সববাংলায়

গোষ্ঠ পাল

বিভাগঃ , ,

গোষ্ঠ পাল (Gostha Pal) ভারতীয় ফুটবলের ইতিহাসে এক কিংবদন্তি নাম। ময়দানে তাঁর দুর্ভেদ্য রক্ষণভাগের খেলার জন্য তিনি ‘চাইনিজ ওয়াল’ নামে খ্যাতি লাভ করেছিলেন। পরাধীন ভারতে যখন ফুটবল শুধুমাত্র একটি খেলা ছিল না, বরং জাতীয় আত্মমর্যাদা ও সাহেবদের বিরুদ্ধে প্রতীকী লড়াইয়ের একটি ক্ষেত্র হয়ে উঠেছিল, তখন গোষ্ঠ পাল ছিলেন সেই লড়াইয়ের অন্যতম প্রধান মুখ। তিনি ছিলেন বিদেশ সফরে যাওয়া ভারতীয় ফুটবল দলের প্রথম অধিনায়ক, ভারতের প্রথম ফুটবলার যিনি ‘পদ্মশ্রী’ সম্মানে ভূষিত হন এবং মোহনবাগান ক্লাবের ইতিহাসে অন্যতম শ্রেষ্ঠ রক্ষণভাগের খেলোয়াড়। ভারতীয় ফুটবলের বিকাশে তাঁর অবদান আজও সমানভাবে স্মরণীয়।

১৮৯৬ সালের ২০ আগস্ট বর্তমান বাংলাদেশের মাদারীপুর জেলার ভোজেশ্বর গ্রামে গোষ্ঠ বিহারী পালের জন্ম হয়। তাঁর পিতা শ্যামলাল পাল ছিলেন একজন ব্যবসায়ী। গোষ্ঠ পাল ছিলেন বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। তাঁর জন্মের খুব অল্পদিনের মধ্যেই তাঁর বাবার মৃত্যু হয়। গোষ্ঠ পালের পুষ্পা কুণ্ডুর সঙ্গে বিবাহ হয়। তাঁদের দুই সন্তান – নীরাংশু এবং সুকুমার।

তিনি সারদা চরণ আরিয়ান ইনস্টিটিউশনে পড়াশোনা করেন এবং পরে বিদ্যাসাগর কলেজে অধ্যয়ন করেন।

শৈশব থেকেই খেলাধুলার প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল। বিশেষ করে ফুটবলের প্রতি তাঁর আকর্ষণ এতটাই প্রবল ছিল যে পরিবারের আপত্তি ধীরে ধীরে উৎসাহে পরিণত হয়। পরে পরিবারের সঙ্গে তিনি কলকাতায় চলে আসেন এবং সেখানেই তাঁর ফুটবলজীবনের প্রকৃত সূচনা ঘটে।

মাত্র এগারো বছর বয়সে তিনি কলকাতার কুমারটুলি ক্লাবের হয়ে ফুটবল খেলতে শুরু করেন। ১৯০৭ থেকে ১৯১৩ সাল পর্যন্ত তিনি কুমারটুলি ক্লাবের হয়ে খেলেন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই নিজের অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় দেন। তাঁর শারীরিক শক্তি, বল নিয়ন্ত্রণ, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং প্রতিপক্ষকে আটকে দেওয়ার অনন্য দক্ষতা ফুটবল মহলের নজর কেড়ে নেয়। সেই সময় মোহনবাগানের খেলোয়াড় রাজেন সেন তাঁর প্রতিভা লক্ষ করেন এবং তাঁর উদ্যোগেই গোষ্ঠ পালের মোহনবাগানে যোগদানের পথ সুগম হয়।

এক নজরে গোষ্ঠ পালের জীবনী:

  • জন্ম: ২০ আগস্ট, ১৮৯৬
  • মৃত্যু: ৮ এপ্রিল, ১৯৭৬
  • কেন বিখ্যাত: ভারতীয় ফুটবলের কিংবদন্তি রক্ষণভাগের খেলোয়াড়, ‘চাইনিজ ওয়াল’ নামে পরিচিত, বিদেশ সফরে যাওয়া ভারতীয় দলের প্রথম অধিনায়ক এবং ভারতের প্রথম পদ্মশ্রীপ্রাপ্ত ফুটবলার।
  • পুরস্কার ও স্বীকৃতি:পদ্মশ্রী (১৯৬২), মোহনবাগান রত্ন (মরণোত্তর, ২০০৪)।

১৯১২ সালে তিনি মোহনবাগান ক্লাবে যোগ দেন এবং ১৯১৩ সালে প্রথমবারের মতো সবুজ-মেরুন জার্সি গায়ে মাঠে নামেন। এরপর প্রায় তেইশ বছর তিনি মোহনবাগানের হয়ে খেলেন। ভারতীয় ফুটবলের ইতিহাসে এত দীর্ঘ সময় এক ক্লাবের হয়ে উচ্চমানের ফুটবল খেলার নজির খুবই বিরল। গোষ্ঠ পালের খেলার প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল দৃঢ় রক্ষণ, নির্ভুল ট্যাকল, লম্বা ক্লিয়ারেন্স এবং অসাধারণ মানসিক স্থিরতা। তিনি প্রতিপক্ষের আক্রমণ ঠেকাতে যেমন পারদর্শী ছিলেন, তেমনি গোটা দলের রক্ষণভাগকে সংগঠিত রাখার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন।

১৯২১ সালে তিনি মোহনবাগানের অধিনায়ক নির্বাচিত হন এবং পরবর্তী পাঁচ বছর সেই দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর নেতৃত্বে মোহনবাগান বহু গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে ইউরোপীয় দলগুলোর বিরুদ্ধে স্মরণীয় লড়াই উপহার দেয়। যদিও তাঁর খেলোয়াড়জীবনে মোহনবাগান আইএফএ শিল্ড, ডুরান্ড কাপ বা রোভার্স কাপ জিততে পারেনি, তবু তাঁর অবদান ট্রফির সংখ্যায় পরিমাপ করা যায় না। পরাধীন ভারতের বাস্তবতায় সাহেবদের শক্তিশালী দলগুলোর বিরুদ্ধে সমানে সমানে লড়াই করাটাই ছিল সবচেয়ে বড় সাফল্য। সেই সংগ্রামের অন্যতম প্রতীক ছিলেন গোষ্ঠ পাল।

ক্যালকাটা ক্লাব, মিডলসেক্স রেজিমেন্ট, নর্থ স্ট্যাফোর্ডশায়ার রেজিমেন্ট, হাইল্যান্ড লাইট ইনফ্যান্ট্রি এবং অন্যান্য ইউরোপীয় দলের বিরুদ্ধে মোহনবাগানের প্রতিটি লড়াইয়ে তিনি ছিলেন রক্ষণভাগের প্রধান ভরসা। তাঁর ট্যাকলিং ছিল কঠোর কিন্তু নিয়ন্ত্রিত, আর প্রতিপক্ষের আক্রমণ নষ্ট করার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অসাধারণ। মাঠে তাঁর উপস্থিতি প্রতিপক্ষের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি করত। ইংরেজ সংবাদপত্র The Englishman-এর এক সাংবাদিক তাঁকে নিয়ে লিখেছিলেন—“Gostha, impregnable as the Chinese Wall।” এই মন্তব্য থেকেই ‘চাইনিজ ওয়াল’ উপাধিটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং পরবর্তীকালে সেটিই তাঁর পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে যায়।

১৯২৪ সালে ভারতীয় ফুটবল দলের সিলন (বর্তমান শ্রীলঙ্কা) সফরের জন্য যে দল গঠিত হয়, গোষ্ঠ পাল তার অধিনায়ক নির্বাচিত হন। ভারতীয় ফুটবলের ইতিহাসে এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। বিদেশের মাটিতে ভারতীয় দলের নেতৃত্ব দিয়ে তিনি দেশের ফুটবল ইতিহাসে একটি বিশেষ স্থান অর্জন করেন। শুধু ফুটবলই নয়, তিনি হকি, ক্রিকেট এবং টেনিস খেলাতেও দক্ষ ছিলেন। তবে ফুটবলই তাঁকে অমরত্ব এনে দেয়।

১৯৩৬ সালে তিনি ফুটবল থেকে অবসর গ্রহণ করেন। তাঁর অবসর গ্রহণও একটি অভূতপূর্ব ঘটনার মধ্যে দিয়ে ঘটে। মোহনবাগান মাঠে মোহনবাগান ও ক্যালকাটা ক্লাবের মধ্যে খেলা চলছিল। তখন ক্যালকাটা ক্লাব ব্রিটিশদের গর্বের ক্লাব ছিল। সেই ম্যাচের রেফারি ক্লেইটন ব্রিটিশ পক্ষপাতী ছিলেন এবং মোহনবাগানের ফুটবলাররা বিপক্ষের পেনাল্টি বক্সে ঢুকলেই বাঁশি বাজিয়ে দিচ্ছিলেন। এই ঘটনা চলতেই থাকে – এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে থাকেন গোষ্ঠ পাল সহ দলের সকলে এবং অবশেষে সকলে মাঠে শুয়ে পড়েন। এই প্রতিবাদ ময়দানে গভীর প্রভাব ফেলেছিল কিন্তু ব্রিটিশ প্রভাবিত IFA গোষ্ঠ পালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করে। গোষ্ঠ পাল প্রতিবাদে খেলাই ছেড়ে দেন। এই ঘটনাকে অনেকেই তাঁর আপসহীন চরিত্রের পরিচয় হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

অবসরের পরও তিনি মোহনবাগানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং খেলোয়াড় বাছাইয়ের কাজও করেছেন। ১৯৪৮ সালে কিছু সময়ের জন্য ক্লাবের সচিবের দায়িত্বও সামলান।

গোষ্ঠ পালের জনপ্রিয়তা কেবল একজন সফল ফুটবলারের কারণে নয়, তাঁর মধ্যে জাতীয়তাবাদী চেতনার প্রতিফলনের কারণেও। পরাধীন ভারতে ফুটবল ছিল আত্মমর্যাদার সংগ্রামের একটি প্রতীক। সাহেবদের বিরুদ্ধে মাঠে নামা মানেই ছিল দেশের সম্মানের লড়াই। গোষ্ঠ পাল সেই লড়াইয়ের অন্যতম সৈনিক ছিলেন। ফুটবল জীবনে কোনও বড় ট্রফি না জেতায় গোষ্ঠ পালের প্রতিক্রিয়া ছিল “ট্রফি পাওয়ার কথা যত না চিন্তা করসি, সাহেব গো হারামু কি কইরা সেই চিন্তাই তখন বেশি করসি। ট্রফি পাই নাই বইল্যা আমাগো কষ্ট হয় নাই।”

১৯৬২ সালে ভারত সরকার তাঁকে ‘পদ্মশ্রী’ সম্মানে ভূষিত করে। তিনি ছিলেন ভারতের প্রথম ফুটবলার যিনি এই সম্মান লাভ করেন। ভারতীয় ক্রীড়াক্ষেত্রে তাঁর অবদানের স্বীকৃতি হিসেবেই এই সম্মান প্রদান করা হয়। ফুটবলকে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় খেলায় পরিণত করার ক্ষেত্রে যে প্রজন্ম ভূমিকা রেখেছিল, গোষ্ঠ পাল ছিলেন তাদের অন্যতম প্রধান প্রতিনিধি।

১৯৭৬ সালের ৮ এপ্রিল গোষ্ঠ পালের মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুর মাধ্যমে ভারতীয় ফুটবলের একটি ঐতিহাসিক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে। কিন্তু মৃত্যুর পরেও তিনি ভারতীয় ক্রীড়াজগতের স্মৃতিতে অমর হয়ে আছেন।

তাঁর স্মৃতিকে সম্মান জানিয়ে বিভিন্ন সময়ে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। ১৯৮৪ সালে কলকাতায় তাঁর একটি পূর্ণাবয়ব মূর্তি স্থাপন করা হয়। সেই ভাস্কর্যে তাঁকে খালি পায়ে ফুটবল খেলতে দেখা যায়, যা তাঁর যুগের ভারতীয় ফুটবলারদের সংগ্রামের প্রতীক। মূর্তির ফলকে তাঁকে ভারতীয় ফুটবলের সর্বকালের অন্যতম সেরা রক্ষণভাগের খেলোয়াড় হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। কলকাতার ইডেন গার্ডেন্স ও মোহনবাগান মাঠ সংলগ্ন একটি গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার নামকরণ করা হয়েছে ‘গোষ্ঠ পাল সরণি’। ১৯৯৮ সালে ভারত সরকার তাঁর স্মরণে ডাকটিকিট প্রকাশ করে। ২০০৪ সালে মোহনবাগান ক্লাব তাঁকে মরণোত্তর ‘মোহনবাগান রত্ন’ সম্মানে ভূষিত করে। এছাড়া ক্লাব প্রাঙ্গণে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ‘গোষ্ঠ পাল সংগ্রহশালা’, যেখানে তাঁর জীবন ও ক্রীড়া-অবদানের নানা স্মারক সংরক্ষিত রয়েছে।

ভারতীয় ফুটবলের ইতিহাসে বহু তারকা এসেছেন, বহু রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু গোষ্ঠ পাল শুধুমাত্র একজন দক্ষ ফুটবলার ছিলেন না; তিনি ছিলেন এক যুগের প্রতীক। তাঁর মধ্যে ফুটে উঠেছিল আত্মসম্মান, জাতীয়তাবোধ, নেতৃত্ব এবং খেলাধুলার প্রতি নিঃস্বার্থ নিষ্ঠা। সেই কারণেই প্রায় এক শতাব্দী পরেও ভারতীয় ফুটবলের ইতিহাসে ‘চাইনিজ ওয়াল’ গোষ্ঠ পালের নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

তথ্যসূত্র


  1. “India’s greatest footballer”, SportsStar, The Hindu, 15 April 2006.
  2. ‘ক্লাবের নাম ইস্টবেঙ্গল’, শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়।
  3. http://www.thexplorateur.in/2019/02/Gosto-paul-bengal-footballer-untold-story.html?m=1
  4. https://web.archive.org/web/20100627120345/http://www.mohunbaganclub.com/goshtopalreport.html
  5. https://en.wikipedia.org/wiki/Gostha_Pal

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading