সববাংলায়

করম দেবতা | করম পরব

বাংলার লোকঐতিহ্যের নানা স্তর। সেখানে লৌকিক দেবদেবীদের একটি স্বতন্ত্র গুরুত্ব রয়েছে। বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে সন্ধান করলে অসংখ্য প্রান্তিক দেবদেবীর হদিশ পাওয়া যাবে। কেবল দেবতাই নয়, তাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা পরবগুলিও বাংলার লোকসংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। বাংলা এবং বাংলার বাইরেও পূজিত হন তেমনই একজন দেবতা হলেন করম দেবতা (Karam Devta) ও তাঁকে কেন্দ্র করে হয় করম পরব (Karam Parab)। মূলত পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, ঝাড়গ্রাম ইত্যাদি অঞ্চলের প্রান্তজন অর্থাৎ বাউরি, খেড়িয়া, শবর, কোড়া, বাগদি, হাড়ি, মুন্ডা, সাঁওতাল প্রভৃতি জনজাতির মধ্যে এই করম দেবতার পূজার এবং তাকে কেন্দ্র করে আয়োজিত করম পরবের প্রচলন রয়েছে। কৃষিকাজ এবং আরও বড় অর্থে বললে সৃষ্টির সঙ্গে করম দেবতার সরাসরি সংযোগ রয়েছে। কৃষ্ণের সঙ্গেও করমকে একাত্ম করে দেখবার একটা প্রবণতা লক্ষ করা যায়। তবে সাধারণভাবে বলতে গেলে শস্যকে অশুভ শক্তির কুদৃষ্টি থেকে রক্ষা করতে এবং ফলন বৃদ্ধি ও সারা বছর কৃষিজমি সবুজ থাকার প্রার্থনা জানিয়ে বিশেষ বিশেষ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ করম দেবতার পূজা করে থাকেন।

করম ঠাকুর অনেক সময় আদিবাসীদের নিকট করম রাজা নামে পরিচিত। এই করম ঠাকুর মূলত কর্মের প্রতীক। কর্ম শব্দটিরই সহজ উচ্চারণরূপ হয় করম। গবেষকেরা মনে করেন আদিবাসী সমাজে বহু প্রাচীনকাল থেকে, কৃষিকাজের উদ্ভবের সঙ্গে সঙ্গেই করম দেবতারও পূজার প্রচলন হয়েছিল। সুহৃদকুমার ভৌমিক একটি প্রবন্ধে লিখেছেন যে, ‘ব্রাহ্মণ্যশাসিত হিন্দু সমাজে এই করম রাজাই কর্মবীর শ্রীকৃষ্ণ।’ করম পূজাকে কৃষিভিত্তিক পূজা বলে মনে করা হয় বলে সুহৃদকুমার মন্তব্য করেছেন যে, ‘করমকে যদি কৃষ্ণই ধরা হয় তাহা হইলেও কৃষ্ণ শব্দের মৌলিক অর্থ কিষাণ বা কৃষক’। এছাড়াও করম পরবে করম গাছ যাকে কদম গাছ হিসেবে উল্লেখ করেছেন উক্ত প্রাবন্ধিক, সেই কদম্ব বৃক্ষের সঙ্গেও শ্রীকৃষ্ণের আখ্যানের সাযুজ্য রয়েছে। উল্লিখিত প্রবন্ধ থেকেই নৃতাত্ত্বিক নির্মলকুমার বসুর মত জানতে পারা যায়। নির্মলবাবুর মতে, শ্রীচৈতন্যদেবের আবির্ভাব এবং বিপুল প্রভাবের ফলে রাঁচি অঞ্চলের মুন্ডারা বৈষ্ণব ধর্ম গ্রহণ করেছিল। কিন্তু তাদের গান বৈষ্ণব পদাবলী হিসেবে নয়, করম গান হিসেবে পরিচিত। মুন্ডাদের এই বৈষ্ণব ধর্ম গ্রহণের পিছনে যে আসলে বহুপূর্ব থেকে করম ঠাকুর ও কৃষ্ণের মিলমিশের তত্ত্বই সক্রিয় তাও স্পষ্টত উল্লেখ করা আছে।

করম পূজায় যে ব্রতকথা পড়বার রীতি রয়েছে, সেই ব্রততে রয়েছে করম ঠাকুরকে কেন্দ্র করে এক কাহিনি। করম ও ধরম (মতান্তরে কারু ও ধারু) ছিলেন দুই যমজ ভাই। ধরম প্রচন্ড বৈষয়িক মানুষ হলেও করম ছিলেন একেবারে বিপরীত, ধার্মিক এক মানুষ। সবসময় তিনি করম গাছের এক ডাল নিয়ে পূজা করতেন কিন্তু ধরমের তা একেবারেই পছন্দ ছিল না। একদিন ধরম অবজ্ঞা ভরে সেই ডাল ভেঙে দূরে ফেলে দিয়েছিলেন। এই ঘটনার সঙ্গে সঙ্গেই প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দেয়। দুইভাইয়ের সমস্ত পৈতৃক সম্পত্তি, গরু, ছাগল, ঘর-জমি সব বিনষ্ট হয়ে যায়। বিত্তবান থেকে একেবারে দেউলিয়া হয়ে যান তাঁরা। করম তখন ধরমকে উপদেশ দেন যে ভক্তিভরে করম রাজার পূজা করতে, তিনি ধরমের আচরণে রুষ্ট হয়েছেন। ধরম রাজি হল ভাইয়ের কথায় এবং বহু কষ্ট সহ্য করে দেশ-দেশান্তর অতিক্রম করে করম রাজার আদি অধিষ্ঠানে গিয়ে তাঁকে তুষ্ট করলেন। করম রাজা সন্তুষ্ট হয়ে ধরমকে নিজের গাছের একটি শাখা নিয়ে ঘরে ফিরে যেতে বললেন এবং ভাদ্র মাসের শুক্লা একাদশীর দিন সেই শাখাটিকে পূজা করলে যে তাঁরা তাঁদের সম্পত্তি পুনরায় ফিরে পাবে ও তার বৃদ্ধিও ঘটবে, সেকথাও বলে দিলেন। সেই ব্রতকথার কাহিনি অনুযায়ী এভাবেই সারাদেশে করম পূজার প্রচলন হয়েছিল।

অনুরূপ আরও একটি কাহিনিও অবশ্য প্রচলিত রয়েছে। এক গ্রামে সাত ভাই থাকত। তারা মাঠে সারাদিন চাষের কাজ করত এবং এতই পরিশ্রম করতে হত যে দুপুরে বাড়ি ফিরে তাদের খাওয়ার সময় পর্যন্ত হতো না। সেই কারণে তাদের স্ত্রীয়েরা মাঠে তাদের জন্য খাবার বহন করে নিয়ে যেত। কিন্তু একদিন মাঠে খাবার নিয়ে কেউ গেল না। সারাদিন পরিশ্রমের পর ভাইয়েরা বাড়ি ফিরে দেখে তাদের বউয়েরা একটি করম গাছকে ঘিরে নাচছে এবং গান করছে। স্বামীদের প্রতি কর্তব্য ভুলে স্ত্রীদের এমন আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে ভাইয়েরা সেই করম গাছের ডাল ছিঁড়ে নদীতে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। এই ঘটনার পর তাদের পরিবারের ওপর কালো ছায়া নেমে আসে। খুবই কষ্টের দিন শুরু হয় তাদের, অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ হতে শুরু করে। অবশেষে পুরোহিতের পরামর্শে করম দেবতার সন্ধান করে তারা তাঁকে বাড়ি নিয়ে আসে এবং ভক্তিভরে পূজা করে আশীর্বাদ প্রার্থনা করে। মূলত ঝাড়খণ্ড অঞ্চলে এই গল্প প্রচলিত।

মূলত ভাদ্র মাসের শুক্লা একাদশীতে করম পূজার আয়োজন করা হয়ে থাকে। পুজোর জন্য প্রথমে গভীর বন থেকে করম গাছের দুটি শাখা সংগ্রহ করে নিয়ে আসবার উদ্দেশ্যে কিশোর, কিশোরী, বাজনদারদের একটি দল অপূর্ব শোভাযাত্রা করে যায় জঙ্গলের দিকে। করম গাছের কাছে নিবেদন জানিয়ে সেখান থেকে দুটি শাখা নেওয়া হয়। কিশোরীরা সেই শাখাতে সিঁদুর মাখিয়ে তাদের গায়ে হলুদ ও লাল সুতো জড়িয়ে দেয়। শাখার নিম্নাংশে লাল গামছা জড়িয়ে তাকে বহন করে নিয়ে আসা হয় পূজার জন্য নির্বাচিত নির্দিষ্ট স্থানে। সেখানে পাহানের সহকারী ডাল দুটিকে আখড়া প্রাঙ্গনের বেদীতে প্রোথিত করে দেয়। পূজার দায়িত্ব সকলের হয়ে পালন করেন গ্রামপতি। বেদীর পাশে কিশোরীরা ছোট ছোট ঝুড়ি এনে রাখে, তাতে যব, জনার, ছোলা ইত্যাদি নয় রকমের শস্য রোপণ করা হয়। এই ধরনের ঝুড়িকে বলে ‘জাওয়া ডালি’। জাওয়া শব্দের অর্থ জন্মানো। মেয়েরা সাত থেকে নয়দিন সেই শস্যবীজের যত্ন নেয়। সন্তানবতী মেয়েরা আবার ছোট ছোট আধারে সিঁদুর মাখানো কচি শশা এনে রাখে বেদীর পাশে। সেই শশাগুলি তাদের সন্তানের প্রতীক। মেয়েরা পুজোতে সারাদিন উপবাস করে থাকে।

রাতের প্রথম প্রহরে গ্রামপতি ও তাঁর সহকারীরা পূজা আরম্ভ করেন। সকলেই যোগ দেয় পূজোতে। বিশেষ কোন মন্ত্র নেই, কেবল অপদেবতার হাত থেকে শস্যকে রক্ষা করবার প্রার্থনা। নৈবেদ্যের মধ্যে দেখা যায় কলা, আলোচাল, হরিতকী, দুধ, দই, এমনকি হাড়িয়াও থাকে। করম রাজার প্রিয় খাদ্য খিচুড়ি। তবে এই খিচুড়ি অন্যরকম হয়। ডাল, চালের সঙ্গে বলির পশুপক্ষীর মাথা মেশানো থাকে। ঐ অঞ্চলের লোকেরা তাকে ‘তাহিরে’ বলে। এখানে উল্লেখ্য যে, করম পূজার সঙ্গে বলির যোগ থাকলেও বৈষ্ণব ধর্মের প্রভাবে অনেক স্থানেই বলি প্রথা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তবে যেসব জায়গায় বলি প্রচলিত আছে সেখানে করম পূজায় মূলত ছাগ ও পায়রাই বেশি বলি হয়। কোথাও কোথাও আবার অস্ত্র প্রয়োগ করে বলি দেওয়া হয় না, তার বদলে পশুপক্ষীগুলির শ্বাসরোধ করে মেরে দেবতাকে উৎসর্গ করা হয়। বলির পরেই গ্রামপতি ব্রতকথা শোনানো আরম্ভ করেন।
করম পূজায় নৃত্য ও গীতের বিশেষ ভূমিকা আছে। ব্রতকথা শেষ হয়ে গেলে আসে এই নৃত্যগীতের পালা। যে বিশেষ ধরনের নাচ করম পূজায় করা হয় তা ‘করম-নাচ’ বা ‘পাতা-নাচ’ নামে পরিচিত। কিশোরী মেয়েরা করমের কাছে প্রার্থনা জানিয়ে নানারকম গান করে থাকে। করম গানের কিছু লাইন উদ্ধৃত করা হল — “করম কাটি কুটি অখাড়ায় থাপন করি;/সখী সব করে একাদশী,/আজরে করম ভেল রাতি—।” কিংবা “বড়দাদা মাঙিতে গেলে মু/ডুবি ভরাই দিব গো—/ভাইকে খাওয়াব গুঝিগুঝি/পান গো—।/পান গো—”।

স্থানভেদে করম দেবতার পূজাতেও ভিন্ন ভিন্ন রীতি চোখে পড়ে। যেসব জায়গায় করম গাছ পাওয়া যায় না সেখানে নিমগাছ, গম্ভীরা গাছ বা সিজ গাছের ডাল করম দেবতার প্রতীক হিসেবে পূজা করা হয়ে থাকে। কোথাও কোথাও আবার দেখা যায় করমরাজা ও করমরাণীর বিবাহ দেওয়া হয়। কোন কোন স্থানে পূজার শেষে করম গাছ বিসর্জন দেওয়া অবশ্যকৃত্য হিসাবে পালিত হয়। অন্যদিকে বিহার প্রদেশে আবার বৃক্ষশাখার পরিবর্তে দুটি গর্ত করে সেখানে কুশ গাছ পুঁতে পুজো করা হয়। উল্লেখ্য যে, মেদিনীপুর ও বাঁকুড়া জেলার বর্ণহিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ এবং সামন্ত বংশীয় রাজারাও কিন্তু করম পূজা করে থাকেন। তবে তাঁদের পুজোয় আবার ব্রাহ্মণ নিযুক্ত করা হয় এবং সেখানে শাস্ত্রীয় এবং লৌকিক আচারের একটা মিশেল চোখে পড়ে। প্রান্তিক জনজাতির নিজস্ব সংস্কৃতি এইভাবেই কোথাও কোথাও সমাজের মুখ্যধারার ধর্মীয় সংস্কৃতির একটা অংশ হয়ে উঠেছে।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

তথ্যসূত্র


  1. ‘বাংলার লৌকিক দেবতা’, গোপেন্দ্রকৃষ্ণ বসু, দে’জ পাবলিশিং (পরিবর্ধিত প্রথম দে’জ সংস্করণ), কলকাতা, এপ্রিল, ১৯৭৮।
  2. ‘বাংলার বনদেবতা’, তুলিকা মজুমদার, সম্পাদক, পুস্তক বিপনি, কলকাতা, ডিসেম্বর, ১৯৬০।
  3. https://en.m.wikipedia.org/
  4. https://www.karmapuja.org/
  5. https://tribaldarshan.com//
  6. https://theindiantribal.com/

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading