ইতিহাস

লবণের ইতিবৃত্ত

“নুন খায় যার গুণ গায় তার”- এই প্রবাদটির সাথে আমরা কম বেশি সবাই পরিচিত।এই উক্তি কতবার যে আমরা ব্যবহার করেছি তার হিসেব নেই। আরব্য রজনী ‘আলি বাবা আর চল্লিশ চোরে’ও লবণ নিয়ে আছে এক গল্প। চল্লিশ ডাকাতের সর্দার যখন কারও বাড়িতে ডাকাতি করতে যেত, তখন সে নাকি ঐ বাড়ির বাড়তি নুন খেতে অস্বীকার করত। কারণ নুন খেলে নাকি সে আর নেমক হারামি (বিশ্বাসঘাতকতা) করতে পারবে না। এই দেখেই আলিবাবার পরিচারিকা মর্জিনা ধরে ফেলেছিল যে সে আসলে অতিথি বেশে ডাকাত।

সিগমুন্ড ফ্রয়েডের বন্ধু ছিলেন সাইকোলজিস্ট আর্নেস্ট জোনস। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে সাইকোঅ্যানালিসিসের সূচনা করার ক্ষেত্রে জোনস সাহেব মুখ্য ভূমিকা রেখেছিলেন। ১৯১২ সালে তিনি লবণের প্রতি মানুষের তীব্র আকর্ষণ বিষয়ে একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। তিনি তাঁর গবেষণায় যা বুঝতে পারেন তা হচ্ছে— এ নেশা কিছুটা অযৌক্তিক ও অবচেতনভাবে কিছুটা যৌনতা-সম্পর্কিত। তাঁর এই সিদ্ধান্তের সমর্থনে তিনি আবিসিনিয়ায় প্রচলিত এক অদ্ভুত প্রথার উল্লেখ করেন— সেখানে অতিথিকে এক খণ্ড লবণ দেয়া হয় এবং অতিথি সেই টুকরো চাটেন। জোনস উল্লেখ করেন, ‘সব যুগে লবণ এমন সব বিনিয়োগে কাজে লাগানো হয়েছে, যা তার প্রাকৃতিক গুণাবলির চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান।’ হোমার লবণকে স্বর্গীয় বস্তু বলে উল্লেখ করেছেন। প্লেটো বলেছেন, ‘লবণ ঈশ্বরের কাছে বিশেষভাবে প্রিয়।’ তিনি ধর্মীয় অনুষ্ঠান, চুক্তি ও জাদুতে লবণের ব্যবহার নিয়ে আলোচনা করেছেন।

জোনসের মতে, লবণ অনেক সময়ই মানুষের উর্বরা শক্তির বা প্রজনন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। এ ধারণা তৈরি হওয়ার একটা কারণ থাকতে পারে— স্থলের প্রাণীর চেয়ে সাগরের নোনা জলে বসবাসকারী মাছের বংশবিস্তারের হার অনেক গুণ বেশি। যেসব জাহাজে লবণ বহন করা হতো, সেগুলোয় প্রচুর ইঁদুর থাকত; বহু শতক ধরে মানুষ বিশ্বাস করত ইঁদুরের প্রজননের জন্য যৌন সম্পর্কের প্রয়োজন হয় না, শুধু লবণের মধ্যে বাস করলেই হয়! রোমানরা প্রেমে পড়া কোনো পুরুষকে ‘স্যালাক্স’ নামে ডাকত, যার অর্থ লবণাক্ত। ফ্রান্সস্পেনের সীমান্তসংলগ্ন পাইরিনিজে কোনো জুটি চার্চে বিয়ে করতে যাওয়ার সময় তাঁদের বাম পকেটে লবণ নিয়ে যেতেন, যাতে তাঁরা সন্তান জন্ম দেয়ার অক্ষমতায় না ভোগেন। জার্মানিতে নববধূদের জুতোয় লবণ ছিটিয়ে দেয়া হতো। জোনস আরো অনেক উদাহরণ দিয়েছেন। প্রাচীন মিশরের অকৃতদার পুরোহিতরা লবণ খেতেন না, কারণ লবণ মানুষের যৌন চাহিদা উসকে দেয়। আমেরিকান আদিবাসীদের ‘পিমা’ সম্প্রদায়ের কোনো পুরুষ ‘অ্যাপাচি’ গোত্রের কাউকে হত্যা করলে তিন সপ্তাহ সেই পুরুষ ও তাঁর স্ত্রীকে যৌনসংসর্গ ও লবণ থেকে দূরে থাকতে হতো। ভারতের বিহারে নারী সাপুড়েরা নির্দিষ্ট সময় পর পর লবণ থেকে দূরে থাকেন এবং ভিক্ষা করতে বের হন। ভিক্ষা থেকে আয়ের অর্ধেক দেয়া হয় পুরোহিতকে আর বাকি অর্ধেক দিয়ে লবণ ও মিষ্টি কিনে গ্রামবাসীদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। জোনস তার যুক্তির পক্ষে ফ্রয়েডকে টেনে আনেন। ফ্রয়েড জোনসের এ লেখার আট বছর আগে ‘Zur Psychopathie des Altagslebens’ গ্রন্থে লিখেছিলেন যে, কুসংস্কার গড়ে ওঠে কোনো সাধারণ বস্তু বা ঘটনাকে অত্যধিক গুরুত্ব দেয়ার মাধ্যমে। আর এ গুরুত্ব দেয়ারও একটা কারণ আছে। অবচেতনভাবে এসব সাধারণ বস্তুই আমাদের জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছুর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। জোনস মনে করেন, লবণের প্রতি মানুষের আকর্ষণ বুঝতে হলে সত্যিকার অর্থে এর গুরুত্বকে অনুধাবনের চেষ্টা করতে হবে। জোনস সিদ্ধান্ত টানেন, ‘এটা ভাবার যথেষ্ট কারণ আছে যে, আদিকালের মানুষ লবণকে বীর্য ও মূত্রের গঠনে থাকা কিছু আবশ্যিক উপাদানের সঙ্গে একই সারিতে ফেলেছিলেন।’ তবে জোনস যখন এ আলোচনা করছেন তখন সবকিছুর পেছনেই বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা খোঁজা হয়। এটা সত্য যে, বীর্য, মূত্র, রক্ত, চোখের জল, ঘাম ও শরীরের প্রায় সব অংশেই লবণ থাকে; কোষের কার্যক্রমের জন্য লবণ একটি অপরিহার্য উপাদান। লবণ ও জল না পেলে কোষ পুষ্টি লাভ করে না এবং জলশূন্যতায় ভোগে। তবে লবণ নিয়ে মানুষের আগ্রহকে ব্যাখ্যা করতে পারে এমন আরো ভালো নমুনা পাওয়া যায় কয়েক বছর পরে। বিশের দশকে মিশিগানের ডায়মন্ড ক্রিস্টাল সল্ট কোম্পানির বুকলেটে শিরোনাম ছিল— ‘লবণের একশ একটি ব্যবহার’। এসব ব্যবহারের মধ্যে ছিল: সিদ্ধ সবজির রঙ উজ্জ্বল রাখা, আইসক্রিম ঠাণ্ডা রাখা, ফোটানো জলকে দ্রুত ঠাণ্ডা করা, ছত্রাক দূর করা, কাপড় থেকে দাগ তোলা, মোমবাতির ক্ষয় হ্রাস করা, ফুল তাজা রাখা, মুখের ভেতরের ঘা সারানো প্রভৃতি।

লবণের ব্যবহার কিন্তু একশ একের বেশি। আধুনিককালে লবণের প্রায় ১৪ হাজার ব্যবহার নির্ণয় করা হয়েছে। ওষুধ তৈরি, রাস্তা থেকে শীতকালে বরফ গলানো, কৃষিজমিতে সার দেয়া, সাবান বানানো, বয়ন শিল্পের রঙে লবণ কাজে লাগে। মানুষের শরীরের প্রয়োজনীয় সোডিয়াম ক্লোরাইডের মূল উৎস হচ্ছে লবণ।

হাজার হাজার বছর আগে থেকে মানুষ খাবারে লবণের ব্যবহার শুরু করে। তবে তখনকার এই লবণ আজকের যুগের সাগরের জল পরিশুদ্ধ প্রক্রিয়াজতকৃত লবণ নয়। তখন লবণ সংগ্রহ করা হতো খনি থেকে। সেই সময়ের লোকেরা নিজস্ব উপায়ে খনি থেকে লবণ উত্তোলনের প্রক্রিয়া শিখে নিয়েছিল। চীনের সানশি প্রদেশের ইয়নচুনে এরকম এক খনির কথা জানা যায়। এটাই এখন পর্যন্ত পাওয়া সবচাইতে প্রাচীন খনি যেখান থেকে মানুষ মাটি খুঁড়ে লবণ বের করতে পারতো।

বর্তমানে পোল্যান্ড, তুরস্ক, বলিভিয়াসহ আরও কিছু দেশে এখনও লবণের খনির দেখা মেলে। আস্ট্রিয়ার একটি এলাকার নাম ‘সালজবুর্গ’ যার মানে হলো লবণের শহর। এই এলাকাটি সতেরো কিলোমিটার জায়গা জুড়ে রয়েছে একটি লবণের খনি। তেমনি সেল্টিক বা স্কটলেন্ড, গ্রীক এবং মিশরের বিভিন্ন এলাকার নাম হয়েছে এই লবণের কারণে। ইতালির দক্ষিণাঞ্চলে সিসিলিতে অপরূপ ডোরাকাটা লবণের একটি লবণের খনি দেখতে পাওয়া যায়। খনিটি প্রায় ২০ কিলোমিটার জায়গা দখল করে আছে। আজ থেকে প্রায় ৫০ লক্ষ বছর আগে ভূমধ্যসাগর আংশিক বা সম্পুর্ণ শুকিয়ে যাওয়ার সময় এই অসাধারণ প্যাটার্নটি তৈরি হয়। জলের বাষ্পীভবনের ফলে পড়ে থাকা লবণই কালক্রমে কালোর মাঝে সাদা ও গোলাকার ডোরা তৈরির মূল কারণ।

ভূপৃষ্ঠ থেকে ১৩০০ ফুট নীচে ৫ হাজার বছর আগের লবণ খনির খোঁজ পাওয়া গেছে সম্প্রতি তুরস্কে। ধারণা করা হচ্ছে খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০০ অব্দে বানানো হয়েছিলো এই লবণ খনি যা আজও ব্যবহারযোগ্য। খনির আসল মালিক ছিলো ‘হিটিসরা’, যারা প্রাচীন মধ্যপ্রাচ্যে বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলো, এবং তাঁরা নিজেদের হাতকেই খনি থেকে লবণ তোলার কাজে ব্যবহার করতো। ধারণা করা হচ্ছে এখানে এখনও ১ বিলিয়ন টন লবণ জমা রয়েছে। এখন এখান থেকে প্রতিদিন ৫০০ টন লবণ সংগ্রহ করা হচ্ছে।

খ্রীষ্টের জন্মের ৬০০০ হাজার বছর আগেও মানুষ খনি থেকে লবণ তুলতে পারত। আমরা খাওয়ার জন্য যে লবণ ব্যবহার করি তার বেশির ভাগই আসে সমুদ্রের লবণ থেকে। সাধারণ লবণ দেখতে সাদা হলেও খনি থেকে তোলা লবণ বিভিন্ন রঙের হতে পারে। সাদা লবণ মূলত সমুদ্রের পরিশোধিত লবণ। পৃথিবীর অনেক জায়গায় কালো লবণ পাওয়া যায়। এর বেশির ভাগ পাওয়া যায় ভারতে। ওখানে এই লবণকে ‘কালা নমক’ বলা হয়। এটি মূলত খনির লবণ। এর মধ্যে রয়েছে সোডিয়াম ক্লোরাইড, আয়রন, সালফার কম্পাউন্ড। রান্নার স্বাদ বাড়াতে অনেক সময় এই ব্ল্যাক বা কালো লবণ ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

সমুদ্র থেকে যে লবণ আনা হয় তা একটি বিশেষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিশোধন করা হয়। জোয়ারের সময় সমুদ্রের জল জমা করে রাখা হয় বড় বড় জমিতে। তারপর সেই জমির চারপাশ বাঁধ দিয়ে জল আটকে ফেলা হয়। তারপর সুর্যের আলোতে সেই জল বাষ্প হয়ে গেলে তার নিচে লবণ পড়ে থাকে। পড়ে আবার সেই লবণ পরিষ্কার করে বাজারে বিক্রয় করা হয়। ইংরেজিতে একে টেবিল সল্টও বলা হয়। আর এই লবনের সাথে আয়োডিন মিশিয়ে তৈরি করা হয় আয়োডাইজ সল্ট বা আয়োডিন লবণ।

এক ফরাসি লোককথায় দেখা যায়, একজন রাজকন্যা তার পিতাকে লবণের মতো ভালোবাসেন (এই রূপকথা ভারতবর্ষেও বহুল শ্রুত)। কিন্তু রাজা এ উত্তর শুনে মেয়ের ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে তাঁকে রাজ্যছাড়া করেন। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই রাজা লবণের গুরুত্ব বুঝতে পারেন এবং এটাও বোঝেন যে, মেয়ে তাকে কত ভালোবাসে।

আজকের দিনে লবণ খুবই সস্তা পণ্য, চাইলেই যত দরকার তত পরিমাণ লবণ পাওয়া যায়। কিন্তু এই সহজলভ্যতা কিন্তু মাত্র গত একশ বছরের ইতিহাস। এর আগে মানব ইতিহাসে লবণ ছিল অন্যতম চাহিদাযোগ্য পণ্য। আধুনিক কালের আগে খাদ্য সংরক্ষণের মূল উপায় ছিল লবণ। প্রাচীন মিশরীয়রা মমি তৈরিতে লবণ ব্যবহার করতেন। এভাবে সংরক্ষণ, ক্ষয়ের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেয়া এবং জীবন রক্ষাকারী ভূমিকার কারণে লবণ বিস্তৃত একটি প্রতীকী চেহারা পায়— একেই হয়তো ফ্রয়েড লবণ নিয়ে মানুষের অযৌক্তিক ভাবনার কারণ বলে উল্লেখ করেছেন।

লবণ মাখিয়ে খাবার সংরক্ষণ করার উপায় বের করেছিলেন মিশরীয়রাই। মিশরীয়রা মাছে লবণ মাখিয়ে বিক্রি করতো ফিনিশিয়দের কাছে। লবণের নানান ধরনের ব্যবহারের ফলে লবণের ব্যবসা অনেক জমজমাট হয়ে ওঠে। লবণ বিক্রির জন্য আফ্রিকায় একটি আলাদা রাস্তা তৈরি হয়েছিল। সেই রাস্তা আফ্রিকার সাহারা মরুভূমির মধ্যে দিয়ে গেছে। এই রাস্তা দিয়ে টুয়ারেগ নামের এক জাতি বছরে প্রায় ১৫০০০ টন লবণ নিয়ে যেত। হাজার হাজার বছর আগে প্রাচীন মিশরীয়রা লবণকে পবিত্র বলে মনে করত। তাই তারা কবরে লবণ রাখত। মৃতদেহ লবণ দিয়ে মাখালে তা টিকে থাকে অনেকদিন। তাই তারা মৃত মানুষের কবর দেবার সময় লবণ রেখে দিত। লবণের অন্য ধরনের ব্যবহারও তখন থেকে চালু হয়ে আসছে।

লবণ প্রাচীন ইহুদি, এমনকি আধুনিক যুগের ইহুদিদের কাছেও ঈশ্বরের সঙ্গে ইসরায়েলের চুক্তির অনন্তকালের প্রতীক। ‘তোরাহ’-তে লেখা আছে, ‘ঈশ্বরের সামনে এটা লবণের অনন্তকালের চুক্তি।’ আরো আছে, ‘ইসরায়েলের ঈশ্বর এই ভূমিকে চিরকালের জন্য ডেভিড ও তার পুত্রদের হাতে তুলে দিলেন লবণের অঙ্গীকারপত্রের মাধ্যমে।’ শুক্রবার রাতে ইহুদিরা সাবাথের রুটি লবণজলে ডুবিয়ে খায়। ইহুদি ধর্মে রুটি খাদ্যের প্রতীক, যা ঈশ্বরের উপহার। আর লবণে রুটি চোবানোর ফলে সেটি সংরক্ষিত হয়, যা ঈশ্বরের সঙ্গে তাঁর বাছাইকৃতদের চুক্তি বজায় রাখার প্রতীক। আনুগত্য ও বন্ধুত্ব লবণ দিয়ে অটুট থাকে। কারণ লবণের স্বাদ কখনো বদলায় না। এমনকি লবণ জলে গলিয়ে ফেলা হলেও পুনরায় একে চারকোনা ক্রিস্টালে পরিণত করা যায়। ইসলাম ও ইহুদি ধর্মে লবণ দিয়ে কোনো তর্কের অবসান ঘটানো হয়। কারণ লবণ অপরিবর্তনীয়। ভারতীয় সেনারা লবণের মাধ্যমে ব্রিটিশদের প্রতি তাদের আনুগত্য প্রকাশ করতেন।

প্রাচীন মিশরীয়, গ্রিক ও রোমানরা উৎসর্গ ও নৈবেদ্য হিসেবে লবণ ব্যবহার করত। তাঁরা লবণ ও জলের ব্যবহার করত ঈশ্বরকে ডাকতে। ধারণা করা হয়, খ্রিস্টানদের পবিত্র জলের ধারণা এ ঐতিহ্য থেকেই এসেছে। খ্রিস্ট ধর্মে লবণ শুধু জীবনীশক্তি ও স্থায়িত্বের ধারণার সঙ্গে জড়িত। একই সঙ্গে সত্য ও জ্ঞানের প্রকাশ। ক্যাথলিক চার্চ শুধু পবিত্র জল নয়, সঙ্গে পবিত্র লবণের ধারণাকেও ধারণ করে। পবিত্র লবণ মানে ‘জ্ঞানের লবণ’ বা ‘স্যাল স্যাপিয়েনশিয়া’। নতুন গৃহে লবণ ও রুটি নিয়ে যাওয়ার রীতি মধ্যযুগের আগে থেকে প্রচলিত ছিল। ব্রিটিশরা রুটি নিয়ে না গেলেও বহু বছর তাঁরা নতুন ঘরে লবণ নিয়ে যেত। ১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজ কবি রবার্ট বার্নস এলিসল্যান্ডে যখন নতুন বাড়িতে উঠেছিলেন তখন তাঁর আত্মীয়স্বজনরা লবণের বাটি হাতে তাঁকে ঘিরে মিছিল করেছিল। জার্মানির হামবুর্গ শহর বছরে একবার তাঁদের শহরের মঙ্গল কামনায় রাস্তায় প্রতীকীরূপে চকোলেট দিয়ে মোড়া রুটি ও মার্সিপ্যান ‘সল্টসেলার’ বহন করে।

যেহেতু লবণ ক্ষয় প্রতিরোধ করে, তাই এটা বিভিন্ন ক্ষতি থেকেও রক্ষা করে। মধ্যযুগের প্রাথমিক কালে উত্তর ইউরোপে কৃষকরা এরগোট নামে ছত্রাক আক্রমণ থেকে ফসল রক্ষা করতে শস্যকে নোনা জলে চুবিয়ে নিতেন। তাই অ্যাংলো-স্যাক্সন কৃষকরা লবণকে জাদুময় উপাদান হিসেবে বিবেচনা করবেন, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

খারাপ আত্মা লবণকে ঘৃণা করে। জাপানের ঐতিহ্যবাহী থিয়েটারগুলোয় শো শুরু হওয়ার আগে মঞ্চে লবণ ছিটিয়ে দেয়া হয়, যাতে শিল্পীদের কোনো খারাপ আত্মা আক্রমণ করতে না পারে। হাইতিতে জাদুটোনা কাটানো এবং কোনো জোম্বির দেহে প্রাণ ফিরিয়ে আনার একমাত্র উপায় হচ্ছে লবণ। আফ্রিকা ও ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জের মানুষ বিশ্বাস করে খারাপ আত্মা যে মানুষে ভর করে, তাঁর ত্বককে লবণ জল দিয়ে ধুতে হয়, এতে সেই দেহে খারাপ আত্মা আর প্রবেশ করতে পারে না।

ইহুদিদের বিশ্বাসমতে, লবণ মানুষকে দুষ্ট চোখ থেকে রক্ষা করে। ‘দ্য বুক অব এজেকিয়েল’ এ বলা হয়েছে, শয়তানের হাত থেকে সদ্য জন্মানো নবজাতকের শরীরে লবণ ডলতে। ইউরোপে শিশুদের রক্ষায় তাঁদের জিহ্বায় লবণ দেওয়া বা নোনা জলে চোবানোর রীতি খ্রিস্টানদের ব্যাপ্টাইজমের আগে থেকেই প্রচলিত। ফ্রান্সে এমনকি ব্যাপ্টাইজেশনের আগে নবজাতকদের নোনা জলে চোবানো হতো, এই প্রথা ১৪০৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত প্রচলিত ছিল। ইউরোপের কিছু অংশে এ রীতি সামান্য পরিবর্তন হয়েছে, যেমন— হল্যান্ডে শিশুদের দোলনায় লবণ রাখা হয়।

লবণ কিছু ক্ষেত্রে ভয়ানক হয়ে উঠতে পারে, তাই এটি কীভাবে সংরক্ষণ করা হবে— সে বিষয়েও সচেতনতা দেখা যায়। মধ্যযুগের ইউরোপে খাবার টেবিলে রাখা লবণ ছুরির অগ্রভাগ দিয়ে স্পর্শ করা হতো, হাত দিয়ে নয়। ইহুদিদের আইন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বই হচ্ছে— ‘শালচান আরুখ’। এ গ্রন্থে বলা হয়েছে, খাবারের টেবিলে লবণ নিতে হবে মাঝের দুই আঙুল দিয়ে। কারণ কেউ যদি বুড়ো আঙুল দিয়ে লবণ স্পর্শ করে তাহলে তাঁর সন্তানদের মৃত্যু হবে, কেনো আঙুল ব্যবহার করলে দারিদ্র্য আসবে এবং অনামিকা ব্যবহার করলে সে খুনি হয়ে উঠবে।

জাপানের শিন্টোরায় যে কোন মানুষ বা স্থানকে পরিশুদ্ধ করতে লবণ ছিটিয়ে দেয়া হয়। এ জন্য সুমো কুস্তীগিরদের উপর লবণ ছিটিয়ে দেয়া হয়।

লবণ যে শুধু মানুষের জীবনে কল্যাণ বয়ে এনেছে তা কিন্তু নয়। অনেক যুদ্ধও কিন্তু এই লবণের কারণে হয়েছিল। ইতালির ভেনিস শহরের সাথে জেনোয়া নামের আরেকটি শহরের লড়াই ঘটেছিল শুধুমাত্র লবণকে কেন্দ্র করে। এই লবণ নিয়ে আরও একটি মজার ঘটনা আছে। ১৮০০ সালের দিকে ইংল্যান্ডের এক জায়গায় লবণ পাওয়া যায়। এই লবণ সরবরাহ করতে গিয়েই লিভারপুল নামে এক বিশাল বন্দর গড়ে ওঠে।

লবণের ইতিহাস কিন্তু শুধু খাওয়ায় লবণের ব্যবহার বা লবণ নিয়ে বাণিজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। প্রাচীন রোমে সৈন্যদের বেতন দেওয়া হতো এই লবণ দিয়ে। ইংরেজিতে ‘সোলজার’ মানে হলো সৈন্য আর স্যালারি মানে বেতন। এই দুটি শব্দ এসেছে ‘সল্ট’ থেকে। আজ আমরা যে স্যালাড খাই, সেই শব্দটিও এসেছে সল্ট থেকে সল্টেড হয়ে।

একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য কী পরিমাণ লবণ প্রয়োজন, সেটা আধুনিক বিজ্ঞানীরা হিসাব করে বের করেছেন। বছরে এক পাউন্ডের দুই-তৃতীয়াংশ থেকে ১৬ পাউন্ড। গরম আবহাওয়ার দেশ, যারা কঠোর কায়িক পরিশ্রম করে, তাঁদের লবণ বেশি দরকার। কারণ ঘামের সঙ্গে তাঁদের শরীর থেকে প্রচুর লবণ বের হয়ে যায়। এ কারণে ওয়েস্ট ইন্ডিজের দাসদের নোনতা খাবার দেয়া হতো। অন্যদিকে যাদের বেশি ঘামাতে হয় না এবং যারা পশুর মাংস খায়, তাঁদের প্রয়োজনীয় লবণ মাংস থেকেই আসে। পূর্ব আফ্রিকার যাযাবর পশু পালকগোষ্ঠী ‘মাসাইরা’ তাঁদের লবণের চাহিদা পূরণ করে পশুর রক্ত পান করে। অন্যদিকে সবজি পটাশিয়ামে সমৃদ্ধ হলেও তাতে সোডিয়াম ক্লোরাইডের পরিমাণ খুব কম থাকে।

ইতিহাসের বিভিন্ন যুগ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, শিকারিগোষ্ঠী কখনো লবণ উৎপাদন বা বাণিজ্যে যুক্ত ছিল না, বরং কৃষিভিত্তিক সমাজই এ কাজ করেছে। যেখানেই মানুষ কৃষিকাজ শুরু করেছে, সেখানেই তাঁরা খাবারের সঙ্গে লবণ মেশানোর পথ খুঁজেছে। কীভাবে তাঁরা লবণের এ প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছিল, তা এক রহস্য। মানুষের ক্ষুধা লাগলে সে খাবার খোঁজে, এটাই সহজাত প্রবৃত্তি। লবণের অভাবে মাথাব্যথা, ঝিমুনি ও শেষমেশ মানুষ জ্ঞান হারাতে পারে। তার পরও বহুদিন লবণ সরবরাহ না হলে মানুষ মারা যেতে পারে। কিন্তু এই পুরো সময়ে মানুষ কখনো লবণের অভাব বোধ করে না। যদিও বেশির ভাগ মানুষ প্রয়োজনের চেয়ে বেশি লবণ খায়। এর কারণ বোধহয় তাঁরা লবণের স্বাদ পছন্দ করে। অন্যদিকে পশুপালন শুরু হওয়ার পর তাঁদের জন্য লবণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিল। মানুষের মতো মাংসখেকোরা তাঁদের লবণের চাহিদা পূরণ করে লবণ থেকে কিন্তু তৃণভোজীদের লবণ সংগ্রহ করতে হয় লবণের উৎস থেকে। আদিমকালের মানুষ লবণের খোঁজে তৃণভোজীদের অনুসরণ করত। গৃহপালিত পশুকে লবণ খাওয়ানোর দরকার হতো। একটা ঘোড়ার মানুষের চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি লবণ প্রয়োজন, গরুর প্রয়োজন ১০ গুণ বেশি। মানুষ পশুপালন শুরু করেছিল সম্ভবত হিম যুগের আগে এবং সেই আমলেও মানুষ বুঝত যে পশুর লবণ প্রয়োজন। রেইনডিয়ার মানুষের মূত্রত্যাগের স্থান চাটত— এটা মানুষ পর্যবেক্ষণ করেছিল। মানুষের মূত্রে লবণ আছে। মানুষ বুঝেছিল লবণ দিলে রেইনডিয়ার তাঁদের কাছে আসবে এবং পোষ মানবে।

খ্রিস্টপূর্ব ১১ হাজার বছরে হিম যুগের অবসান ঘটে। পুরো দুনিয়াকে ঢেকে রাখা বরফ ধীর ধীরে অদৃশ্য হতে থাকে। ঠিক এ সময়েই ‘এশিয়ান উলফ’ নামে পরিচিত নেকড়ে মানুষের পোষ মানে। আকারে ছোট হলেও এ নেকড়ে ছিল ভয়ানক শিকারি, এমনকি সুযোগ পেলে এরা মানুষকেও খেয়ে ফেলত। বন্য অবস্থায় থাকা আরেক প্রতিপক্ষ এবার পোষ মানল— কুকুর, যা বিশ্বস্ত এক সহায়তাকারী হিসেবে আজও মানুষের সঙ্গে আছে।

হিমবাহ গলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিরাট চারণভূমি উন্মোচন হলো। মানুষের সঙ্গে বন্য মেষ, ছাগলও এ ভূমি থেকে খাদ্য সংগ্রহ করত। শুরুর দিকে নিশ্চয়ই মানুষ তাঁর খাদ্যের ভাণ্ডারে ভাগ বসানো এসব প্রাণীকে হত্যা করত। কিন্তু তৃণভূমির কাছে বসবাসকারীরা শিগগিরই বুঝতে পারল এসব প্রাণীকে নিয়ন্ত্রণ করা গেলে তাঁরা হয়ে উঠবে খাবারের সহজলভ্য ও নিশ্চিত উৎস। এমনকি তাঁদের কুকুরগুলো এসব পশুকে নিয়ন্ত্রণে কাজে লাগতে পারে। খ্রিস্টপূর্ব ৮৯০০ অব্দে ইরাকে মেষ পোষ মানানো হয়েছিল, যদিও এ ঘটনা দুনিয়ার কিছু অঞ্চলে আরও আগে ঘটেছিল। খ্রিস্টপূর্ব ৮০০০ অব্দে এশিয়ার পশ্চিমাংশের নারীরা জমিতে বীজ বোনা শুরু করেছিলেন। ধারণা করা হয়েছিল, এটা ছিল কৃষিকাজের সূচনা। কিন্তু ১৯৭০ সালে ইউনিভার্সিটি অব হাওয়াই মিয়ানমারে এমন কিছু নিদর্শন খুঁজে পায়, যার ফলে আগের ধারণাটি ভেঙে যায়। স্পিরিট কেভ নামে একটি স্থানে চাষ করে উৎপাদিত কিছু সবজির অবশেষ পাওয়া যায়, যার মধ্যে ছিল— মটর, শসা, বাদাম। কার্বন ডেটিং পদ্ধতিতে দেখা গেছে, এসব সবজি খ্রিস্টপূর্ব ৯৭৫০ অব্দের। শুয়োর পোষ মানে আরো পরে, খ্রিস্টপূর্ব ৭০০০ অব্দে। শুয়োর গরু-ছাগলের মতো মাঠে চরে বেড়ায় না, তাই এদের পোষ মানাতে কিছুটা দেরি হয়েছিল। তবে ষাঁড় পোষ মেনেছিল আরো পরে। খ্রিস্টপূর্ব ছয় হাজার পূর্বাব্দে তুরস্ক বা বলকান অঞ্চলে ষাঁড় পোষ মানানো হয়েছিল। খাবার নিয়ন্ত্রণ, খাসি করা ইত্যাদির মাধ্যমে মানুষ বন্য ষাঁড়কে গবাদিপশুতে রূপান্তর করে। গবাদিপশু মানুষের প্রধান খাবার হয়ে উঠল। একই সঙ্গে পশুকে খাওয়ানোর জন্য প্রচুর শস্য ও লবণেরও প্রয়োজন হয়ে পড়ল। লবণের ওপর এ নির্ভরতার কারণে তা প্রতীকীরূপে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে এবং অর্থনৈতিক মূল্যও চড়া হয়ে ওঠে।

লবণ দুনিয়ার অন্যতম প্রথম আন্তর্জাতিক পণ্য; লবণের উৎপাদন দুনিয়ার প্রথম শিল্পের একটি এবং অবশ্যম্ভাবীরূপে প্রথম মনোপলি বাণিজ্য সৃষ্টি হয় এ পণ্যকে কেন্দ্র করে।

লবণের সন্ধান হাজার বছর ধরে প্রকৌশলীদের ব্যস্ত রেখেছে এবং তাঁরা এ কাজের জন্য অদ্ভুত ধরনের ও উদ্ভাবনী অনেক যন্ত্র তৈরি করেছেন। লবণ পরিবহনের জন্য তৈরি হয়েছে রাস্তা। রসায়ন ও ভূতত্ত্বের বিকাশের অগ্রভাগে ছিল লবণ। যুদ্ধ, জোট, বিদ্রোহ— এমন সব সামাজিক ঘটনা ঘটেছে এ লবণ বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে। পৃথিবীতে এমন কোনো স্থান নেই, যেখানে লবণ পাওয়া যায় না। তবে বিষয়টি আধুনিক ভূতত্ত্বের বিকাশ হওয়ার আগ পর্যন্ত জানা যায়নি। বিশ শতকের আগ পর্যন্ত মানুষ জানপ্রাণ দিয়ে লবণের সন্ধান করেছে, এর বাণিজ্যের দখল নিতে যুদ্ধ করেছে। বহু সহস্রাব্দ ধরে লবণ সম্পদের প্রতিনিধিত্ব করেছে। ক্যারিবীয় বণিকরা তাঁদের ঘরের তলায় লবণ মজুদ করে রাখতেন। চীনা, রোমান, ফরাসি, ভেনেসীয় সমাজে যুদ্ধের খরচ তুলতে সরকার লবণের ওপর কর বসিয়েছিল। অনেক সময় শ্রমিক ও সেনাদের বেতন হিসেবে লবণ দেয়া হতো। অর্থের সমার্থক হিসেবে ব্যবহার হয়েছে লবণ। ১৭৭৬ খ্রিস্টাব্দে রচিত পুঁজিবাদের বিশ্লেষণ নিয়ে অ্যাডাম স্মিথের গ্রন্থ ‘দ্য ওয়েলথ অব নেশনস’ গ্রন্থে লেখক বলেছেন, যার কোনো মূল্য আছে, তাকেই অর্থ হিসেবে ব্যবহার করা যায়। উদাহরণ হিসেবে তিনি তামাক, চিনি, শুকনো মাছ, গবাদিপশুর কথা উল্লেখ করেন। আর বলেন, ‘আবিসিনিয়ায় বাণিজ্য ও বিনিময়ের সাধারণ উপায় হিসেবে লবণ ব্যবহার হতো।’ তবে তিনি এটাও বলেছিলেন যে, সবচেয়ে ভালো মুদ্রা হতে পারে ধাতু থেকে। কারণ তা সহজে নষ্ট হয় না। লবণ নিয়ে যুদ্ধ, গুপ্তধনের মতো মজুদ, এর ওপর ট্যাক্স ধার্য করা প্রভৃতি আজকের দিনে হাস্যকর মনে হতে পারে। আজকের দিনে কোনো দেশের নেতা হয়তো অন্য দেশের তেলের ওপর নির্ভরতা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করতে পারেন। সপ্তদশ শতকে ঘটনাটা ছিল একটু ভিন্ন, সে সময় এক ব্রিটিশ নেতা ফরাসিদের লবণের ওপর নিজেদের নির্ভরতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন।

সব যুগেই মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় বস্তুই সত্যিকার মূল্যবান। প্রেম আর সম্পদের খোঁজই মানুষের ইতিহাসে সবচেয়ে রোমাঞ্চকর গল্পের জন্ম দিয়েছে। তবে এ দুইয়ের মধ্যে একটা পার্থক্য আছে বৈকি! প্রেমের গল্প অনন্তকালের জন্য আর সম্পদের খোঁজের ধরন বদলে যায় যুগের সঙ্গে সঙ্গে।

ভাইকিংরা সর্বপ্রথম উত্তর ইউরোপ ও বাল্টিক অঞ্চলে লবণ পরিবহন বা বাণিজ্য শুরু করে। এর মাধ্যমে তাঁরা মধ্যযুগের শেষভাগ ও রেনেসাঁ যুগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লবণ পথের একটি প্রতিষ্ঠা করেন। এ রকম সময়ই ইউরোপীয়রা বুঝতে পারে সাগরের জল প্রাকৃতিকভাবে শুকিয়ে ফেললেই সবচেয়ে ভালো লবণ পাওয়া যায়। এ আবিষ্কারের ফলে ব্রিটানি উপদ্বীপ, বরনেফ সাগর লবণ উৎপাদনের মূল কেন্দ্র হয়ে উঠল। এ উপসাগর ছিল ইউরোপের সর্ব-উত্তরের বিন্দু, এখানকার আবহাওয়া সাগরের জল বাষ্পীভূত করার জন্য সহায়ক ছিল। একই সঙ্গে এ উপসাগরের অবস্থান ছিল ক্রমান্বয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা আটলান্টিক উপকূলের কাছেই এবং এর সঙ্গে যুক্ত ছিল নদী, যা লবণকে সহজেই স্থলভাগের বসতিতে পৌঁছে দিতে পারত।

মধ্যযুগে খাবার সংরক্ষণ ছাড়াও শিল্পক্ষেত্রে লবণের অনেক ব্যবহার দেখা যায়। চামড়া শিল্প, চিমনি পরিষ্কার, মৃৎপাত্রের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন কাজে লবণের ব্যবহার শুরু হয়। এছাড়া দাঁতের ব্যথা, পেটের সমস্যায়ও লবণের ব্যবহার চালু হয়।

লবণ মেশানো কড মাছের বাণিজ্য এ সময় ইউরোপে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এ ‘সল্ট কড’ বাণিজ্য পর্তুগিজদের মাছ শিকার ও লবণ উপাদানের ব্যবসার বিকাশ ঘটায়। পর্তুগালের আভেইরো ছিল লবণ উৎপাদনের আদর্শ স্থান। ১০ম শতক থেকে এটা পর্তুগিজদের লবণের প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে। কিন্তু লবণের ক্রমবর্ধমান চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে সেতুবালে নতুন লবণ উৎপাদন কেন্দ্র গড়ে ওঠে, রাজধানীর দক্ষিণে ছিল এর অবস্থান। এ কেন্দ্রটিই পর্তুগালের সবচেয়ে বড় লবণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে। সেতুবালের লবণ বড় দানা, সাদা রঙ ও শুষ্কতার জন্য ইউরোপে বিখ্যাত হয়ে ওঠে।

ইংল্যান্ডে দক্ষ মৎস্যশিকারি দল ও নৌবাহিনী থাকা সত্ত্বেও তাঁদের সাগরের লবণ ছিল না। উপকূলের চ্যানেলে লবণযুক্ত পাথর ধুয়ে ও আগুন জ্বালিয়ে ইংরেজরা লবণ উৎপাদন করত। কিন্তু এসব পদ্ধতি ছিল তুলনামূলকভাবে ব্যয়বহুল। মানও ভালো হতো না। তাই ইংরেজরা ফ্রান্স থেকে লবণ আমদানি করত।

লবণ ব্রিটিশদের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ সল্ট কড ও গরুর এবং শুকরের মাংস ছিল তাঁদের নৌবাহিনীর রেশন। একই অবস্থা ছিল ফ্রান্সেও। খ্রিস্টীয় চোদ্দ শতক নাগাদ উত্তর ইউরোপের কোনো দেশের যুদ্ধ প্রস্তুতির অন্যতম ছিল বিপুল পরিমাণ লবণের মজুদ গড়ে তোলা। ১৩৪৫ খ্রিস্টাব্দে কাউন্ট অব হল্যান্ড ফ্রিজিয়ানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং এ উদ্দেশে সাত হাজার কড মাছ লবণ দিয়ে সংরক্ষণের নির্দেশ দেন। ১৫৫৫ খ্রিস্টাব্দে সুইডিশ বিশপ ওলাস ম্যাগনাস তাঁর ‘আ ডেসক্রিপশন অব দ্য নর্দান পিপলস’ গ্রন্থে লিখেছিলেন— দীর্ঘ সময়ের সামরিক অবরোধে টিকে থাকতে মাছ, মাংস লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করে রাখতে হবে। ষোলো শতকে লবণাক্ত মাছের মাধ্যমে ইউরোপীয়দের দৈনিক লবণ গ্রহণের পরিমাণ ছিল ৪০ গ্রাম, যা আঠারো শতকে বেড়ে হয় ৭০ গ্রাম।

ইউরোপ থেকে এবার আসা যাক আমেরিকায়। উত্তর আমেরিকার স্থানীয় বা গ্রামাঞ্চলের রাস্তাগুলো নিখুঁত পরিকল্পনায় তৈরি— এমন বলা যাবে না। কারণ এসব পথ মূলত সৃষ্টি হয়েছে পশু চলাচলের পথের রেখা ধরে। এগুলো ছিল মূলত পশুর লবণ সংগ্রহের পথ। পশুরা তাদের প্রয়োজনীয় লবণ সংগ্রহ করত ঝরনা, নোনা জল, লবণের শিলা কিংবা অন্য যেকোনো প্রাকৃতিক লবণের উৎস থেকে। পশুর এসব লবণ চাটার স্থান আমেরিকাজুড়ে ছড়িয়ে আছে। এসব স্থান সাধারণত সমতল, সাদা, বাদামি বা ছাই রঙের মাটি। পশুর লবণ চাটার ফলে বিরাট গর্ত এমনকি গুহার সৃষ্টি হতো। মানুষ এ পথগুলোর ধারেই বসতি স্থাপন করে গ্রামের পত্তন করেছে। লেক এরির কাছে মহিষের যাতায়াতে তৈরি একটি পথ দেখা যায় এবং এ পথের পাশে যে শহর গড়ে ওঠে, তার নাম বাফেলো। ইউরোপীয়রা যখন আমেরিকায় আসে তখন স্থানীয় গ্রামগুলোয় তাঁরা প্রচুর লবণ উৎপাদন প্রক্রিয়া দেখতে পায়। আমেরিকার নেটিভ ইন্ডিয়ানরা বেশ ভালোভাবেই লবণ উৎপাদন করতে পারত। এদের অনেক গোষ্ঠীরই লবণ দেবী আছে। নাভাহো গোষ্ঠীর এ লবণ দেবী একজন বয়স্ক নারী। যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকোয় স্থানীয়দের লবণ সংগ্রহ অভিযান ছিল এক রকমের উৎসব। অনেক সময় লবণ সংগ্রহ করতেন ধর্মীয় নেতারা। গোষ্ঠীর মধ্যে কোনো একটি নির্দিষ্ট দল থাকত লবণ সংগ্রহের জন্য। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে লবণ সংগ্রহ করতেন মূলত পুরুষরা, তবে নাভাহোদের নারীরাও লবণ সংগ্রহে যেতে পারতেন। লবণ সংগ্রহকারী দলের নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের জন্য প্রার্থনা করা হতো। তাঁরা ফিরে এলে বিশেষ আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাদের বরণ করে নেয়া হতো।

আমেরিকার ইতিহাসে লবণ নিয়ে ধারাবাহিক যুদ্ধ দেখা যায়। লবণের সরবরাহ যিনি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন, তিনিই ক্ষমতার চেয়ারে বসতেন। ইউরোপীয়দের আগমনের আগে এটাই ছিল আমেরিকার চিত্র। এমনকি তাঁরা আসার পর আমেরিকান সিভিল ওয়ার পর্যন্ত লবণের এ গুরুত্ব অব্যাহত ছিল। আমেরিকার সব সভ্যতাই লবণ সহজলভ্য এমন এলাকায় গড়ে উঠেছে। ইনকারা ছিল লবণ উৎপাদক। কুজকোর কাছে তাঁদের ছিল লবণ কূপ। কলম্বিয়ার যাযাবর গোষ্ঠীগুলো স্থায়ী গৃহ তৈরি করেছিল লবণের প্রয়োজনে। লবণ তৈরি শেখার পর তাঁরা যাযাবর জীবন ত্যাগ করে। দেশটির বর্তমান রাজধানী বোগোটার কাছেই বাস করত ‘চিবচা’ গোষ্ঠী। এরাই সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে সবচেয়ে ক্ষমতাশালী ছিল, কারণ তাঁরা উন্নত মানের লবণ তৈরি করতে পারত। চিবচারা তাঁদের লবণ দেবতাকে সম্মান জানাতে বছরে দুবার কিছুদিন লবণ ও যৌন সম্পর্ক থেকে বিরত থাকত। আজটেক গোষ্ঠীর মধ্যে মূত্র বাষ্পে পরিণত করে লবণ তৈরির রীতি ছিল। আজটেকরা তাঁদের সামরিক শক্তির জোরে লবণের প্রাকৃতিক উৎসগুলো নিজেদের দখলে রেখেছিল। আজটেক রাজারা প্রজাদের কাছ থেকে কর ও উপহার হিসেবে লবণ পেতেন। স্প্যানিশরা মেক্সিকোতে প্রবেশ করে সেখানকার আদিবাসীদের লবণের উৎসগুলোর দখল নেয়। স্প্যানিশরা এ অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার করতে লবণের গুরুত্ব খুব ভালোভাবেই বুঝেছিল। তাঁরা খেয়াল করেছিল কীভাবে নিজেদের স্বাধীনতা রক্ষা ও আজটেকদের অত্যাচার থেকে বাঁচতে টলাটোক গোষ্ঠী লবণ খাওয়া ছেড়ে দিয়েছিল।

লবণের দখল আর স্বাধীনতার আরো নমুনা ইতিহাসে দেখা যায়।

আমেরিকার গৃহযুদ্ধ নিয়ে ১৯৩৯ সালে নির্মিত ক্লাসিক চলচ্চিত্র ‘গন উইদ দ্য উইন্ড’ দেখিয়েছে যে, যুদ্ধের সময় দক্ষিণাংশে একটি কামানও তৈরি হয়নি। তবে দক্ষিণের পরাজয়ে এ অস্ত্র সংকটই একমাত্র কারণ নয়। ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে দক্ষিণে পর্যাপ্ত পরিমাণ লবণ উৎপাদন হয়নি। দক্ষিণের গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য ভার্জিনিয়া, কেন্টাকি, ফ্লোরিডা ও টেক্সাস মিলে উৎপাদন করেছিল ২৩ লাখ ৬৫ হাজার বুশেল লবণ আর নিউইয়র্ক, ওহিও ও পেনসিলভানিয়া উৎপাদন করেছিল ১ কোটি ২০ লাখ বুশেল লবণ। লবণ উৎপাদনের এ পার্থক্য গৃহযুদ্ধের জয়-পরাজয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ যুক্তরাষ্ট্র লবণের বিরাট ভোক্তা হয়ে ওঠে, আমেরিকানরা ইউরোপীয়দের চেয়ে বেশি লবণ গ্রহীতা হয়ে পড়ে। উত্তরাংশের রাজ্যগুলোয় প্রচুর লবণ উৎপাদনক্ষেত্র গড়ে ওঠে। তবে তখনো যুক্তরাষ্ট্রের লবণের চাহিদার বেশির ভাগ মেটানো হতো আমদানি থেকে, যদিও এ আমদানির কারণ ছিল মূলত দক্ষিণের রাজ্যগুলো। অর্থাৎ গৃহযুদ্ধ চলাকালে লবণ উৎপাদনে উত্তরাংশ বহুগুণে এগিয়ে ছিল দক্ষিণের কনফেডারেটদের চেয়ে। জর্জ ওয়াশিংটন থেকে নেপোলিয়নের মতো জেনারেলরা ভালোভাবেই বুঝেছিলেন যে লবণ মজুদ বা পর্যাপ্ত সরবরাহ না রেখে যুদ্ধ করতে নামাটা বোকামি। নেপোলিয়ন যখন রাশিয়া থেকে পিছু হটছিলেন, তখন তাঁর সেনাবাহিনীর হাজার হাজার সদস্য সামান্য ক্ষত থেকেই মৃত্যুবরণ করছিল। কারণ তাঁদের কাছে ক্ষতের জীবাণুনাশক হিসেবে পর্যাপ্ত লবণ ছিল না। লবণ যে শুধু সেনাবাহিনীর খাবার ও ওষুধ হিসেবে কাজে লাগে তা নয়, অশ্বারোহী বাহিনীসহ অন্য ইউনিটগুলোর ঘোড়ার খাবার, সেনাদের খাবার ও সংরক্ষিত পশুপালের জন্যও প্রচুর লবণ প্রয়োজন হতো।

লবণ বাণিজ্য দুনিয়ার পরিবহন ব্যবস্থার বিকাশে বৈপ্লবিক ভূমিকা রেখেছিল। কথাটা মোটেই বাড়িয়ে বলা নয়। যেমন— জার্মানির উত্তরাংশ ও যুক্তরাষ্ট্রের খালগুলো। অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগে বিজ্ঞানের নতুন নতুন আবিষ্কারে দুনিয়া দ্রুত বদলাতে শুরু করে। লবণ উৎপাদনের চাহিদা নতুন কারখানা ও পদ্ধতির সৃষ্টি করে।

ব্রিটিশরা ভারতে স্থানীয় বাণিজ্য ধ্বংসের জন্য বিভিন্ন কালাকানুন তৈরির আগে এখানে লবণের পর্যাপ্ত ও সহজ জোগান ছিল। ভারতের অনেক জায়গাতেই লবণের উৎস ছিল না কিন্তু উপকূলীয় অঞ্চলে প্রচুর লবণ উৎপাদন হতো এবং বিভিন্ন স্থানে লবণযুক্ত শিলা ও লবণাক্ত হ্রদ ছিল। তাই ভারতে কখনই লবণের কোনো সংকট ছিল না। লবণ উৎপাদনের বিবরণী প্রাচীনকালেই পাওয়া যায়। তবে তখন ধার্মিক হিন্দুরা সাগরের নোনা জল শুকিয়ে তৈরি লবণ ছাড়া অন্য কোনো উৎসের লবণ ব্যবহার করত না। ভারতের পশ্চিম উপকূল গুজরাটে লবণ উৎপাদনের ইতিহাস পাঁচ হাজার বছর পুরনো। নয় হাজার বর্গমাইল বিস্তৃত ‘কচ্ছের রান’ জলাভূমির সঙ্গে সাগরের সংযোগ আছে। এখানকার জল শুকিয়ে লবণ তৈরি হতো। কলকাতার উপকূলেও লবণ তৈরি হতো। বর্তমান পাকিস্তান উপকূলেও ছিল লবণ তৈরির ইতিহাস। বাংলায় ব্রিটিশরা ওড়িশার লবণ দিয়ে বাণিজ্য করত। আঠারো শতকে ফরাসিদের সঙ্গে ব্রিটিশদের যুদ্ধে তাঁদের গানপাউডারের জন্য প্রয়োজনীয় লবণের বেশির ভাগ এসেছিল ওড়িশা থেকে। ব্রিটিশরা আসার আগে থেকেই ভারতে লবণের পরিবহন ও বাণিজ্যে সামান্য করের প্রচলন ছিল। তবে ব্রিটিশরা এসে তাঁদের বাণিজ্য স্বার্থকেই প্রাধান্য দিয়েছিল। ইংল্যান্ডে উৎপাদিত লবণ দামে ও মানে ওড়িশার লবণের সামনে কুলোতে পারত না। ১৭৯০ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশরা ওড়িশায় উৎপাদিত সব লবণ কিনে নেয়ার অনুরোধ করে। কিন্তু ওড়িশার মারাঠা গভর্নর রঘুজি ভোঁসলা ব্রিটিশদের অসৎ উদ্দেশ্য বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন এ লবণের দখল নিয়ে তাঁরা তাঁদের দেশে উৎপাদিত লবণ এ দেশে চড়া দামে বিক্রির পরিকল্পনা করছে। রঘুজি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় ব্রিটিশরা বাংলায় ওড়িশার লবণ বিক্রি নিষিদ্ধ করে। লবণ নিয়ে ব্রিটিশদের এ বাণিজ্য মনোভাব পরবর্তীতে আরো নানা ফন্দি-ফিকির করেছিল। তখন বাংলা আর ওড়িশার সীমান্তে শুরু হয় লবণ চোরাচালান। পরবর্তীতে ব্রিটিশরা ওড়িশা দখল করে নেয় এবং ১৮০১ খ্রিস্টাব্দে এক ঘোষণার মাধ্যমে সেখানকার লবণের ওপর নিজেদের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব দাবি করে। বেসরকারি ব্যাবসায়ীদের লবণ বিক্রি নিষিদ্ধ করা হয়। যেসব ব্যবসায়ীর লবণের মজুদ ছিল, তাঁদের নির্ধারিত দামে সেগুলো সরকারের কাছে বিক্রি করতে বাধ্য করা হয়। ১০ বছরের মধ্যে ভারতে ব্রিটিশরা বাদে অন্য সবার লবণ উৎপাদন বন্ধ করে দেয়া হয়। আবার পরবর্তীকালে গান্ধীজি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লবণ আইন ভঙ্গ করে লবণ সত্যাগ্রহ আন্দোলন করেছিলেন।

প্রগৈতিহাসিক কাল থেকেই লবণ মানবসভ্যতার অবিচ্ছেদ্য উপাদান। আজকের দিনে লবণের অঢেল সরবরাহের কারণে এর গুরুত্ব সেভাবে অনুভূত হয় না। তবে ইতিহাসে পেছনের দিকে তাকালে লবণের গুরুত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ধর্ম, পুরাণ, যুদ্ধ, প্রযুক্তি ও যোগাযোগ ব্যবস্থার বিকাশ— সবখানেই পাওয়া যায় লবণের উপস্থিতি।