সববাংলায়

কান্তজীউ মন্দির, দিনাজপুর

বিভাগঃ ,

ভারতীয় উপমহাদেশের বিখ্যাত প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান কান্তজীউ মন্দির (Kantajew Temple) বা কান্তনগর মন্দির হল বাংলাদেশের প্রাচীন অঞ্চল দিনাজপুরের একটি জনপ্রিয় মন্দির। মূলত স্থাপত্য শিল্পের উজ্জ্বল নিদর্শন বহনকারী এই মন্দির কাহারোল উপজেলার ঢেপা নদীর তীরে অবস্থিত। মন্দির নির্মাাণের পূর্বে ওই অঞ্চলের নাম ছিল শ্যামগড়, পরবর্তীকালে এই মন্দিরের দেবতা কান্তজীউর নাম অনুসারে ওই অঞ্চলের নাম দেওয়া হয় কান্তনগর। অষ্টাদশ শতকে স্থাপিত এই মন্দিরে ভগবান কৃষ্ণ এবং তাঁর স্ত্রী দেবী রুক্মিণীর পূজা করা হয়। কেবল বাংলাদেশেই নয়, গোটা বিশ্বের পোড়ামাটির অলঙ্কৃত মন্দিরগুলোর মধ্যে অন্যতম সুন্দর মন্দির এটি। এই মন্দির দিনাজপুরের রাজপরিবার ও বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান। বর্তমানে মন্দিরটি দিনাজপুর রাজদেবোত্তর এস্টেটের একটি অংশ, সাথে বাংলাদেশের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরও এই মন্দিরের দেখাশোনা করে। প্রায় তিনশো বছরেরও বেশি সময়ের পুরনো এই নবরত্ন মন্দিরকে ১৯৬০ সালে বাংলাদেশের তৎকালীন সরকার অর্থাৎ পাকিস্তান সরকার সংরক্ষিত প্রাচীন কীর্তি হিসেবে ঘোষণা করেছিল।

হিন্দু পুরাণ মতে, প্রাচীন কালে এই অঞ্চলে শ্রীকৃষ্ণের যুদ্ধ বিগ্রহ মূর্তি অধিষ্ঠিত ছিল। তবে এই মন্দির প্রতিষ্ঠা বিষয়ের প্রধান লোককথা রয়েছে দিনাজপুরের জমিদার কৃষ্ণভক্ত মহারাজ প্রাণনাথকে কেন্দ্র করে। জনশ্রুতি আছে যে, প্রাণনাথ সিংহাসন আরোহণের কয়েক বছরের মধ্যে একটি গভীর ষড়যন্ত্রের সম্মুখীন হন। তবে বিচক্ষণতার সঙ্গে তিনি ওই সংকট কাটিয়ে দিল্লীর সম্রাট ঔরঙ্গজেবের কাছ থেকে রাজা উপাধি লাভের পর দিল্লী থেকে বৃন্দাবন ভ্রমণের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিলেন। বৃন্দাবনে তিনি একটি মন্দিরে রুক্মিণীকান্তের বিগ্রহ দেখে বিমোহিত হন এবং তিনি ঐ রকম একটি মূর্তি নিজের দেশে প্রতিষ্ঠা করে পূজার্চনা করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। এই কারণে তিনি বহু কষ্ট ও অধিক অর্থের বিনিময়ে ওই রকম একটি বিগ্রহ সংগ্রহ করে তা তিনি নিজের রাজ্যে স্থাপন করেছিলেন।

আবার অন্য মতে, মহারাজ প্রাণনাথ বৃন্দাবনের একটি কৃষ্ণমূর্তি সঙ্গে করে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিলে একরাতে স্বপ্নে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে নিষেধ করেন। ভগবান তাঁকে বলেন যে, ওই কৃষ্ণমূর্তি না নিয়ে পরের দিন নদীতে স্নানের সময় তিনি যে মূর্তি লাভ করবেন তা গ্রহণ করতে। তিনি স্বপ্ন অনুসারে পরের দিন স্নানের সময় একটি কৃষ্ণমূর্তি লাভ করেছিলেন, যা দিনাজপুরের কান্তজীউ মন্দিরে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন। এছাড়া এই মন্দির প্রতিষ্ঠা বিষয়ের আরও একটি জনশ্রুতি আছে যে, প্রাণনাথ নৌবহরে আসার সময় তার বহর এক জায়গায় থেমে যায় এবং সেখানেই তিনি একটি কৃষ্ণমূর্তি পেয়েছিলেন। এরপর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং স্বপ্নে তাঁকে ওই মূর্তিতে প্রাণ প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়েছিলেন।

যাই হোক, মন্দিরের উত্তরের শিলালিপি থেকে জানা যায় যে, মহারাজা প্রাণনাথের তত্ত্বাবধান ও পৃষ্ঠপোষকতায় এই মন্দিরের নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছিল ১৭০৪ সালে। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের প্রধান দেবতা শ্রীকৃষ্ণের ১০৮টি নামের একটি হচ্ছে শ্রীকান্ত বা রুক্মিণীকান্ত। শ্রীকৃষ্ণের নামের এই কান্ত শব্দটি দিয়েই জমিদার প্রাণনাথ মন্দিরটির নাম রাখেন কান্তজীউ মন্দির। কান্ত অর্থাৎ কৃষ্ণ এবং জীউ বা জী শব্দটি ব্যবহৃত হয় সম্মানার্থে। তবে প্রাণনাথ নিজের জীবদ্দশায় এই মন্দিরের নির্মাণ কাজ শেষ করতে পারেননি। প্রাণনাথের মৃত্যুর পর তাঁর পালিত পুত্র রাজা রামনাথ ১৭২২ সালে আবার কোনমতে ১৭৫২ সালে মন্দির নির্মাণের কাজ সমাপ্ত করেছিলেন। ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে এই মন্দির ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর রাজা গিরিজনাথ মন্দিরের সংস্কার করলেও মন্দিরের চূড়াগুলো আর নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি।

প্রায় ১ মিটার উঁচু বর্গাকার বেদীর উপর কান্তজীউ মন্দির নির্মাণ করা হয়েছিল। তিন তল বিশিষ্ট এই মন্দিরের নয়টি চূড়া বা শিখর ছিল ভূমিকম্পের পর যা একেবারেই নষ্ট হয়ে যায়। মন্দিরের প্রথম তলার চার কোণে চারটি, দ্বিতীয় তলার চারকোণে চারটি এবং তৃতীয় তলার মূল চূড়াসহ মোট নয়টি চূড়া ছিল। শোনা যায় যে, এই মন্দিরের শীর্ষ চূড়ায় একটি পিতলের ধর্ম পতাকা ছিল, যার উচ্চতায় ছিল প্রায় ১২ ফুট ও ওজন ছিল প্রায় ৭ মণ। প্রথম দিকে কান্তজীউ মন্দিরের উচ্চতা ছিল ৭০ ফুট। ভূমিকম্পের পর মন্দিরের উচ্চতা কমে হয় ৫০ ফুট। কান্তজীউ মন্দিরের প্রতিটি তলার চারপাশে বারান্দা রয়েছে। মন্দিরের পশ্চিম দিকে দ্বিতীয় বারান্দা থেকে ওপরের দিকে ওঠার জন্য একটি অন্ধকারাচ্ছন্ন সিঁড়ি আছে। মন্দিরের নীচের তলায় ২৪টি, দ্বিতীয় তলায় ২০টি এবং তৃতীয় তলায় ১২টি দরজা রয়েছে। চতুর্ভুজ আকৃতির এই মন্দিরের নীচের তলায় বহু খাঁজযুক্ত খিলানের প্রবেশপথ রয়েছে এবং দুটি সুন্দর ইটের স্তম্ভ দিয়ে খিলানগুলো আলাদা করা আছে। ওই প্রবেশপথ দিয়ে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে ভিতরের সুন্দর দেবমূর্তি। মূল গর্ভগৃহের চারপাশ জুড়ে রয়েছে কয়েকটি ক্ষুদ্র ঘর। এই মন্দিরের ক্ষুদ্রাকৃতি গর্ভগৃহে পর্যাপ্ত আলোর অভাব বেশ অনুভূত হয়। মন্দির নির্মাণের পর রাজা মন্দিরের বাইরের দিকে একটি প্রাচীরও নির্মাণ করেছিলেন।

ইট-বালি টেরাকোটা ও কঠিন পাথরের সংমিশ্রণে এই মন্দির তৈরি করা হয়েছিল। ধারণা করা হয়, কান্তজীউ মন্দির নির্মাণে ব্যবহৃত পাথর আনা হয়েছিল হিমালয়, আসামের পার্বত্যাঞ্চল, বিন্ধ্যাঞ্চল ও বিহারের রাজমহল পাহাড় থেকে। বাংলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পুরাকীর্তি এই মন্দিরটি মূলত তার টেরাকোটা শিল্পকর্মের জন্যই জগৎ বিখ্যাত। পুরো মন্দির জুড়ে প্রায় ১৫০০০ এর মতো টেরাকোটার ফলক রয়েছে। অবিভক্ত বাংলার সবথেকে সুন্দর এই মন্দিরের টেরাকোটা ও ইটগুলো স্থানীয় নদী ও পুকুরের এটেঁল মাটি দিয়ে তৈরি হয়েছিল বলে মনে করা হয়। ওই মাটি আগুনে পুড়িয়ে রক্তের মতো লালবর্ণের করা হত, তারপর ওই মাটির উপর ইটের কাজ ও টেরাকোটা কাজ করতেন স্থানীয় হিন্দু-মুসলিম মিস্ত্রি ও কারিগররা। এছাড়া প্রচলিত আছে যে, পারস্য থেকেও কারিগর এসেছিল এই মন্দির নির্মাণ করতে তাই মন্দিরে টেরাকাটার অলঙ্কারের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি ইন্দো-পারস্য স্থাপনা কৌশলও লক্ষ করা যায়। বাংলাদেশে টেরাকোটার স্থাপত্যের অনন্য এই নিদর্শনের একদিকে যেমন রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলা, দেবদেবীর মানবিক চিত্র রামায়ণ ও মহাভারতের ঘটনা সম্বলিত পৌরাণিক ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল, আবার অন্যদিকে লক্ষ করা যায় মুঘল আমলের বাংলার সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ছবি। এছাড়া পোড়ামাটির ওই ফলক চিত্রগুলিতে উদ্ভিদ, প্রাণীকুল, জ্যামিতিক নকশা, তদানীন্তন সামাজিক ও অবসর বিনোদনের চমৎকার দৃশ্য খোদিত করা আছে।

প্রাচীনকালে বৃন্দাবন থেকে প্রাণনাথ রায়ের আনা কৃষ্ণমূর্তিটি এখন কান্তজীউ মন্দিরে আর নেই। রাসযাত্রার সময় আবার অনেকের মতে ভূমিকম্পের সময়েই মূর্তিটি চুরি হয়ে গিয়েছিল। তবে বর্তমানে মন্দিরের নীচের তলায় কান্তজীউ ও দেবী রুক্মিণীর একটি যুগল বিগ্রহ দেখা হয়।

সারা বছর বহু মানুষ এই মন্দিরে কৃষ্ণ ও তাঁর স্ত্রী রুক্মিণীর দর্শন লাভের পাশাপাশি মন্দিরের টেরাকোটার কাজ দেখতে আসেন। তবে রাসমেলা উপলক্ষে এই মন্দিরে সর্বাধিক ভিড় হয়। প্রতি বছর শীতের শুরুতে মন্দির প্রাঙ্গণে প্রায় এক মাস ধরে চলে রাসমেলা। এই মেলা রাজা রামনাথ রায়ের শাসনকাল থেকে একই প্রথা মেনে পালিত হচ্ছে। এ সময় বাংলাদেশসহ গোটা ভারতীয় উপমহাদেশের অনেক তীর্থযাত্রী এই মন্দিরে আসে। রাস উৎসব ছাড়া মহাসমারোহে জ্যৈষ্ঠ বা আষাঢ় মাসে এই মন্দিরে অনুষ্ঠিত হয় শ্রীকৃষ্ণের স্নানযাত্রা। এ সময়ে গোটা কান্তনগরে থাকে হাজার হাজার কৃষ্ণ ভক্তদের উপচে পড়া ভিড়। আবার ফাল্গুন মাসের দোল পূর্ণিমা উপলক্ষেও মন্দিরে জমজমাট সমারোহের আয়োজন করা হয়।

বৃন্দাবন থেকে রাজা প্রাণনাথ কৃষ্ণ মূর্তি নিয়ে আসার সময় মাঝে মাঝে নিজের রাজবাড়িতে কৃষ্ণের পুজো করতে চেয়েছিলেন। আর এরপর জন্মাষ্টমী উপলক্ষে তিনি ওই মূর্তি রাজবাড়িতে নিয়ে যান। সেই থেকে এখনও প্রাচীন প্রথা অনুসরণ করে ভাদ্র মাসের অষ্টমী তিথিতে নদী পথে নৌকায় করে বাদ্য বাজনা সহকারে মন্দিরের শ্রীকৃষ্ণের বিগ্রহ দিনাজপুরের রাজবাড়ির মন্দিরে নিয়ে যাওয়া হয় এবং প্রায় তিন মাস সেখানে থাকার পর রাস পূর্ণিমার সময় শ্রীকৃষ্ণের বিগ্রহ কান্তজীউ মন্দিরে আবার ফিরিয়ে আনা হয়।

কান্তজীউ মন্দির বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের এক মূর্ত প্রতীক। এই মন্দিরটি শুধু একটি অঞ্চলের সাংস্কৃতিক পরিচয়কে তুলে ধরে না, বরং দেশের পর্যটন শিল্পেও কান্তজীউ মন্দিরটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই মন্দিরের সূক্ষ্ম পোড়ামাটির কাজ এবং স্থাপত্য নকশা সাধারণ দর্শনার্থীদের বিস্মিত করে। এই মন্দিরের শৈল্পিক সৌন্দর্য ও ঐতিহাসিক গুরুত্বের কারণে বর্তমানে মন্দিরটিকে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার জন্য প্রচেষ্টা চলছে।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading