বিজ্ঞান

অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করে কীভাবে

জ্বর হয়েছে, গা হাত-পায়ে সামান্য ব্যথা? ডাক্তার প্রেসক্রিপশনে লিখে দিলো অ্যাজিথ্রোমাইসিন ট্যাবলেট। ওষুধের দোকানে বলে দিলো এটা অ্যান্টিবায়োটিক। পরে অনেকবারই শুনেছেন নামটা – অ্যান্টিবায়োটিক। কিন্তু শুধুই জ্বর-জ্বালা নয়, আরো অনেক জীবাণুঘটিত রোগের উপশম করতে অ্যান্টিবায়োটিক অব্যর্থ ব্রহ্মাস্ত্র। ‘অ্যান্টি’ কথার মানে জানেন যে বিরোধী। প্রশ্ন হল কীসের বিরোধী? কী এই অ্যান্টিবায়োটিক এবং আমাদের শরীরকে সুস্থ করে তোলার জন্য অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করে কীভাবে? চলুন জেনে নেওয়া যাক।

‘অ্যান্টিবায়োটিক’ এমন একধরনের ওষুধ যা জীবাণু সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করে ও জীবাণুদের ধ্বংস করে। ১৯২৮ সালে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী আলেকজাণ্ডার ফ্লেমিং (Alexander Fleming) সর্বপ্রথম অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কার করেন যার নাম পেনিসিলিন (penicillin)। এই কাজের জন্য বিজ্ঞানী ফ্লেমিং ১৯৪৫ সালে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। এরপর বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীরা অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে আবিষ্কার করতে থাকেন একের পর এক অ্যান্টিবায়োটিক। ফলে সমগ্র বিশ্ববাসী জানতে পারে অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করে কীভাবে ।

রোগজীবাণু প্রতিরোধক ওষুধকে সাধারণভাবে ‘অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল’ বলা হয়ে থাকে। শব্দটির আক্ষরিক অর্থ ‘জীবাণুর বিরুদ্ধে’ (against of microbes)। এটি বিভিন্ন ধরনের হয় যেমন- অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল (ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধী), অ্যান্টিভাইরাল (ভাইরাস প্রতিরোধী), অ্যান্টিফাঙ্গাল (ছত্রাক প্রতিরোধী), অ্যান্টিপ্যারাসাইটিক (পরজীবী প্রতিরোধী) ইত্যাদি। এদের মধ্যে অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল ওষুধকে সাধারণভাবে অ্যান্টিবায়োটিক বলা হয়ে থাকে। একটি অ্যান্টিবায়োটিক যদি একটি নির্দিষ্ট প্রজাতির ব্যাকটেরিয়ার উপর কার্যকারী হয় তাহলে তাকে বলে ন্যারো-স্পেকট্রাম (narrow-spectrum) অ্যান্টিবায়োটিক। অপরপক্ষে যদি একটি অ্যান্টিবায়োটিক অনেকগুলি প্রজাতির ব্যাকটেরিয়ার উপর কার্যকরী হয়, তবে তাকে বলে ব্রড-স্পেকট্রাম (broad-spectrum) অ্যান্টিবায়োটিক।


প্রাকৃতিক খাঁটি মধু ঘরে বসেই পেতে চান?

ফুড হাউস মধু

তাহলে যোগাযোগ করুন – +91-99030 06475


 


যখন আমরা কোনো অ্যান্টিবায়োটিক ক্যাপসুল বা সিরাপ খাই, এটি আমাদের পরিপাকনালিতে প্রবেশ করে এবং খাদ্যের পরিপোষক পদার্থের মতোই রক্তে শোষিত হয়ে যায়। সংক্রমণ গুরুতর আকার ধারণ করলে ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে সরাসরি অ্যান্টিবায়োটিক রক্তে মিশিয়ে দেওয়া হয়। এরপর প্রধানত নিম্নলিখিত পদ্ধতি অবলম্বন করে অ্যান্টিবায়োটিকগুলি জীবাণু ধ্বংস করে —

  • কোষপ্রাচীর ধ্বংস করে দেওয়া: বেশিরভাগ ব্যাকটেরিয়া একটি কোষপ্রাচীর গঠন করে যার প্রধান উপাদান হল পেপটাইডোগ্লাইক্যান (peptidoglycan)। এটি তৈরি হয় অ্যামিনো শর্করা (amino sugar) ও পেপটাইড অণু দিয়ে। মানুষ বা অন্যান্য প্রাণীকোষে এই পদার্থটি থাকে না। পেনিসিলিনের মতো কিছু অ্যান্টিবায়োটিক এই পদার্থটির সংশ্লেষণের চূড়ান্ত ক্রস-লিঙ্কিং ধাপ বা ট্রান্সপেপটাইডেশনকে (transpeptidation) বন্ধ করে দেয়। ফলে পেপটাইডোগ্লাইক্যানের অনুপস্থিতির কারণে কোষপ্রাচীর ভঙ্গুর হয়ে যায় যা সহজেই ফেটে গিয়ে ব্যাকটেরিয়াকে নষ্ট করে দেয়। কোষপ্রাচীরহীন ব্যাকটেরিয়ার (যেমন- Micoplasma sp.) উপর এই ধরণের অ্যান্টিবায়োটিক কোনো প্রভাব ফেলতে পারে না। মানুষের শরীরের কোনো জৈবরাসায়নিক প্রক্রিয়াকে এই ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক বাধা না দেওয়ায় এটি মানব শরীরের জন্য নিরাপদ।
  • বিপাকীয় পথকে বাধা দেওয়া: ব্যাকটেরিয়ার বিপাকীয় পদ্ধতির উপর আক্রমণ করে কিছু অ্যান্টিবায়োটিক তাদের ধ্বংস করে। সমস্ত কোষেই ফোলিক অ্যাসিড বা ভিটামিন বি-এর প্রয়োজন হয় এবং এটি সহজেই মানুষের কোষে ব্যাপন প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করতে পারে। কিন্তু ব্যাকটেরিয়া কোষে কোষপ্রাচীর ভেদ করে এটি সহজে প্রবেশ করতে না পারায় ব্যাকটেরিয়ারা নিজেরাই এটিকে তৈরি করে নেয়। সালফার ঘটিত ওষুধ যেমন সালফোনামাইডস (salfonamides) ব্যাকটেরিয়া কোষে ভিটামিন উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসেচক ডাইহাইড্রোপটেরোয়েট (dihydropteroate) সংশ্লেষণে বাধা দেয়। ফলে ভিটামিন সংশ্লেষণ বন্ধ হয়ে যায় এবং ব্যাকটেরিয়াগুলি বাড়তে পারে না।
  • নিউক্লিক অ্যাসিড সংশ্লেষণ বন্ধ করে দেওয়া: ব্যাকটেরিয়া এবং মানুষ উভয়ের কোষেই ডিএনএ’র প্রতিলিপিকরণ (replication) ঘটে। দুটি ক্ষেত্রে এটির পদ্ধতি এতটাই আলাদা যে ফ্লুরোকুইনোলন (fluroquinolone) জাতীয় অ্যান্টিবায়োটিক যার নাম ‘সিপ্রোফ্লোক্সাসিন’ (ciprofloxacin) বিশেষভাবে ব্যাকটেরিয়া কোষে প্রতিলিপিকরণের জন্য প্রয়োজনীয় উৎসেচক ডিএনএ গাইরেজকে (DNA gyrase) আক্রমণ করে। এই উৎসেচক ক্রোমোজোমাল ডিএনএ-র প্যাঁচ খুলে প্রতিলিপিকরণ পদ্ধতিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করে। গাইরেজ উৎসেচক নষ্ট হয়ে গেলে ব্যাকটেরিয়ার নিউক্লিক অ্যাসিডের প্রতিলিপিকরণ বন্ধ হয়ে যায় ও ব্যাকটেরিয়া বংশবিস্তার করতে না পেরে আস্তে আস্তে নষ্ট হয়ে যায়।
  • প্রোটিন সংশ্লেষণ বন্ধ করে দেওয়া: আরেক ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক ‘টেট্রাসাইক্লিন’ (tetracycline) প্রোটিন সংশ্লেষণ বন্ধ করে ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি রোধ করে। ব্যাকটেরিয়া এবং মানুষ উভয়ই রাইবোজোম নামক কাঠামোর উপর প্রোটিন সংশ্লেষণ করে। টেট্রাসাইক্লিন ব্যাকটেরিয়ার কোষঝিল্লি অতিক্রম করতে পারে এবং সাইটোপ্লাজমে উচ্চ ঘনত্বের মধ্যে জমা হতে পারে। টেট্রাসাইক্লিন তখন রাইবোজোমে একটি একক সাইটে আবদ্ধ হয়, ৩০এস (30S) রাইবোসোমাল সাব ইউনিট এবং একটি মূল আরএনএ মিথস্ক্রিয়াকে ব্লক করে যা দীর্ঘায়িত প্রোটিন শৃঙ্খল তৈরি বন্ধ করে দেয়। এর ফলে প্রোটিনের অভাবে ব্যাকটেরিয়া নষ্ট হয়ে যায়। তবে মানবকোষে প্রোটিন সংশ্লেষণ বন্ধ করার জন্য টেট্রাসাইক্লিন পর্যাপ্ত পরিমাণে জমা হয় না।

এই প্রক্রিয়াগুলি বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিভিন্ন হয়। সাধারণত অ্যান্টিবায়োটিক নির্দিষ্ট ব্যাকটেরিয়া কোষ ছাড়া শরীরের অন্যান্য কোষকে আক্রমণ করে না। ফলে এটি শরীরের জন্য অনেকটাই নিরাপদ। অ্যান্টিবায়োটিকের একটি সাধারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হল ডায়েরিয়া। এটি গ্রহণ করলে ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের ক্ষুদ্রান্ত্র ও বৃহদন্ত্রে অবস্থিত উপকারী ব্যাকটেরিয়াগুলিও ধ্বংস হয়ে যায়। ফলে পাচিত খাদ্যের শোষণ ও আত্তীকরণ ব্যাহত হয়। এই ঘটনা এড়িয়ে যাওয়ার জন্য অনেক সময় চিকিৎসকেরা অ্যান্টিবায়োটিকের সঙ্গে ‘প্রোবায়োটিক’ (probiotic) ওষুধ খাওয়ার পরামর্শ দেন। এর প্রভাবে বন্ধু-ব্যাকটেরিয়াগুলি পুনরায় আমাদের দেহে ফিরে আসে এবং আমাদের শরীর ঠিক থাকে। এছাড়াও অ্যান্টিবায়োটিকের কিছু সাধারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হল বমি-বমি ভাব, বমি, পেশিতে যন্ত্রণা ইত্যাদি।

যেকোনো অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক সেবন উপকারের বদলে শরীরের ক্ষতি করে। প্রয়োজনের চেয়ে বেশি অ্যান্টিবায়োটিক দেহে প্রবেশ করলে অনেক জটিলতা দেখা দিতে পারে যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল –

  • শিশুদের প্রাণঘাতী ডায়েরিয়া রোগ হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়।
  • অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক অন্ত্রে উপস্থিত সংবেদনশীল উপকারী ব্যাকটেরিয়াগুলিকে নষ্ট করে দেয়।
  • অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিকের ফলে নিরাময়-অযোগ্য গনোরিয়ার ঘটনা বাড়ছে।
  • শরীরের রোগ প্রতিরোধ করার ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। ভবিষ্যতে কাজ করে না কোনো সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিক। ফলে বেড়ে যায় হাসপাতাল ও ওষুধের খরচ।

অপরপক্ষে প্রয়োজনের চেয়ে কম মাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করলে বা কোনো অ্যান্টিবায়োটিকের কোর্স সম্পূর্ণ না করলে শরীরের সমস্ত ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়াগুলি পুরোপুরি নষ্ট হয় না। যে ব্যাকটেরিয়াগুলি জীবিত থেকে যায় তারা এর বিরুদ্ধে বেঁচে থাকার শক্তি অর্জন করে। আমাদের শরীরে কোনো জীবাণুকে প্রতিরোধ করার জন্য টিকা বা ভ্যাকসিন দিলে আমাদের শরীরে যেমন ওই নির্দিষ্ট জীবাণুর বিরুদ্ধে রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা জন্মায়, ঠিক তেমনই প্রয়োজনের তুলনায় কম মাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক ব্যাকটেরিয়াদের ক্ষেত্রে টীকার মতো কাজ করে। তারা এমনভাবে নিজেদের অভিযোজিত করে নেয় যে ওই নির্দিষ্ট অ্যান্টিবায়োটিক আর তাদের ধ্বংস করতে পারে না। এই ব্যাকটেরিয়াগুলি থেকে সৃষ্ট অপত্য ব্যাকটেরিয়ারাও ওই অ্যান্টিবায়োটিকের প্রতিরোধী হয়ে দাঁড়ায়। ফলে ব্যাকটেরিয়াগুলি ক্রমশ ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে থাকে। এই ঘটনাকে বলে ‘অ্যান্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্স’ (antibiotic resistance) এবং ব্যাকটেরিয়াগুলিকে বলা হয় ‘সুপারবাগ’ (supar bug) বা সুপার ব্যাকটেরিয়া (supar bacteria)। সেজন্য সামান্য অসুস্থ হলেই দোকান থেকে অ্যান্টিবায়োটিক কিনে না খেয়ে চিকিৎসকের পরামর্শমতো সঠিক ওষুধ সঠিক পরিমাণে খাওয়া উচিত।

অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করে কীভাবে এবং অ্যান্টিবায়োটিকের সঠিক ব্যবহার না করলে কী ক্ষতি হতে পারে আশা করা যায় তা এখানে সহজভাবে বোঝা গেল।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুকে নিয়ে জানা-অজানা তথ্য


নেতাজী

ছবিতে ক্লিক করে দেখুন এই তথ্য