্তাভ জিভ যেন সবকিছুকে গ্রাস করতে চায়। তাঁর গলার মালায় রয়েছে পঞ্চাশটি নরমুণ্ড আর কানে রয়েছে কর্ণাবতংস যা শবদেহ দিয়ে নির্মিত। তাঁর রূপ ভয়ংকর, মাথায় তাঁর জটা, কোমরে খুব ছোট বস্ত্রখণ্ড। তন্ত্রশাস্ত্র অনুযায়ী গুহ্যকালী সর্বদাই শবদেহের মাংস খেতে অভ্যস্ত। মহাকাল সংহিতা অনুসারে কালীর এই গুহ্যকালী রূপটিই প্রধান রূপ।
এরপরে রয়েছে দেবী কালীর মহাকালী রূপ। তন্ত্রসার অনুযায়ী মহাকালীর পাঁচটি মুখ, পনেরোটি চোখ। আবার শ্রীশ্রীচণ্ডীর বর্ণনা অনুযায়ী আদ্যাশক্তির অংশ মহাকালীর দশটি মুখ এবং তিরিশটি চোখ রয়েছে। সাধনার সময় ভক্তকে তিনি প্রচণ্ড ভয় দেখান এবং সাধনার সিদ্ধিলাভের পরে এই মহাকালীই আবার ভক্তকে রূপ, সৌভাগ্য দান করে থাকেন। চণ্ডীতে তাঁর দশটি হাতের উল্লেখও রয়েছে। সেই দশ হাতে আছে দশটি অস্ত্র – খড়্গ, চক্র, গদা, ধনুক, বাণ, শূল, নরমুণ্ড, শঙ্খ ইত্যাদি।
ভদ্রকালী নামটি দেবী দুর্গা ও সরস্বতীর অপর নাম হিসেবে থাকলেও যিনি জীবের অন্তিমকালে তাঁর মঙ্গল করেন তিনিই তন্ত্রমতে ভদ্রকালী নামে পরিচিতা হন। অতসী ফুলের মতো তাঁর গায়ের রঙ, মাথায় তাঁর জটা আর গলায় রয়েছে কণ্ঠহার। কালিকাপুরাণে ভদ্রকালীর কপালে অর্ধচন্দ্রের অবস্থান রয়েছে বলে জানা যায়। আবার তন্ত্রশাস্ত্রে তাঁকে মুক্তকেশী ভীষণদর্শনা বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
কালীর চামুণ্ডা রূপটি অনেকের কাছেই পরিচিত। দেবী মহাশক্তির একটি রূপ চামুণ্ডা। দেবী ভাগবত পুরাণে এবং মার্কণ্ডেয় পুরাণে চামুণ্ডাকে নিয়ে কাহিনী রয়েছে। সেই কাহিনী থেকে জানা যায় চণ্ড ও মুণ্ড নামে দুই অসুরকে বধ করার সময় দেবী দুর্গার কপাল কুঁচকে গিয়েছিল এবং সেখান থেকেই আবির্ভূতা হয়েছিলেন চামুণ্ডা। বাঘের ছাল গায়ে পরে শীর্ণ-রুগ্ন চেহারার চামুণ্ডা তাঁর বিকট দাঁত বের করে ভীতি প্রদর্শন করেন।
শ্মশানে পূজিতা হন শ্মশানকালী। সাধারণভাবে কালীকে শ্মশানচারী বলেই অনেকে মনে করা হয়। শ্মশানকালীর গায়ের রঙ কাজলের মতো ঘোর কালো। ভয়ংকর তাঁর রূপ, মুক্তকেশী দেবীর বাঁ হাতে থাকে পানপাত্র আর ডান হাতে রয়েছে সদ্য কাটা মানুষের মাথা। উন্মত্ত উলঙ্গিনী দেবী শ্মশানকালীর উল্লেখ পাওয়া যায় বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘দেবী চৌধুরানি’ উপন্যাসেও। এই উপন্যাসে ডাকাতরা শ্মশানকালীর পুজো করে নরবলি দিয়ে তারপর ডাকাতি করতে যেতো বলে বর্ণনা করেছেন বঙ্কিমচন্দ্র।
এছাড়াও দেবীর শ্রীকালী রূপ দারুক অসুরকে বধ করেন বলে তন্ত্রমতে জানা যায়। মহাদেব যখন বিষ পান করে নীলকণ্ঠ হন, সেই সময় মহাদেবের শরীরে প্রবেশ করে শ্রীকালীর গায়ের রঙ কালো হয়েছিল বলে অনেকে মনে করেন।
মহানির্বাণ তন্ত্রে আদ্যাকালীর রূপেরও উল্লেখ আছে। তবে এখানেই শেষ নয়। বামা কালী, নিশা কালী, বেতালবাহনা কালী, রুদ্রকালী ইত্যাদি নামেও দেবী কালীর বহু রূপের কথা জানা যায়।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান