সববাংলায়

পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের বোতল চিনবেন কিভাবে

আপনি কি পুরানো প্লাস্টিকের বোতলে জল পান করেন? ঠান্ডা পানীয়ের বোতলগুলো বাড়িতে পুনর্ব্যবহারের জন্য রেখে দিয়েছেন? যদি উত্তরটা হ্যাঁ হয়, তাহলে সতর্ক হোন। সব রকমের প্লাস্টিক সামগ্রী দীর্ঘদিন ব্যবহার করা স্বাস্থ্যসম্মত নয় এবং শরীরের জন্য একদম নিরাপদও নয়। তবে পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের বোতল চিনবেন কিভাবে – এই প্রশ্ন যদি মনের মধ্যে ঘোরে তাহলে জেনে রাখা ভাল যে তার জন্য বিশেষ কষ্ট করতে হবে না, শুধু প্লাস্টিকের বোতল বা পাত্রের ঠিক তলায় দেখতে হবে। সেখানে দেওয়া বিশেষ সাংকেতিক চিহ্ন থেকে সহজেই বোঝা যায় প্লাস্টিকের বোতলটি আবার ব্যবহার করা যাবে কিনা। বাড়ি বা কর্মস্থলে আপনার নাগালে থাকা প্লাস্টিক পণ্যের নিচে একপলক চোখ বুলিয়ে নিন – সেখানে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের ভিত্তিতে আগে থেকে ঠিক করা তিনকোনা রিসাইক্লিং চিহ্ন ও তার মধ্যে থাকা সংখ্যা খুব গুরুত্বপূর্ণ।

পূনর্ব্যবহারঅযোগ্য প্লাস্টিক চিনবেন কিভাবে
চিত্র – ১

কোন প্রকার প্লাস্টিকের বোতল বা পাত্র পুনরায় ব্যবহার করা যাবে, ব্যবহার করা কতটা নিরাপদ হবে— রিসাইক্লিং চিহ্নের ভিতরে লেখা এই নম্বরই তার আভাস দেয়। কোন ধরনের প্লাস্টিক স্বাস্থ্যসম্মত, কোন প্লাস্টিক কি প্রকার পলিমার নিয়ে তৈরি এবং তা কি কাজের জন্য ব্যবহার করা উচিত — সব তথ্যই দেয় ওই সংখ্যা। ঘড়ির কাঁটার দিকে ঘুরন্ত ত্রিভুজের ছবির মধ্যে এক থেকে শুরু করে সাত পর্যন্ত যে কোনো সংখ্যা থাকতে পারে।একে বলে প্লাস্টিক আইডেন্টিফিকেশন কোড (PIC)।১৯৮৮ সালে সোসাইটি অফ প্লাস্টিক ইন্ডাস্ট্রিস এই সংকেত প্রথম ব্যবহার শুরু করে।যদি ত্রিভুজের মধ্যে কোনো সংখ্যা না থাকে তাহলে তা সার্বজনীন পুনর্ব্যবহারযোগ্য পলিমার দিয়ে তৈরি।

প্লাস্টিক চিনবেন কিভাবে
প্লাস্টিক আইডেন্টিফিকেশন কোড

ইংরেজিতে শূন্য এক বা শুধু এক (01/1) লেখা বোতল বা পাত্রগুলি পলিথিন টেরিপথলেট পলিমার (PET/PETE) দিয়ে তৈরি। এগুলো পরিষ্কার রাখা কঠিন ও পুনর্ব্যবহারে দুর্গন্ধ আসে। বিশেষত ঠোঁট লাগিয়ে পানীয় গ্রহণ করলে ও দীর্ঘদিন ব্যবহার করলে ব্যাকটেরিয়া ও জীবাণু দ্রুত বৃদ্ধি পায়। সূর্যের আলো ও অন্য তাপের উৎসের সংস্পর্শে এলে এই প্রকার প্লাস্টিকের ক্ষয় ঘটে। ঠান্ডা পানীয়, জ্যামের পাত্র, কেনা জলের বোতল ও তেল রাখার জন্য এ জাতীয় প্লাস্টিক ব্যবহার করা হয়। এগুলি রাসায়নিকভাবে রিসাইকেল (recycle) করা হয় এবং পুনর্ব্যবহার করা স্বাস্থ্যসম্মত নয়।

দ্বিতীয় প্রকার (02) প্লাস্টিক হল হাই ডেনসিটি পলিথিন অর্থাৎ এই ধরণের প্লাস্টিক উচ্চ ঘনত্বের পলিথিলিন; যা সংক্ষেপে এইচডিপিই (HDPE) নামেও পরিচিত। এই প্লাস্টিক শক্ত ও স্বচ্ছ; যা কিছুটা উচ্চ তাপমাত্রায় রাখা যেতে পারে। এই ধরণের প্লাস্টিকের সামগ্রী সবচেয়ে নিরাপদ। এ ধরনের প্লাস্টিক সাধারণত বাচ্চাদের খেলনা, দুগ্ধ জাত সামগ্রী, জুস, ভালো জলের বোতল ও খাবার প্যাকেজিংয়ে ব্যবহার করা হয়। এই প্রকার প্লাস্টিক ফ্রীজের ঠান্ডা ও সামান্য গরমেও ব্যাবহার করা যায়। এগুলো যেমন রিসাইকেল করাও যায় তেমনই বাড়িতে পুনর্ব্যবহার যোগ্য।

তৃতীয় প্রকার (03) প্লাস্টিক হল পলি ভিনাইল ক্লোরাইড (PVC)। নিত্য দিনের ব্যবহারের জন্য এই প্রকার প্লাস্টিক অনুপযোগী। ফিল্ম, পাইপলাইন, বিভিন্ন ইনফ্লাটেবল জিনিস ও বর্ষাতি পোশাক তৈরির জন্য ব্যবহার করা হয়। যেহেতু পিভিসি অনেক রকম দূষিত রাসায়নিক নিঃসরণ করে তাই  একে বিষাক্ত প্লাস্টিক বলে। তাই খাদ্য সামগ্রী কোনোভাবেই এই প্রকার প্লাস্টিকের সংস্পর্শে রাখা উচিত নয়।

চতুর্থ প্রকার (04) প্লাস্টিক হল লো ডেনসিটি পলিথিন (LDPE )। এ ধরনের প্লাস্টিক কম ঘনত্বের পলিথিলিন। এগুলো স্বচ্ছ ও বাঁকানো যায়। এটি ফ্রীজে রাখা খাদ্যের মোড়ক তৈরীতে এবং নমনীয় খাদ্য ( যেমন- মধু, জেলি, তেল) প্যাকিং করতে এই প্লাস্টিক ব্যবহার করা হয়। বেশির ভাগ বাজারের ব্যাগ এই প্লাস্টিক থেকে তৈরি। এই নম্বরযুক্ত প্লাস্টিক নিরাপদ।এগুলো পুনর্ব্যবহার যোগ্য কিন্ত সবগুলো রিসাইকেল করা যায় না অর্থাৎ পরিবেশ দূষণ ঘটায়।

পঞ্চম প্রকার (05) প্লাস্টিক হল পলিপ্রপিলিন (PP) যা কোনো রকম ক্ষতি ছাড়াই বহুদিন ব্যবহার করা যায়। রান্নাঘরের ব্যবহৃত বিভিন্ন জিনিস ও মাইক্রোওয়েভে ব্যবহার যোগ্য পাত্র, কাপ, স্ট্র, টেপ, দড়ি, বোতলের মুখ ইত্যাদি তৈরিতে এই প্লাস্টিক ব্যবহার করা হয়। এগুলো রিসাইকেল যোগ্য এবং শক্ত ও হালকা হওয়ায় প্রচুর ব্যবহার হয়। এগুলো তাপ, আর্দ্রতা, রাসায়নিক ইত্যাদি থেকে খাদ্য সমগ্রীকে রক্ষা করে।

ষষ্ঠ প্রকার (06) প্লাস্টিক হল পলিস্টিরিন (PS) যা মূলত প্যাকিংয়ের কাজে ব্যবহৃত হয়। পেট্রোলিয়াম থেকে তৈরি হওয়া এই প্রকার প্লাস্টিক বেশ ক্ষতিকর। সিডি, ডিভিডি বা ডিম বহনের কার্টুন ইত্যাদি তৈরিতে এই প্লাস্টিক ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এতে উপস্থিত রাসায়নিক আমাদের স্বাস্থ্য ও প্রজনন তন্ত্রে কুপ্রভাব ফেলে। এই ধরণের প্লাস্টিক যাতে কম ব্যবহার হয় তার জন্য সচেতনতার প্রয়োজন। এগুলো খুব একটা রিসাইকেলও হয় না। এই প্লাস্টিকে খাদ্য রেখে গরম করলে স্টাইরিন নামক ক্যান্সার সৃষ্টিকারী কারসিনোজেন খাদ্যে মিশতে পারে। তাই এই প্লাস্টিক ব্যবহার থেকে সাবধান থাকতে হবে।

সপ্তম প্রকার (07) প্লাস্টিক অন্যান্য সব ধরণের প্লাস্টিক বা পলি কার্বনেট (PC)দের বোঝায়। এগুলির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট রিসাইক্লিং পদ্ধতি বা ব্যবহার পদ্ধতি নেই। এই ধরণের প্লাস্টিক বাচ্চাদের দুধের বোতল, ফিডার, গাড়ির যন্ত্রাংশ, সিপার, বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিক সামগ্রী তৈরিতে এই প্লাস্টিক ব্যবহৃত হয়।

যে সমস্ত রাসায়নিক পদার্থ দিয়ে বোতল বা পাত্র তৈরি করা হয় তার ক্ষতিকারক প্রভাব এর মধ্যে রাখা খাদ্য বা পানীয়তে যেতে পারে। তাই নিজের ও পরিবারের সুরক্ষার জন্য অপুনর্ব্যবহারযোগ্য  প্লাস্টিকের বোতল ও পাত্রের মায়া ছাড়তে হবে। একই সঙ্গে পরিবেশও যাতে দূষিত না হয় তাই এগুলো যত্রতত্র না ফেলে রিসাইকেল করার জন্য ডাস্টবিনে ফেলতে হবে। পাশাপাশি, আশেপাশের মানুষকে প্লাস্টিকের অপকারিতা সম্বন্ধে সচেতন করতে হবে। জনসচেতনতাই প্লাস্টিকের বিরুদ্ধে লড়াই করার একমাত্র হাতিয়ার।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading