ইতিহাস

হরিনাথ দে

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের জগতে হরিনাথ দে’র অবদান যতটা বিস্ময়ের উদ্রেক করে মনে ততোধিক বিস্ময় লাগে এই মানুষটা সম্পর্কে এ যাবৎ অতি নগণ্য আলোচনা ও কাজের পরিমাণ দেখলে। এ কথা হলফ করে বলা যায় খুব কম মানুষই বাংলার এই ক্ষনজন্মা বিস্ময় প্রতিভা সম্পর্কে অবহিত।

পশ্চিমবঙ্গের কামারহাটির আড়িয়াদহ গ্রামে ১৮৭৭ সালের ১২ আগস্ট হরিনাথের জন্ম। পিতা ভোলানাথ দে রাইপুর সেন্ট্রালের (বর্তমান ছত্তিশগড়) ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতের একজন পদস্থ অফিসার ছিলেন। রাইপুরে যে বাড়িতে শৈশবে হরিনাথ দে বসবাস করেন, সে বাড়িতে ১৮৭৭ সাল থেকে ১৮৭৯ সাল অব্দি তরুণ নরেন্দ্র নাথ দত্ত বাস করেছিলেন।

হরিনাথ তাঁর প্রাথমিক পড়াশোনা রাইপুর হাই স্কুলে শেষ করে  কলকাতা যাত্রা করেন পরবর্তী পড়াশোনার জন্য। কলকাতা এসে সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুল ও কলেজে পড়েন এবং স্কুলের পাঠ শেষ করে প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন। ১৮৯৩ সালে হরিনাথ প্রেসিডেন্সির ছাত্র হিসেবেই কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ল্যাটিন ও ইংরেজি ভাষায় প্রথম শ্রেণীতে ষান্মানিক স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন এবং ওই বছরই তিনি কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ল্যাটিন ভাষায় প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করে সরকারি বৃত্তি লাভ করেন। এরপর তিনি ইংল্যান্ড যান কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চ শিক্ষালাভের জন্য। সেখানে ক্রাইস্ট’স কলেজে ভর্তি হন। কেম্ব্রিজে পড়ার সময়েই হরিনাথ গ্রীক ভাষায় এম.এ.-তে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হলেন প্রাইভেট পরীক্ষার্থী হিসেবে। এর পর হরিনাথ প্যারিসে যান এবং সেখানকার সরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ে আরবি ভাষা শেখেন। এরপর হরিনাথ মিশর গিয়ে আরবি ভাষাও শেখেন। আরবি ভাষা শেখা শেষ করে হরিনাথ জার্মানির মারমুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষালাভের জন্য যান এবং এখান থেকে তিনি সংস্কৃত, তুলনামূলক ব্যাকরণ এবং আধুনিক ভাষা শিক্ষাদান পদ্ধতি সম্পর্কে বিশদ জ্ঞান অর্জন করেন। ১৯০০ সাল নাগাদ তিনি কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত ‘ক্লাসিক্যাল ট্রাইপস্’ পরীক্ষার প্রথম ভাগ দিলেন এবং এই পরীক্ষাতেও প্রথম শ্রেণীতেই উত্তীর্ণ হলেন। পরের বছরই তিনি মধ্যযুগীয় আধুনিক ভাষায় ট্রাইপস্ পরীক্ষায় ডিগ্রি অর্জন করলেন। কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হরিনাথ দে গ্রীক, ল্যাটিন, হিব্রু ভাষায় শিক্ষা লাভ করে যে নজিরবিহীন প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন তা আজও আমাদের গর্বিত করে।

১৯০১ সালের শেষ দিকে হরিনাথ  দেশে ফিরে এলে তাঁকে ঢাকা সরকারি কলেজের ইংরেজির অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। তিনি বিদেশী শাসকের শিক্ষা বিভাগে উচ্চপদে নিযুক্ত প্রথম ভারতীয়। প্রেসিডেন্সি কলেজে ইংরেজির অধ্যাপকরূপেও কলকাতা তাঁকে পেয়েছিল কিছুকালের জন্য। অধ্যাপনাকালে পরীক্ষার্থীও  হয়েছিলেন এবং কৃতিত্বের সঙ্গে পাশ করে পাঁচ হাজার টাকা বৃত্তিও পেয়েছিলেন সেই সময়। ১৯০৬ সালে প্রাইভেট পরীক্ষার্থী হয়ে হরিনাথ কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পালি ভাষায় প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে এম.এ.পাশ করেন। ১৯০৭ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষাবিজ্ঞানের প্রথম অধ্যাপক উনি। ইম্পিরিয়্যাল লাইব্রেরীতে (অধুনা ন্যাশনাল লাইব্রেরী) দায়িত্বপূর্ণ কাজ করার সময়েও হরিনাথ কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সংস্কৃত ভাষার দুটি বিভাগে এম.এ.পরীক্ষা দেন এবং এখানেও দুটিতেই প্রথম বিভাগে প্রথম হন। ন্যাশনাল লাইব্রেরি অফ ইণ্ডিয়ার প্রথম ভারতীয় লাইব্রেরিয়ান ছিলেন হরিনাথ। চৌদ্দটি ভাষায় এম.এ. ছিল তাঁর। ভারতে প্রথম ভাষাবিজ্ঞান বা Linguistics-এর পথিকৃৎ ছিলেন এই হরিনাথ দে। কেবল লিখতে, পড়তে বা বলার ক্ষমতা নয় মাতৃভাষার মত প্রতিটি ভাষায় সুগভীর পাণ্ডিত্যও অর্জন করেছিলেন তিনি। হরিনাথ দে, ‘ম্যাকুলে’স এসে অন মিল্টন’ বইটির নবরূপায়ন করে সম্পাদনা ও প্রকাশনা দুটিই করেন। এরপর হরিনাথের গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে ইবন বতুতা রচিত বিখ্যাত ভ্রমণ কাহিনী ‘রিহলা’র ইংরেজী অনুবাদ গ্রন্থ প্রকাশ। তিনি জালালউদ্দিন আবু জাফর মোহাম্মদের গ্রন্থ ‘আল্ ফাকরি ও ইংরেজী অনুবাদ করে প্রকাশ করেন।

হরিনাথ দে বহু বিখ্যাত গ্রন্থের টীকাকরণ, অনুবাদের কাজ সম্পন্ন করেছেন। বৌদ্ধ ধর্ম সংক্রান্ত ‘লঙ্কাবতার সূত্র’ ও ‘নির্বাণ ব্যাখ্যা শাস্ত্রম্’ সম্পাদনা করে তিনি প্রকাশ করেছিলেন। বহু আরবি, ফারসি, পার্শিয়ান, পালি ও বাংলা গ্রন্থেরও পূর্ণ বা আংশিক অনুবাদ করে প্রকাশ করেছিলেন। কয়েকটি সংস্কৃত নাটকেরও ইংরেজি অনুবাদ করেন যার মধ্যে অন্যতম মহাকবি কালিদাস রচিত ‘অভিজ্ঞানম শকুন্তলম’। তাঁর জীবদ্দশায় রচিত  নানা রচনা নিয়ে Harinath Details Collection’  ৮৮টি খণ্ডে বিভক্ত যেটি কলকাতার ন্যাশনাল লাইব্রেরী অফ ইণ্ডিয়াতে সংরক্ষিত অতি মূল্যবান সম্পদ।হরিনাথের বহু লেখা বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। তার কিছু সংখ্যক ১৯৭২ সালে সংকলিত ও সম্পাদনা করে সুনীল বন্দ্যোপাধ্যায় কলিকাতা সংস্কৃত পুস্তক ভাণ্ডার থেকে প্রকাশ করেছেন যে গ্রন্থটির নামকরণ করা হয়েছে — “Select Papers, Mainly Idiological”। এটি কলকাতায় ন্যাশনাল লাইব্রেরি অফ ইন্ডিয়া তে সংরক্ষিত।

বাংলা ভাষায় তাঁর পাণ্ডিত্য এবং কৃতিত্ব বিশ্বের জ্ঞানভাণ্ডারকে, বিশেষ করে ভাষাবিজ্ঞানের ভারতীয় পথিকৃৎ হিসেবে তাঁর কার্যকলাপ অভূতপূর্ব সমৃদ্ধি দিতে পেরেছে।হরিনাথ দে’র ভাষা প্রতি ভালবাসা কেবল তাঁর সেই ভাষা সম্পর্কে নিজের পাণ্ডিত্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলনা, অন্য ভাষাভাষীর মানুষও যাতে তাঁর আপন মাতৃভাষার স্বাদ থেকে বঞ্চিত না হয় সে দিকেও লক্ষ্য থাকত তাঁর। তাঁর কাজ আজও সংরক্ষিত আছে কলকাতায় অবস্থিত ভারতীয় জাতীয় গ্রন্থাগারে। মোট ৮৮ টি খণ্ডে সাহিত্য, ভাষাতত্ত্ব এবং হিন্দু ধর্ম নিয়ে তাঁর লেখা অমূল্য গবেষণা যত্ন করে রাখা আছে সেখানে তাঁরই নামে একটি পৃথক সংগ্রহ বিভাগ তৈরি করে।

১৯১১ সালে ৩০ আগস্ট টাইফয়েডে এই বিস্ময় প্রতিভা মাত্র চৌঁত্রিশ বছর বয়সে পরলোক গমন করেন।

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

To Top
error: Content is protected !!

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন