১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার সঙ্গে সঙ্গে দেশবিভাজনও এই উপমহাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা ছিল। সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের জন্য ভারত এবং মুসলমানদের জন্য একটি পৃথক রাষ্ট্র পাকিস্তানের দাবি করে লড়াই চালিয়েছিলেন মহম্মদ আলি জিন্নাহরা। অবশেষে তাঁদের সেই দাবি পূরণ হয়েছিল। তবে এই দুই পৃথক রাষ্ট্র স্বাধীনতার পর থেকেই একাধিকবার যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে। অধিকাংশ ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ (Indo-Pakistani war) কাশ্মীরের অধিকারকে কেন্দ্র করে ঘটেছে। তবে কেবল কাশ্মীর নয়, কখনও বাংলাদেশ বা কখনও গুজরাতের কচ্ছ মরু অঞ্চলের কর্তৃত্ব নিয়েও যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে সরকারিভাবে মূলত চারবার ভারত ও পাকিস্তান একে অপরের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে। আমরা এখানে মূলত সেই চারটি ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করব।
১৯৪৭ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ:-
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর ব্রিটিশ ভারত দুটি ভাগে অর্থাৎ ভারত ও পাকিস্তান, এই দুটি রাষ্ট্রে বিভাজিত হয়। এই বিভাজন মূলত ধর্মের ভিত্তিতে হয়েছিল। হিন্দু ও মুসলমানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে এই দুই পৃথক রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল। বিভাজনের পর রাজ্যগুলির সামনে ছিল তিনটি বিকল্প, ভারতে যোগদান, পাকিস্তানে যোগদান অথবা স্বাধীন থাকা। সর্ববৃহৎ প্রিন্সলি স্টেট জম্মু ও কাশ্মীরে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনসংখ্যা এবং হিন্দু জনসংখ্যার একটি বড় অংশ ছিল। জম্মু ও কাশ্মীরকে যখন বেছে নিতে বলা হয় যে তার বিভিন্ন অঞ্চলকে কোন দেশের সঙ্গে যুক্ত করা হবে, তখন কাশ্মীরের মহারাজা হরি সিং প্রাথমিকভাবে কাশ্মীরের স্বাধীনতা চেয়েছিলেন। সেই সময় পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর সহায়তায় উপজাতীয় ইসলামিক বাহিনী জম্মু ও কাশ্মীরের কিছু অংশ আক্রমণ করেছিল। এর ফলে এক যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হয়। এই যুদ্ধ প্রথম কাশ্মীর যুদ্ধ নামেও ইতিহাসে পরিচিত। এই আকস্মিক আক্রমণের ফলে উপায়ন্তর না দেখে মহারাজা হরি সিং সামরিক সহায়তা পাওয়ার জন্য জম্মু ও কাশ্মীরকে ভারতীয় অধিরাজ্যের অন্তর্ভুক্তির চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য হন।
এই সমস্যাটিকে তখন জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের দৃষ্টিগোচর করা হয়েছিল এবং ১৯৪৮ সালের ২২ এপ্রিল রেজোলিউশন ৪৭ পাশ করা হয়েছিল। সেইদিনই নিয়ন্ত্রণ রেখা তৈরি হয়েছিল এবং ১৯৪৯ সালের ১ জানুয়ারি রাত প্রায় বারোটায় যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয়েছিল। জম্মু ও কাশ্মীরের দুই-তিনটি অংশের (কাশ্মীর উপত্যকা, জম্মু ও লাদাখ) নিয়ন্ত্রণ ছিল ভারতের হাতে এবং পাকিস্তান গিলগিট-বালতিস্তান এবং আজাদ কাশ্মীর দখল করে। ভারত সেই অংশগুলিকে পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীর বলে থাকে।
১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ:-
১৯৬৫ সালে সংঘটিত দ্বিতীয় ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধটির কেন্দ্রবিন্দুও ছিল কাশ্মীর। যুদ্ধটি ১৯৬৫ সালের অগাস্ট থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত চলেছিল। ভারতীয় শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের জন্য জম্মু ও কাশ্মীরে পাক সেনাবাহিনীর অনুপ্রবেশের পরই, যা অপারেশন জিব্রাল্টার নামে পরিচিত, এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। যুদ্ধে দুই পক্ষেরই অনেক প্রাণহানি ঘটে এবং উল্লেখ্য যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে এই যুদ্ধই সবচেয়ে বড় ট্যাঙ্কযুদ্ধের দৃষ্টান্ত ছিল।
কাশ্মীর সমস্যা তো চলছিলই, তার পাশাপাশি ১৯৫৬ সালে গুজরাতের কচ্ছ মরু অঞ্চলের কর্তৃত্ব নিয়ে দুই দেশের মধ্যে বিরোধ উপস্থিত হয়। সেই বিরোধ সাময়িক স্থগিত হয় সেই অঞ্চলের কর্তৃত্ব ভারতের হাতে এলে। এরপর, ১৯৬৫ সালের জানুয়ারিতে ভারত নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে পাকসেনা টহল দিতে থাকে। ৮ এপ্রিল উভয়েই কচ্ছ অঞ্চলে একে অপরের পোস্টে আক্রমণ করে। পাকিস্তান অপারেশন ডেজার্ট হক (Operation Desert Hawk) এর সূচনা করে এবং ভারতের কিছু পোস্ট দখলে সমর্থ হয়। দুই পক্ষের মধ্যে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠতে থাকে। জুন মাসে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী হ্যারল্ড উইলসন দুই দেশকেই তাদের শত্রুতা শেষ করতে রাজি করান এবং উভয় দেশই ৩০ জুন আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের মাধ্যমে বিতর্কিত সীমান্ত নিষ্পত্তির জন্য একটি ট্রাইবুনাল গঠন করে। ১৯৬৮ সালে ট্রাইবুনাল রায় দেয় এবং পাকিস্তান কচ্ছ অঞ্চলে দাবিকৃত ৩৫০০ বর্গমাইল ভূমির মধ্যে মাত্র ৩২০ বর্গমাইল ভূমি লাভ করে।
কচ্ছে সাফল্যের পর এবং ১৯৬২ সালে চীনের নিকট ভারতের পরাজয়ের প্রেক্ষিতে ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের নেতৃত্বাধীন পাকিস্তানের ধারণা হয়েছিল কাশ্মীরের বিরোধপূর্ণ অঞ্চলে পাকিস্তানের আকস্মিক ও দ্রুতগতির আক্রমণ ভারতীয় সেনাবাহিনী প্রতিহত করতে সক্ষম হবে না। তাছাড়াও পাকিস্তান মনে করেছিল কাশ্মীরের মানুষ ভারতীয় শাসনের প্রতি অসন্তুষ্ট এবং কিছু অনুপ্রবেশকারী সেখানে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম হবে। তাই পাকিস্তান অপারেশন জিব্রাল্টার পরিচালনার মাধ্যমে কাশ্মীরে কিছু অনুপ্রবেশকারী পাঠিয়ে দেয়। তবে স্থানীয় কাশ্মীরি জনগণ এই ব্যাপারে ভারত সরকারকে সচেতন করে দিলে পাকিস্তানের পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়ে যায়।
পাকিস্তানি সৈন্য কাশ্মীরিদের ছদ্মবেশে লাইন অব কন্ট্রোল অতিক্রম করে গেলে ভারতীয় সৈন্যরা ১৫ আগস্ট যুদ্ধবিরতি রেখা অতিক্রম করে এবং একাধিক গুরুত্বপূর্ণ শৃঙ্গ দখল করে নেয়। ২৮ আগস্টের মধ্যে পাক-অধিকৃত কাশ্মীরের হাজি পীর পাস ভারতীয় সেনা দখল করে নেয়।
১ সেপ্টেম্বর পাকিস্তান জম্মু ও কাশ্মীরের গুরুত্বপূর্ণ শহর আখনুর দখল করে ভারতীয়দের যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করে তাদের রসদ সরবরাহের পথ রুদ্ধ করতে চেয়েছিল। এইজন্যই অপারেশন গ্র্যান্ড স্ল্যামের পরিকল্পনা করে তারা। পাকিস্তানি সৈন্যরা উন্নতপ্রযুক্তির ট্যাঙ্ক নিয়ে গোলাবর্ষণ করতে করতে অগ্রসর হয়। ভারতীয় সৈন্য হতভম্ব হয়ে পড়ে। ভারত সরকার ঠিক করে ভারতীয় বিমানবাহিনীর সাহায্যে পাকিস্তানি আক্রমণ রোধ করবে। কাশ্মীর ও পাঞ্জাবে পাকিস্তানি বিমান হামলা চালালেও অন্যদিকে ভারত পাকিস্তানের পাঞ্জাব আক্রমণ করে ফলে প্রতিরক্ষার জন্য পাকিস্তানকে সৈন্য স্থানান্তর করতে হয় এবং আখনুর শহরের দখল চলে গিয়ে অপারেশন গ্র্যান্ড স্ল্যাম ব্যর্থ হয়ে যায়। কারগিলের নিকটস্থ উচ্চভূমি এবং শ্রীনগর-লেহ রাস্তার দখল পাকিস্তানিরা নিয়ে নিলেও ভারতীয় সেনা তাদের সেখান থেকে হটিয়ে দিতে সক্ষম হয়।
৬ সেপ্টেম্বর ভারতীয় সেনা পশ্চিম সীমান্তে আন্তর্জাতিক সীমা র্যাডক্লিফ লাইন অতিক্রম করে। সেদিনই ইসোগিল খালের পশ্চিম পাড়ে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ হয়।
৬ সেপ্টেম্বর অপর এক প্রান্তে পাকিস্তানের বর্কি শহর ভারতীয় সেনা দখল করে নেয় যা লাহোর বিমানবন্দরের খুবই কাছে অবস্থিত ছিল। এই সময় আমেরিকা, লাহোর থেকে সাধারণ নাগরিকদের বের করে নেওয়ার জন্য সাময়িক যুদ্ধবিরতির জন্য আহ্বান জানায়।
কেবল ট্যাঙ্ক এবং বিমানবাহিনীর সাহায্যে যুদ্ধ ছাড়াও এই যুদ্ধে নৌবাহিনীও বিশেষ ভূমিকা নিয়েছিল। পাকিস্তান নৌবাহিনীর একটি ফ্লোটিলা ভারতীয় নৌবাহিনীর রাডার স্টেশন উপকূলীয় শহর দ্বারকায় বোমাবর্ষণ করে, যা অপারেশন দ্বারকা নামে পরিচিত। তবে ভারত এই যুদ্ধকে মূলত স্থলপথেই রাখতে চেয়েছিল এবং সেই অনুযায়ী পরিকল্পনায় সফলও হয়েছিল।
যুদ্ধের নির্দিষ্ট ফলাফল পাওয়া না গেলেও দুইপক্ষই নিজেদের বিজয়ী বলে দাবি করতে থাকে। ভারত দাবিই করেছিল পাকিস্তানের ১৯২০ বর্গকিমি এলাকা দখল করেছে বলে অন্য দিকে পাকিস্তান দাবি করেছিল তারা ভারতের ৫৫০ বর্গকিমি দখল করেছে বলে। ভারতের দখলীকৃত অংশের মধ্যে মূলত শিয়ালকোট, লাহোর এবং কাশ্মীরের বিভিন্ন উর্বর অংশ ছিল। অন্য দিকে পাকিস্তান ভারতীয় মরু অঞ্চল ও কাশ্মীরের ছাম্ব সেক্টরের দখল নিতে পেরেছিল। নিরপেক্ষ মত অনুসারে, যুদ্ধবিরতির সময় ভারতের পাল্লা ছিল ভারী।
অবশেষে দুই দেশের অনেক ক্ষয়ক্ষতির পরে ২০ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে সর্বসম্মতিক্রমে একটি প্রস্তাব পাশ করে, যেটি ৪৮ ঘন্টার মধ্যে দুই দেশের কাছ থেকে নিঃশর্ত যুদ্ধবিরতি চেয়েছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত রাশিয়া ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে সংঘর্ষের বৃদ্ধি রোধ করার জন্য কূটনৈতিক হাতিয়ার ব্যবহার করেছিল। সোভিয়েত ইউনিয়ন, প্রিমিয়ার আলেক্সি কোসিগিনের নেতৃত্বে , তাসখন্দে (বর্তমানে উজবেকিস্তানে) শান্তি আলোচনার আয়োজন করে, যেখানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী এবং পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি মুহাম্মদ আইয়ুব খান ১৯৬৬ সালের ১০ জানুয়ারি তাসখন্দ ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেন। প্রসঙ্গত, এই আলোচনার পরই লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর রহস্যজনকভাবে মৃত্যু ঘটে।
১৯৭১ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ:-
১৯৭১ সালে সংঘটিত ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সঙ্গে সরাসরিভাবে কাশ্মীর সমস্যা জড়িত ছিল না, বরং মুজিবর রহমানের নেতৃত্বে পূর্ব পাকিস্তান ও ইয়াহিয়া খানের নেতৃত্বে পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে যে সংকট ও যুদ্ধ সৃষ্টি হয়েছিল তারই সঙ্গে ভারত জড়িয়ে পড়েছিল৷ ১৯৭১ সালের এই লড়াই ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার লড়াই। অপারেশন সার্চলাইট এবং ১৯৭১ সালের নৃশংসতার ফলে প্রায় ১০ মিলিয়ন বাঙালি প্রতিবেশী ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল৷ তখন বাংলাদেশের চলমান স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারত হস্তক্ষেপ করেছিল। বাঙালি শরনার্থীদের নিরাপদ আশ্রয় দিতে ভারত সরকার পূর্ব পাকিস্তান-ভারত সীমান্ত খুলে দিয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, আসাম, মেঘালয় এবং ত্রিপুরার সরকার সীমান্তে শরণার্থী শিবির স্থাপন করেছিল। ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী সিদ্ধান্ত নেন যে, লাখ লাখ উদ্বাস্তু গ্রহণের পরিবর্তে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাওয়াই সঙ্গত এবং সেই কারণেই স্বাধীনতাকামী পূর্ব পাকিস্তানের সরকারের প্রতি পূর্ণ সমর্থন প্রকাশ করেন তিনি৷ ১৯৭১ সালের ২৮ এপ্রিল কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভা সেনাপ্রধান জেনারেল স্যাম মানেকশ-কে পূর্ব পাকিস্তানে যেতে নির্দেশ দিয়েছিল৷ দেশত্যাগী পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক অফিসার এবং ভারতীয় রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং (RAW) অবিলম্বে মুক্তিবাহিনী গেরিলাদের নিয়োগ ও প্রশিক্ষণের জন্য ভারতীয় শরণার্থী শিবিরগুলি ব্যবহার করতে শুরু করে, যাদেরকে মূলত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। ১৯৭১ সালের নভেম্বর নাগাদ ভারতীয় সামরিক বাহিনী পাকিস্তানি সৈন্যদের ওপর সরাসরি গুলিবর্ষণ শুরু করেছিল, এমনকি পাকিস্তানি ভূখন্ডে অনুপ্রবেশও করেছিল। ২১ নভেম্বর থেকে মুক্তিবাহিনীর সহায়তায় ভারতীয় বাহিনী পূর্ব পাকিস্তানে প্রবেশ করে এবং আনুষ্ঠানিক যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছিল।
ভারত ক্রমাগত পূর্ব পাকিস্তানের কমরেডদের মনোবল বজায় রাখার চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছিল৷ ২৩ নভেম্বর ইয়াহিয়া খান জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে দেশকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে বলেন। ৩ ডিসেম্বর পাকিস্তান এয়ারফোর্স অপারেশন চেঙ্গিজ খান সম্পন্ন করে। ওইদিন আটটি ভারতীয় বিমানঘাঁটিতে হামলা করে পাকিস্তানি বিমানবাহিনী। এই হামলার পর ইন্দিরা গান্ধী জানান এই বিমান হামলা ছিল ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা। সেইদিন রাতেই ভারতীয় বিমানবাহিনীও পাল্টা আক্রমন করে পাকিস্তানের বিমান হামলার প্রতিক্রিয়া জানায়৷ এইভাবে যুদ্ধ শুরু হয়। তবে যুদ্ধ কেবল বিমানবাহিনীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ভারতীয় নৌবাহিনীও ৪/৫ ডিসেম্বর করাচি বন্দরে আক্রমণ করেছিল। পাকিস্তানও তার পাল্টা জবাব দিয়েছিল। এছাড়াও পাকিস্তানের ওপর মুহুর্মুহু বিমান আক্রমণ চালায় ভারত। অপ্রতিরোধ্য ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী এক পাক্ষিকেরও কম সময়ে আত্মসমর্পণ করে। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানের ইস্টার্ন কমান্ড একতরফা যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানায়।
১৯৯৯ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ:-
১৯৯৯ সালে সংঘটিত ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ সাধারণত কার্গিল যুদ্ধ নামে পরিচিত। ১৯৯৯ সালের গোড়ার দিকে যখন পাকিস্তানি সৈন্যরা এলওসি বা লাইন অব কন্ট্রোল অতিক্রম করে কার্গিল জেলার ভারতীয় ভূখণ্ড দখল করেছিল তখন থেকেই সংকট ও দ্বন্দ্বের সূত্রপাত হয়েছিল। ভারতে এই যুদ্ধকে অপারেশন বিজয় নামে অভিহিত করা হয়।
১৯৮৪ সালে সিয়াচেন হিমবাহকে ঘিরে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে সংঘর্ষ ঘনিয়ে উঠেছিল। অপারেশন মেঘদূতের মাধ্যমে ভারত সিয়াচেন হিমবাহ নিজেদের দখলে আনতে সক্ষম হয়েছিল। ১৯৯০-এর দশকে কাশ্মীরে বিচ্ছিন্নতাবাদী কার্যকলাপের (কয়েকটি পাকিস্তান-সমর্থিতও ছিল) কারণে উত্তেজনা ও সংঘাত বৃদ্ধি পায়। আবার উভয় দেশই সফলভাবে পারমানবিক পরীক্ষা পরিচালনার ফলে একটি যুদ্ধের বাতাবরণ তৈরি হয়েছিল। পরিস্থিতি প্রশমিত করার প্রয়াসে, উভয় দেশই কাশ্মীর সংঘাতের শান্তিপূর্ণ ও দ্বিপাক্ষিক সমাধান প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ১৯৯৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে লাহোর ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করে।
এরপর পাকিস্তানি সশস্ত্র সেনা আধাসামরিক বাহিনী এলওসি-এর ভারতীয় অঞ্চলে অনুপ্রবেশ করে। এই অনুপ্রবেশ ‘অপারেশন বদর’ নামে পরিচিত। এর উদ্দেশ্য ছিল কশ্মীর ও লাদাখের মধ্যে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা এবং ভারতীয় বাহিনীকে সিয়াচেন হিমবাহ থেকে সরিয়ে দেওয়া। এইভাবে পাকিস্তান ভারতকে বৃহত্তর কাশ্মীর সমস্যার নিষ্পত্তিতে আলোচনায় বসতে বাধ্য করে। পাকিস্তানের এও ধারণা ছিল যে, এই অঞ্চলের বিশৃঙ্খলা কাশ্মীর সমস্যাকে আন্তর্জাতিক স্তরে পৌঁছে দেবে এবং এর দ্রুত সমাধান হবে৷ কেউ কেউ অনুমান করেন পাকিস্তানের এই অপারেশনের মূল উদ্দেশ্য ছিল অপারেশন মেঘদূতের প্রতিশোধ নেওয়া। অনেকে মনে করেন ১৯৯৮ সালের অক্টোবর মাসে পারভেজ মোশারফ সেনাবাহিনীর প্রধান নিযুক্ত হওয়ার পরই ভারত আক্রমণের ব্লুপ্রিন্ট পুনরায় সক্রিয় হয়েছিল।
৩ মে কার্গিলে পাকিস্তানিদের অনুপ্রবেশ ঘটে। ভারতীয় সেনারা পাকিস্তানি সেনাদের হাতে বন্দী ও নিহতও হয়েছিলে। ক্রমাগত গোলাবর্ষণ করে ভারতীয়দের অনেক ক্ষতি করে দিয়েছিল পাকসেনারা। মে মাসের মাঝামাঝি ভারত কার্গিলে আরও অনেক সৈন্য মোতায়েন করে। ভারতীয় বিমানবাহিনী সন্দেহভাজন অনুপ্রবেশকারীদের ওপর বিমান হামলাও শুরু করেছিল। ভারতীয় সেনাবাহিনীর সঙ্গে বিমানবাহিনী মিলিত হয়ে যে পাক-বিরোধী অভিযান চালায় তা ‘অপারেশন নিরাপদ সাগর’ নামে পরিচিত। কার্গিল যুদ্ধের অন্তর্গত একটি গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ ছিল তোলোলিং-এর যুদ্ধ, যাতে ভারত সফলতা পায়।
যুদ্ধ চলাকালীন ১৫ জুন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফকে অবিলম্বে কার্গিল থেকে সমস্ত পাকিস্তানি সেনা ও অনিয়মিত সেনাদের প্রত্যাহার করবার কথা বলেন, একপ্রকার বাধ্যই করেন।
তাদের সরকারের চাপে, পাকিস্তানি বাহিনী ভারত-শাসিত কাশ্মীর থেকে তাদের পশ্চাদপসরণ শুরু করে। প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের সঙ্গে বৈঠকের পর নওয়াজ শরিফ আনুষ্ঠানিকভাবে কার্গিল থেকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর প্রত্যাহারের ঘোষণা করেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী অপারেশন বিজয়কে সফল ঘোষণা করেন। এই যুদ্ধে পাকিস্তানের নর্দার্ন লাইট ইনফ্যান্ট্রির অনেক ইউনিট ব্যাপকভাবে হতাহত হয়, ফলে পাকিস্তানি বাহিনীর মনোবল ভেঙে যায়। ২৬ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে কর্গিল যুদ্ধ সমাপ্ত হয়েছিল।
উপরোক্ত চারটি গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ ছাড়াও বিভিন্ন সময়ে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে নানারকম সংঘাত লেগেই আছে। বেলুচিস্তানের বিদ্রোহ, আফগান সংঘাত ইত্যাদি ছাড়াও একাধিকবার ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে সীমান্ত নিয়ে নানারকম সংঘাত লেগেই আছে। আজও ভারত-পাকিস্তান দুটি প্রতিবেশি দেশ প্রায়ই গোলাগুলি বর্ষণে লিপ্ত হয়।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান