ইতিহাস

যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত

যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত (Jatindranath Sengupta) একজন প্রথিতযশা বাঙালি কবি যিনি বাংলা সাহিত্যে বিখ্যাত হয়ে আছেন দুঃখবিলাসী,নৈরাশ্যবাদী,বাস্তববাদী কবি হিসেবে। রবীন্দ্র যুগের সেই সময় দাঁড়িয়ে বাংলা সাহিত্যে এক সম্পূর্ন ভিন্ন ধারার অস্তিত্ববাদী ভাবধারা এনে বাংলা কাব্য জগতে এক নতুন দিকের সূচনা করেছিলেন তিনি। বাংলা সাহিত্যে তিনিই প্রথম ইঞ্জিনিয়ার কবি ছিলেন।

১৮৮৭ সালের ২৬ জুন বর্ধমানের কালনা মহকুমার অন্তর্গত পাতিলপাড়া গ্রামে মামারবাড়িতে যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের জন্ম হয়। যতীন্দ্রনাথের পৈতৃক ভিটে ছিল নদীয়ার শান্তিপুরের কাছে হরিপুর গ্রামে। তাঁর বাবা দ্বারকানাথ সেনগুপ্ত একজন বিশিষ্ট কবি ছিলেন। তাঁর মায়ের নাম মোহিতসুন্দরী দেবী। যতীন্দ্রনাথ ছিলেন তাঁর বাবা মায়ের একমাত্র জীবিত সন্তান। তাঁর আগের পাঁচ ভাইবোন শৈশবেই মারা যান। তিনিও আটবছর বয়সে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হন এবং আজীবন তিনি ওই রোগেই ভুগেছিলেন। তাঁর রোগ জর্জর শীর্ণকায় শরীর ক্রমেই তাঁর লেখাপড়ার ক্ষেত্রে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। তাঁর শরীর ও স্বাস্থ্যের উন্নতির জন্য তাঁর বাবা তাঁকে নিজের কর্মস্থল বালেশ্বরে নিয়ে গেলেও শেষ পর্যন্ত তাঁর বাবার চাকরি চলে গেলে সেখানেও তাঁর বেশীদিন থাকা হয়নি। ১৯০৭ সালে হাজারিবাগের খ্যাতনামা উকিল চারুচন্দ্র গুপ্তের কন্যা শ্রীমতি জ্যোর্তিলতা দেবীর সাথে যতীন্দ্রনাথের বিবাহ হয় এবং তাঁদের তিনটি পুত্র ও চার কন্যা সন্তান হয়।

যতীন্দ্রনাথের লেখাপড়ায় হাতেখড়ি হয় গ্রামের পাঠশালায়। তাঁর যখন বারো বছর বয়স তখন স্কুল থেকে বৃত্তি কলকাতায় কাকার বাড়ীতে চলে আসেন উচ্চ শিক্ষার জন্য। কিন্তু এখানেও তিনি প্লেগে আক্রান্ত হন। কলকাতার ওরিয়েন্টাল সেমিনারী স্কুল থেকে ১৯০৩ সালে এন্ট্রাস পাস করার পর আট বছর বয়সে জেনারেল অ্যাসেম্বলিজ ইনষ্টিটিউশন (স্কটিশ চার্জ কলেজ) থেকে এফ. এ পরীক্ষায় পাস করে এক বন্ধুর পরামর্শে শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি হন। কিন্তু তাঁর ভগ্নস্বাস্হ্যের জন্য ইন কলেজে ভর্তি হওয়া নিয়ে সংশয় তৈরি হয়। শিবপুরে ভর্তি প্রসঙ্গে তিনি নিজেই বলেছেন, ‘‘…পদ্মপুকুরের সন্নিকটে বসেই প্রবেশিকা পরীক্ষা করলেন সেখানকার ডাক্তার। বুকের মাপ, দেহের ওজন সবই কম হল। তখন ডাক্তারবাবু একটা পরীক্ষা করলেন। সেটা তৃতীয় প্রহরের নিদাঘ রৌদ্রে দূরের একটা অশ্বত্থগাছ দেখিয়ে বললেন— ঐ পর্যন্ত জোরে ছুটে গিয়েই ফিরে এস। হাঁপিয়ে গেলেও সেটা পারলাম।… তখন ডাক্তার করুণাপরবশ পাশ করিয়ে দিলেন অর্থাৎ বুকের মাপ দেহের ওজন ইত্যাদি বাড়িয়ে লিখে দিলেন। ইঞ্জিনিয়ার হবার জন্য কোমর বাঁধলাম।’’ ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি হওয়ার পরে প্রথম বছর ছুতোরখানায় কাজ করতে দেওয়া হয়। সেখানে কাজ করতে গিয়ে তাঁর হাত চিরে যায়। অনেকেই কষ্ট সহ্য না করতে পেরে পড়া ছেড়ে দিলেও যতীন্দ্রনাথ শেষ পর্যন্ত নিরলস পরিশ্রমের দ্বারা ১৯১১ সাল ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করেন।

শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে পাস করার পরে যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত ঢাকায় প্রশিক্ষণ নিতে যান। প্রশিক্ষণ শেষে ১৯১৩ সালে তিনি ইষ্ট ইন্ডিয়া রেলওয়েতে সার্ভারের পদে যোগদান করেন। সার্ভার পদে যোগদানের মাত্র বারো দিন পরে নদিয়ার জেলা বোর্ডের চাকরিতে যোগদান করেন তিনি। এখানে কাজে যোগ দেওয়ার পরে তিনি অসুস্হ হয়ে পড়লে কাজ ছেড়ে বাড়ীতে চলে আসেন। গ্রামে ফিরে দেশলাই তৈরির কারখানা গড়লেন ও সেই সাথে তিনি নিজে চরকায় সুতো কেটে কাপড় বোনার কাজ শুরু করলেন। মূলত অতিরিক্তি উর্পাজনের কারনেই তিনি কাশিমবাজারে রাজা মণীন্দ্রচন্দ্রের এষ্টেটে ওভারসিয়ারের পদে যোগদান করলেন।

বাংলা সাহিত্যের জগতে যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত-ই প্রথম ইঞ্জিনিয়ার কবি। চাকরিতে যোগদান করার পর তাঁর সাহিত্য চর্চা সমান্তরাল ভাবেই চলতে থাকে। যতীন্দ্রনাথের কাছে বাস্তবতাই ছিল চরম সত্য। কল্পনা বিলাসীতা তাঁর মধ্যে সম্পূর্ণরূপে অনুপস্থিত ছিল। বাংলা কাব্যগ্রন্থকে ভাবের বেড়াজাল থেকে মুক্ত করে বাস্তবের জগতে তিনিই প্রথম নিয়ে আসেন। তাঁর কাছে শাশ্বত প্রেম ছিল অস্তিত্বহীন। অনন্ত যন্ত্র‌ণাই ছিল সত্য। মানুষে মানুষে বৈষম্য ও অন্যায় তাঁকে ঈশ্বরের প্রতি বিমুখ করে তোলে। তাঁর বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণের বিচার তাঁকে আবেগমুক্ত যুক্তিসিদ্ধ করে তুলেছে। দুঃখবিলাসী কবি হিসেবেই বাংলা কাব্য জগতে তাঁর আত্মপ্রকাশ ঘটে। কাব্যরচনাকে যতীন্দ্রনাথ মানবতার পক্ষে এক আন্দোলন হিসেবেই হাতিয়ার করেছিলেন।

যতীন্দ্রনাথের কাছে কবিতা ছিল একটি শিল্পকর্ম। তাঁর কাব্য রচনার মূল আধারই ছিল মানবপ্রেম। সমাজের সর্বহারা, বঞ্চিত, নিপীড়িত, অত্যাচারিত মানুষের জীবনযন্ত্রণাই ছিল তাঁর কাব্যের মূল বিষয়। তর্ক,কটাক্ষ, প্রচ্ছন্ন পরিহাস ছিল তাঁর রচনার বৈশিষ্ট্য। তাঁর কাব্যগ্রন্থগুলির নামকরণেও জীবনের কঠোর বাস্তব চিত্রই ফুটে ওঠে। ১৯২৩ সালে ৩৬ বছর বয়সে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘মরু মরিচীকা’ প্রকাশ পায়। এরপর ১৯২৭ সালে দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘মরুশিখা’, ১৯৩০ সালে ‘মরুমায়া’,১৯৪৪ সালে ‘সায়ম’,১৯৪৮ সালে ‘ত্রিযামা’ প্রকাশিত হয়। ১৯৫৭ সালে তাঁর মৃত্যুর পরে ‘নিশান্তিকা’ প্রকাশ হয়।

যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত দৈনিক ‘বসুমতী’ পত্রিকায় ‘বিপ্রতীপ গুপ্ত’ ছদ্মনামে লিখতেন। তাঁর রচিত ‘ হাট’ কবিতাটি বাংলা কাব্য সম্ভারে একটি অন্যতম জনপ্রিয় কবিতা যা পরবর্তীকালে বিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচীতে অন্তর্ভুক্ত হয়।তাঁর ‘বেদিনী’ ও ‘কচি ডাব’ কবিতায় জীবন সংগ্রামে পর্যুদস্ত সাধারণ মানুষের দুঃখই চিত্রিত হয়েছে। নিয়মের আড়ালে নারী নির্যাতনের বিপক্ষে তিনি সর্বদা সরব হয়েছেন তাঁর কবিতার মাধ্যমে। নারী যে চিরকালই অনুকম্পার পাত্রী হয়ে থাকবে না সে কথা তিনি তাঁর কাব্যগ্রন্থের মাধ্যমে দৃঢ় ভাবে প্রকাশ করেছেন। ‘পাষাণ পথে’ ও ‘কেতকী’ তেমনই দুটি কবিতা যেখানে তিনি লাঞ্ছিত নারীর অপমানকেই ব্যক্ত করেছেন। ‘সায়ম’ কাব্যগ্রন্থে ‘কৃষ্ণা’ কবিতাটিতে পৌরাণিক কাহিনীর আড়ালে নারী নির্যাতনের চিত্রটি তিনি তাঁর নিপুণ মুন্সিয়ানায় তুলে ধরেছেন। সমাজে নারীর অবহেলা ও অবস্থানের জন্য তিনি কেবল পুরুষকেই দায়ী করেননি আমাদের ধর্মকেও দায়ী করেছেন।এবং আঘাত সহন করতে করতেই যে একদিন নারী জাগরণ ঘটবে একথাও তিনি ব্যক্ত করেছেন।

যতীন্দ্রনাথ সমাজে শ্রেণী বৈষম্যের প্রতি কটাক্ষ হেনেছেন বারংবার। তাঁর একটি বিখ্যাত করিতার পংক্তি ” চেরাপুঞ্জি থেকে একখানি মেঘ ধার দিতে পার গোবি -সাহারার বুকে”(ঘুমের ঘোরে কাব্যগ্রন্থ) যার মধ্যে দিয়ে সমাজের উচ্চবিত্তদের বৈভব ও শোষিত শ্রেণীর বৈষম্য ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি। ‘কান্ডারি,’ ‘চাষার বেগার’,’পথের চাকুরী’, ‘ডাকহরকরা’ প্রভৃতি গল্পে ভাগ্যবিড়ম্বিত মানুষের দুর্দশার কথা বর্ণনা করেছেন তিনি। ‘নবান্ন’ কবিতায় কবি কৃষকের মনে নতুন আশার বর্ণনা দিয়েছেন এইভাবে

“আমি ভাবি ফসলটা নাবি, আরও কটা দিন যাক,
ভরা অঘ্রাণে ঘটে না-ত কোন দৈব-দুর্বিপাক।
মাড়াই-সরাই শেষ করে সবে খামারে দিইছি হাত,
কালকে হঠাৎ
বন্ধু দোহাই, তুলনাকো হাই হইনু অপ্রগলভ_
ক্ষমা কর সখা বন্ধ করিনু তুচ্ছ ধানের গল্প।”
(নবান্ন, মরুমায়া)

‘ফেমিন -রিলিফ’ কবিতায় কবি সহায় সম্বলহীন অসহায় মানুষকে সাহায্য করার জন্য যে সমস্ত সামগ্রী আসে তা উচ্চবিত্ত মানুষের ভোগে কিভাবে ব্যবহৃত হয় তার বর্ণনা দিয়েছেন। তাঁর প্রথম তিনটি কাব্যগ্রন্থ ‘অগ্নি’, ‘রুদ্র’, ‘মরুর দহন’ ও শেষ তিনটি কাব্যগ্রন্থে নিশা, ত্রিযামা এই শব্দগুলি ব্যবহার করেছেন যেগুলি অন্ধকারের প্রতীকী হিসেবে দ্যোতক হয়েছে।

আধুনিক বাংলা সাহিত্যে ‘অ্যান্টি রোমান্টিক’, নৈরাশ্যবাদী, বুদ্ধিকেন্দ্রিক কবিতা লিখে শিক্ষিত সমাজে আলোড়ন ফেলে দিয়েছিলেন। সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের পরে তিনিই প্রথম কবি যিনি সমাজের অনগ্রসর শ্রেণীর মানুষের জন্য সরব হয়েছিলেন। যতীন্দ্রনাথ চেয়েছিলেন কর্মজগতের মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে। রবীন্দ্রনাথ যেখানে সমাজ সংস্কারকে সযত্নে এড়িয়ে গেছেন সেখানে যতীন্দ্রনাথ সমাজের বঞ্চিত শ্রেণীর কথাই তুলে ধরেছেন তাঁর রচনায়।
কাব্যগ্রন্থ ছাড়াও তিনি বেশ কিছু অনুবাদ সাহিত্য রচনা করেছেন। মহাকবি কালিদাসের ‘কুমারসম্ভব’, ‘গান্ধী বাণী কণিকা’,’ প্রাচীন মেয়ে’, শেক্সপীয়ারের ‘হ্যামলেট’, ‘এ্যান্টনি ও ক্লিওপেট্রা’, ‘ম্যাকবেথ’, ‘ওথেলো’ প্রভৃতি। ১৯৩১ সালে তাঁর সমালোচনামূলক কাব্যগ্রন্থ ‘কাব্যপরিমিতি’ প্রকাশিত হয় ও ১৯৪৮ সালে তাঁর কাব্যসংকলন ‘অনুপূর্বা’ প্রকাশিত হয়। যতীন্দ্রনাথের আত্মজীবনী নাম ‘আত্মকথা’।

নিজের ইঞ্জিনিয়ার সত্তার সাথে যতীন্দ্রনাথ তাঁর সাহিত্যিক সত্তার একটি অপূর্ব মেলবন্ধন করেছিলেন তিনি। তাঁর রচনায় নৈরাশ্য, অবসন্নতা, সমাজের উপেক্ষিত দিকগুলিই প্রকাশ পেয়েছে বেশি এবং এই কারণেই তাঁকে বাংলা সাহিত্যের ‘দুঃখময় কবি’ আখ্যা দেওয়া হয়ে থাকে।

১৯৫৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের মৃত্যু হয়।

  • সববাংলায় সাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য আজই যোগাযোগ করুন
    contact@sobbanglay.com

  • এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

    আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

শুধুমাত্র খাঁটি মধুই উপকারী, তাই বাংলার খাঁটি মধু খান


ফুড হাউস মধু

হোয়াটস্যাপের অর্ডার করতে এখানে ক্লিক করুন