খেলা

আইস হকি খেলা

আইস হকি

হকি খেলারই একটি বিশেষ রূপভেদ আইস হকি (Ice Hockey) যা কিনা মূলত শীতকালীন অলিম্পিক গেমসে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। কানাডার সবথেকে জনপ্রিয় দলগত আউটডোর খেলা এই খেলা। এমনকি এই খেলা কানাডার জাতীয় খেলা হিসেবেও স্বীকৃতি পেয়েছে। এছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উত্তরাঞ্চল, উত্তর ও পশ্চিম ইউরোপ ইত্যাদি অঞ্চলে এই খেলা অত্যন্ত জনপ্রিয়। মূলত ছয়জন খেলোয়াড়ের দুটি দলের মধ্যে একটি পাক (Puck)-কে জালের ভিতরে পাঠানোর চেষ্টা চলে এই খেলায়। বরফের উপর স্কেটিং করে খেলা হয় বলে এই খেলার নাম আইস হকি।

১৮০০ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত মনে করা হত ব্রিটিশ ফিল্ড হকি থেকেই এই খেলার উৎপত্তি হয়েছে এবং তা স্কটিশ, আইরিশ অভিবাসী এবং ব্রিটিশ সেনাদের মাধ্যমেই সমগ্র কানাডা জুড়ে এই খেলা ছড়িয়ে পড়েছিল। অনেকে মনে করেন আইরিশ ‘হার্লি’ খেলার অনুসরণে একটি লাঠি আর বলের পরিবর্তে একটি কাঠের ব্লক ব্যবহার করে এই খেলার সূত্রপাত ঘটে। ১৮৬০ সালে কানাডার অন্টারিওর কিংস্টন বন্দরে প্রথম বলের বদলে ‘পাক’ (Puck) ব্যবহার করে খেলা হয়। তাছাড়া একেবারে শুরুর দিকে আইস হকিতে একটি দলে মোট ৩০ জন খেলোয়াড় খেলতেন, কিন্তু সেই নিয়ম পরে বদলে যায়। আইস হকির নিয়মগুলি মূলত ফিল্ড হকি থেকেই নেওয়া হয়েছে। ১৮৭৫ সালে মন্ট্রিলের ভিক্টোরিয়া স্কেটিং রিঙ্কে প্রথম ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে আইস হকি আনুষ্ঠানিকভাবে খেলা হয়। কিন্তু অদ্ভুতভাবে সেই খেলাটি সহিংস চেহারা নেয়। শিন এবং মাথা অনেকের ফেটে গিয়েছিল এবং ভয়ে মহিলা দর্শকরা পালিয়ে গিয়েছিলেন। ১৮৭৭ সালে গঠিত হয় ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটি হকি ক্লাব। এই ক্লাবই প্রথম প্রতি দলে নয়জন করে খেলোয়াড় থাকার নিয়মটি বিধিবদ্ধ করে। ১৮০০ শতকের শেষ দিকে কানাডার সবথেকে জনপ্রিয় খেলা হিসেবে পরিচিত হতে শুরু করে এই খেলা। কানাডার ‘অ্যামেচার হকি অ্যাসোসিয়েশন’ই প্রথম বিশ্বের জাতীয় হকি সংস্থা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ১৮৮৫ সালে মন্ট্রিলে প্রথম আইস হকি লিগ অনুষ্ঠিত হয়। কিংস্টনের মোট চারটি দল এই খেলায় অংশ নিয়েছিল। এই সময় থেকেই প্রত্যেক দলে ৬ জন খেলোয়াড় থাকার নিয়ম হয় এবং বলের বদলে রবারের ‘পাক’ ব্যবহৃত হতে থাকে। তবে আজকের এই আইস হকির রূপ আসতে অনেক সময় লেগেছে। ১৯০৪ সালের দিকে হাউটনে ‘ইন্টারন্যাশনাল প্রফেশনাল হকি লিগ’ অনুষ্ঠিত হওয়ার মধ্য দিয়েই পেশাদারি আইস হকি খেলার সূত্রপাত ঘটে। এর কয়েক বছর পরে মন্ট্রিলে গড়ে ওঠে ‘ন্যাশনাল হকি অ্যাসোসিয়েশন’ (NHA)। খেলার জনপ্রিয়তাও দিন দিন বাড়ছিল, কিন্তু খেলার উপযোগী কৃত্রিম আইস রিঙ্ক (Ice-Rinks) সেভাবে প্রস্তুত ছিল না। ১৯১১ সালে ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটির দুই হকি খেলোয়াড় কানাডীয় ব্যবসায়ী জোসেফ ফ্র্যাঙ্ক প্যাট্রিক এবং তাঁর পুত্র লেস্টার গড়ে তোলে ‘প্যাসিফিক কোস্ট হকি অ্যাসোসিয়েশন’। এই সংগঠনটি ব্রিটেনের ভ্যাঙ্কুভার ও ভিক্টোরিয়া অঞ্চলে দুটি সুগঠিত আইস-রিঙ্ক তৈরি করে। ১৯২০ সালে বেলজিয়ামের অ্যান্টার্পে গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকে প্রথম আইস হকি টুর্নামেন্ট স্থান পেয়েছিল। প্রথমদিকে অলিম্পিকের এই প্রতিযোগিতায় পুরুষ খেলোয়াড়রাই অংশ নিত। ১৯২০ সালের পর থেকেই এই খেলা শীতকালীন অলিম্পিকে স্থান পায়। আর এই শীতকালীন অলিম্পিকে কানাডা আইস হকি টুর্নামেন্টগুলিতে প্রভূত সাফল্য অর্জন করে। মোট ২২টি পদকের মধ্যে ১৩টি স্বর্ণপদক অর্জন করেছিল কানাডা। প্রথম সাতটি শীতকালীন অলিম্পিকের মধ্যে ছয়টিতেই স্বর্ণপদক জিতেছিল কানাডা। তবে ১৯৫৬ সালের পর থেকে সোভিয়েত রাশিয়া দ্রুত সাফল্য অর্জন করতে থাকে।

এই খেলার খেলার প্রধান উদ্দেশ্য হল বরফের উপর একটি হকি স্টিক দিয়ে পাক-কে (Puck) আঘাত করে গোল করা। যে দল যতবার পাকটিকে গোলে পাঠাতে পারে, সেই দল তত পয়েন্ট অর্জন করে। এক্ষেত্রে প্রত্যেক দলের লক্ষ্য হল বিপক্ষ দলকে গোল করা থেকে বিরত করা এবং বাধা দেওয়া। খেলার শেষে যে দল সবথেকে বেশি গোল করতে সক্ষম হয়, সেই দলই বিজয়ী হয়। যদি একান্তই খেলার শেষে দুই দলেরই সমান স্কোর অর্থাৎ টাই (Tie) হয়, সেক্ষেত্রে অতিরিক্ত সময়ে (Overtime) খেলা চলবে এবং সেই সময়ে সর্বোচ্চ গোলদাতা দল বিজয়ী হবে। আইস হকি যে বরফের রিঙ্কের উপর খেলা হয় তা দৈর্ঘ্যে ৬১ মিটার লম্বা এবং প্রস্থে ৩০ মিটার চওড়া। সমগ্র রিঙ্কটি তিন ভাগে বিভক্ত যার মধ্যে রিঙ্কের মাঝের অংশটিকে নিরপেক্ষ অঞ্চল বলা হয় যাতে একটি কেন্দ্রীয় বৃত্ত রয়েছে। এই বৃত্ত থেকেই খেলাটি শুরু হয়। নিরপেক্ষ অংশের উভয় পাশে যথাক্রমে আক্রমণাত্মক এবং রক্ষণাত্মক অঞ্চল রয়েছে। এই অঞ্চলগুলি নির্ধারিত হয় উপস্থিত সময়ে কোন দলের স্টিকে পাক রয়েছে তার উপর ভিত্তি করে। গোলের অংশের সামনে একটি গোল ক্রিজ হিসেবে অর্ধবৃত্ত রয়েছে। প্রতিটি দলে সর্বোচ্চ ২০ জন খেলোয়াড় থাকতে পারে যার মধ্যে কেবলমাত্র ৬ জন খেলোয়াড়ই রিঙ্কে থাকতে পারেন। এদের মধ্যে একজন থাকেন গোল-টেন্ডার এবং বাকি পাঁচজন আউটফিল্ড খেলোয়াড়। আইস হকি খেলায় ব্যবহৃত পাকটি রবারের তৈরি হয় যার ওজন হয় প্রায় ৬ আউন্স। প্রতিটি খেলায় ২০ মিনিটের তিনটি পর্ব থাকে। প্রত্যেক পর্বের শেষে স্টপওয়াচ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে খেলায় গোল করার জন্য খেলোয়াড়কে অবশ্যই গোল লাইনের উপর দিয়ে পাকটিকে আঘাত করতে হবে। তারা তাদের শরীরের কোনও অংশ বা লাঠি ব্যবহার করতে পারলেও হাত ব্যবহার করতে পারে না। ন্যাশনাল হকি লিগের পেশাদার আইস হকি টুর্নামেন্টের ক্ষেত্রে রিঙ্কের গোল লাইনে একটি সেন্সর লাগানো থাকে যা পাকের লাইন স্পর্শ করার সঠিক সময় নির্দেশ করে।

খেলা শুরুর সময় কেন্দ্রীয় বৃত্তে রেফারি দুই দলের বিরোধী খেলোয়াড়ের মধ্যে পাকটি ফেলে দেন। খেলোয়াড়রা তাঁদের শারীরিক শক্তি ব্যবহার করতেই পারেন খেলা চলার সময়ে, কিন্তু কখনোই কাঁধের উপরে উঠতে পারেন না। আক্রমণাত্মক খেলার জন্য কোনও খেলোয়াড় বহিষ্কৃত হলে দুই মিনিট তাঁকে রিঙ্কের বাইরে থাকতে হয় এবং ঐ সময়ের জন্য পাঁচজন খেলোয়াড় নিয়েই সেই দল মাঠে খেলা জারি রাখে। তবে যদি ঐ দল এই দুই মিনিটের মধ্যে একটি গোল করে, তাহলে সত্ত্বর সেই খেলোয়াড় আবার রিঙ্কে ফিরে আসতে পারেন। প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়কে লাঠি দিয়ে ঠেলে দেওয়া, হাত বা লাঠি দিয়ে তাদের ধরে রাখা ইত্যাদি কার্যক্রম শাস্তিযোগ্য বলে বিবেচিত হয় আইস হকি খেলায়। তবে এগুলি গৌণ ‘পেনাল্টি’ (Minor Penalty) হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু খেলার মধ্যে বিপক্ষীয় খেলোয়াড়দের সঙ্গে মারামারি, বারবার গৌণ পেনাল্টি করা কিংবা বিপক্ষের খেলোয়াড়দের চূড়ান্তভাবে আহত করা ইত্যাদি প্রধান পেনাল্টি (Major Penalty) হিসেবে বিবেচিত হয় যার ফলে খেলোয়াড়কে সর্বোচ্চ ৫ মিনিট পর্যন্ত মাঠের বাইরে থাকতে হয়।  

কানাডা, মধ্য ইউরোপ, উত্তর ইউরোপ, পূর্ব ইউরোপ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এই খেলা একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় খেলা। তাছাড়া বেলারুস, ক্রোয়েশিয়া, ফিনল্যান্ড, লাটভিয়া, রাশিয়া, স্লোভাকিয়া, সুইডেন এবং সুইজারল্যান্ডে এই খেলাটি অন্যতম জনপ্রিয় শীতকালীন ক্রীড়া হিসেবে পরিচিত। সমগ্র বিশ্বের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল হকি লিগ ওরফে এনএইচএল (NHL) পুরুষদের আইস হকির সর্বোচ্চ স্তর এবং সবথেকে শক্তিশালী পেশাদার হকি প্রতিযোগিতা। এছাড়া রাশিয়া এবং পূর্ব ইউরোপের মধ্যে অনুষ্ঠিত অন্যতম জনপ্রিয় আইস হকির প্রতিযোগিতা হল কন্টিনেন্টাল হকি লিগ অর্থাৎ কেএইচএল (KHL)। আন্তর্জাতিক স্তরে সমস্ত টুর্নামেন্ট পরিচালনা এবং আইস হকির আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা হল আন্তর্জাতিক আইস হকি ফেডারেশন (IIHF)। এই সংস্থার অধীনে ৭৬টি দেশে আইস হকি ফেডারেশন রয়েছে। আন্তর্জাতিক স্তরে অন্যান্য বিখ্যাত আইস হকি প্রতিযোগিতা হল ইউরোপের চ্যাম্পিয়নস হকি লিগ, কানাডা ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্টার্ন হকি লিগ, সুইডেনের সুইডিশ হকি লিগ, ফ্রান্সের লিগ ম্যাগনাস, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, চিন ও রাশিয়ার মধ্যে প্রচলিত এশিয়া লিগ ইত্যাদি। ১৯২৪ সাল থেকে শীতকালীন অলিম্পিকে আইস হকি প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হতে থাকে নিয়মিতভাবে যেখানে কানাডা, চেক রিপাবলিক, ফিনল্যান্ড, রাশিয়া, সুইডেন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই ছয়টি দেশই সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। পুরুষদের বিভাগে ৬৯টি পদকের মধ্যে ৭টি বাদে বাকি সব পদকই এই ছয়টি দেশই কোনও না কোনও সময় পেয়েছে।

ভারতেও ১৯৮৯ সাল থেকে এই খেলা শুরু হয়। তবে ২০০৯ সাল থেকে ভারতের জাতীয় হকি দল আন্তর্জাতিক স্তরে প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। লাদাখ, উত্তরাখণ্ড, সিকিম, অরুণাচল প্রদেশ, হিমাচল প্রদেশ, জম্মু ও কাশ্মীরের বিভিন্ন প্রান্তে এই খেলার চল রয়েছে। ২০২০ সালে গুলমার্গে আয়োজিত খেলো ইন্ডিয়া উইন্টার গেমসের ক্রীড়া তালিকায় এই খেলা ছিল উল্লেখযোগ্য স্থানে। এছাড়াও ভারতের লাদাখেই বিশ্বের উচ্চতম মহিলা আইস হকি টুর্নামেন্ট আয়োজিত হয়ে থাকে। ভারতের বিখ্যাত আইস হকি ক্লাবগুলির মধ্যে অন্যতম হল লাদাখ উইন্টার স্পোর্টস ক্লাব, ইন্দো-টিবেটান বর্ডার পুলিশ, লাদাখ স্কাউট, সিমলা আইস স্কেটিং ক্লাব, আইস হকি অ্যাসোসিয়েশন অফ মহারাষ্ট্র, মুম্বাই, কার্গিল আইস অ্যান্ড স্নো স্পোর্টস ক্লাব এবং সবশেষে আইস হকি অ্যাসোসিয়েশন অফ উত্তরাখণ্ড।       

   

  • অফিস ও হোম রিলোকেশন

     

    বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন

  • প্যাকার্স ও মুভার্স এর বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান 

    বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

ঈশ্বরচন্দ্র ও তাঁর পুত্রের সম্পর্ক



বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন