ইতিহাস

জামাল নজরুল ইসলাম

মহাকাশ বিজ্ঞানের গবেষণায় স্টিফেন হকিংয়ের মতোই বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ডের মহাকাল নিয়ে চর্চা করেছিলেন বাংলাদেশের বিজ্ঞানী জামাল নজরুল ইসলাম (Jamal Najrul Islam)। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে বাংলার সারস্বত সমাজে স্টিফেন হকিংয়ের মতো জনপ্রিয়তা পাননি তিনি। বিজ্ঞানের গবেষণায় চুড়ান্ত প্রতিভার অধিকারী জামাল নজরুল ইসলাম লণ্ডনের লক্ষ টাকা বেতনের চাকরি ছেড়ে চলে এসেছিলেন চট্টগ্রামের বিশ্ববিদ্যালয়ে শুধুমাত্র বাংলাদেশের বিজ্ঞানচর্চার পরিবেশ উন্নত করে তুলবেন বলে। মাত্র দু’ হাজার আটশো টাকা বেতনে অধ্যাপনা করে বাংলাদেশের উৎসাহী, বিজ্ঞানমনস্ক ছাত্র-ছাত্রীদের গড়ে তুলতে অনলস পরিশ্রম করেছেন তিনি। তাঁর লেখা ‘দ্য আল্টিমেট ফেট অফ দ্য ইউনিভার্স’ বইটি ফরাসি, জাপানি, পর্তুগিজ সহ বিশ্বের অনেকগুলি ভাষায় অনূদিত ও সমাদৃত হয়েছে। স্টিফেন হকিংয়ের সুপারিশে লণ্ডনের ড়োয়াল সোসাইটি থেকে মোট ছয়টি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয় জামাল নজরুল ইসলামের যা তাঁকে বিশ্বের দরবারে পরিচিতি এনে দেয়। বাংলাদেশের উন্নতির জন্য দেশের মাটিতে থেকে গবেষণা করতে চেয়েও অনেক প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়েছেন তিনি, কিন্তু সেগুলিকে উপেক্ষা করে স্বীয় প্রতিভাবলে বাঙালির বিজ্ঞানচর্চার ইতিহাসে স্মরণীয় অবদান রেখে গিয়েছেন জামাল নজরুল ইসলাম।

১৯৩৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের ঝিনাইদহ শহরে এক অভিজাত পরিবারে জামাল নজরুল ইসলামের জন্ম হয়। তাঁর বাবা মহম্মদ সিরাজুল ইসলাম ঝিনাইদহ জেলার সহকারী মুন্সেফ ছিলেন এবং তাঁর মা রাহাত আরা বেগম ছিলেন সাহিত্যানুরাগী এবং সঙ্গীতশিল্পী। তাঁর মা রবীন্দ্রনাথের ডাকঘর নাটকটি উর্দু ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন বলে জানা যায়। ঝিনাইদহে জন্ম হলেও জামাল নজরুল ইসলামের পরিবারের আদি নিবাস ছিল চট্টগ্রামে। আশ্চর্যের বিষয় হল, কবি কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে তাঁদের পরিবারের সখ্য ছিল এবং বাড়িতে কবির যাতায়াতও ছিল। সিরাজুল ইসলাম এবং রাহাত আরা বেগম কবির নামেই তাঁদের চতুর্থ পুত্রের নাম রেখেছিলেন জামাল নজরুল ইসলাম। তাঁদের আরো তিন পুত্র ও চার কন্যা সন্তান ছিল। দুর্ভাগ্যবশত মাত্র দশ বছর বয়সেই মা’কে হারান জামাল নজরুল ইসলাম।

কলকাতায় বাবার বদলির কারণে কলকাতার মডেল স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় জামাল নজরুল ইসলামের। তারপর শিশু বিদ্যাপীঠে ভর্তি হন তিনি এবং চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত কলকাতাতেই পড়াশোনা করেন। চট্টগ্রামে ফের বাবার বদলি হওয়ায় চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলের প্রবেশিকা পরীক্ষায় বসেন জামাল নজরুল। এই পরীক্ষায় বিশেষ কৃতিত্বের কারণে তাঁকে ডবল প্রমোশন দিয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি করা হয়। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত এই স্কুলে পড়াশোনা করে নবম শ্রেণিতে জামাল ভর্তি হন পাকিস্তানের লরেন্স কলেজে। তৎকালীন শিক্ষাব্যবস্থার প্রেক্ষিতে এই কলেজ থেকে সিনিয়র কেম্ব্রিজ এবং হায়ার সিনিয়র কেম্ব্রিজ পাশ করেন তিনি। কলেজে পড়াকালীনই গণিতের প্রতি অত্যন্ত আগ্রহী হয়ে পড়েন জামাল। এখান থেকে কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে ভর্তি হয়ে জামাল বিজ্ঞানে স্নাতক উত্তীর্ণ হন এবং তারপরেই ১৯৫৭ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য চলে যান লণ্ডনের বিখ্যাত কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের ফাদার গোরে তাঁকে গণিতচর্চায় বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করেছিলেন। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রায়োগিক গণিত ও তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ে পুনরায় তিনি স্নাতক পাশ করেন ১৯৫৯ সালে। ১৯৬৪ সালে এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই প্রায়োগিক গণিত ও তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের উপরে গবেষণা করে পি.এইচ.ডি ডিগ্রি লাভ করেন জামাল নজরুল ইসলাম। নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই গবেষণার কাজ শেষ করে ফেলেছিলেন জামাল কিন্তু তখনো জমা দেওয়ার সময় না হওয়াতে অনুমতিসাপেক্ষে তাঁকে পোস্ট-ডক্টরাল গবেষণা শুরু করেন তিনি। ১৯৮২ সালে বিজ্ঞানজগতে বিশেষ কৃতিত্বের ছাপ রাখায় কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় ডি.এস.সি ডিগ্রিতে ভূষিত করে জামাল নজরুল ইসলামকে।

যদিও এর অনেক আগেই তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়ে গিয়েছিল। ১৯৬৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যাণ্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পোস্ট-ডক্টরাল সদস্য হিসেবে কর্মজীবন শুরু হয় জামাল নজরুল ইসলামের। ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত এখানে কাজ করার পরে ১৯৬৭ সালে তিনি যোগ দেন কেমব্রিজের ‘ইনস্টিটিউট অফ থিওরিটিক্যাল অ্যাস্ট্রোনমি’তে। এখানে তিনি ১৯৭১ সাল পর্যন্ত যুক্ত ছিলেন। এরপরে ১৯৭১ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজিতে ভিজিটিং সহযোগী হিসেবে এবং ১৯৭২ থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ে সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করেন। বহু ব্যাপ্ত কর্মজীবনে এর পরের বছর লণ্ডনের কিংস কলেজে লেকচারার পদে, ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত কার্ডিফ বিশ্ববিদ্যালয়ে সায়েন্স রিসার্চ কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে নিযুক্ত থেকেছেন জামাল নজরুল ইসলাম। লণ্ডনের সিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমে লেকচারার পদে এবং পরে ১৯৮৪ সালে রিডার পদে উন্নীত হন তিনি। তাঁর কর্মজীবনের উল্লেখযোগ্য তিনটি বছর ১৯৬৮, ১৯৭৩ এবং ১৯৮৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটনে ‘ইনস্টিটিউট ফর অ্যাডভান্সড স্টাডি’ সংস্থায় ভিজিটিং সদস্য হিসেবে কাজ করেছেন জামাল নজরুল ইসলাম। কিন্তু বেশিদিন বিদেশে থাকতে চাননি তিনি, তাই ১৯৮১ সালেই তিনি চট্টগ্রামে ফিরে এসেছিলেন এবং এখানকার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে মাত্র দুই হাজার আটশো টাকা বেতনে গণিতের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। এখানেই এক অপ্রত্যাশিত ঘটনার সম্মুখীন হতে হয় তাঁকে। এক বছর অধ্যাপনা করার পরে পুনরায় বিদেশে যেতে চাইলে কিছুতেই বিশ্ববিদ্যালয় সিণ্ডিকেট থেকে ছুটি পাননি তিনি। ফলে সেই চাকরি ছেড়ে দিয়ে বিদেশযাত্রা করেন জামাল নজরুল ইসলাম এবং পরবর্তীকালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সব স্থায়ী বাড়ি-ঘর, জমি-জায়গা বিক্রি করে দিয়ে পাকাপাকিভাবে বাংলাদেশের চট্টগ্রামে চলে আসেন তিনি। তখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁকে পুনরায় কাজে বহাল করে এবং বেতন বাড়িয়ে তিন হাজার টাকা করে। বিদেশের লাখ টাকার চাকরি এক লহমায় ত্যাগ করে বাংলাদেশের পোড়াজমিতে, অপমান-লাঞ্ছনা আর পরিকাঠামোহীনতার মধ্যে মাত্র তিন হাজার টাকার বেতনে কাজ করতে চেয়েছেন বিজ্ঞানী জামাল শুধুমাত্র বাংলাদেশের বিজ্ঞানপিপাসু ছাত্র-ছাত্রীদের ভবিষ্যৎ গড়বেন বলে। পড়াতে চেয়েছিলেন পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে, কিন্তু বাধ্য হয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কূটচক্রে গণিত বিভাগে পড়াতে শুরু করেন জামাল নজরুল। বাংলাদেশে বিজ্ঞান গবেষণার উপযুক্ত পরিবেশের অভাবে পিছিয়ে পড়া লক্ষাধিক শিক্ষার্থীকে এগিয়ে দেওয়াই তাঁর কাছে একটি নোবেল পাওয়ার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়েছিল।

জামাল নজরুল ইসলামের লেখা প্রথম বই ‘দ্য আল্টিমেট ফেথ অফ দ্য ইউনিভার্স’ প্রকাশ পায় ১৯৮৩ সালে কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে। মহাবিশ্বের সম্ভাব্য পরিণতি বিষয়ে এই বইটি লেখার আগে তিনি ‘স্কাই অ্যাণ্ড টেলিস্কোপ’ নামক বিখ্যাত পত্রিকায় একটি সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধ লিখেছিলেন ১৯৭৯ সালের জানুয়ারি সংখ্যায়। এই লেখাটি এবং পরবর্তীকালে বইটিও তাঁকে জনপ্রিয় করে তোলে এবং ফরাসি, জাপানি, পর্তুগিজ সহ বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয় বইটি। এরপরে তিনি আরো দুটি বই লেখেন – ‘রোটেটিং ফিল্ডস ইন জেনারেল রিলেটিভিটি’ এবং ‘অ্যান ইন্ট্রোডাকশন টু ম্যাথমেটিক্যাল কসমোলজি’। লণ্ডনের রয়্যাল সোসাইটির পক্ষ থেকে ছয়টি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয় জামাল নজরুল ইসলামের এবং এই কাজে তাঁকে সুপারিশ করেছিলেন বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং। সেই গবেষণাপত্রগুলির বিষয় ছিল সাধারণ আপেক্ষিকতা এবং আহিত কণা। এই একই বিষয়ে ১৯৮৫ সালে জামাল নজরুল লেখেন একটি গুরুত্বপূর্ণ বই ‘রোটেটিং ফিল্ডস ইন জেনারেল রিলেটিভিটি’। তবে শুধুই ইংরেজি ভাষাতেই নয়, তিনি মাতৃভাষা বাংলাতেও বহু বিজ্ঞানের বই লিখেছেন শুধুমাত্র বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চার পরিসর সুগঠিত করে তোলার জন্য। ‘কৃষ্ণ বিবর’, ‘মাতৃভাষা ও বিজ্ঞানচর্চা’ ইত্যাদি তাঁর লেখা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বই বলেই পরিগণিত হয়। স্টিফেন হকিংয়ের মতো ব্ল্যাক হোল নিয়ে চূড়ান্ত গবেষণা করে আশ্চর্য সব তথ্য এবং বিশ্লেষণ দিয়ে ‘কৃষ্ণ বিবর’ বইটি লিখেছিলেন জামাল নজরুল। প্রায় সমমানের গবেষণা করলেও শুধুমাত্র প্রচারের অভাবে বাংলাদেশে প্রথমদিকে জনপ্রিয়তা পাননি জামাল নজরুল ইসলাম। এগুলি ছাড়া আরো দুটি বই লিখেছিলেন তিনি যা তাঁর জীবৎকালে প্রকাশ পায়নি। বইদুটি হল – ‘অ্যান ইন্ট্রোডাকশন টু ম্যাথমেটিক্যাল ইকোনমিক্স’ এবং ‘কনফাইনমেন্ট অ্যাণ্ড শ্রোডিঙ্গার ইকুয়েশন ফর গাউস থিওরিস’। জীবৎকালে মোট ছয়টি বই এবং অজস্র ছোটো-বড়ো গবেষণাপত্র লিখে বিজ্ঞানের জগতে স্মরণীয় অবদান রেখে গেছেন তিনি।

১৯৮৫ সালে বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমীর পক্ষ থেকে স্বর্ণপদকে ভূষিত হন বিজ্ঞানী জামাল নজরুল ইসলাম। এরপরে ১৯৯৪ সালে ন্যাশনাল সায়েন্স অ্যাণ্ড টেকনোলজি পদক লাভ করেন তিনি। ২০০০ সালে ‘একুশে পদক’ এবং ২০১১ সালে বিজ্ঞানে বিশেষ কৃতিত্বের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘রাজ্জাক-শামসুন লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট’ পদকে সম্মানিত হন জামাল নজরুল ইসলাম।

২০১৩ সালের ১৬ মার্চ চুয়াত্তর বছর বয়সে বিজ্ঞানী জামাল নজরুল ইসলামের মৃত্যু হয়।

  • এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

    আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com

  • সববাংলায় সাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য আজই যোগাযোগ করুন
    contact@sobbanglay.com

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

শুধুমাত্র খাঁটি মধুই উপকারী, তাই বাংলার খাঁটি মধু খান


ফুড হাউস মধু

হোয়াটস্যাপের অর্ডার করতে এখানে ক্লিক করুন