ইতিহাস

জামশেদজি টাটা

জামশেদজি টাটা

‘টাটা গ্রুপ’-এর প্রতিষ্ঠাতা জামশেদজি টাটা (Jamsetji Tata) ‘ভারতীয় শিল্পের জনক’ হিসেবে বিখ্যাত হয়ে আছেন। কেবলমাত্র পুঁজির ভিত্তিতে ব্যবসায়িক সাফল্য অর্জনই তাঁর জীবনের লক্ষ্য ছিল না, একজন ব্যবসায়ীর থেকেও তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল দেশপ্রেমিক এবং সমাজসেবী। ব্রিটিশ শাসিত ভারতে একজন সফল উদ্যোগপতি হওয়ার পাশাপাশি ভারতকে যেমন সামগ্রিকভাবে এক ব্যবসায়িক সাফল্য এনে দিয়েছিলেন তিনি, ঠিক একইভাবে ভারতের সর্বপ্রকার পরিকাঠামোর উন্নয়নে অকাতরে দান করেছেন জামশেদজি টাটা। ভারতের সবথেকে বড় বাণিজ্যিক সংস্থা হিসেবে টাটা গ্রুপকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন তিনি। তাঁর নামেই গড়ে ওঠে জামসেদপুর শহরটি। বিশ্ব বাণিজ্যের ক্ষেত্রে তিনি এতই প্রভাবশালী ছিলেন যে ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু জামশেদজি টাটাকে ‘ওয়ান ম্যান প্ল্যানিং কমিশন’ নামে ভূষিত করেছিলেন। ২০২১ সালে আন্তর্জাতিক সংস্থা ইডেল-গিভ ফাউন্ডেশন এবং হুরুন ইণ্ডিয়ার যৌথ উদ্যোগে করা এক সমীক্ষায় বিশ্বের সবথেকে ধনী পুঁজিপতি এবং শ্রেষ্ঠ জনহিতকারী হিসেবে প্রথমেই উঠে এসেছে জামশেদজি টাটার নাম যাঁর সারাজীবনে জনহিতকর প্রকল্পে বিনিয়োগকৃত অর্থের পরিমাণ ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৭৭ হাজার কোটি টাকা।

১৮৩৯ সালের ৩ মার্চ দক্ষিণ গুজরাটের নাভসারি শহরে এক দরিদ্র পার্সি পুরোহিত পরিবারে জামশেদজি টাটার জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম নুসেরওয়ানজি টাটা এবং মায়ের নাম জীবনবাঈ টাটা। তাঁদের পার্সি জরথ্রুস্টীয় বংশে তাঁর বাবাই ছিলেন প্রথম ব্যবসায়ী। তাঁর মাতৃভাষা গুজরাতি হলেও পারিবারিক পৌরোহিত্যের রীতি সম্পূর্ণ ত্যাগ করে বম্বেতে রপ্তানির ব্যবসা চালু করেন নুসেরওয়ানজি। জামশেদজিও তাঁর বাবার পদাঙ্ক অনুসরণ করেছেন। ছাত্র থাকাকালীনই তিনি হিরাবাঈ দাব্বুকে বিবাহ করেন।


বাংলায় শিখুন ওয়েব কন্টেন্ট রাইটিং ও আরও অনেক কিছু

ইন্টার্নশিপ

আগ্রহী হলে ছবিতে ক্লিক করে ফর্ম জমা করুন 


 

তাঁর বাবার উৎসাহে ও আগ্রহে পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত হন জামশেদজি টাটা। তখনকার পার্সিদের মধ্যে পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়া ছিল বিরল ঘটনা। খুব ছোটবেলা থেকেই জামশেদজি পাটিগণিতে দক্ষ হয়ে ওঠেন আর তাই তাঁর বাবা আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষার কথাই ভেবেছিলেন তাঁর জন্য যা জামশেদজিকে আরো দক্ষ করে তুলবে। চোদ্দ বছর বয়সে বম্বেতে তাঁর বাবার কাছে চলে আসেন তিনি এবং নুসেরওয়ানজি তাঁকে বম্বের এলফিনস্টোন কলেজে ভর্তি করিয়ে দেন। ১৮৫৮ সালে একজন গ্রিন স্কলার হিসেবে ঐ কলেজ থেকে উত্তীর্ণ হন জামশেদজি। এই গ্রিন স্কলার ডিগ্রিটি আজকের যুগের স্নাতক ডিগ্রির সমতুল ছিল। কলেজের উদারপন্থী ভাবধারা তাঁকে সারাজীবন বিদ্যায়তনিক শিক্ষায় এবং পড়াশোনার প্রতি আস্থাশীল করে তোলে। কলেজ পাশ করার পরে তিনি বম্বেতেই তাঁর বাবার ব্যবসায় যোগ দেন এবং চিন, জাপান, ইউরোপ ও মার্কিন মুলুকে তাঁর সেই ব্যবসার শাখা সম্প্রসারিত করতে যারপরনাই পরিশ্রম করেন। সেই সময় ১৮৫৭ সালের উত্তাল সিপাহি ব্রিদ্রোহের আবহে একজন সফল ব্যবসায়ী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠান করা খুবই দুষ্কর ছিল। নুসেরওয়ানজি টাটা বারবার চিনে ভ্রমণ করতেন যাতে তখনকার উঠতি আফিমের ব্যবসার খুঁটিনাটি খুব সহজে বুঝতে পারেন এবং সেকালে চিনে পার্সিদের একটি কলোনিতে তাঁর পরিচিতি গড়ে ওঠে যেখানকার অধিবাসীরা এই ব্যবসার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিল। তিনি চাইতেন তাঁর ছেলে জামশেদজিও এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হোক। তাই তিনি জামশেদজিকে চিনে পাঠান আফিমের ব্যবসার খুঁটিনাটি দেখে ও বুঝে নেবার জন্য। যদিও চিনে ভ্রমণের সময় জামশেদজি টাটা বুঝতে পারেন যে সেখানে সদ্য সদ্য বস্ত্র শিল্প গড়ে উঠছে, ফলে সেই ব্যবসায় লাভের প্রভূত সম্ভাবনা রয়েছে।

১৮৬৮ সালে ঊনত্রিশ বছর বয়সে বাবার ব্যবসায় প্রায় নয় বছর কাজ করার পরে ব্যবসায়িক জ্ঞানে সমৃদ্ধ হয়ে ওঠেন টাটা এবং নিজের উদ্যোগে মাত্র একুশ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে একটি আমদানি-রপ্তানির ব্যবসা চালু করেন। তারপরেই ইংল্যাণ্ড থেকে তিনি বস্ত্রশিল্পের খুঁটিনাটি এবং এই ব্যবসার নানা দিক সম্পর্কে ভালমতো জেনে আসেন। দক্ষিণ বম্বের চিঞ্চপোকলিতে একটি দেউলিয়া হয়ে যাওয়া তেলের কারখানা কিনে নিয়ে তাকে কাপড় কলে পরিণত করেন টাটা। সেই কাপড় কলের নাম দিয়েছিলেন তিনি ‘আলেকজান্দ্রা মিল’। দুই বছর পরে লাভের আশায় সেই কারখানা বিক্রি করে দেন তিনি। ১৮৭৪ সাল নাগাদ নাগপুরের আশেপাশে মধ্য ভারতের সমস্ত সুতা কাটা, বুনন ও প্রস্তুতকারক কারখানাগুলি ঘুরে ঘুরে দেখেন এবং ভাবেন এই স্থানেই তিনি তাঁর পরবর্তী ব্যবসাটি শুরু করবেন। এই অপরিচিত স্থানে ব্যবসা চালু করার ব্যাপারে বম্বের মানুষেরা টাটাকে খুবই তাচ্ছিল্য করেন, কিন্তু তখন কেউই সেভাবে বুঝতে পারেনি কেন তিনি বম্বের মতো বস্ত্রশিল্পের ঘাঁটি ছেরে নতুন জায়গায় ব্যবসা শুরু করতে চেয়েছিলেন। আর ব্যবসার জন্য নাগপুরকে বেছে নেওয়াই তাঁর সবথেকে বড়ো সাফল্য হয়ে উঠল। বম্বের থেকে নাগপুরে জমি এবং অন্যান্য উপাদান অনেক সস্তায় পাওয়া যেত। একইসঙ্গে কারখানা ছিল প্রচুর, পণ্য বন্টন সহজ ছিল এবং জমির দাম কম থাকায় একসময় নাগপুরে ব্যবসা শুরু করার পরে নাগপুরকে ঘিরেই রেলপথ তৈরি হতে থাকে। কিছুদিনের মধ্যেই ১৮৭৭ সালে টাটা ‘এম্প্রেস মিল’ নামে নতুন একটি কাপড় কল চালু করেন।

তাঁর জীবনে মূল লক্ষ্য ছিল চারটি – লৌহ-ইস্পাত কারখানা স্থাপন, একটি বিশ্বমানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন, একটি স্বতন্ত্র হোটেল এবং একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপন। তাঁর জীবৎকালে কেবলমাত্র হোটেলটিই স্থাপন করে যেতে পেরেছিলেন তিনি। ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ১১ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে ১৯০৩ সালে মুম্বাইয়ের কোলাবাতে তাজমহল হোটেল স্থাপন করেন তিনি। ১৮৮৫ সালে পণ্ডিচেরিতে তিনি আরেকটি সংস্থা খোলেন ফরাসি কলোনিতে ভারতীয় কাপড় বিক্রির উদ্দ্যেশ্যে কিন্তু সেই উদ্যোগ ব্যর্থ হয়। এরপরে বম্বের কুরলাতে ধর্মশ্রী মিল কিনে নেন তিনি এবং কিছুদিন পরে সেটিও বিক্রি করে আহমেদাবাদে অ্যাডভান্সড মিল কিনে নেন। সবথেকে উন্নতমানের প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি করেছিলেন তিনি এই কাপড় কলটিকে। তার ফলে আহমেদাবাদ শহরে এবং সমগ্র ভারতে বস্ত্রশিল্প ও সুতা শিল্পের দুনিয়ায় এক আমূল পরিবর্তন আনেন তিনি। স্বদেশি আন্দোলনের সময় স্বদেশি ভাবধারায় উদ্দীপিত হয়ে ওঠেন তিনি। কিন্তু ১৯০৫ সালের আগে যে স্বদেশি আন্দোলন চালু হয় ভারতে, তার আগেই আজীবন স্বদেশি ভাবধারাতেই বিশ্বাস করেছিলেন টাটা। স্বদেশি আন্দোলন শুরু হওয়ার পরে বম্বেতে তাঁর কাপড় কলের নাম বদলে তিনি নাম দেন ‘স্বদেশি মিল’। কিন্তু ম্যাঞ্চেস্টার থেকে আসা মিহি সুতোর কাপড়ের কাছে ভারতে তৈরি মোটা সুতোর কাপড় প্রতিযোগিতায় ধোপে টেকেনি। কিন্তু টাটা নিজের উদ্যোগে ম্যাঞ্চেস্টারের সমমানের কাপড় তৈরির চেষ্টা করেছিলেন তাঁর কাপড়কলে যাতে বাইরে থেকে আমদানিকৃত কাপড়ের পরিমাণ কমানো যায়। ভারতকে ভবিষ্যতে সমস্ত প্রকারের কাপড় প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে চাইতেন তিনি। সেই জন্য ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে তুলোর উৎপাদন কীভাবে বাড়ানো যায় এবং উন্নতমানের তুলো উৎপাদনের জন্য নানাবিধ চেষ্টা করতেন টাটা। ভারতে তিনিই প্রথম তাঁর কাপড় কলে রিং স্পিণ্ডল ব্যবহার করা শুরু করেছিলেন যা বস্ত্র শিল্পের দুনিয়ায় নতুন দিশা দেখিয়েছিল।     

শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে উদার হস্তে দান করে গিয়েছেন জামশেদজি টাটা। ২০২১ সালে আন্তর্জাতিক সংস্থা ইডেল-গিভ ফাউন্ডেশন এবং হুরুন ইণ্ডিয়ার যৌথ উদ্যোগে করা এক সমীক্ষায় বিশ্বের সবথেকে ধনী পুঁজিপতি এবং শ্রেষ্ঠ জনহিতকারী হিসেবে প্রথমেই উঠে এসেছে জামশেদজি টাটার নাম যার সারাজীবনে জনহিতকর প্রকল্পে বিনিয়োগকৃত অর্থের পরিমাণ ১ কোটি ৪২ লক্ষ ডলার।


প্রাকৃতিক খাঁটি মধু ঘরে বসেই পেতে চান?

ফুড হাউস মধু

তাহলে যোগাযোগ করুন – +91-99030 06475


 


ঝাড়খণ্ডের সাক্‌চি গ্রামে তাঁর একটি লৌহ-ইস্পাত কারখানা স্থাপিত হয় যার কারণে ঐ অঞ্চলের নিকটবর্তী রেলস্টেশনের নাম হয় টাটানগর। পরে ওই শহরের নামও তাঁর নামানুসারে রাখা হয় জামশেদনগর। ১৯৬৫ সালে ভারত সরকার তাঁর স্মৃতিরক্ষার্থে একটি পোস্টাল স্ট্যাম্প উদ্বোধন করে।

১৯০৪ সালের ১৯ মে জার্মানির বাড ন্যুইহেমে বাণিজ্যসফরকালে জামশেদজি টাটার মৃত্যু হয়।

 

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

শ্রীচৈতন্যের মৃত্যু আজও এক ঘনীভূত রহস্য



সেই রহস্য নিয়ে বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন