ইতিহাস

জয় গোস্বামী

জয় গোস্বামী

বাংলা আধুনিক কবিতার জগতে বিখ্যাত অগ্রজপ্রতিম কবি জয় গোস্বামী (Joy Goswami)। মূলত সত্তরের দশক থেকে তাঁর কবিতা লেখার সূত্রপাত। রানাঘাটে বেড়ে ওঠা জয় গোস্বামীর লেখায় বারবার উঠে আসে মফস্বলের চিত্র। দীর্ঘ ১৬ বছর ‘দেশ’ পত্রিকায় সম্পাদকীয় বিভাগে চাকরি করেছেন তিনি। উনিশ বছর বয়সে প্রথম একইসঙ্গে তিনটি লিটল ম্যাগাজিনে তাঁর কবিতা ছাপা হয়েছিল। ১৯৭৬ সালে প্রথম ‘দেশ’ পত্রিকায় কবিতা প্রকাশ পায় জয় গোস্বামীর। তারপর থেকে ধারাবাহিকভাবে তাঁর লেখা চলেছে। নানা পত্র-পত্রিকায় লেখা প্রকাশিত হওয়ার পাশাপাশি ১৯৭৬ সালে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ পায় ‘ক্রিসমাস ও শীতের সনেটগুচ্ছ’ নামে। তারপর একে একে ‘আলেয়া হ্রদ’, ‘উন্মাদের পাঠক্রম’, ‘ভুতুমভগবান’, ‘ঘুমিয়েছো ঝাউপাতা?’, ‘পাগলী তোমার সঙ্গে’, ‘বজ্রবিদ্যুৎভর্তি খাতা’ ইত্যাদি বিখ্যাত সব কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। রবীন্দ্রনাথজীবনানন্দ তাঁর খুবই প্রিয় কবি। রবীন্দ্রনাথের গান জয় গোস্বামীকে নতুন করে ভাবায়, সেই গান নিয়েও বেশ কিছু প্রবন্ধ লিখেছেন তিনি। ‘যারা বৃষ্টিতে ভিজেছিল’ কাব্যোপন্যাসটি লেখার জন্য আজও বাঙালি পাঠকমহলে সমাদৃত হন জয় গোস্বামী। কবিতা ছাড়াও বেশ কিছু উপন্যাস ও গদ্যও লিখেছেন তিনি।       

১৯৫৪ সালের ১০ নভেম্বর কলকাতায় জয় গোস্বামীর জন্ম হয়। তাঁর বাবা মধু গোস্বামী প্রত্যক্ষভাবে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর মা সবিতা গোস্বামী পেশায় ছিলেন স্কুলশিক্ষিকা। তাঁর পাঁচ বছর বয়সেই তাঁর পরিবার নদীয়া জেলার রানাঘাটে চলে আসে। মাত্র আট বছর বয়সে জয় গোস্বামী পিতৃহারা হন। তাঁর মা তখন একাই সংসারের দায়িত্ব নেন। প্রচণ্ড ব্যস্ততার মধ্যেও তাঁর মা তাঁকে বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত সব লেখক-লেখিকাদের লেখাপত্র পড়ে শোনাতেন আর সেই অভিজ্ঞতা থেকেই বাংলা সাহিত্যের প্রতি একটা আগ্রহ গড়ে উঠেছিল তাঁর। ১৯৮৪ সালে তাঁর মায়ের মৃত্যু হয়। ১৩-১৪ বছর বয়সে প্রথম বাড়ির একটি পাখাকে নিয়ে কবিতা লেখেন জয়। ‘সিলিং ফ্যান’ নামের সেই কবিতাটি ১৯৭৩ সালে একইসঙ্গে ‘সীমান্ত সাহিত্য’, ‘পদক্ষেপ’ এবং ‘হোমশিখা’ নামক তিনটি পৃথক লিটল ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়। কৈশোরে রানাঘাটের ‘নবাঙ্কুর ক্রিকেট ক্লাব’-এ ক্রিকেট খেলা শেখার জন্য ভর্তি হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু দুর্বল স্বাস্থ্যের কারণে ভারী ক্রিকেট ব্যাট তিনি তুলতেই পারতেন না হাতে, ফলে ক্রিকেট খেলার সাধ তাঁর অপূর্ণই রয়ে গেল। কিন্তু ঐ নবাঙ্কুর ক্লাবের ক্রিকেট দেখতে যেতেন নিয়মিত আর সেই ক্লাবের প্রশিক্ষক ভৃগু বন্দ্যোপাধ্যায়ের মাধ্যমেই লিটল ম্যাগাজিনের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটে। পরবর্তীকালে একটি আত্মজৈবনিক লেখায় জয় গোস্বামী জানাচ্ছেন যে তাঁর কৈশোরে রানাঘাটে প্রত্যেক দুর্গাপূজা উপলক্ষ্যে একটি বালিকা বিদ্যালয়ে বিরাট সমারোহে প্রদর্শনী হত আর সেখানে থাকত প্রচুর  লিটল ম্যাগাজিন। সেই প্রদর্শনীতে পাড়ার ছেলে হিসেবে স্বেচ্ছাসেবক পদে কাজ করতে করতেই প্রচুর লিটল ম্যাগাজিন হাতে নিয়ে দেখেছেন জয় আর সেই সময়েই ‘অনুক্ত’ নামে একটি অনামী পত্রিকার পাতায় জীবনানন্দ দাশের গল্প পড়েছিলেন জয়। এই পত্রিকা পড়ার মোহে ভৃগু বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতে গিয়ে নিয়মিত পত্র-পত্রিকা চেয়ে নিয়ে আসতেন তিনি আর পড়া শেষ হয়ে গেলে ফেরত দিয়ে আসতেন। কলকাতার কলেজ স্ট্রিটের পাতিরাম বুক স্টল থেকে এইসব পত্র-পত্রিকা কিনে আনতেন ভৃগুবাবু আর তাঁর কথা শুনে পরে জয় নিজেই একদিন গিয়েছিলেন পাতিরামের স্টলে। ভৃগুবাবুর কাছ থেকেই বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত কবিতা পত্রিকার আঠারোটি সংখ্যা পেয়েছিলেন তিনি, তাছাড়া সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায় প্রমুখদের লেখাও তিনি ঐ লিটল ম্যাগাজিন থেকেই পড়েছিলেন। রানাঘাটে ভৃগু বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতিষ্ঠিত ‘সিনেক্লাব’ সংস্থায় কৈশোরেই বার্গম্যান, ফেলিনি, কুরোসাওয়া প্রমুখ বিশ্ববিখ্যাত চিত্রপরিচালকদের নানা ছবি দেখে বড়ো হয়েছেন জয় গোস্বামী। ছোটোবেলা থেকে গান শোনার অভ্যাসও তাঁকে কবিতার মোহে আবিষ্ট করেছিল। ছোটোবেলায় তাঁদের বাড়িতে নিয়মিত ‘শুকতারা’ পত্রিকার পূজাবার্ষিকী আসত, সেই পত্রিকার পাত্রায় বিভিন্ন লেখকদের গল্প পড়তেন জয়। তাছাড়া নতুন জামা-কাপড় কেনার মত পূজাবার্ষিকী কেনার আনন্দও উপভোগ করতেন তিনি। পরবর্তীকালে ১৯৯৪ সালে কাবেরী গোস্বামীকে বিবাহ করেন জয়। তাঁদের এক কন্যা বুকুন পেশায় ফ্যাশন ডিজাইনার এবং এক ছেলে বৌদ্ধ কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার।


এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com


 

রানাঘাটেরই একটি স্থানীয় স্কুলে জয় গোস্বামী মাত্র একাদশ শ্রেণি পর্যন্ত প্রথাগত পড়াশোনা করেছেন, তারপর আর তাঁর পড়া হয়নি। প্রথাগত পড়াশোনা ছাড়লেও নিয়মিত কবিতা লেখা শুরু করেন তিনি। ১৯ বছর বয়সে লিটল ম্যাগাজিনের পাতায় প্রথম কবিতা ছাপা হয় তাঁর আর তার পর দীর্ঘ ১৬ বছর বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিনে কবিতা লিখেছেন জয় গোস্বামী। মাঝেমাঝে লিটল ম্যাগাজিনের সম্পাদকেরা তাঁর কাছে চিঠি লিখেও কবিতা চাইতেন। ১৯৭৬ সালে ডাকযোগে ‘দেশ’ পত্রিকায় একটি কবিতা পাঠান তিনি এবং ঐ বছরই প্রথম ‘দেশ’ পত্রিকায় তাঁর সেই কবিতা ছাপা হয়। এর পরে ধীরে ধীরে জয় গোস্বামীর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে।

পরবর্তীকালে ‘দেশ’ পত্রিকার দপ্তরেই তিনি সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন জয় গোস্বামী।

তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ক্রিসমাস ও শীতের সনেটগুচ্ছ’ প্রকাশ পায় ১৯৭৭ খ্রিস্টাব্দে। মূলত সত্তরের দশক থেকেই তাঁর কবিতার বইগুলি পরপর প্রকাশ পেতে থাকে এবং সাধারণ পাঠক-বোদ্ধামহলে শক্তিমান কবি হিসেবে জয় গোস্বামী পরিচিতি লাভ করেন। বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং কবিমনের কল্পনাবিলাসে মাখা তাঁর সব কবিতা। অদ্ভুত এক প্রেম ও নিঃসঙ্গতার মায়াজাল ছড়িয়ে থাকে জয় গোস্বামীর কবিতায়। উচ্চকিত সুরের বদলে, নিহিত কোমল খাদের স্বরে জয় গোস্বামী তাঁর বক্তব্য উপস্থাপন করেন। জীবনানন্দের পরে বাংলা কাব্য জগতে এক স্পষ্ট বাঁকবদলের কাব্যভাষা নির্মাণ করে গিয়েছেন তিনি এবং এখনও করে চলেছেন। একদিকে ছন্দের বৈচিত্র্য এবং অন্যদিকে প্রতীকের ব্যবহারে অনন্য মাত্রা পায় তাঁর কবিতাগুলি।

তাঁর ‘ঘুমিয়েছ ঝাউপাতা’  কাব্যগ্রন্থের জন্য জয় গোস্বামী ১৯৮৯ সালে তিনি আনন্দ পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়া ১৯৯৭ সালে ‘বজ্রবিদ্যুৎ ভর্তি খাতা’ কাব্যগ্রন্থের জন্য তিনি বাংলা আকাদেমি পুরস্কার পান। ২০০০ সালে পুনরায় তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘পাগলী তোমার সঙ্গে’র জন্য সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কারে ভূষিত হন তিনি। এছাড়াও ‘যারা বৃষ্টিতে ভিজেছিল’ কাব্যোপন্যাসের জন্যও ১৯৯৮ সালে আনন্দ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন জয় গোস্বামী।

তাঁর অন্যান্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল – ‘প্রত্নজীব’ (১৯৭৮), ‘আলেয়া হ্রদ’ (১৯৮১), ‘উন্মাদের পাঠক্রম’ (১৯৮৬), ‘ভুতুমভগবান’ (১৯৮৮), ‘ঘুমিয়েছো ঝাউপাতা?’ (১৯৮৯), ‘বজ্রবিদ্যুৎ ভর্তি খাতা’ (১৯৯৫), ‘সূর্যপোড়া ছাই’ (১৯৯৯), ‘মা নিষাদ’ (১৯৯৯), ‘পাতার পোশাক’ (১৯৯৭), ‘তোমাকে আশ্চর্যময়ী’, ‘বিষাদ’, ‘হরিণের জন্য একক’ (২০০২), ‘মায়ের সামনে স্নান করতে লজ্জা নেই’ (২০১৭) ইত্যাদি। মোট ১৬টি কাব্যগ্রন্থ আছে জয় গোস্বামীর। কবিতা ছাড়াও লিখেছেন বহু উপন্যাস, কাব্যোপন্যাস ইত্যাদি। তাঁর লেখা ‘যারা বৃষ্টিতে ভিজেছিল’ (১৯৯৮) আজও বাঙালির মুখে মুখে ফেরে। ‘হৃদয়ে প্রেমের শীর্ষ’, ‘সেইসব শেয়ালেরা’, ‘সাঁঝবাতির রূপকথারা’, ‘সব অন্ধকার ফুলগাছ’ ইত্যাদি তাঁর অন্যতম গদ্যরচনা। সম্পাদক রমাপদ চৌধুরীর তাগাদায় তাঁর লেখা প্রথম গল্প ‘মল্লার যেখানে নামে’ ১৯৯৪ সালে প্রকাশ পায় আনন্দবাজার পত্রিকার ‘রবিবাসরীয়’ বিভাগে। দেশ পত্রিকায় কাজ করার সময় সম্পাদক সাগরময় ঘোষের অনুরোধে এবং তাগাদায় ‘সংশোধন বা কাটাকুটি’ নামে একটি গল্প লিখেছিলন জয় গোস্বামী। এছাড়াও সংবাদ প্রতিদিন-এর রোববার সাপ্তাহিক সংখ্যায় সম্পাদক ঋতুপর্ণ ঘোষের অনুরোধে বিভিন্ন কবির কবিতা নিয়ে মুক্ত গদ্য লিখতে শুরু করেছিলেন তিনি যা পরে ‘গোঁসাইবাগান’ নামে তিন খণ্ডে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জীবনানন্দ দাশ এবং শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা নিয়ে তাঁর ব্যক্তিগত অনুভূতি ও উপলব্ধি ধরা পড়েছে যথাক্রমে তিনটি বইতে ‘আমার জীবনানন্দ’, ‘আমার শক্তি’ এবং ‘আমার রবীন্দ্রনাথ’। তবে রবীন্দ্রনাথের গান নিয়েই ‘আমার রবীন্দ্রনাথ’ বইটি লিখেছিলেন জয় গোস্বামী। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ এবং পশ্চিমবঙ্গ উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সংসদের পাঠ্যপুস্তকে বাংলা ভাষার পাঠক্রমে জয় গোস্বামীর কবিতা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

এখনো অশীতিপর কবি জয় গোস্বামী কবিতাচর্চায় নিমগ্ন। সম্প্রতি ২০২১ সালে শারদীয় ‘দেশ’ পত্রিকায় ‘এক প্রৌঢ়ের জবানবন্দি’ নামে জয় গোস্বামীর নতুন একটি উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে।   

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

বিধান রায় ছিলেন আদ্যোপান্ত এক রসিক মানুষ। তাঁর রসিকতার অদ্ভুত কাহিনী



বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন